মাত্র ১০ বছর বয়সে পৌঁছে গিয়েছিলেন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। শিশুশিল্পী হিসাবে ছোটপর্দায় কাজ করার পাশাপাশি পা রেখেছিলেন বড়পর্দায়ও। হৃতিক রোশনের কেরিয়ার ঘুরিয়ে দেওয়া ছবিতে অভিনয় করেছিলেন তিনি। তবে পেশাগত জীবনের চেয়ে ব্যক্তিজীবন নিয়ে বার বার শিরোনামে এসেছেন হংসিকা মোতওয়ানি। এককালের সেই জনপ্রিয় শিশুশিল্পীই সম্প্রতি তাঁর চার বছরের দাম্পত্যে ইতি টানলেন।
১৯৯১ সালের অগস্টে মুম্বইয়ের এক সিন্ধি পরিবারে জন্ম হংসিকার। তাঁর বাবা পেশায় ব্যবসায়ী এবং মা চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। ছোটবেলা থেকে মায়ের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই ক্লিনিকে যেতেন হংসিকা। সেই ঘটনাই এক দিন তাঁর জীবনে অনুঘটকের মতো কাজ করেছিল।
রূপচর্চা সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানের খোঁজে প্রায়ই হংসিকার মায়ের কাছে পরামর্শের জন্য আসতেন বলি নায়িকারা। শোনা যায়, হংসিকা ক্লিনিকে থাকাকালীন সেখানে গিয়েছিলেন বলি অভিনেত্রী জুহি চাওলা। ছোট্ট মেয়েটিকে দেখে জুহি তাঁর চিকিৎসককে জানিয়েছিলেন, মেয়েকে ছোটপর্দায় অভিনয়ের সুযোগ দেওয়া উচিত।
হংসিকাকে টেলিভিশনের পর্দায় প্রথম সুযোগ দিয়েছিলেন অরুণা ইরানি। সে সময় ‘দেশ মেঁ নিকলা হোগা চাঁদ’ নামে একটি ধারাবাহিক পরিচালনা করছিলেন অরুণা। সেই ধারাবাহিকে প্রথম অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন হংসিকা।
তার পর বেশ কিছু ধারাবাহিকে অভিনয় করতে শুরু করেন হংসিকা। ‘সোনপরী’, ‘শাকা লাকা বুম বুম’, ‘কিঁউকি সাস ভি কভি বহু থি’, ‘করিশ্মা কা করিশ্মা’-সহ বহু ধারাবাহিকে তাঁর অভিনয় মন কেড়েছিল দর্শকের। টেলিভিশন থেকেই তিনি অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলেন বড় পর্দায়।
২০০৩ সালে ‘হাওয়া’ ছবির মাধ্যমে বড়পর্দায় পদার্পণ হংসিকার। একই বছরে তিনি হৃতিক রোশনের ব্লকবাস্টার ছবি ‘কোই মিল গ্যয়া’য় শিশুশিল্পী হিসাবে অভিনয় করেছিলেন। রাতারাতি ইন্ডাস্ট্রির প্রথম সারির শিশুশিল্পীদের তালিকায় নাম লিখিয়ে ফেলেছিলেন তিনি।
যে সময় হংসিকার বন্ধুবান্ধব পড়াশোনা এবং খেলাধুলো নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, সেই সময় তাঁর জীবনে পৌঁছে গিয়েছিল তারকাজীবনের আলো। এমনকি, নিজের স্কুলের কোনও অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসাবে নিমন্ত্রিত থাকতেন তিনি। ২০০৪ সালে সাময়িক ভাবে থমকে গিয়েছিল হংসিকার কেরিয়ার।
২০০৪ সালে হংসিকার বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল। মুম্বইয়ে মায়ের সঙ্গেই থাকতেন হংসিকা। কিন্তু অভিনয় থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন তিনি। তিন বছরের বিরতির পর আবার অভিনয়ের ফেরার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
১৬ বছরের হংসিকাকে দেখা গিয়েছিল নায়িকার ভূমিকায়। ৩৪ বছর বয়সি নায়কের সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করেছিলেন তিনি। ‘আপ কা সুরুর’ ছবিতে সঙ্গীতশিল্পী অভিনেতা হিমেশ রেশমিয়ার বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন হংসিকা।
গুঞ্জন শোনা যায়, নায়িকাসুলভ চেহারা তৈরির জন্য হরোমান ইঞ্জেকশন নিয়েছিলেন হংসিকা। সে বিষয়ে নাকি হংসিকাকে সাহায্য করেছিলেন তাঁর চিকিৎসক মা। ইঞ্জেকশন প্রয়োগের পাশাপাশি নায়িকা বিশেষ ধরনের অস্ত্রোপচারও করিয়েছিলেন বলে দাবি। পরে অবশ্য নায়িকা তা অস্বীকার করেছিলেন।
