ভিয়েতনামের মতো ভারতেও খোঁজ মিলল এক নিদ্রাহীন ব্যক্তির। দাবি, প্রায় পাঁচ দশক ধরে এক বারের জন্যও দু’চোখের পাতা এক করেননি মধ্যপ্রদেশের ওই ব্যক্তি। পূর্বের প্রতিবেশী ছোট্ট দেশ ভিয়েতনামের বাসিন্দা তাই নিয়পের মতো এ দেশেও রয়েছেন এমন এক জন, যাঁর জীবন থেকে ঘুম বিদায় নিয়েছে পাকাপাকি ভাবে।
বয়স ৭৫-এর কোঠায়। গত ৫০ বছর নাকি তিনি এক বারের জন্য ঘুমোতে পারেননি। মধ্যপ্রদেশের রেওয়া জেলার চাণক্যপুরী কলোনির বাসিন্দা মোহনলাল দ্বিবেদী। অবসরজীবন যাপন করতে গিয়ে যখন বাকিরা নিশ্চিন্তে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুমিয়ে কাটান তখন মোহন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এক মুহূর্তের জন্যও নাকি চোখ বন্ধ করেননি।
দীর্ঘ ক্ষণ ঘুমের অভাব শরীর ও মন উভয়ের উপরই বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব ঘটলে শরীরে দেখা দেয় নানা উপসর্গ। দিনে ৬-৭ ঘণ্টা ঘুম না হলে ক্লান্তি, দুর্বলতা, অবসাদ, এমনকি গুরুতর অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। এর কোনও কিছুর বিন্দুমাত্র লক্ষণ ফুটে ওঠেনি সত্তরোর্ধ্ব এই বৃদ্ধের দেহে। দিব্যি সুস্থ দেহে ঘোরাফেরা করেন তিনি।
১৯৭৩ সালে হঠাৎ করেই এই সমস্যা দেখা দেয় মোহনের জীবনে। দীর্ঘ ৫০টি বছর বিনিদ্র রাত কাটাতে হচ্ছে তাঁকে। রাতে যখন সকলে ঘুমিয়ে স্বপ্নের জগতে বিচরণ করে মোহন তখন সারা রাত জেগে কাটিয়ে দেন। শান্তির ঘুম উড়ে যাওয়ায় রাতের বেলাও তাঁকে একা জেগে বসে থাকতে হয়।
মোহন জানিয়েছেন, যদি তিনি আঘাতও পান, তাতেও তিনি খুব বেশি ব্যথা অনুভব করেন না। এমনকি ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করেন না। সারা রাত জেগে থাকার পরেও, তিনি কোনও দিনই শরীরে ভারী ভাব, ক্লান্তি বা শক্তির অভাব অনুভব করেন না। চোখেরও তেমন কোনও সমস্যা নেই মোহনের।
বছরের পর বছর ধরে ঘুমে চোখ জড়িয়ে না এলেও দিব্যি সুস্থ-সবল তিনি। শরীরে নেই কোনও আধিব্যাধি। রোগবালাই তো দূরের কথা, পাড়াপড়শিদের অনেকের থেকেই নাকি বহু গুণে সক্রিয় ও সম্পূর্ণ সুস্থ এই বৃদ্ধ।
অদ্ভুত এই ‘সমস্যাটি’ চালু হওয়ার পর প্রথমে কারও কাছেই বিষয়টি খোলসা করে জানাতে পারেননি মোহন। পরে তিনি পরিবারকে সমস্ত কিছু খুলে বলেন। পরিবারের সদস্যেরা রোগ থেকে মুক্ত করার জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দেন। প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে ও চিকিৎসকদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।
মোহনের অবস্থার কোনও উন্নতি না হওয়ায় দিল্লি এবং মুম্বইয়ের খ্যাতনামা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একাধিক মেডিক্যাল পরীক্ষা করা হয়। তবে চিকিৎসকেরা তাঁর এই অবস্থার সঠিক কারণ নির্ধারণ করতে পারেননি। মোহনের নিদ্রাহীনতার ‘রহস্যভেদ’ করতে পারেননি কেউই।
জীবন থেকে ঘুম উড়ে গেলেও মোহনের পেশাগত জীবনে এর কোনও প্রভাব পড়েনি। তিনি ১৯৭৩ সালে কলেজে লেকচারার হিসাবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭৪ সালে মধ্যপ্রদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ডেপুটি কালেক্টর হন। ধীরে ধীরে পদোন্নতি হয়ে অবশেষে ২০০১ সালে যুগ্ম কালেক্টর পদ থেকে অবসরগ্রহণ করেন।
