ত্রিদেশীয় সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে রক্তাক্ত পশ্চিম এশিয়া। আরবের আকাশে শোনা যাচ্ছে লড়াকু জেটের গর্জন। ঝাঁ চকচকে শহর থেকে খনিজ তেলের শোধনাগারে যখন-তখন আছড়ে পড়েছে দূরপাল্লার ‘হাইপারসনিক’ (শব্দের পাঁচ গুণের চেয়ে গতিশীল) ক্ষেপণাস্ত্র। লাগাতার আক্রমণ শানাচ্ছে ‘কামিকাজ়ে’ (আত্মঘাতী) ড্রোন। এ-হেন পরিস্থিতিতে সবার অলক্ষে মুচকি হাসছেন পোড় খাওয়া এক রাষ্ট্রনেতা। যুযুধান কোনও পক্ষে না থেকেও ‘অদ্ভুত জাদুমন্ত্রে’ এই যুদ্ধ যেন জিতে যাচ্ছেন তিনি!
ইরান সংঘর্ষে ইতিমধ্যেই ‘বিজয়ী’র তকমা পাওয়া ওই রাষ্ট্রনেতা হলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহেই তাঁকে নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কাউন্সিল প্রেসিডেন্ট অ্যান্টনিয়ো কস্তা। চলতি বছরের ১১ মার্চ বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের রাষ্ট্রদূতদের সভায় ভাষণ দেন তিনি। সেখানে কস্তা বলেন, ‘‘পশ্চিম এশিয়ার লড়াইয়ে জিতছে মস্কো। কারণ, ওই সংঘাতের জেরেই আর্থিক ভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়ে গিয়েছে ক্রেমলিন।’’
কস্তার এই মন্তব্য একেবারেই ফেলে দেওয়ার নয়। উল্টে তাঁর কথার পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন সামরিক বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ। তাঁদের দাবি, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়া ইস্তক একাধিক ফ্রন্টে লাভবান হচ্ছে রাশিয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমি দুনিয়ার চাপে প্রায় থমকে যাওয়া খনিজ তেল ‘উরাল ক্রুড’ এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবসা ইতিমধ্যেই নতুন উদ্যমে শুরু করেছেন পুতিন। তাঁর সামনে চলে এসেছে ইউক্রেন কব্জা করার সুযোগ। পাশাপাশি, অত্যাধুনিক হাতিয়ার বিক্রি করেও মুনাফা লুটতে পারবেন তিনি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজ়রায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করে মার্কিন ফৌজ। যুদ্ধের প্রথম দিনেই তাদের সাঁড়াশি আক্রমণে প্রাণ হারান সাবেক পারস্যের শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। ওই ঘটনার পর হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে পাল্টা প্রত্যাঘাতে নামে তেহরান। পশ্চিম এশিয়ার আরব মুলুকগুলিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আমেরিকার সেনাঘাঁটিগুলিকে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনে নিশানা করছে তারা।
কৌশলগত দিক থেকে হরমুজ় প্রণালীর আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। পারস্য ও ওমান সাগরের মধ্যবর্তী ১৬৭ কিলোমিটার লম্বা এবং ৩৩-৩৯ কিলোমিটার চওড়া সংকীর্ণ একফালি ওই জায়গাটি জ্বালানি পরিবহণের অন্যতম ব্যস্ত সামুদ্রিক রাস্তা হিসাবে পরিচিত। বিশ্বের ২০ শতাংশ খনিজ তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস ওই পথে সরবরাহ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, কুয়েত, বাহরিন, ইরাক বা ওমানের মতো পশ্চিম এশিয়ার প্রায় সমস্ত উপসাগরীয় রাষ্ট্র।
এ-হেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ় প্রণালী ইরানি সেনা অবরুদ্ধ করায় বিশ্ব বাজারে হু-হু করে চড়তে শুরু করেছে অপরিশোধিত খনিজ তেলের দাম। সংঘাতের দ্বিতীয় সপ্তাহেই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তরল সোনার দর ৪২ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি ব্যারেলপ্রতি খনিজ তেল বিক্রি হচ্ছিল কমবেশি ৭২-৭৩ ডলারে। বর্তমানে সেটাই ১০৩-১১৪ ডলারে ঘোরাফেরা করছে। এই দর ২০০ ডলারে নিয়ে যাওয়ার ছক কষছেন তেহরানের সেনা কমান্ডারেরা।
