ইসলামাবাদে ভেস্তে গিয়েছে আমেরিকা এবং ইরানের শান্তিবৈঠক। এর মধ্যেই খবর, আমেরিকা এবং ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার বৈঠকও আয়োজন করতে চায় পাকিস্তান। তারা চাইছে, এই বৈঠকটিও ইসলামাবাদেই হোক।
পাকিস্তানের দুই আধিকারিক সূত্রে তেমনটাই জানাচ্ছে সংবাদসংস্থা এপি। জানা গিয়েছে, দ্বিতীয় দফার বৈঠক আয়োজন করার জন্য ইতিমধ্যে প্রস্তাবও দিয়েছে ইসলামাবাদ। তবে এ বিষয়ে আমেরিকা বা ইরান এখনও পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত জানায়নি পাকিস্তানকে।
কিন্তু কেন ভেস্তে গিয়েছিল আমেরিকা এবং ইরানের শান্তিবৈঠক? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই জানিয়েছেন যে, ইসলামাবাদে একাধিক বিষয়ে আমেরিকা এবং ইরানের প্রতিনিধিরা সম্মত হয়েছিলেন। আলোচনা সফল হওয়ার পথেই এগোচ্ছিল। কিন্তু একটি বিষয় ‘কাঁটা’ হয়ে দাঁড়ায়।
ইরান কোনও ভাবেই পারমাণবিক বোমা তৈরির ইচ্ছা থেকে সরে আসতে রাজি হয়নি বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প। সে বিষয়ে তারা অনমনীয় ছিল। তার ফলে আমেরিকার পক্ষেও সমঝোতায় এগোনো সম্ভব হয়নি। ইরান অবশ্য পাল্টা দাবি করেছে যে, আমেরিকার ‘অযৌক্তিক’ দাবির কারণে আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মুশকিল আসান করতে আসরে নেমেছে রাশিয়া। জানিয়েছে, তাদের প্রস্তাব মেনে নিলে সহজেই আমেরিকা এবং ইরানের সংঘাতে ইতি টানা যেতে পারে। কী সেই প্রস্তাব?
আমেরিকার কাছে ইরানের পরমাণু বোমা বানানো নিয়ে সবচেয়ে বড় চিন্তা সে দেশের হাতে থাকা ৬০ শতাংশ শুদ্ধ ইউরেনিয়াম। মনে করা হচ্ছে ইরানের হাতে ৪৫০ কিলোগ্রাম ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অস্ত্রোপযোগী উপাদানে রূপান্তরিত করা যায়। এই পরিমাণ ইউরেনিয়াম দিয়ে ১০টিরও বেশি পরমাণু বোমা তৈরি করা সম্ভব।
অন্য দিকে, ২০১৫ সালের আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী, বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে ইরানের ২০ শতাংশের বেশি পরিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদনে ছাড় রয়েছে। তার বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন নিষিদ্ধ।
কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই আমেরিকা-সহ কয়েকটি পশ্চিমি দেশ এবং ইজ়রায়েল মনে করে ইরানের পরমাণু বিদ্যুৎ কর্মসূচির আসল উদ্দেশ্য পরমাণু অস্ত্র তৈরি করা। ইতিমধ্যেই ৬০ শতাংশ শুদ্ধ ইউরেনিয়াম তৈরি করে ফেলেছে ইরান। পরমাণু বোমা তৈরি করতে গেলে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ বা তার বেশি পরিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রয়োজন।
আর সে কারণেই ইরানকে থামাতে উদ্যত হয়েছে আমেরিকা-ইজ়রায়েল জোট। দু’দেশই চায় না যে, ইরানের হাতে পরমাণু অস্ত্র থাকুক। আর সে কারণেই জট তৈরি হয়েছে দু’পক্ষের। ইরান নাকি কোনও ভাবেই পরমাণু বোমা তৈরির ইচ্ছা থেকে সরে আসতে রাজি হচ্ছে না। আমেরিকাও জানিয়েছে, ইরানের হাতে থাকা ইউরেনিয়াম কুক্ষিগত করতে বদ্ধপরিকর তারা।
ফলে যত সমস্যা তা তৈরি হয়েছে ওই ৬০ শতাংশ শুদ্ধ ইউরেনিয়ামকে কেন্দ্র করে। সপ্তাহান্তে ইরান এবং আমেরিকার মধ্যে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায়, ফেব্রুয়ারির শেষে দু’দেশের মধ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধ স্থায়ী ভাবে শেষ হওয়ার আশাও কমেছে।
