Conflict over Crude Oil

‘তরল সোনা’র দখলদারি নিয়ে দড়ি টানাটানি, তেলের কুয়োয় বসে ‘দুই হুজুরের’ স্বার্থের সংঘাতে উত্তপ্ত হচ্ছে বাগদাদও!

আগামী এক দশকে ইরাকের খনিজ তেলকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হতে পারে পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতি। কারণ, বাগদাদের ‘তরল সোনা’কে কেন্দ্র করে স্বার্থের সংঘাতে জড়িয়েছে চিন, আমেরিকা-সহ পশ্চিমি দুনিয়া এবং ওপেক।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:০০
০১ ১৯
Iraq’s Political Future May Decide China vs West Oil Power Balance

বাগদাদের ‘তরল সোনা’য় ড্রাগনের ‘কুনজর’! লগ্নি আর পরিকাঠামোগত উন্নতির নামে ধীরে ধীরে টাইগ্রিস নদীর পার্শ্ববর্তী তৈলক্ষেত্রগুলিকে কব্জা করছে চিন। বিষয়টা বুঝতে পেরে পাল্টা চালে বেজিংকে বিপদে ফেলতে তৎপর আমেরিকা। তার জন্য নতুন করে ঘুঁটি সাজাতে হচ্ছে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের পারের ‘সুপার পাওয়ার’কে। এই দুই মহাশক্তিধরের পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার স্বার্থের সংঘাতে জড়িয়েছে খনিজ তেল রফতানিকারী দেশগুলির সংগঠন ওপেকও। এই ‘যুদ্ধ’ ২০২৬ সালে ইরাকবাসীর ভাগ্য পুরোপুরি বদলে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

০২ ১৯
Iraq’s Political Future May Decide China vs West Oil Power Balance

পশ্চিম এশিয়ায় খনিজ তেলসমৃদ্ধ আরব রাষ্ট্রগুলির মধ্যে অন্যতম হল ইরাক। ‘তরল সোনা’র ভান্ডারের নিরিখে বাগদাদের স্থান বিশ্বে পঞ্চম। বর্তমানে মাটি বা সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা মোট খনিজ তেলের আট থেকে নয় শতাংশ রয়েছে প্রাচীন ব্যাবিলনীয় সভ্যতার এই দেশে। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, গত বেশ কয়েক বছর ধরেই ইরাকের এক-তৃতীয়াংশ তৈলক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করছে কোনও না কোনও চিনা সংস্থা। বিষয়টিকে কেন্দ্র করে আরব মুলুকটিতে দিনকে দিন তীব্র হচ্ছে স্বার্থের সংঘাত।

০৩ ১৯
Iraq’s Political Future May Decide China vs West Oil Power Balance

১৯৭৯ সালে ইরাকের ক্ষমতা দখল করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পয়লা নম্বর শত্রু সাদ্দাম হুসেন। প্রেসিডেন্ট হিসাবে বাগদাদের কুর্সিতে বসেই দেশের যাবতীয় তেল সংস্থাগুলির জাতীয়করণ করেন তিনি। শুধু তা-ই নয়, তাঁর আমলে ধীরে ধীরে পশ্চিম এশিয়ার আরব মুলুকটি থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেয় একাধিক বিদেশি সংস্থা। এর সিংহভাগই ছিল ওয়াশিংটনের। পাশাপাশি নতুন করে ইউরোপ এবং আমেরিকার বিনিয়োগ আসাও পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছিলেন সাদ্দাম।

Advertisement
০৪ ১৯
Iraq’s Political Future May Decide China vs West Oil Power Balance

২১ শতকের গোড়াতেই সেনা অভিযান চালিয়ে ইরাক দখল করে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে ২০০৩ সালের এপ্রিলে পতন হয় সাদ্দামের। তত দিনে অবশ্য আর্থিক ভাবে কোমায় চলে গিয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাগদাদ। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে আরব মুলুকটিতে ‘বন্ধু’র ছদ্মবেশে পা রাখে চিন। একে বেজিঙের ‘মাস্টারস্ট্রোক’ বলে মেনেছেন দুনিয়ার তাবড় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা।

