সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি বা সিআইএ। আমেরিকার দুঁদে সেই গোয়েন্দা সংস্থার সুনাম জগৎজোড়া। বিশ্ব জুড়ে বহু গোপন অভিযানের নেপথ্যে রয়েছে সিআইএ-র গোয়েন্দাদের হাত। বলা হয়, বিশ্বে কোথাও কোনও গোপন অভিযান চলছে এবং সে খবর সিআইএ-র কাছে নেই, তেমনটা হতে পারে না।
কিন্তু অনেকেই জানেন না আমেরিকার এই দোর্দণ্ডপ্রতাপ গোয়েন্দা সংস্থাকে এক বার ঘোল খাইয়েছিলেন তাদেরই এক গোয়েন্দা। শুধু তা-ই নয়, মস্কোর কাছে গোপন তথ্য বিক্রি করে রাশিয়ায় মার্কিন গুপ্তচর নেটওয়ার্ক একা হাতে ধ্বংস করেছিলেন তিনি। আমেরিকার কাছে তিনি ‘চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতক’ তকমাও পান।
কথা হচ্ছে অলড্রিচ আমেসের। আমেরিকার মেরিল্যান্ডের সংশোধনাগারে ৫ জানুয়ারি মৃত্যু হয়েছে অলড্রিচের। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।
বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার বছরের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে ডবল এজেন্টদের। প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করতে এবং নিজের দেশে শত্রুর গুপ্তচরবৃত্তির নেটওয়ার্ক ভেঙে ফেলার ক্ষেত্রে এই ডবল এজেন্টদের জুড়়ি মেলা ভার।
বিশ্বে ডবল এজেন্টদের ইতিহাস অনেক পুরনো। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে চিনের সেনানায়ক সান জু তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে ডবল এজেন্ট নিয়োগের জন্য উদার ভাবে ব্যয় করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সান জু তাঁর ‘দ্য আর্ট অফ ওয়ার’-এ লিখেছেন, ‘‘আমাদের উপর গুপ্তচরবৃত্তি করতে আসা শত্রুর গুপ্তচরদের খুঁজে বার করতে হবে, ঘুষ দিয়ে প্রলুব্ধ করতে হবে, দূরে নিয়ে যেতে হবে এবং আরামে আশ্রয় দিতে হবে। এই ভাবে তাঁরা ডাবল এজেন্ট হয়ে উঠবে এবং আমাদের সেবা করার জন্য তৈরি থাকবে।’’
ইতিহাসে অনেক বিখ্যাত ডাবল এজেন্ট রয়েছেন, যাঁরা একা হাতে ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করেছিলেন। গুপ্তচরবৃত্তির ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত ডাবল এজেন্ট ছিলেন মাতা হারি। মাতা ছিলেন এক জন বিদেশি নৃত্যশিল্পী এবং যৌনকর্মী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য ১৯১৭ সালে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ফ্রান্স।
এই ডবল এজেন্টদের কেউ কেউ দেশপ্রেমে অনুপ্রাণিত ছিলেন তো কেউ আদর্শে। সিআইএ কর্তা অলড্রিচও ছিলেন তেমনই এক ডবল এজেন্ট। বলা হয়, ডবল এজেন্ট হিসাবে আমেরিকার যে ক্ষতি অলড্রিচ করেছিলেন, তা অন্য কেউ কোনও দিন করতে পারেননি।
তবে আদর্শ বা দেশপ্রেম অলড্রিচকে ডবল এজেন্ট করেনি, করেছিল লোভ। ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে প্রথমে সোভিয়েতের কাছে এবং পরে রাশিয়ানদের কাছে বিভিন্ন সিআইএ অভিযান এবং এজেন্টদের সম্পর্কে অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি।
অলড্রিচের বাবাও ছিলেন সিআইএ এজেন্ট। বেশ কিছু দিন বর্মায় (অধুনা মায়ানমার) কর্মরত ছিলেন তিনি। অলড্রিচের বাবা ছিলেন কুখ্যাত মাতাল। কলেজ ছেড়ে দেওয়ার পর বাবার সুপারিশে সিআইএতে কেরানি হিসেবে চাকরি পান অলড্রিচ।
