ইহুদি-মার্কিন যৌথ অভিযানে রক্তাক্ত ইরান। তাদের মুহুর্মুহু ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলায় নিহত ইরানের শিয়া ধর্মগুরু তথা সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। খামেনেইয়ের মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান ইরান।
তেহরানের তরফে খামেনেইয়ের মৃত্যুর খবরে সিলমোহর দেওয়ার পরেই ইরানের বিভিন্ন শহরে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন স্থানীয় মানুষজন। কোম, ইয়াসুজের মতো শহরে ইরানের পতাকা হাতে নিয়ে রাস্তায় বেরোন বহু মানুষ।
ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নিধনের আঁচ এসে পড়েছে ভারতেও। কর্নাটকের চিক্কাবল্লাপুরের একটি গ্রাম ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনেইয়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তিন দিনের শোকপালনের কথা ঘোষণা করেছে।
ইরানের ইসলামীয় বিপ্লবের জনক ছিলেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লা খোমেইনি। বিপ্লবের পর তিনিই ছিলেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা। রুহুল্লা খোমেইনির মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পদে বসেন আলি খামেনেই। ৮৬ বছর বয়সে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনিই ছিলেন ওই আসনে।
কড়া নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থাকতেন খামেনেই। জনসাধারণের মধ্যে তাঁর উপস্থিতির কথা কখনও আগে থেকে ঘোষণা করা হত না।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে আসীন হওয়ার পর থেকে কখনও দেশের বাইরে পা রাখেননি খামেনেই। ১৯৭৯ সালে ফ্রান্স থেকে তেহরানে প্রত্যাবর্তনের পর তাঁর পূর্বসূরি রুহুল্লা খোমেইনিও দেশের বাইরে পা রাখেননি।
সেই খামেনেইয়ের মৃত্যুতেই শোকস্তব্ধ কর্নাটকের চিক্কাবল্লাপুরের আলিপুর গ্রাম। আলিপুরের জনসংখ্যা মেরেকেটে ২৫ হাজার। আনুমানিক ৯০ শতাংশ শিয়া মুসলিম অধ্যুষিত সেই গ্রামে খামেনেই নিহত হওয়ার পরেই উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। তিন দিনের শোকপালনের কথা ঘোষণা করে গোটা গ্রাম।
কিন্তু কেন? শিয়া মুসলিম অধ্যুষিত এবং ইসলামীয় প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে স্থায়ী সাংস্কৃতিক সংযোগের কারণে দীর্ঘ দিন ধরে ‘মিনি ইরান’ নামে পরিচিত আলিপুর। গ্রামবাসীদের মতে ১৯৮১ সালে সেই গ্রামে সফর করেছিলেন খামেনেই।
ইসলামীয় বিপ্লবের দু’বছর পর ১৯৮১ সালের অক্টোবরে ইরানের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন খামেনেই। ইরানীয় আর্কাইভ অনুযায়ী, ১৯৭৯ সালের ইসলামীয় বিপ্লবের পরে ক্ষমতায় আসা রুহুল্লা খোমেইনির সরকারের শুরু করা প্রচারের অংশ হিসাবে ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারত সফর করেছিলেন তিনি। তখন খামেনেইয়ের বয়স ছিল ৪১।
২০২০ সালে তা নিয়ে এক্স হ্যান্ডলে একটি পোস্টও করেছিলেন ইরানের সদ্যপ্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা। সেই পোস্টে তিনি লেখেন, ‘‘বিপ্লবের শুরুতে আমি ভারতভ্রমণ করেছিলাম। আমি দেখেছি, আমার আগেই সেখানে সর্বোচ্চ নেতা খোমেইনির মতাদর্শ পৌঁছে গিয়েছিল। সে কথা এখনও সত্য। খোমেইনি এবং তাঁর মতাদর্শ এখনও সে দেশে সমান জনপ্রিয় এবং বুদ্ধিজীবীদের সমাবেশে তা দৃঢ় ভাবে অনুভূত।’’
খামেনেইয়ের এক্স হ্যান্ডল থেকে করা সেই পোস্টে একটি ছবিও আপলোড করা হয়েছিল। সেই ছবিতে দেখা গিয়েছিল, তাঁকে মালা পরিয়ে স্বাগত জানাচ্ছে জনতা।
আলিপুরের স্থানীয়দের দাবি, ১৯৮১ সালে ইরান সরকারের সহযোগিতায় নির্মিত একটি হাসপাতালের উদ্বোধন করতে তাঁদের গ্রামে গিয়েছিলেন ইরানের সদ্যপ্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা খামেনেই।
ছোট্ট গ্রামটির জন্য খামেনেইয়ের সেই সফর ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের সর্বোচ্চ বিন্দু হিসাবে চিহ্নিত। আজও গ্রামের কয়েক ডজন যুবক ইরানি মাদ্রাসায় ধর্মীয় পড়াশোনা করেন অথবা ইরানের রাজধানী তেহরান এবং মাশহাদের মতো শহরগুলিতে উচ্চশিক্ষার জন্য যান। আর সে কারণেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার মৃত্যুতে উত্তেজনা ছড়িয়েছে সেই গ্রামে। তিন দিনের শোকপালনের ঘোষণা করা হয়েছে। নেওয়া হয়েছে দোকনপাট এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তও।
ইরানীয় বিবরণে ১৯৮০ সালের শেষের দিকে বা ১৯৮১ সালের গোড়ার দিকে খামেনেইয়ের কাশ্মীর সফরের কথাও উল্লেখ রয়েছে। সেই সফরের সময় শ্রীনগরে একটি সমাবেশেও নাকি ভাষণ দিয়েছিলেন তিনি।
খামেনেই হত্যার প্রতিবাদে কাশ্মীর জুড়েও ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। ব্যাপক বিক্ষোভ এবং বন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষের তরফে শ্রীনগরে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করা হয়েছে। বিক্ষোভের আবহে দু’দিনের জন্য সমস্ত স্কুল এবং কলেজ বন্ধের ঘোষণাও করেছে সরকার।
১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হন খামেনেই। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত রাষ্ট্র ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর চূড়ান্ত ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিলেন তিনি।
প্রথমে দুর্বল এবং সিদ্ধান্তহীন বলা হলেও রুহুল্লা খোমেইনির উত্তরসূরি হিসাবে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে খামেনেইয়ের। দেশের ক্ষমতা কাঠামোর শীর্ষে বসে খামেনেইয়ের উত্থান তাঁকে দেশের সমস্ত বিষয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার দিয়েছিল।
সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে সরকারের সমস্ত দফতরের উপরে ছিলেন খামেনেই। তিনি বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবং গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা প্রধানদের নিয়োগ করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট পদে কে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন তা-ও তিনিই নির্ধারণ করতেন।
সব ছবি: পিটিআই, এক্স, সংগৃহীত এবং ফাইল।