০৫ ১৯
Iraq’s Political Future May Decide China vs West Oil Power Balance

পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির একাংশের অবশ্য দাবি, সাদ্দামের আমল থেকেই ইরাকি অর্থনীতিতে ‘অনুপ্রবেশ’ ঘটে চিন এবং রাশিয়ার। বাগদাদ থেকে সস্তায় বিপুল পরিমাণে খনিজ তেল কেনা শুরু করে মস্কো ও বেজিং। বিনিময়ে আরব রাষ্ট্রটির একাধিক পরিকাঠামোগত ক্ষেত্রে বিপুল বিনিয়োগ করে তারা। রাস্তা, বিমানবন্দর এবং পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বিষয়গুলি গড়ে ওঠে ক্রেমলিন এবং ড্রাগনের বদান্যতায়। পাশাপাশি ইরান, কুয়েত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লাগাতার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার হাতিয়ারও রাশিয়ার থেকে পেয়েছিলেন সাদ্দাম।

Advertisement
০৬ ১৯
Iraq’s Political Future May Decide China vs West Oil Power Balance

চিন কিন্তু শুধুমাত্র বাগদাদের তেল কিনেই চুপ করে বসে থাকেনি। সাদ্দাম জমানায় পশ্চিমি সংস্থাগুলির ইরাকত্যাগ নিশ্চিত হতেই আরব মুলুকটির সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে থাকে বেজিং। পরবর্তী দশকগুলিতে দু’তরফে সই হয় একাধিক চুক্তি। এর জেরে টাইগ্রিস নদীর তেলক্ষেত্রগুলিতে ঢুকে পড়ার সুযোগ পায় ড্রাগন। ২০২৬ সালে তা তাদের সামনে সৌভাগ্যের দরজা খুলে দিয়েছে, বলছেন বিশ্লেষকেরা।

০৭ ১৯
Iraq’s Political Future May Decide China vs West Oil Power Balance

বর্তমানে ইরাকের মোট খনিজ তেল উত্তোলনের প্রায় ৩৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে চিন। বেজিঙের সংস্থাগুলির হাত ধরে দৈনিক ৩০ লক্ষ ব্যারেল ‘তরল সোনা’ খনি থেকে তুলতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করতে পারছে বাগদাদ, যা আরব দেশটির মোট তৈল উৎপাদনের দুই-তৃতীয়াংশ। এই পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে আসতেই ভুরু কুঁচকেছে আমেরিকা-সহ পশ্চিমি দুনিয়া। স্বার্থের সংঘাতের সূত্রপাত সেখানেই।

Advertisement
০৮ ১৯
Iraq’s Political Future May Decide China vs West Oil Power Balance

সাদ্দাম পতনের পর থেকে ফের ধীরে ধীরে ইরাকে ফিরতে শুরু করে একাধিক পশ্চিমি তেল সংস্থা। উদাহরণ হিসাবে ফরাসি কোম্পানি টোটাল এনার্জির কথা বলা যেতে পারে। বাগদাদের সামুদ্রিক তৈলক্ষেত্রে ২,৭০০ কোটি ডলারের বেশি লগ্নি করেছে তারা। সেখান থেকে ‘তরল সোনা’ তোলার পরিকাঠামো প্রকল্পের নির্মাণকাজও প্রায় শেষ করে এনেছে তারা। দৈনিক ২.১ লক্ষ ব্যারেল তেল ওই খনিগুলি থেকে তোলা হবে বলে গত বছরের সেপ্টেম্বরে জানায় টোটাল এনার্জি।

