তেলের ভান্ডারের পর টন টন ‘হলুদ ধাতু’র সন্ধান মিলল বালির দেশে। পশ্চিম এশিয়ার রাষ্ট্রের মাটির তলায় লুকিয়ে রয়েছে তাল তাল সোনা! দুনিয়ার অন্যতম ধনী দেশটি আক্ষরিক অর্থেই এ বার সোনায় মুড়ে যেতে চলেছে। তেলের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে সে দেশের অর্থনীতির পালে জোর হাওয়া দেবে সোনা।
খনিজ তেল সমৃদ্ধ রাষ্ট্র সৌদি আরব। নতুন বছরের শুরুতেই সুখবর মিলল আরব মুলুকে। দেশটিতে একসঙ্গে চারটি জায়গায় ৭০.৮ লক্ষ আউন্স বা প্রায় ২৪৪ টন সোনা মজুতের হদিস মিলেছে বলে দাবি। এই দাবি বাস্তব হলে তা আধুনিক খনিজ সম্পদের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন বলে গণ্য হবে, এমনটাই ধারণা খনিজ বিশেষজ্ঞদের।
সৌদিতে যে সোনা মজুতের কথা বলা হচ্ছে সেই হলুদ সম্পদের মূল্য ৩২ লক্ষ ৫৯ হাজার ৮১২ কোটি টাকা। এই বিপুল স্বর্ণভান্ডারের জ্যাকপট হাতের মুঠোয় এলে সৌদির অর্থনীতি আরও ফুলেফেঁপে উঠবে তা বলাই বাহুল্য। সোনার খনি সন্ধানের খবরটি ১২ জানুয়ারি বিশ্বের কাছে প্রকাশ্যে এনেছে সে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত খনিজ উত্তোলনকারী সংস্থা মাদেন।
সরকারপোষিত সংস্থাটি এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করে জানিয়েছে, দেশে সোনার ভান্ডার খুঁজে বার করার জন্য বিভিন্ন স্থানে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করেছিল তারা। সেই খননকার্যের ফলে প্রাথমিক ভাবে মনে করা হয়েছিল ৯০ লক্ষ সোনা সঞ্চিত থাকতে পারে মাটির নীচে। পরে তুল্যমূল্য বিচার করে সংস্থাটি জানিয়েছে সৌদির চারটি স্থানে প্রায় ৭১ লক্ষ টন সোনা সঞ্চিত রয়েছে।
মাদেন জানিয়েছে, মধ্য আরবের সোনার খনিগুলিতে উন্নত মানের খননকার্য চালানোর ফলে নতুন নতুন খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চল চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। ইতিমধ্যেই মক্কায় মনসৌরি মাসারা স্বর্ণখনিতে মাদেন সোনা উত্তোলনের কাজ চালাচ্ছে। সেখান থেকে বছরে ৩০ লক্ষ আউন্স সোনা উত্তোলন করা হয়। উরুক এবং উম্মে আস সালামের খনি থেকে সম্মিলিত ভাবে ১০.৬ লক্ষ আউন্স সোনা উত্তোলন করা হয়েছে। একই সঙ্গে যেখানে ওয়াদি আল জাওয়ের আকর থেকে আনুমানিক ৩৮ লক্ষ আউন্স সোনা উত্তোলন করা হয়েছে।
মনসৌরি মাসারা স্বর্ণখনি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সোনার ভান্ডার বলে পরিচিত। সেখানে মাটির নীচে কয়েক লক্ষ টন সোনা জমা রয়েছে বলে অনুমান খনি বিশেষজ্ঞদের। মধ্য আরব জুড়ে মাটির নীচে থরে থরে সোনা জমে রয়েছে, বলছে জরিপ অনুসন্ধানে জানা যায়। সেই অনুমান কাজে লাগিয়ে ওই অঞ্চল জুড়ে দীর্ঘ দিন ধরে কৌশলগত ভাবে অনুসন্ধান পর্ব চালিয়ে গিয়েছে মাদেন। আর তাতেই এসেছে সাফল্য।
মাদেনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বব উইল্ট জানিয়েছেন, নতুন আবিষ্কারগুলি এই দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধান কৌশলেরই সাফল্য। সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলটি বাস্তবে যে কাজ করছে, তারই প্রমাণ সঞ্চিত সোনার খনির নতুন সংযোজন। এই কারণে সংস্থাটি আরবভূমিতে স্বর্ণসন্ধানে ক্রমাগত বিনিয়োগ করে চলেছে। বিনিয়োগের সেই প্রতিফলন যুক্ত হয়েছে মাদেনের ‘পোর্টফোলিয়োয়’।
সৌদির সোনার ভান্ডার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করবে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে আগামী দিনে দেশে কোটি কোটি ডলার বিদেশি বিনিয়োগ আসতে পারে। খনিজ তেলের পাশাপাশি সোনার খনিতেও বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবেন বিদেশি সংস্থাগুলি। ফলে দেশের অর্থনীতির ভিতকে আরও শক্তিশালী করবে বলে অনুমান সে দেশের সরকারের।
