ছিলেন ক্রিকেটজগতের উদীয়মান তারকা। খেলেছেন রঞ্জি ট্রফিতেও। যদিও ধীরে ধীরে ক্রিকেটের সম্ভাবনাময় কেরিয়ার থেকে সরে গিয়ে অন্ধকার জগতের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন নিজেকে। দীর্ঘ ১৬ বছর কেটেছে গরাদের পিছনে। একের পর এক ঘৃণ্য অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল তাঁর নাম। নাবালিকাদের অপহরণ করে তাদের ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত ছিলেন প্রাক্তন এই ক্রিকেটার।
পুলিশ সূত্রে খবর, সৎপাল গত চার মাসে ১০ জনেরও বেশি নাবালিকাকে অপহরণ, ধর্ষণ করেছিলেন। গণধর্ষণের সঙ্গেও জড়ায় তাঁর নাম। চারটি রাজ্যের মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধী ছিলেন সৎপাল ওরফে সত্তু। ২৫,০০০ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল তাঁর নামে। সেই কুখ্যাত অপরাধীই উত্তরপ্রদেশে মুজ়ফ্ফরনগর পুলিশ এবং স্পেশ্যাল অপারেশন গ্রুপের (এসওজি) সঙ্গে একটি এনকাউন্টারে মারা গিয়েছেন বলে খবর।
ত্তরপ্রদেশের মুজ়ফ্ফরনগরের পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় সত্তুর গায়ে গুলি লাগে। তাতেই মৃত্যু হয়েছে কুখ্যাত এই অপরাধীর। পঞ্জাবের বাসিন্দা অভিযুক্ত সৎপাল ওরফে সত্তু মোট ১৬ বছর কারাগারে কাটিয়েছিলেন। এর মধ্যে ১১ বছর মুজ়ফ্ফরনগরে এবং ৫ বছর লুধিয়ানা জেলে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লুধিয়ানা জেল থেকে পালিয়ে যান সত্তু। তার পর থেকে মুজ়ফ্ফরনগর ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলিতে গা-ঢাকা দিয়ে ছিলেন তিনি। তাঁর হদিস দিতে পারলে ২৫ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল।
গত সোমবার, ২২ জুন, রাত প্রায় সাড়ে ১১টায় এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। গুলি চলার পর পুলিশের জালে ধরা পড়েন সত্তু। একটি গুলি তাঁর পায়ে এবং অন্যটি কোমরের উপরে লাগে। তাঁকে প্রথমে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। মঙ্গলবার অবস্থার অবনতি হয়। ওই দিনই দুপুর ১টা নাগাদ তিনি মারা যান। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
১৯ জুন মুজ়ফ্ফরনগরের তিতাভি এলাকার এক ব্যক্তি সিভিল লাইন্স থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁর নাবালিকা মেয়েকে এক ব্যক্তি প্রলুব্ধ করে গাড়িতে তুলে নিয়ে গিয়েছে বলে জানান তিনি। মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে এসএসপি সঞ্জয়কুমার বর্মার নির্দেশে পুলিশের ১০টি দল গঠন করা হয়। পুলিশ প্রায় ১,০০০টি সিসিটিভির ফুটেজ খতিয়ে দেখতে শুরু করে।
সিসিটিভিতে থাকা ব্যক্তিকে সৎপাল বলে চিহ্নিত করে পুলিশ। তাঁর সন্ধানে চিরুনিতল্লাশি শুরু হয়। পুলিশ খবর পায় যে অভিযুক্ত আর একটি বড় অপরাধের পরিকল্পনা করছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তল্লাশি অভিযান শুরু করা হয়। এই সময় একটি গাড়ি থামানোর চেষ্টা করা হলে চালক পুলিশের উপর এলোপাথাড়ি গুলি চালান বলে অভিযোগ। ওই গাড়িতে ছিলেন সৎপাল। গুলিতে সাব-ইনস্পেক্টর অজয় গৌর এবং কনস্টেবল অঙ্কিত আহত হন। পাল্টা জবাবে পুলিশের গুলিতে সৎপাল আহত হন।
সংঘর্ষের পর পুলিশ গাড়িটি থেকে অপহৃত নাবালিকাকে নিরাপদে উদ্ধার করে। ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একটি রিভলভার, বিপুল পরিমাণ গুলি, মেয়েটির দুল, একটি জাল আধার কার্ড, একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। তল্লাশি অভিযানে চার রাজ্যের পুলিশদল অংশ নিয়েছিল।
পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে, সত্তু অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে নাবালিকা এবং গরিব পরিবারের মেয়েদের লক্ষ্যবস্তু করতেন। নিজেকে সৈনিক, সরকারি কর্মচারী বা প্রভাবশালী ব্যক্তি বলে পরিচয় দিয়ে পরিবারগুলির বিশ্বাস অর্জন করতেন। অনেক সময় তিনি গরিব পরিবারগুলিকে আর্থিক ভাবে সাহায্য করার অছিলায় তাঁদের বাড়িতে যাওয়া শুরু করতেন। তার পর চাকরি পাইয়ে দেওয়ার অজুহাতে মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে যেতেন।
এর পর সৎপাল তাঁদের নির্জন জায়গায়, জঙ্গলে বা হোটেলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করতেন। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধর্ষণের পর ভারী বস্তু দিয়ে নাবালিকাদের মাথায় আঘাত করতেন। তারা তখন কিছু বলার মতো অবস্থায় থাকত না।
