পশ্চিম এশিয়ায় তৈরি হবে ‘ষড়ভুজ জোট’! প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ইজ়রায়েল সফরের মুখে ইহুদি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর এ-হেন প্রস্তাব ঘিরে দুনিয়া জুড়ে পড়ে গিয়েছে হইচই। সংশ্লিষ্ট সমঝোতায় গেলে কতটা লাভ হবে ভারতের? এর মাধ্যমে ‘ইসলামীয় নেটো’র স্বপ্ন দেখা পাকিস্তানকে ধ্বংস করতে পারবে নয়াদিল্লি? ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। যদিও বিষয়টিতে সরকারি ভাবে কোনও বিবৃতি দেয়নি সাউথ ব্লক।
চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী মোদীর ইজ়রায়েল সফর শুরু হতে না হতেই ‘ষড়ভুজ জোট’-এর (হেক্সাগন অ্যালায়েন্স) ঘোষণা করেন ইহুদি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা একটা নতুন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে যাচ্ছি। পশ্চিম এশিয়া ও তার আশপাশের এলাকাগুলিকে নিয়ে আত্মপ্রকাশ করবে ষড়ভুজ জোট। চরমপন্থী সংগঠনগুলিকে জবাব দেওয়াই হবে এর মূল উদ্দেশ্য।’’ এর পরই ভারতকে ‘বিশ্বশক্তি’ এবং মোদীকে ‘ব্যক্তিগত বন্ধু’ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ভারত ছাড়া সংশ্লিষ্ট জোটে কোন কোন দেশ থাকবে, তারও ইঙ্গিত দিয়েছেন নেতানিয়াহু। তাঁর দাবি, এর অংশ হবে গ্রিস ও সাইপ্রাস। এ ছাড়া আরব, আফ্রিকা এবং এশিয়ার আরও কয়েকটি রাষ্ট্র এতে যোগ দেবে বলে জানিয়েছেন ইহুদি প্রধানমন্ত্রী। তবে জোটের ‘গুরুত্বপূর্ণ’ সদস্য হিসাবে নয়াদিল্লিকে সবচেয়ে বেশি করে চাইছেন তিনি। বেঞ্জামিনের কথায়, ‘‘এর মাধ্যমে পশ্চিম এশিয়ার চরমপন্থী সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে এককাট্টা হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সহজ হবে।’’
প্রস্তাবিত ‘ষড়ভুজ জোট’ কী ভাবে কাজ করবে? ঘোষণার সময় তারও নীলনকশা প্রকাশ করেছেন নেতানিয়াহু। সংশ্লিষ্ট জোটের সদস্যেরা সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় নিয়মিত মতের আদানপ্রদান করুক, চাইছেন ইহুদি প্রধানমন্ত্রী। এই সহযোগিতার মাধ্যমে এক দিকে যেমন রাষ্ট্রগুলির ঘনিষ্ঠতা বাড়বে, অন্য দিকে তেমনই একে অপরকে ভরসা করতে পারবে তারা। এককথায় প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের লক্ষ্যে একজোট হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ইজ়রায়েলি রাষ্ট্রপ্রধানের।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, নেতানিয়াহুর প্রস্তাবিত জোটের অংশ হলে আখেরে লাভ হবে ভারতের। প্রথমত, এর মাধ্যমে ইজ়রায়েলি গুপ্তচর ও গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ, শিন বেট ও আমানের থেকে পাক মদতপুষ্ট কুখ্যাত সন্ত্রাসবাদীদের গতিবিধির টাটকা খবর হাতে পাবে নয়াদিল্লি। সে ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে সরকার, সেনা, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা-সহ অন্যান্য প্রশাসনিক কর্তা-ব্যক্তিদের। দ্বিতীয়ত, ইহুদিদের সাহায্যে দিব্যি দূরের শত্রুদের উপর নজর রাখতে পারবে সাউথ ব্লক।
গত কয়েক বছর ধরেই তুরস্কের সঙ্গে বেড়েছে ইসলামাবাদের ঘনিষ্ঠতা। ২০২৫ সালে ‘অপারেশন সিঁদুর’ চলাকালীন পাক ফৌজকে অত্যাধুনিক ড্রোন ও অন্যান্য হাতিয়ার সরবরাহ করে সাহায্যের অভিযোগ ওঠে আঙ্কারার বিরুদ্ধে। শুধু তা-ই নয়, পশ্চিম এশিয়ার একাধিক জঙ্গিগোষ্ঠীকে পর্দার আড়াল থেকে মদত দিয়ে চলেছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিচেপ তায়িপ এর্ডোয়ান। ফলে ইজ়রায়েলের সঙ্গে ‘ইউরোপের রুগ্ন মানুষ’টির অহি-নকুল সম্পর্ক রয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না।