২০২২ সাল থেকে মদিনা শহরের সোনা এবং তামার খনিতে খনিজ উত্তোলন শুরু করে সরকার। আরব মুলুকে বিদেশ থেকে আরও বিনিয়োগ এলে সৌদি প্রশাসন যে তামা এবং হলুদ ধাতুর উত্তোলন কয়েক গুণ বৃদ্ধি করতে পারবে, তা বলাই বাহুল্য। সোনা নিয়ে সরকার ও মাদেনের বেশ বড়সড় পরিকল্পনা রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে হলুদ ধাতুর শিল্পকে তারা ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছে দিতে চায়। সোনার এই বিপুল ভান্ডারকে কাজে লাগিয়ে তাকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ হিসাবে গড়ে তুলতে চায় সৌদির রাজপরিবার ও মাদেন।
সোনা ছাড়াও মাদেন অন্যান্য খনিজ সম্পদের দিকেও নজর দিতে শুরু করেছে। জাবাল শায়বান এবং জাবাল আল ওয়াকিলে প্রাথমিক পর্যায়ের খননকাজে তামা, নিকেল এবং প্ল্যাটিনামের মতো মূল্যবান ধাতুর উপস্থিতি শনাক্ত করেছে।
মাদেনের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রধান খনি মনসৌরি মাসারা সোনা উত্তোলনে দেশের মধ্যে রেকর্ডধারী। সেখানকার আকরিকের নমুনা পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করার পর দেখা গিয়েছে প্রতি টন মাটিতে ২.৮ গ্রাম পর্যন্ত সোনা রয়েছে। অনুমান, ১১ কোটি ৬০ লক্ষ টন সোনা জমানো রয়েছে সেই খনিতে। খনিটি সম্প্রসারণ ও ড্রিলিংয়ের ফলে পরবর্তী কালে তাতে আরও ৪০ লক্ষ আউন্স সোনা সংযোজিত হতে পারে বলে মাদেনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাদেন পশ্চিম এশিয়ার বৃহত্তম খনি এবং ধাতু উত্তোলনকারী সংস্থাগুলির মধ্যে একটি। ২০২৩ সালে এর সম্পদের পরিমাণ ছিল ৭১২ কোটি ডলার। ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী মাদেন ১৭টি খনি এবং সাইট পরিচালনা করে। কর্মীসংখ্যা ৬ হাজারের বেশি। ৩০টি দেশে পণ্য রফতানি করে তারা। আগামী ১৮ বছরে ফসফেট, অ্যালুমিনিয়াম, সোনা, তামা এবং নতুন নতুন খনিজ পদার্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে পা রাখতে চায় মাদেন। ভবিষ্যতে সে দেশের ২৫ লক্ষ কোটি ডলারের খনিজ সম্পদকে কাজে লাগানোই এই সংস্থার মূল পরিকল্পনা।
সৌদির বৃহত্তম খনিজ উত্তোলনকারী সংস্থা মাদেন নিশ্চিত করেছে যে, মাসারার খনিতে ২০২৬ সাল পর্যন্ত খনন অব্যাহত থাকবে। বিশেষজ্ঞদের আশা, পর পর এই আবিষ্কারের ফলে সৌদির খনিশিল্পের চেহারা বদলে যেতে পারে।
নিজের দেশে কুবেরের ঐশ্বর্য পোঁতা থাকলেও পাকিস্তানের স্বর্ণভান্ডারের দিকেও নজর রয়েছে ইসলামি দেশটির। মাটি খুঁড়ে ওই হলুদ ধাতুর উত্তোলনে প্রবল আগ্রহ দেখিয়েছেন আরব মুলুকের যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমন আল-সৌধ। গত বছর (২০২৫ সালে) এই নিয়ে ইসলামাবাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিল সৌদি সরকার। পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশের রেকো ডিকের তামা ও সোনার খনিতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে আরব দেশ।
বালুচিস্তানের সোনা এবং তামার খনিতে বিনিয়োগের জন্য ইসলামাবাদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে একটি পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (পিআইএফ) তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে সৌদি প্রশাসনের। এর মাধ্যমে মোট ৯২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার লগ্নি পেতে পারে পাকিস্তান।
সরকারি সূত্রের মতে, সৌদির মাটিতে প্রভূত পরিমাণ খনিজ সম্পদ রয়েছে। সে দেশের জিয়োলজিস্টস কো-অপারেটিভ অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল আজিজ বিন লাবনের মতে, সৌদিতে ৫,৩০০-র বেশি খনিজ সম্পদের খোঁজ পাওয়া যেতে পারে। আকরিক সোনা বা তামা ছাড়াও সৌদিতে বিভিন্ন ধরনের ধাতু এবং অধাতব শিলা, অলঙ্কারে ব্যবহার হয় এমন দামি পাথরও রয়েছে তালিকায়। সেই সঙ্গে নির্মাণশিল্পে ব্যবহৃত হয় এমন সামগ্রীও ছড়িয়ে রয়েছে এ দেশে।
নতুন খনিগুলি থেকে সোনা উত্তোলনের কাজ শুরু হলে নয়া উচ্চতায় পৌঁছোবে সৌদির খনিশিল্প, এ নিয়ে আশাবাদী সে দেশের শিল্পমহল। এই নতুন খোঁজের ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাঁদের ব্যবসার ক্ষেত্র হিসাবে সৌদিকে বেছে নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এর জেরে দেশের অর্থনীতির ভোল পাল্টে যাবে বলেও দাবি ওই রিপোর্টে। একই আশা প্রকাশ করেছেন সৌদি প্রশাসন।
সব ছবি: সংগৃহীত।