০৯ ১৯
Iraq’s Political Future May Decide China vs West Oil Power Balance

ফ্রান্সকে বাদ দিলে ইরাকি তেলে ২,৫০০ কোটি ডলার লগ্নি করেছে বহুজাতিক ব্রিটিশ জ্বালানি সংস্থা বিপি। বাগদাদের উত্তর অংশের তেলক্ষেত্রগুলির উপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে তাদের। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক সংস্থা শেভরন এবং এক্সনমোবিলের মতো সংস্থাও পশ্চিম এশিয়ার ওই আরব দেশটির জ্বালানি ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে লগ্নি বাড়াচ্ছে। সেটা একেবারেই পছন্দ নয় বেজিঙের।

১০ ১৯
Iraq’s Political Future May Decide China vs West Oil Power Balance

ইরাকের উপর পশ্চিম দুনিয়ায় প্রভাব কমাতে সেখানকার ‘তরল সোনা’র বাজারে ঝাঁপিয়েছিল রাশিয়াও। লম্বা সময় ধরে বাগদাদের দু’টি তৈলক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করত মস্কোর সংস্থা। কিন্তু, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্রেমলিনের ফৌজ ইউক্রেন আক্রমণ করলে আমূল বদলে যায় পরিস্থিতি। পূর্ব ইউরোপে যুদ্ধ শুরু হতে না হতেই রাশিয়ার উপর ১৬ হাজারের বেশি নিষেধাজ্ঞা চাপায় আমেরিকা-সহ পশ্চিমি দুনিয়া। এর পর আর মস্কোর সংস্থাকে তেল উৎপাদন থেকে দূরে সরিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র দেরি করেনি বাগদাদ।

১১ ১৯
Iraq’s Political Future May Decide China vs West Oil Power Balance

অন্য দিকে ২০১৯ সালে ইরাকের সঙ্গে ‘তরল সোনা’র উত্তোলন নিয়ে বড় চুক্তি করে চিন। এর পোশাকি নাম ছিল ‘অয়েল ফর রিকনস্ট্রাকশন’। তত দিনে অবশ্য যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির অর্থনীতি অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। পরবর্তী দু’বছরের মাথায় (পড়ুন ২০২১ সালে) বেজিঙের সঙ্গে আরও তিনটি সমঝোতায় সই করে বাগদাদ। ফলে মাত্র দুই থেকে চার ডলারে সেখানকার অপরিশোধিত খনিজ তেল হস্তগত করার সুযোগ চলে আসে ড্রাগনের হাতে।

১২ ১৯
Iraq’s Political Future May Decide China vs West Oil Power Balance

এ ছাড়া কৌশলগত অবস্থানের কথা মাথায় রেখে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ বা বিআরআই প্রকল্পে ইরাককে জড়িয়ে ফেলেছে চিন। এর মাধ্যমে পশ্চিম এশিয়ার দেশটিতে বড় বড় রাস্তা এবং সেতু নির্মাণের কাজ করছে বেজিঙের একাধিক সংস্থা। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটির নকশা বেশ বিপজ্জনক। কারণ, এর মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরের তীর পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে ড্রাগন। সেটি ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য এবং প্রয়োজনে যুদ্ধের সময় সামরিক দিক থেকে মান্দারিনভাষীদের বাড়তি সুবিধা দেবে।

১৩ ১৯
Iraq’s Political Future May Decide China vs West Oil Power Balance

আন্তর্জাতিক বাজারে খনিজ তেল রফতানিকারী দেশগুলির সংগঠন ওপেকের নেতৃত্ব দিয়ে থাকে সৌদি আরব। ‘তরল সোনা’র দর বেশি রাখতে মাঝেমধ্যেই সদস্য রাষ্ট্রগুলিকে এর উত্তোলন কমাতে বলে রিয়াধ। আগামী দিনে মার্কিন, ব্রিটিশ এবং ফরাসি সংস্থাগুলি নিজেদের স্বার্থে ইরাকে খনিজ তেলের উৎপাদন বৃদ্ধি করলে বিশ্ব বাজারে কমতে পারে এর দাম। সে ক্ষেত্রে লোকসানের মুখে পড়বে সৌদি। এর জেরে তৈরি হতে পারে আঞ্চলিক অস্থিরতা।