বিশ্ব বাজারে খনিজ তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার নেপথ্যে আরও একটি কারণ রয়েছে। আরব রাষ্ট্রগুলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মার্কিন সেনাঘাঁটিগুলির পাশাপাশি সেখানকার তৈল শোধনাগারকেও নিশানা করছে ইরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। সৌদি আরব, আমিরশাহি, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরিন বা ইরাকের তরল সোনার কুয়োয় ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালিয়েছে তারা। ফলে বহু ক্ষেত্রে বন্ধ করতে হয়েছে উৎপাদন।
খনিজ তেলের দর লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকায় জ্বালানি সঙ্কটের আতঙ্কে ভুগছে বিশ্বের বহু দেশ। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক স্তরে চাপের মুখে পড়ে রুশ খনিজ তেল বিক্রির উপর থেকে ৩০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা সরাতে বাধ্য হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন আক্রমণের নির্দেশ দেন পুতিন। তার পরেই মস্কোর উপর ১৬ হাজারের বেশি নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয় আমেরিকা-সহ পশ্চিমি বিশ্ব। ফলে এত দিন খোলা বাজারে জ্বালানি বিক্রি করতে পারছিল না ক্রেমলিন।
নিষেধাজ্ঞার নাগপাশে আটকে পড়া রাশিয়ার কাছে ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ছিল বেশ চ্যালেঞ্জের। এই পরিস্থিতিতে ভারত ও চিনকে বিপুল ছাড়ে খনিজ তেল বিক্রি শুরু করেন পুতিন। কিন্তু, পশ্চিম এশিয়ায় লড়াইয়ের জেরে তরল সোনার দর হু-হু করে বৃদ্ধি পাওয়ায় সেই ছাড় তুলে নিয়েছেন তিনি। ফলে চাহিদা বেশি থাকায় বাজারমূল্যে উরাল ক্রুড বিক্রি করে দু’হাতে টাকা রোজগার করতে পারছে মস্কো।
গত ৯ মার্চ পুতিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ক্রেমলিনের দাবি, সেখানে মস্কোর খনিজ তেলের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ব্যাপারে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। তবে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির বাজারকে স্থিতিশীল করতে চাইছে আমেরিকা। এই পরিস্থিতিতে উরাল ক্রুড নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করতে শোনা গিয়েছে রুশ প্রেসিডেন্টকে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘বন্ধু’ পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলির জন্য যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পুতিন বলেছেন, ইউরোপীয় গ্রাহকেরা যদি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম খনিজ তেল এবং বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসের রফতানিকারী রাশিয়ার কাছে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা ফিরে পেতে চায়, তা হলে আমরা তাদের সঙ্গে ব্যবসা করতে প্রস্তুত। উল্লেখ্য, ইউক্রেন যুদ্ধের আগে পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলি মস্কোর থেকে তাদের চাহিদার ৪০ শতাংশের বেশি গ্যাস কিনছিল। গত বছর (পড়ুন ২০২৫ সাল) ১৩ শতাংশ পাইপলাইন গ্যাস এবং এলএনজি (লিক্যুইফায়েড ন্যাচরাল গ্যাস) ক্রেমলিনের থেকে আমদানি করেছিল ইইউ।