এই পরিস্থিতিতে নিজেদের স্বার্থেই তুরস্কের উপর নজরদারি চালাবে মোসাদ। নেতানিয়াহুর প্রস্তাবিত ‘ষড়ভুজ জোটে’ যোগ দিলে তা নিয়মিত পেতে কোনও অসুবিধা হবে না ভারতের। তা ছাড়া গ্রিস ও সাইপ্রাস এর অংশ হলে ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় চক্রব্যূহের ঘেরাটোপের মুখে পড়বে আঙ্কারা। সীমান্ত বিবাদের জেরে এই দুই রাষ্ট্রের সঙ্গেও সীমান্ত বিবাদ রয়েছে এর্ডোয়ানের। তা ছাড়া গত ৫২ বছর ধরে সাইপ্রাসের উত্তর অংশ রয়েছে তুর্কি সেনার দখলে।
গত বছরের (পড়ুন ২০২৫ সাল) সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ করে পাকিস্তান। এতে বলা হয়েছে, স্বাক্ষরকারী দুই দেশের মধ্যে কোনও একটি রাষ্ট্র তৃতীয় কোনও শক্তি দ্বারা আক্রান্ত বা আগ্রাসনের শিকার হলে, তাকে উভয় দেশের উপর আঘাত বা যুদ্ধ হিসাবে বিবেচনা করা হবে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট ‘নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন’ বা নেটোর কায়দায় হওয়া এই সমঝোতা যে ভারতের উদ্বেগ বাড়িয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।
রিয়াধের সঙ্গে ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সেরে ফেলা ইস্তক এর সম্প্রসারণের কথা বলতে শোনা গিয়েছে ইসলামাবাদের নেতা-মন্ত্রীদের। মুসলিম দেশগুলির মধ্যে একমাত্র পাকিস্তানের কাছেই রয়েছে পরমাণু হাতিয়ার। একে সামনে রেখে ‘ইসলামীয় নেটো’ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশীর। সেই লক্ষ্যে সৌদির মতো অন্য মুসলিম রাষ্ট্রগুলিকে কাছে টানতে তাদের আণবিক সুরক্ষা দিতেও যে রাওয়ালপিন্ডি পিছপা হবে না, তা বলাই বাহুল্য।
গোড়ার দিকে পাকিস্তানের ‘ইসলামীয় নেটো’ গঠনের ব্যাপারে হাওয়া দিচ্ছিল তুরস্ক। পরে অবশ্য, ওই ধরনের জোটে যাওয়ার কোনও ইচ্ছা নেই বলে জানিয়ে দেয় আঙ্কারা। তার পরেও নয়াদিল্লি যে পুরোপুরি উদ্বেগ কাটিয়ে উঠেছে, এমনটা নয়। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সৌদির সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বেশ ভাল। তবে, চুক্তির কারণে সংঘাত পরিস্থিতিতে রিয়াধ খনিজ তেলের সরবরাহ বন্ধ করলে বিপদে পড়বে সাউথ ব্লক। আর তাই পাল্টা জোট আবশ্যক, বলছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।
নেতানিয়াহুর প্রস্তাবিত ‘ষড়ভুজ় জোটে’ এক বা একাধিক আরব দেশ থাকলে সে দিক থেকে কিছুটা নিশ্চিন্ত হতে পারবে ভারত। তা ছাড়া সংশ্লিষ্ট সমঝোতা অস্ত্রব্যবসার ক্ষেত্রেও সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের বাড়বাড়ন্ত আটকাতে ইতিমধ্যেই নয়াদিল্লির একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র কেনার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছে গ্রিস ও তুরস্ক। সেই তালিকায় আছে ব্রহ্মস ও প্রলয়। প্রতিরক্ষা চুক্তি হতে পারে পিনাকা মাল্টিব্যারেল রকেট লঞ্চার নিয়েও।
গত কয়েক বছরে ইজ়রায়েলের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে একাধিক হাতিয়ার তৈরি করেছে ভারত। এর মধ্যে বারাক-৮ ও স্পাইডার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ড্রোন গুরুত্বপূর্ণ। এ দেশের কমান্ডো বাহিনী ব্যবহার করে টাভোর নামের একটি অত্যাধুনিক রাইফেল। নেতানিয়াহুর প্রস্তাবিত জোটের অংশ হলে আরও কিছু অস্ত্র যৌথ ভাবে তৈরির ব্যাপারে যে ইহুদিরা আগ্রহী হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তা ছাড়া সাইবার সুরক্ষা ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধের সরঞ্জামও সেখান থেকে পাবে নয়াদিল্লি।