আর সেই সূত্র ধরেই রাশিয়ার আগমন। আমেরিকার সঙ্গে ভবিষ্যৎ শান্তিচুক্তির অংশ হিসাবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম গ্রহণ করতে রাশিয়া প্রস্তুত বলে সোমবার জানিয়েছে ক্রেমলিন। বিশ্বের বৃহত্তম পরমাণু অস্ত্রের ভান্ডারের অধিকারী রাশিয়া, যে কোনও শান্তিচুক্তির অংশ হিসাবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তাদের দিয়ে দেওয়ার জন্য বার বার প্রস্তাব দিয়েছে।
সংবাদসংস্থা এএফপির এক প্রশ্নের জবাবে সোমবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ‘‘প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আমেরিকা এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের সময় এই প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন। প্রস্তাবটি এখনও বহাল রয়েছে। কিন্তু ওদের তরফে এখনও কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি।’’
হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করা নিয়ে ট্রাম্পের হুমকি এবং সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেছে ক্রেমলিন। ফেব্রুয়ারির শেষে আমেরিকা ও ইজ়রায়েল যৌথ ভাবে ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকেই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি স্থবির হয়ে রয়েছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্রের কথায়, ‘‘এই ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে থাকবে।’’
তবে এই প্রথম নয়। মাসখানেক আগেও ইরানের যে ইউরেনিয়াম নিয়ে এত সমস্যা, তা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সমস্যা মিটিয়ে ফেলার প্রস্তাব দিয়েছিল রাশিয়া। কিন্তু রাশিয়ার এই আবেদনে সাড়া দেয়নি আমেরিকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়ার এই সমস্যা সমাধানের ‘মহান প্রচেষ্টা’ তত্ত্বগত ভাবে শুনতে ভাল লাগলেও, বাস্তবে তা সম্ভব নয়। অন্তত এই প্রস্তাব কখনওই মেনে নেবে না আমেরিকা। রাশিয়ার ইতিমধ্যেই উন্নত পরমাণু অস্ত্র রয়েছে এবং ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির অধীনে দেশটি ইরানের স্বল্প-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সংরক্ষণ করেছিল।
কিন্তু এখন ইরানের ইউরেনিয়াম রাশিয়ার হাতে তুলে দেওয়ার অর্থ তাদের পরমাণু শক্তির দিক দিয়ে আরও সবল করে দেওয়া। আর সে কারণেই আমেরিকা মস্কোর প্রস্তাবে কখনওই রাজি হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা।
অন্য দিকে আমেরিকা-সহ বহু দেশ অনেক দিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, কাসপিয়ান সাগরের সাহায্যে চোরাপথে ইরানকে হাতিয়ার চালান করে রাশিয়া। ফলে ইরানের ইউরেনিয়াম যে সেই পথে আবার ইরানে পৌঁছোবে না, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। অন্তত সেই আশঙ্কা থেকেই মস্কোর প্রস্তাব ওয়াশিংটন মেনে নেবে না বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
ফলে বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে এখনই ‘শান্তিদূত’ হওয়া হচ্ছে না রাশিয়ার। হরমুজ় সংক্রান্ত জট এখনও চলতে পারে বেশ কিছু দিন। এর মধ্যে আমেরিকা এবং ইরান দ্বিতীয় দফার বৈঠকে বসতে রাজি হবে কি না এবং বৈঠকে বসলেও সমস্যার সুরাহা হবে কি না, এখন সে দিকেই নজর সারা বিশ্বের।
সব ছবি: সংগৃহীত এবং ফাইল থেকে।