দ্বিতীয়ত, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের থেকে বিপুল পরিমাণে সামরিক সহযোগিতা পাচ্ছিলেন ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জ়েলেনস্কি। এক কথায় মার্কিন হাতিয়ারেই তাঁর ফৌজ রুশ সেনার অগ্রগতি ঠেকিয়ে রেখেছে বললে অত্যুক্তি হবে না। ফলে গত চার বছরে শত চেষ্টা করেও কিভের পতন ঘটাতে পারেননি পুতিন। সান্ত্বনা পুরস্কারের মতো তাঁর হাতে এসেছে কেবলমাত্র ইউক্রেনের ডনবাস এলাকা।
কিন্তু, ইরান যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ায় পূর্ব ইউরোপের উপর থেকে একরকম চোখ সরিয়ে নিয়েছে ওয়াশিংটন। শুধু তা-ই নয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের থেকে হাতিয়ার ও গোলা-বারুদের সাহায্য জ়েলেনস্কি কতটা পাবেন, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আক্রমণের ঝাঁজ বাড়াতে পারেন পুতিন। তখন ইউক্রেনের পতন আটকানো কঠিন হবে, বলছেন সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েলের মতো জোড়া ‘সুপার পাওয়ার’-এর সঙ্গে লম্বা সময় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হলে ইরানের চাই বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক অস্ত্র। ইহুদিদের ঘিরতে হামাস, হিজ়বুল্লা ও হুথির মতো প্যালেস্টাইনপন্থী একাধিক বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে মাঠে নামিয়েছে তেহরান। পর্দার আড়ালে থেকে তাঁদেরও হাতিয়ার ও গোলা-বারুদের জোগান দিচ্ছে সাবেক পারস্যের শিয়া ফৌজ।
ফলে যত সময় গড়াচ্ছে, ততই ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যাচ্ছে ইরানি অস্ত্রভান্ডার। যুদ্ধের মধ্যে সেই ঘটাতি পূরণ করতে পারে মস্কো। ক্রেমলিনের সঙ্গে দীর্ঘ দিনের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে তেহরানের। ফলে সঙ্কটকালে শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, মাল্টিব্যারেল রকেট এবং বিপুল সংখ্যায় ড্রোন সাবেক পারস্যে সরবরাহ করতে পারে। যা পশ্চিম এশিয়ায় লড়াইয়ের মোড় ঘোরাতে সাহায্য করবে।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ইউক্রেন যুদ্ধে ‘আত্মঘাতী’ (পড়ুন কামিকাজ়ে) ড্রোন সরবরাহ করে রাশিয়ার হাত শক্ত করে ইরান। প্রতিদানে ইতিমধ্যেই তেহরানকে কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক গোয়ান্দা তথ্য দিয়ে সাহায্য করার অভিযোগ উঠেছে মস্কোর বিরুদ্ধে। লড়াই দীর্ঘস্থায়ী হলে এই সহযোগিতা যে আরও বাড়বে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তখন অস্ত্র বিক্রি করে ফের মোটা রোজগার করতে পারবেন পুতিন।
তবে ইরান যুদ্ধে মস্কোর সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি উঠে না যাওয়ায় খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রি করে কত দিন রাষ্ট্রীয় আয় রুশ প্রেসিডেন্ট বাড়াতে পারবেন, তা কিন্তু লাখ টাকার প্রশ্ন। তা ছাড়া ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য তুরস্কে বেশ কয়েক রাউন্ড আলোচনা সেরেছে ক্রেমলিন। সেখানে সমঝোতাসূত্র বেরিয়ে এলে অস্তিত্ব রক্ষা করতে হয়তো সক্ষম হবে কিভ।।
তা ছাড়া ইজ়রায়েলের সঙ্গে মস্কোর সম্পর্ক আদায় কাঁচকলায়, এমনটা নয়। দূরপাল্লার হাতিয়ার পেলে ইহুদি রাষ্ট্রটিকে অনায়াসেই ধ্বংসের চেষ্টা করতে পারে তেহরান। ইরান মদতপুষ্ট হামাস, হিজ়বুল্লা বা হুথির মতো বিদ্রোহী গোষ্ঠী আগামী দিনে ক্রেমলিনের মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। আর তাই সামরিক বিশ্লেষকদের দাবি, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সামরিক লাভ উপভোগ করছেন পুতিন। স্বার্থের সংঘাত দেখা দিলে পশ্চিম এশিয়া থেকে মুখ ফেরাতে বিন্দুমাত্র দেরি করবেন না তিনি।
সব ছবি: সংগৃহীত।