সংখ্যায় ৫০০-এর বেশি মহিলা। তাঁদের প্রত্যেকেরই মারাত্মক অভিযোগ। একটি হাসপাতাল ও সেখানকার এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে রোগীদের অভিযোগ সম্মতি ছাড়াই যথেচ্ছ ভাবে জননাঙ্গে অস্ত্রোপচারের। অভিযোগ, প্রয়োজনীয় অনুমতি না নিয়ে এক চিকিৎসক বন্ধ্যাত্বকরণের অস্ত্রোপচার করেছেন শয়ে শয়ে মহিলার।
গত ডিসেম্বরে ৫০০ জনেরও বেশি মহিলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার একটি হাসপাতাল এবং এর ঊর্ধ্বতন কর্তাদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগে মামলা করেছেন। তাঁদের দাবি, প্রাক্তন চিকিৎসক জাভেদ পারওয়াইজ় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সম্মতি ছাড়াই তাঁদের শরীরে অন্যায্য অস্ত্রোপচার করেছেন। চেসাপিক রিজিয়োনাল মেডিক্যাল সেন্টারের বিরুদ্ধে দায়ের করা সেই মামলায় অপ্রয়োজনীয় সি-সেকশন এবং বন্ধ্যাত্বকরণের অভিযোগ রয়েছে।
৫১০ জন মামলাকারীর প্রত্যেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ১ কোটি ডলার বা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৯০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন। চেসাপিক রিজিয়োনাল মেডিক্যাল সেন্টারের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্যসেবা জালিয়াতির ফৌজদারি অভিযোগও রয়েছে। এই ধরনের ঘটনা খুবই বিরল বলে দাবি করেছে সে দেশের প্রথম সারির সংবাদপত্র।
সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলায় দোষ প্রমাণিত হলে হাসপাতালটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। শাস্তির খাঁড়া নেমে আসতে পারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উপরেও। ফলে ভবিষ্যতে সরকারি স্বাস্থ্য পরিকল্পনায় দ্বিতীয় বার তাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। সরকারি অনুমোদন পাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হবে হাসপাতালটি।
অভিযোগে বিশেষ ভাবে তিন জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা হলেন, জেমস রিস জ্যাকসন, পিটার ব্যাস্টোন এবং উইন ডিক্সন। জ্যাকসন ১ ডিসেম্বর, ২০১৬ সাল থেকে হাসপাতালের প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান কর্মকর্তা হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। ব্যাস্টোন এবং ডিক্সন ছিলেন তাঁর পূর্বসূরি।
বিপুল ক্ষতিপূরণের মামলা যাঁরা করেছেন, তাঁদের অধিকাংশই কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা। মার্কিন সরকারের মেডিকেডে স্বাস্থ্য পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন তাঁরা। এই পরিকল্পনাটি দরিদ্র মানুষদের চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার সরকারি পরিকল্পনা। তদন্তকারীদের দাবি, না জানিয়ে বা জোর করে অনেকেরই প্রজনন অঙ্গ অপসারণ করেছিলেন চিকিৎসক জাভেদ। অস্ত্রোপচারের অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় পদ্ধতিও প্রয়োগ করেছিলেন।
মামলাটির তদন্ত করতে গিয়ে প্রায় সব রোগীই একবাক্যে জানিয়েছেন, পারওয়াইজ়ের কাছে চিকিৎসা করাতে গেলেই তিনি মহিলাদের বিভ্রান্ত করতেন। এমনকি ক্যানসারের মতো দুরূহ রোগের ভয় দেখিয়ে জরুরি অস্ত্রোপচারের জন্য চাপ দিতেন।
হিস্টেরেক্টমি, ডাইলেশন অ্যান্ড কিউরেটেজের (ডি অ্যান্ড সি) মতো স্ত্রীরোগের অস্ত্রোপচারের জন্য রোগিণীদের রাজি করাতেন। এর পিছনে ছিল বড় ধরনের আর্থিক জালিয়াতির চক্র। পারওয়াইজ় যত বেশি অস্ত্রোপচার করতেন, তত বেশি অর্থ ট্রাইকেয়ার, মেডিকেড, মেডিকেয়ার এবং বেসরকারি বিমা থেকে তাঁর ও হাসপাতালের পকেটে ঢুকত।