১৪ ১৯
Iraq’s Political Future May Decide China vs West Oil Power Balance

সাদ্দামের পতনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দের সরকারই শাসন করছে ইরাক। বিশেষজ্ঞদের দাবি, জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির জেরে কোনও কারণে তারা প্রশাসন থেকে সরলে আরও জটিল হতে পারে পরিস্থিতি। এতে বাগদাদের উপরে হঠাৎ করে কমে যাবে আমেরিকার প্রভাব। সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পূর্ণ শক্তিতে ঝাঁপাতে পারে চিন এবং রাশিয়ার মতো ‘সুপার পাওয়ার’ দেশগুলি।

১৫ ১৯
Iraq’s Political Future May Decide China vs West Oil Power Balance

ইরাকের তৈলক্ষেত্রের একটা বড় অংশ এখনও ছোঁয়া যায়নি বলে বিশ্বাস করে পশ্চিমি দুনিয়া। গত বছরের ২০ জানুয়ারি নতুন একটি অপরিশোধিত খনিজ তেলের কুয়ো আবিষ্কারের কথা ঘোষণা করে সেখানকার তেল সংস্থা ‘ইরাকি মিডল্যান্ড অয়েল’ (আইএমও)। অশোধিত ‘তরল সোনা’র খনিটি রাজধানী বাগদাদের পূর্ব দিকে অবস্থিত বলে জানা গিয়েছে।

১৬ ১৯
Iraq’s Political Future May Decide China vs West Oil Power Balance

ইরানি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই তৈলক্ষেত্রটিতে ২০০ কোটি ব্যারেল হালকা এবং মাঝারি শ্রেণির অপরিশোধিত খনিজ তেল জমা রয়েছে। আইএমওর ডিরেক্টর জেনারেল মহম্মদ ইয়াসিন হাসান জানিয়েছেন, ওই কূপটি থেকে দিনে পাঁচ হাজার ব্যারেল অশোধিত ‘তরল সোনা’ উৎপাদন করা যেতে পারে। তবে সেটা এখনও শুরু হয়নি।

১৭ ১৯
Iraq’s Political Future May Decide China vs West Oil Power Balance

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাগদাদের কাছে মজুত রয়েছে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল। অর্থাৎ, পশ্চিম এশিয়ায় মোট জমে থাকা ‘তরল সোনা’র ১৭ শতাংশের মালিকানা আছে ইরাকের হাতে। নতুন তৈলক্ষেত্র আবিষ্কারের জেরে অনেকটাই বাড়ল সেই পরিমাণ। এতে তেল মজুতের ক্ষেত্রে রিয়াধের সঙ্গে বাগদাদের ফারাক কমবে বলেও মনে করা হচ্ছে।

১৮ ১৯
Iraq’s Political Future May Decide China vs West Oil Power Balance

নতুন তৈলক্ষেত্র আবিষ্কারের পর সংবাদমাধ্যমের কাছে এই নিয়ে মুখ খোলেন ইরাকি প্রধানমন্ত্রী মহম্মদ শিয়া আল-সুদানি। তাঁর কথায়, ‘‘আগামী দিনে আমরা ‘তরল সোনা’র রফতানি বৃদ্ধি করব।’’ তা ছাড়া গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রে ইরানের উপর নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছেন তিনি। পারস্য উপসাগরের তীরের প্রতিবেশী দেশটি বাগদাদের গ্যাসের চাহিদার এক তৃতীয়াংশ পূরণ করে বলে জানা গিয়েছে।

১৯ ১৯
Iraq’s Political Future May Decide China vs West Oil Power Balance

গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকে তেলকে কেন্দ্র করেই প্রথমে কুয়েত এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ায় ইরাক। আগামী দশকে সেই পরিস্থিতি ফের ফিরে আসতে চলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। স্বার্থের সংঘাতের ‘বয়েলিং পয়েন্ট’-এ থাকা বাগদাদ শেষ পর্যন্ত নিজেকে রক্ষা করতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
আরও গ্যালারি