মোহন জানান, অনিদ্রা তাঁর পেশার কোনও ক্ষতি করতে পারেনি। সারা রাত না ঘুমিয়েও তিনি সকালে কর্মস্থলে এসে কাজের দায়িত্ব পালন করেছেন। কর্মক্ষেত্রে অবহেলার অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে কেউ কোনও দিনই তুলতে পারেনি বলে দাবি মোহনের।
অবসরগ্রহণের পর, তিনি বেশির ভাগ সময় বই পড়ে কাটান। মানুষ প্রায়ই তাঁকে গভীর রাত পর্যন্ত বারান্দায় হাঁটতে দেখেন। আর একটি মজার বিষয়ও তিনি জানিয়েছেন যে, তাঁর স্ত্রীও দিনে মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা ঘুমোন।
রেওয়ার সঞ্জয় গান্ধী হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট রাহুল মিশ্র এই ঘটনাটিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত আশ্চর্যজনক বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘ঘুম ছাড়া বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব।’’ তিনি আরও জানান যে মোহনের এই চিরঅনিদ্রা স্লিপ থেরাপি এবং মনোবিজ্ঞানের উপর গবেষণার নতুন একটি দিক খুলে দিতে পারে। তাই তিনি মোহনকে নতুন করে মনোবিজ্ঞান বিভাগের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করার কথা জানিয়েছেন।
আরও এক অনিদ্রা রোগে ভোগা ব্যক্তিকে নিয়ে তোলপাড় হয়েছে সংবাদমাধ্যম। ভিয়েতনামের কুয়াং নাম প্রদেশের বাসিন্দা তাই নিয়প। ১৯৪২ সালে কুয়ো সন জেলায় তাঁর জন্ম। নিয়প জানিয়েছেন, ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় থেকেই ঘুমের ব্যাঘাত হত তাঁর।
মোহনের সমস্যা শুরু হওয়ার বছর, অর্থাৎ ১৯৭৩ সালেই নিয়পের ক্ষেত্রেও শুরু হয় এই সমস্যা। কোনও একদিন হঠাৎ করেই নাকি তাঁর দু’চোখ থেকে চিরতরে হারিয়ে যায় ঘুম। নিয়প যাতে দু’চোখের পাতা এক করতে পারেন, সে জন্য তাঁকে ঘুমপাড়ানি গানও শোনানো হয়েছে।
লোকচক্ষুর আড়ালে গিয়ে অন্য কোথাও তিনি ঘুমিয়ে কাটান কি না, তার সন্ধানে নজরদারিও করা হয়েছে। তবে পরিবার থেকে পাড়াপড়শি সকলেরই দাবি, অশীতিপর বৃদ্ধ নিয়প কখনও ঘুমোন না!
সংবাদমাধ্যমের কাছে নিয়পের দাবি, ৩১ বছর বয়সে তাঁর এক বার প্রবল জ্বর হয়েছিল। জ্বরে অচৈতন্য হয়ে গিয়েছিলেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত আর ঘুমোতে পারেননি।
ঘুমের সমস্যার প্রতিকার খুঁজতে মোহন যোগব্যায়াম, আয়ুর্বেদ এবং তুকতাকের পথও বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু ঘুম আসা দূরের কথা, তিনি আজকাল ক্লান্তিও বোধ করতে পারছেন না। চিকিৎসকেরা এ-ও গবেষণা করছেন যে এত বছর ধরে কী ভাবে ঘুমের চক্র ছাড়াই তাঁর শরীর এবং মস্তিষ্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক ভাবে কাজ করছে।
সরকারি অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী মোহন লাল দ্বিবেদী বলেন, ‘‘শুরুতে এটা অদ্ভুত লাগছিল, কিন্তু এখন এটাই আমার জীবনধারা। আমার শরীর সুস্থ এবং এটি ঈশ্বরের কৃপা।’’
সব ছবি: সংগৃহীত।