সরকারি হাসপাতালের প্রাক্তন চিকিৎসক পারওয়াইজ় পাঁচটি বিলাসবহুল গাড়ির মালিক। বিভিন্ন বিদেশি নামীদামি ব্র্যান্ডের দোকান ছাড়া তিনি কেনাকাটা করতেন না বলে সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারি প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করার জন্য আটঘাট বেঁধে নেমেছিলেন পারওয়াইজ়। মেডিকেড জালিয়াতির মামলায় ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) তদন্তকারী আধিকারিকেরা জানতে পারেন যে, পারওয়াইজ় অধিকাংশ রোগীকে মিথ্যা বলেছিলেন যে তাঁদের ক্যানসারের ঝুঁকি রয়েছে। কাউকে জানিয়েছিলেন, তাঁরা ইতিমধ্যেই এই রোগে আক্রান্ত এবং অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন রয়েছে।
এফবিআই তদন্তে উঠে এসেছে, পারওয়াইজ় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তা দাবি করার জন্য একের পর এক রোগীর নকল রেকর্ডও তৈরি করেছিলেন। এমনকি তিনি তাঁর সুবিধামতো অকালপ্রসবের জন্য নথি জালও করেছিলেন।
পারওয়াইজ়ের বিরুদ্ধে মেডিকেডের নিয়ম লঙ্ঘন করে রোগীর সম্মতি ফর্মের তারিখ পরিবর্তন করার অভিযোগও রয়েছে। যেখানে ঐচ্ছিক বন্ধ্যাত্বকরণের জন্য ৩০ দিনের সময়সীমা প্রয়োজন। এখানেই শেষ নয়। পারওয়াইজ়ের পরামর্শে তাঁর রোগীদের সদ্যোজাত সন্তানদের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে (নিকু) ভর্তি করানো হত। সেই সংখ্যা ছিল অস্বাভাবিক।
মেডিকেডের আওতায় থাকা রোগীদের মধ্যে ৪০ শতাংশেরই অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল। তার মধ্যে আবার ৪২ শতাংশের শরীরে একাধিক বার অপ্রয়োজনে ছুরি-কাঁচি চালিয়েছিলেন চিকিৎসক পারওয়াইজ়।
১৯৯৬ সালে, কর জালিয়াতির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ভার্জিনিয়া বোর্ড অফ মেডিসিন পারওয়াইজ়ের মেডিক্যাল লাইসেন্স সাময়িক ভাবে বাতিল করে দেয়। হাসপাতালের তৎকালীন প্রধান নির্বাহী ডোনাল্ড এস বাকলি লাইসেন্স পুনর্বহালের জন্য বোর্ডের উপর চাপ প্রয়োগ করেন।
শুধু তা-ই নয়, স্থানীয় এক প্রসূতি বিশেষজ্ঞ স্টেট মেডিক্যাল বোর্ডকে সতর্ক করেছিলেন যে, পারওয়াইজ় সুস্থ তরুণীদের উপর অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার করছেন। আদালতে সরকার পক্ষের আইনজীবীরা এজলাসে জানিয়েছেন যে, অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা, হাসপাতালের কর্তারা উল্টে অভিযোগকারী চিকিৎসককেই ভর্ৎসনা করেছিলেন।
২০০৮ সালে চেসাপিক রিজিয়োনাল মেডিক্যাল সেন্টারের নিয়োনাটোলজি গ্রুপ কোনও সঠিক কারণ ছাড়াই পারওয়াইজ়ের অস্ত্রোপচার বা ঐচ্ছিক ইনডাকশনের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে শিশু প্রসবের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে তাঁর চিকিৎসা নিয়ে একাধিক বেনিয়মের অভিযোগ ওঠে। সেই নিয়ে একটি ধারাবাহিক সিরিজ় প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ স্বীকৃতি মঞ্চ পারওয়াইজ়কে শীর্ষ দশ চিকিৎসকের তালিকায় রেখেছিল।
অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের জন্য মেডিকেড জালিয়াতির অভিযোগে পারওয়াইজ়কে ইতিমধ্যেই ৫৯ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁর চিকিৎসা লাইসেন্সের মেয়াদ ২০২০ সালে শেষ হয়ে গিয়েছে। এফবিআই সূত্র অনুসারে, ১০ বছর ধরে জালিয়াতির অভিযোগে ২ কোটি ডলারেরও বেশি জরিমানা করা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থাটি জানিয়েছে যে ২০২০ সালের নভেম্বরে প্রাক্তন চিকিৎসককে স্বাস্থ্যসেবা জালিয়াতির ৫২টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
হাসপাতালের ছত্রছায়ায় পারওয়াইজ়ের কয়েকশো রোগী নির্যাতনের খবর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে ছিল না বলে জানিয়েছেন মামলায় অভিযুক্ত ডিক্সন এবং ব্যাস্টোন। তাঁরা সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কোনও বেনিয়মের কথা তাঁরা জানেন না। তাঁর সম্পর্কে কখনও কোনও অভিযোগও শোনেননি বলে জানিয়েছেন তাঁরা। হাসপাতালটি স্বাস্থ্যসেবা জালিয়াতির যে অভিযোগে মুখোমুখি হচ্ছে, সেটিকে মার্কিন সরকারের একটি অন্যায্য এবং অযৌক্তিক মামলা বলে দাবি দুই কর্মকর্তার।
সব ছবি: সংগৃহীত।