২০০৮ সালে ‘মানি হ্যায় তো হানি হ্যায়’ ছবিতে গোবিন্দের সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন হংসিকা। কিন্তু বলিউড তাঁর নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি। ধীরে ধীরে তিনি দক্ষিণী ইন্ডাস্ট্রির দিকে ঝুঁকে পড়েন। ২০০৭ সালে অল্লু অর্জুনের বিপরীতে তেলেগু সিনেমা ‘দেশামুদুরু’তে অভিনয় করে বিপুল সাফল্য পান হংসিকা।
২০০৮ সালের পর আর হিন্দি ছবিতে অভিনয় করতে দেখা যায়নি হংসিকাকে। তামিল, তেলুগু এবং মালয়ালম ভাষার একাধিক ছবিতে অভিনয় করতে থাকেন তিনি। দক্ষিণ ভারতে তাঁর অনুরাগীর সংখ্যা এমন বেড়ে যায় যে, তামিলনাড়ুর মাদুরাইয়ে ভক্তেরা তাঁর নামে একটি মন্দির পর্যন্ত তৈরি করে ফেলেছিলেন।
কেরিয়ারের শুরুর দিকে হংসিকার সঙ্গে নাম জড়িয়ে পড়েছিল তামিল অভিনেতা সিম্বুর। ২০১৩ সালে নিজেদের সম্পর্কের কথা স্বীকারও করেছিলেন দুই তারকা। শোনা যাচ্ছিল, বিয়ের পরিকল্পনাও করছিলেন তাঁরা। কিন্তু ২০১৪ সালে তাঁদের সম্পর্ক ভেঙে যায়।
গুঞ্জন শোনা যেতে থাকে, সিম্বুর বাবা চেয়েছিলেন বিয়ের পর হংসিকা যেন অভিনয় থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। তা নিয়েই দু’পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ হয় এবং সম্পর্ক ভেঙে যায়। হংসিকা তাঁর প্রাক্তন প্রেমিককে নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘আগের সম্পর্কে আমি এতটাই ডুবেছিলাম যে, সেখান থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে নতুন সম্পর্কে জড়াতেই প্রায় ৭-৮ বছর সময় লেগেছিল।’’
সিম্বুর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর দীর্ঘ দিনের বন্ধু সোহেল কাঠুরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন হংসিকা। পেশায় মুম্বইয়ের ব্যবসায়ী সোহেল। কর্মসূত্রেই আলাপ হয়েছিল দু’জনের।
২০১৬ সালে হংসিকার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী রিঙ্কি বজাজের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল সোহেলের। গোয়ায় সোহেল এবং রিঙ্কির বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন হংসিকা। তাঁদের বিয়ের একটি নাচের ভিডিয়োয় নাচতে দেখা গিয়েছিল হংসিকাকে। এই নাচের ভিডিয়োটি সমাজমাধ্যমের পাতায় ছড়িয়ে পড়তে হংসিকাকে ‘তৃতীয় ব্যক্তি’ বলে কটাক্ষ করতে শুরু করেছিলেন অনেকে।
পরে এক সাক্ষাৎকারে হংসিকা জানিয়েছিলেন, তিনি বান্ধবীর ঘর ভাঙেননি। সোহেলের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব বহু বছরের। ২০২০ সালে হংসিকা এবং সোহেল একটি অনুষ্ঠান আয়োজনকারী সংস্থার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কাজের সূত্রেই দু’জনের সম্পর্ক আরও গাঢ় হয়ে ওঠে।
২০২২ সালের নভেম্বরে প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের সামনে হংসিকার সঙ্গে বাগ্দান সেরেছিলেন সোহেল। একই বছর ডিসেম্বরে রাজস্থানের ৪৫০ বছরের পুরনো মন্ডোতা দুর্গে গাঁটছড়া বাঁধেন হংসিকা এবং সোহেল।
হংসিকা এবং সোহেলের বিয়ের অনুষ্ঠানের স্বত্ব কিনে নিয়েছিল এক ওটিটি সংস্থা। কিন্তু চার বছরের দাম্পত্যের পর বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁরা। মুম্বইয়ের বান্দ্রার পরিবার আদালতে পারস্পরিক সম্মতিতে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন মঞ্জুর করেছে।
জানা গিয়েছে, বিয়ের পর হংসিকা এবং সোহেলের মধ্যে জীবনযাপন এবং চিন্তাভাবনা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিত। ছোট ছোট বিষয়েও তাঁরা অশান্তি করতে শুরু করেছিলেন। বন্ধুরা পরামর্শ দিয়ে সেই সম্পর্ক সুন্দর রাখার চেষ্টা করলেও লাভ হয়নি। বিবাহবিচ্ছেদের আবেদনে কোনও খোরপোশ দাবি করেননি হংসিকা। দু’জনের সম্মতিতেই চার হাত আলাদা করলেন নায়িকা।
সব ছবি: সংগৃহীত।