২০২৩ সালে নয়াদিল্লিতে হওয়া সম্মেলনে ‘ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডর’ (আইএমইইসি) নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় জি২০-ভুক্ত সমস্ত দেশ। সুয়েজ খালকে এড়িয়ে ইউরোপ যাওয়ার এই বিকল্প রাস্তার বড় অংশ যাবে ইজ়রায়েলের মধ্যে দিয়ে। যদিও গত দু’বছর ধরে ইহুদিরা গাজ়া যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় এর কাজ সে ভাবে এগোয়নি। প্রস্তাবিত সমঝোতায় মোদী সই করলে এতে গতি আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে আর্থিক দিক থেকে লাভবান হওয়ারও সুযোগ পাবে ভারত।
২০২৩ সাল থেকে উত্তর ইজ়রায়েলের গুরুত্বপূর্ণ হাইফা বন্দর নিয়ন্ত্রণ করছে ভারতের ধনকুবের শিল্পপতি গৌতম আদানির সংস্থা। নেতানিয়াহুর প্রস্তাবিত জোটের অংশ হলে ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় আরও কিছু কৌশলগত বন্দর বকলমে চলে আসতে পারে নয়াদিল্লির হাতে। সংশ্লিষ্ট সমঝোতার মাধ্যমে গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’ বাড়িয়ে এর জন্য ঝাঁপাতে পারে নয়াদিল্লি, যা বৈদেশিক বাণিজ্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।
মোদীর এই সফর যে ইজ়রায়েলের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও জোরদার করবে, তা স্বীকার করেছে নয়াদিল্লিও। নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাতে কৌশলগত সম্পর্ক, প্রতিরক্ষা, কৃষি ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সমন্বয় জোরদার করতে একাধিক দ্বিপাক্ষিক স্মারক সমঝোতা বা মউ (মেমর্যান্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং) সই করতে পারেন তিনি। ইহুদি রাষ্ট্রপ্রধান মনে করেন, তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
এ প্রসঙ্গে ইজ়রায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘‘মোদীর সফরের ফলে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার হবে। পাশাপাশি উচ্চ প্রযুক্তি, এআই সহযোগিতাও বাড়বে।’’ ২০১৭ সালের জুলাইয়ে প্রথম বার পশ্চিম এশিয়ার ইহুদিভূমিতে যান মোদী। তৃতীয় বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এটাই তাঁর প্রথম ইজ়রায়েল সফর, যা নিয়ে নিজেও যথেষ্ট উচ্ছ্বসিত তিনি।
তবে নেতানিয়াহুর প্রস্তাবিত ‘ষড়ভুজ জোটে’ যাওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিপদও রয়েছে। প্রথমত, এর জেরে অন্য আরব দেশগুলির সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কের অবনতি হতে পারে। বিশেষত, সৌদির রাজপরিবার একে কী ভাবে দেখবে, তা বলা কঠিন। তা ছাড়া সামরিক প্রতিশ্রুতি দিলে ইহুদিদের সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে ভারত, যা আগামী দিনে নয়াদিল্লির জন্য ‘গলার কাঁটা’ হয়ে উঠলে বলার কিছুই থাকবে না। তাই এ ব্যাপারে সাবধানি পা ফেলার পক্ষপাতী অনেকেই।
প্রধানমন্ত্রীর ইজ়রায়েল সফরকে ইতিমধ্যেই কটাক্ষ করেছে লোকসভার প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। তাদের দাবি, গোটা বিশ্ব যখন নেতানিয়াহুর সমালোচনা করছে, তখন মোদী ‘নৈতিক কাপুরুষতার’ পরিচয় দিচ্ছেন। অনেকের মতে, ইজ়রায়েলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার চেয়ে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি এবং বাণিজ্যের দিকে বেশি ঝুঁকতে পারে ভারত। শেষ পর্যন্ত এ ব্যাপারে দুই দেশ কী বার্তা দেয়, সেটাই এখন দেখার।
সব ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।