১৯৬৯ সালে সহকর্মী তথা সিআইএ এজেন্ট ন্যান্সি সেগেবার্থকে বিয়ে করেন অলড্রিচ। এর পর তাঁকে তুরস্কে বিদেশি এজেন্ট নিয়োগের জন্য কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স অফিসার হিসাবে পাঠানো হয়। কিন্তু আঙ্কারায় অলড্রিচের ঊর্ধ্বতনেরা মনে করেছিলেন তিনি গুপ্তচর হওয়ার অযোগ্য। চেয়ারে বসে কম্পিউটারের কাজই ভাল তাঁর জন্য। সে কথা অলড্রিচের তুরস্কের ঊর্ধ্বতনেরা সিআইএ-র সদর দফতরে চিঠি লিখে জানিয়েওছিলেন।
ঊর্ধ্বতনেরা জানিয়েছিলেন, অলড্রিচের সমস্যা মদ্যপান। মদ্যপ অলড্রিচ এক বার একটি ট্রেনে অত্যন্ত সংবেদনশীল নথিপত্র-সহ একটি ব্রিফকেস রেখে চলে এসেছিলেন। মদ খেয়ে গাড়ি চালানোর জন্যও ধরা পড়েছিলেন। ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও ছিল তাঁর বিরুদ্ধে।
১৯৭২ সালে ব্যর্থ গুপ্তচর হিসাবে আমেরিকায় ফিরে আসেন অলড্রিচ। ব্যর্থতা মেনে না নিতে পেরে প্রচুর পরিমাণে মদ্যপান শুরু করেন তিনি। দাম্পত্যজীবনেও সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে। পরে বিয়ে ভেঙেও যায়। এর পর সিআইএ-তে তাঁর স্থবির কেরিয়ার শুরু করার জন্য রুশ ভাষা শিখতে শুরু করেন অলড্রিচ। এর পর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সোভিয়েত বিভাগে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।
১৯৮২ সালে সিআইএ-র তরফে অলড্রিচকে মেক্সিকোয় পাঠানো হয়, যা তখন সোভিয়েত গোয়েন্দা কার্যক্রমের কেন্দ্রস্থল ছিল। ১৯৮৩ সালে আমেরিকা ফিরে যান অলড্রিচ। তাঁর মদ্যপানের সমস্যা নিয়ে সিআইএ-র অন্দরে ক্রমাগত উদ্বেগ দেখা দিলেও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সোভিয়েত কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স বিভাগের প্রধান হন তিনি।
ওই সময় কলম্বিয়ার দূতাবাসের এক কর্মী এবং সিআইএ-র গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ মারিয়া দেল রোজ়ারিও কাসাস ডুপুয়ের সঙ্গে প্রেম শুরু করেন অলড্রিচ। পরে তাঁকে বিয়েও করেন। অলড্রিচকে নতুন সংসার যেমন টানতে হত, তেমনই মাসে মাসে খোরপোশ দিতে হত প্রথম স্ত্রীকে। ধীরে ধীরে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন তিনি। প্রচুর টাকার দরকার পড়েছিল তাঁর।
১৯৮৫ সালে ভার্জিনিয়ার ল্যাংলিতে অবস্থিত সিআইএ সদর দফতরে সোভিয়েত/পূর্ব ইউরোপীয় বিভাগে নিযুক্ত থাকাকালীন ওয়াশিংটনে থাকা সোভিয়েত দূতাবাসে গোপনে যোগাযোগ করেন অলড্রিচ। টাকার বিনিময়ে রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। জানা যায়, সোভিয়েতে গোপনে এফবিআই-এর হয়ে কাজ করা কয়েক জন কেজিবি অফিসারের নাম দিয়েছিলেন অলড্রিচ। পরিবর্তে পেয়েছিলেন ৫০ হাজার ডলার।
অভিযোগ, ১৯৮৫ সালে বেশ কয়েক বার এক সোভিয়েত কূটনীতিকের সঙ্গে দেখা করেছিলেন অলড্রিচ। তাঁর কাছে তিনি সিআইএ এবং এফবিআই-এর বেশ কিছু গোপন নথি এবং তথ্য পাচার করেছিলেন। ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরেও কলম্বিয়ার বোগোটায় মস্কোর এক কেজিবি অফিসারের সঙ্গে দেখা করেন অলড্রিচ।
১৯৮৬ সালের জুলাইয়ে অলড্রিচকে ইটালির রোমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। রোমে গিয়েও কেজিবির সঙ্গে বন্ধুত্ব চালিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। গোপনে বৈঠক করার পাশাপাশি টাকার বিনিময়ে কেজিবি কর্তাদের সিআইএ-র গোপন নথি পাচার করতেন তিনি। রোমে কার্যভার শেষে ১৯৮৯ সালে আবার ওয়াশিংটনে ফিরে এসেছিলেন অলড্রিচ। সেখানেও ডবল এজেন্ট হিসাবে কেজিবির সঙ্গে গোপন আঁতাঁত বজায় রেখেছিলেন তিনি। কেজিবি কর্তাদের গোপনে নথি পাচারের জন্য কয়েক বছরে প্রায় ২৭ লক্ষ ডলার পেয়েছিলেন অলড্রিচ।