পুলিশের দাবি অনুযায়ী, নিহত সৎপাল ওরফে সত্তু কুখ্যাত ছোটা রাজন গ্যাংয়ের সদস্য ছিলেন। চণ্ডীগড়ের রামদরবার সেক্টর-৩২ এলাকার বাসিন্দা সত্তুর বাবার নাম মুন্নু রাম। পুলিশ জানিয়েছে, তিনি ওই অপরাধীচক্রে শুটার হিসাবে কাজ করতেন। তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি রাজ্য জুড়ে ২৪টিরও বেশি ফৌজদারি মামলা নথিভুক্ত ছিল। এ সব মামলার মধ্যে হত্যা, ডাকাতি, ধর্ষণ, অপহরণ-সহ একাধিক গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
একসময় ক্রিকেটজগতে উদীয়মান তারকা হিসাবে পরিচিত ছিলেন সত্তু। তাঁর দ্রুত গতির বোলিং প্রতিভা তাঁকে রঞ্জি ট্রফির মতো মঞ্চে পৌঁছে দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জীবনের মোড় বদলে যায়। ভুল সিদ্ধান্ত ও প্রতিকূল পরিস্থিতি তাঁকে এমন এক পথে নিয়ে যায়, যেখান থেকে তিনি আর ফিরে আসতে পারেননি। ক্রিকেটের সাদা জার্সি পরে মাঠে নামা এই খেলোয়াড় ধীরে ধীরে অপরাধজগতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন এবং পরে সেই অন্ধকারজগতের এক পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
১৯৯৬ সালে মোহালি এবং জালন্ধরে পঞ্জাবের হয়ে রঞ্জি ম্যাচ খেলেছিলেন সত্তু। প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার যুবরাজ সিংহ যে মাঠে খেলতেন সেখানেই খেলতেন তিনি। এ ছাড়াও, যুবরাজের বাবা এবং প্রাক্তন ক্রিকেটার যোগরাজ সিংহের কাছেও কিছু দিন প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। সেই সময় সত্তু পঞ্জাব ক্রিকেটের প্রতিভাবান ফাস্ট বোলার হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ইংল্যান্ডে গিয়ে একটি সফল কেরিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি।
ইংল্যান্ডে যাওয়ার জন্য তাঁর প্রায় দু’লক্ষ টাকার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আর্থিক অভাব তাঁর স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই সময় কিছু ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর বিবাদ হয় এবং তিনি হিংসার ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন। এই ঘটনার পর নির্বাচকেরা তাঁকে দল থেকে বাদ দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সত্তু নির্বাচকদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এই ঘটনা তাঁর ক্রিকেটের কেরিয়ারকে শেষ করে দেয়। এর পর থেকেই তাঁর জীবন এক বিপজ্জনক দিকে মোড় নেয়।
ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি নামকরা অপরাধীদের সংস্পর্শে আসেন এবং ধীরে ধীরে অপরাধজগতে জড়িয়ে পড়েন। একসময় পুরসভার কাউন্সিলর থাকা সত্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংগঠিত অপরাধজগতের গভীরে প্রবেশ করেন। পুলিশের নথি অনুযায়ী, কুখ্যাত ছোটা রাজন গ্যাংয়ের সঙ্গেও তাঁর যোগসূত্র ছিল। পঞ্জাব ও উত্তরপ্রদেশ-সহ বেশ কয়েকটি রাজ্যের পুলিশ দীর্ঘ দিন ধরে তাঁকে খুঁজছিল।
সত্তুর বিরুদ্ধে খুন, ডাকাতি, তোলাবাজি, অপহরণ এবং ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের জন্য প্রায় ৩০টি মামলা নথিভুক্ত ছিল। চণ্ডীগড়ের ৩১ নম্বর সেক্টর পুলিশ স্টেশনে একজন দাগী অপরাধী বলে চিহ্নিত ছিলেন তিনি। মুজ়ফ্ফরনগরের এক ব্যবসায়ীকে হত্যার দায়ে তিনি প্রায় ১১ বছর জেল খেটেছেন। ২০১০ সালে মেরঠে সুতোবোঝাই একটি ট্রাক ডাকাতির ঘটনাতেও তাঁর নাম জড়িয়েছিল।
তাঁর অপরাধজীবনের আরও একটি ঘটনা সামনে আসে ২০২৪ সালের মার্চ মাসে। জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি স্ত্রী ও স্ত্রীর কথিত প্রেমিকের একটি ভিডিয়ো দেখেন বলে পুলিশ সূত্রে খবর। ঘটনার পর তাঁর জীবনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তাঁর অপরাধ ইতিহাসের আরও একটি অধ্যায় হয়ে ওঠে।
সত্তু তাঁর স্ত্রীর প্রেমিককে একটি মদ্যপানের আসরে আমন্ত্রণ জানান এবং তাঁকে হত্যা করেন। এই মামলায় পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে লুধিয়ানায় পুলিশের হেফাজত থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন সৎপাল। অবশেষে, মুজ়ফ্ফরনগর সিভিল লাইন্স থানা এবং ক্রাইম ব্রাঞ্চের একটি যৌথ দল তাঁকে এনকাউন্টারে হত্যা করে।
ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় তৈরি।