ধার করা টাকা দিয়ে ধার মেটানো। দেনায় ডুবে থাকা পাকিস্তানের ঋণ মেটানোর বিকল্প আবারও ধার করা। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ধারের টাকা ফেরত চাইতেই মাথায় বজ্রাঘাত ইসলামাবাদ। আন্তর্জাতিক মুদ্রাভান্ডার ও বিভিন্ন দেশের কাছে হাত পেতেই দেশ চালাচ্ছে শাহবাজ় শরিফ সরকার। গত কয়েক বছর ধরেই আর্থিক দিক থেকে দেউলিয়ার দরজায় দাঁড়িয়ে আছে ইসলামাবাদ।
ঋণের বেড়াজাল ক্রমশ ঘিরছে ইসলামাবাদকে। গলা পর্যন্ত দেনায় হাঁসফাঁস অবস্থা। খুঁড়িয়ে চলা আর্থিক পরিস্থিতিতে খাঁড়ার ঘা সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ঋণ পরিশোধের দাবি। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের কাছে টাকা ফেরত চেয়ে বসেছে আরব মুলুকের দেশটি। পাকিস্তানকে ঋণ শোধ করে দিতে বলেছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি।
মোট ৩০০ কোটি ডলারের (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা) ঋণ ফেরত দিতে হবে শাহবাজ় শরিফের সরকারকে। একাধিক সংবাদ প্রতিবদনের রিপোর্টে দাবি করা হচ্ছে, পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের কারণে ইসলামাবাদকে ওই ঋণ দ্রুত মিটিয়ে ফেলতে বলা হয়েছে। সেই টাকা মিটিয়ে দিতেও রাজি হয়েছে পাকিস্তান। এপ্রিলের শেষের দিকে এই ঋণ ইসলামাবাদ মিটিয়ে দেবে বলে জানা যাচ্ছে।
এর মধ্যে ২০০ কোটি ডলার বা প্রায় ৫৬ লক্ষ কোটি পাকিস্তানি টাকা আগামী ১৭ এপ্রিলের মধ্যে পরিশোধ করার কথা রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ৩০০ কোটি ডলার ঋণের সম্পূর্ণ পরিশোধের দাবি তোলার পর পাক অর্থমন্ত্রী মহম্মদ ঔরঙ্গজেব ওয়াশিংটনে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের কাছে এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন।
যুদ্ধের কারণে আকাশছোঁয়া তেলের দামের মধ্যেই বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়ের পরিমাণ বজায় রাখতে পাকিস্তান টাকার ব্যবস্থার বিকল্প বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন পাক অর্থমন্ত্রী। হঠাৎ এত বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারে বড় ধরনের টান পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই জাঁতাকলে আটকে পাকিস্তান সরকার দুই ‘বন্ধু’ চিন এবং সৌদি আরবের কাছে বিকল্প আর্থিক সহায়তার বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছে। এ ছাড়া কিছু অংশ সরাসরি বিনিয়োগে রূপান্তর করার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে ইসলামাবাদ। কারণ ৩০০ কোটি ডলারের ঋণ পরিশোধ করলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার প্রায় ১৮ শতাংশ কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কিন্তু ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে মরিয়া পাকিস্তান।
বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় পাকিস্তানকে সাহায্য করতে এই ঋণ দিয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। সাধারণত এই ধরনের ঋণের ক্ষেত্রে বার বার ‘রোলওভার’ বা মেয়াদ বাড়ানো হয়। এই ঋণের মেয়াদ গত কয়েক দফায় পুনর্নবীকরণও করা হয়েছে। কিন্তু এ বার দীর্ঘমেয়াদি মেয়াদের পরিবর্তে মাত্র এক মাসের জন্য মেয়াদ বাড়িয়েছিল আরব রাষ্ট্রটি। পরবর্তী কালে পূর্ণ অর্থ ফেরত চায় তারা।
পাক অর্থমন্ত্রীর কথায়, “আমাদের যা কিছু জোগান দিতে হবে, তা বাণিজ্যিক বিকল্প এবং দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতা-সহ বিভিন্ন উৎসের সমন্বয়ে হবে।” অর্থাগমের সন্ধানে আমরা সব বিকল্পই খতিয়ে দেখছি।’’ ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইজ়রায়েল হামলার আগে পাকিস্তানের রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা উভয় ক্ষেত্রেই যথেষ্ট শক্তিশালী তহবিল ছিল বলে দাবি পাক অর্থমন্ত্রীর। ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে দেশের সক্ষমতার ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র উদ্ধৃত করে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চিন ও সৌদি আরবের সংস্থার কাছে আর্থিক সাহায্যের জন্য হাত পাততে পারে ইসলামাবাদ। যদিও এই বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছেন পাক অর্থমন্ত্রী। আর্থিক সহায়তা নিয়ে কোনও আলোচনা চলছে কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি ঔরঙ্গজ়েব।
আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার বা আইএমএফর ঋণ কর্মসূচির শর্ত অনুযায়ী পাকিস্তানকে বৈদেশিক অর্থায়নের উৎস নিশ্চিত রাখতে হয়। এই বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধ পাকিস্তানের জন্য আইএমএফের পরবর্তী কিস্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই।
আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার এবং বিশ্বব্যাঙ্কের সঙ্গে বৈঠকে পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী দেশের টালমাটাল অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশল ও বিকল্পের কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে একটি হল ইসলামি সুকুক। এটি ইসলামিক বন্ড নামেও পরিচিত। কিন্তু প্রচলিত অর্থে এটি কোনও বন্ড নয়। একটি সাধারণ বন্ডের নিয়ম অনুসারে সরকারকে টাকা ধার দিলে সরকার সুদ প্রদান করে।
সুকুক হল এমন একটি ঋণ যেখানে বিনিয়োগকারী কোনও নির্দিষ্ট সম্পদ বা প্রকল্পের আংশিক মালিকানা লাভ করেন এবং সেই প্রকল্প থেকে অর্জিত মুনাফা লাভ করেন। সারা বিশ্বে, বিশেষ করে মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য সুকুক একটি জনপ্রিয় মাধ্যম। এতে এক দিকে যেমন বড় প্রকল্পের জন্য বিশাল অঙ্কের তহবিল সংগ্রহ করে দেশ, অন্য দিকে যাঁরা সুদমুক্ত বিনিয়োগ খুঁজছেন তাঁদেরও সুবিধা হয়।
অর্থের অভাবে ধুঁকতে থাকা দেশগুলির দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়েই রেখেছে বেজিং। বিপদে পড়লে পাকিস্তানকে উপুড়হস্ত করতে এক পায়ে খাড়া চিন। সাম্রাজ্য বিস্তারে এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে টাকা ছড়িয়ে আধিপত্য কায়েম করার চেষ্টা করে চলেছে ড্রাগন। মার্কিন গোয়েন্দা রিপোর্ট বলছে, ‘মহাজনী কারবার’ ফেঁদেছে চিন। উন্নয়নের কথা বলে উন্নয়নশীল দেশগুলিকে বিপুল অঙ্কের অর্থ ধার দিচ্ছে তারা। সেই সূত্রেই এই সব দেশের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে ঢুকে পড়তে চাইছে বেজিং। কোনও কোনও দেশে আবার এর বিনিময়ে কৌশলগত ভাবে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি দখলের ষড়যন্ত্র চলছে।
পাকিস্তান চার বছরের ব্যবধানের পর ইউরোবন্ড ইস্যু করতে চলেছে। চলতি বছরে নতুন করে বৈশ্বিক বন্ডের বাজারে ফেরার পরিকল্পনা নিয়েছে ইসলামাবাদ। দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে পান্ডা বন্ড নিয়েও হাত পাকাতে চাইছে ইসলামাবাদ। এই চিনা বন্ড ছেড়ে চিনের বাজার থেকে ৩০০ কোটি ডলার পর্যন্ত সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে শাহবাজ় সরকার।
সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকে গত কয়েক বছর ধরেই এই ঋণ পাচ্ছিল পাকিস্তান। প্রায় ৬ শতাংশ সুদের হারে ঋণ পেয়ে আসছিল তারা। সংযুক্ত আরব আমিরশাহিও গত কয়েক বছর ধরে ঋণ পুনর্নবীকরণ করে আসছিল। গত বছরের ডিসেম্বরে এই ঋণের মেয়াদ প্রথমে এক মাসের জন্য এবং পরে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছিল।
ঋণের পরিমাণ যত বাড়ছে, ততই সেই আর্থিক বোঝা ঘাড় থেকে নামানোর জন্য পাক সরকারকে নানা পন্থা অবলম্বন করতে হচ্ছে। বেলআউট কর্মসূচির আওতায় দেশকে দেউলিয়া হওয়া থেকে উদ্ধারের জন্য সরাসরি নগদ পরিশোধের বিকল্প খুঁজছে ইসলামাবাদ। গভীর অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবিলার জন্য এবং ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক ঋণের কিছু অংশ মেটানোর জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সামরিক চুক্তিগুলির কাঁধে ভর করতে চাইছে ভারতের পশ্চিমের পড়শি দেশটি।
কৌশলের প্রথম ধাপে রয়েছে আর এক ইসলামি রাষ্ট্র। ভারতের ‘বন্ধু’ রাষ্ট্র বলে পরিচিত সৌদি আরবের কাছে ইতিমধ্যেই ২০০ কোটি ডলারের ঋণ নিয়ে রেখেছে পাকিস্তান। সৌদি ঋণকে সামরিক চুক্তিতে রূপান্তরিত করার জন্য ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু করেছে দুই দেশ। পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ডামাডোল আঁচ করে সৌদিও ঘর গোছাতে নেমে পড়েছে। আর এই অবস্থায় সৌদিকে চটাতে চায় না পাকিস্তান। তাই ২০২৫ সালের প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুযায়ী সৌদি আরবে যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছে রাওয়ালপিন্ডি।
কী ভাবে ইরানের হামলা থামানো যায়, সেই নিয়ে সৌদির সঙ্গে আলোচনা করেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। শনিবারের বৈঠকের চার দিন আগে সৌদির যুবরাজকে ফোন করেন শাহবাজ়। চুক্তি অনুসারে তিনি সব রকম পরিস্থিতিতে সৌদির পাশে থাকার আশ্বাস দেন। সৌদিও জানিয়ে দেয়, সেই চুক্তি মেনেই পাকিস্তানে ৫০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে তারা, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। সেই মতো ৩০০ কোটি ডলার পাকিস্তানকে সাহায্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সৌদি।
সব ছবি: সংগৃহীত।