ইতিমধ্যে সিআইএ এবং এফবিআই জানতে পারে যে, সোভিয়েতে থাকা তাঁদের গুপ্তচরদের একে একে গ্রেফতার করা হচ্ছে এবং মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। ১০ জন সোভিয়েত এবং সোভিয়েত-ব্লক গুপ্তচরকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে সেই সময় গ্রেফতার করা হয়।
সিআইএ-র সঙ্গে অলড্রিচের বিশ্বাসঘাতকতার জেরে কয়েক বছরের মধ্যে কেজিবির অন্দরে থাকা সিআইএ-র প্রায় সব গুপ্তচর ধরা পড়ে যান। সন্দিহান হয়ে পড়ে সিআইএ। আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থার কর্তারা বুঝতে পারেন, সর্ষের মধ্যেই ভূত লুকিয়ে রয়েছে।
অন্য দিকে, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরেও রাশিয়ার সঙ্গে তলে তলে সম্পর্ক রেখেছিলেন অলড্রিচ। অর্থের বিনিময়ে সিআইএ-র নথি পাচার জারি রাখেন তিনি। বিভিন্ন সময়ে আমেরিকার নিরাপত্তা সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য রাশিয়ার হাতে পৌঁছোতে থাকে অলড্রিচ মারফত।
বলা হয়, সিআইএ-র ১০০টিরও বেশি গোপন অভিযানের কথা রাশিয়ার কাছে ফাঁস করেছিলেন অলড্রিচ। মস্কোয় সিআইএ-র হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করা ৩০ জনেরও বেশি চরের পরিচয় প্রকাশ করেছিলেন, যার ফলে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয় রাশিয়ায়।
এরই মধ্যে অলড্রিচের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা, বিদেশভ্রমণ, দামি সম্পত্তি, গাড়ি সিআইএ-র দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। অলড্রিচের বেশ কিছু বেনামি সম্পত্তিরও হদিস পায় সিআইএ এবং এফবিআই। সিআইএ কর্তারা বুঝতে পারেন, আসল ভূত কে। গোপনে অলড্রিচের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়।
অবশেষে ১৯৯৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্রেফতার করা হয় অলড্রিচকে। তার আগে প্রায় ১০ মাস ধরে তাঁর গতিবিধির উপর নজর রেখেছিলেন সিআইএ আধিকারিকেরা। গ্রেফতারির সময় অলড্রিচের বয়স ছিল ৩১। সিআইএ-র উচ্চপদস্থ এবং অভিজ্ঞ কর্তা হিসাবে কর্মরত ছিলেন তিনি। অলড্রিচের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী রোজ়ারিওকেও গ্রেফতার করা হয়। তদন্তে উঠে এসেছিল, রাশিয়ার কাছে নথি পাচারে অলড্রিচকে প্রত্যক্ষ ভাবে সমর্থন করেছিলেন রোজ়ারিও।
তদন্ত চলাকালীন ১৯৯৪ সালের ২৮ এপ্রিল অলড্রিচ এবং রোজ়ারিও— উভয়েই নিজেদের দোষ স্বীকার করেন। অলড্রিচকে প্যারোলে মুক্তির সম্ভাবনা ছাড়াই যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রোজ়ারিওকে দেওয়া হয় ৬৩ মাসের কারাদণ্ড। তার পর থেকে জেলেই বন্দি ছিলেন অলড্রিচ। আমেরিকার একাধিক কারাগারে ঠাঁই হয়েছিল তাঁর। মেরিল্যান্ডের জেলে থাকাকালীন গত ৫ জানুয়ারি ৫২ বছর বয়সে মৃত্যু হয় অলড্রিচের।
তৎকালীন সিআইএ পরিচালক আর জেমস উলসি এক বার বলেছিলেন, ‘‘আমাদের অনেক গোয়েন্দা এবং চরের প্রাণ গিয়েছিল কারণ অলড্রিচের মতো বিশ্বাসঘাতক জীবনে বড় বাড়ি-গাড়ি চেয়েছিলেন।’’ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বয়সকালে অলড্রিচ নিজেও তাঁর কর্মকাণ্ডের জন্য অনুতপ্ত হয়ে পড়েছিলেন। জানিয়েছিলেন ভদকা, অহঙ্কার, মহত্ত্বের ভ্রান্ত ধারণা এবং লোভের কারণেই বিপথে চালিত হয়েছিলেন তিনি।
সব ছবি: সংগৃহীত।