‘কাবুলিওয়ালার দেশে’ ঘন ঘন বোমাবর্ষণ! জঙ্গিদের গুপ্তঘাঁটি ওড়ানোর নামে শিশু ও নারীদের নির্বিচারে হত্যা। পাকিস্তানি ‘আগ্রাসনে’ অতিষ্ঠ তালিবান শাসিত আফগানিস্তান। ইসলামাবাদের এ-হেন ‘যুদ্ধং দেহি’ মনোভাবের কড়া সমালোচনা করেছে রাষ্ট্রপুঞ্জ। যদিও তা উড়িয়ে চক্রান্তের আজব তত্ত্ব খাড়া করতে মরিয়া রাওয়ালপিন্ডির সেনা অফিসারেরা। সেই মিথ্যা প্রচারে তাঁদের মুখে বার বার শোনা যাচ্ছে ভারত ও ইজ়রায়েলের নাম।
চলতি বছরের ২৮ জুন আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় তিনটি প্রদেশে হামলা চালায় পাক ফৌজ। পরের দিন ওই ঘটনা নিয়ে বিবৃতি দেন তালিবান সরকারের উপ-মুখপাত্র হামদুল্লা ফিতরাত। সমাজমাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘‘গভীর রাতে ইসলামাবাদের আক্রমণে নারী ও শিশু-সহ মোট ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত ১৬৩ জন।’’ এর পাশাপাশি রাওয়ালপিন্ডিকে সমুচিত জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে কাবুল।
২৭ জুন পাকিস্তানের আর্থিক রাজধানী করাচিতে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে। ইসলামাবাদের আধা সেনা সিন্ধু রেঞ্জার্সের ঘাঁটিকে নিশানা করে ৩-৪ জন সন্ত্রাসবাদীর একটি দল। তাদের এলোপাথাড়ি গুলিতে প্রাণ হারান বাহিনীর তিন সৈনিক। রাওয়ালপিন্ডির দাবি, ওই ঘটনার বদলা নিতেই আফগানিস্তানে বিশেষ অভিযান চালিয়েছে তাদের স্থল ও বায়ুসেনা। তাতে নিহত সন্ত্রাসবাদীর সংখ্যা ২৯।
সামরিক অভিযানের পরের দিন (পড়ুন ২৯ জুন) আফগানভূমিতে হামলার একটি ভিডিয়ো প্রকাশ করে পাক ফৌজ। পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে গণমাধ্যমের কাছে মুখ খোলেন ইসলামাবাদের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লা তারার। তাঁর কথায়, ‘ফিতনা আল-খোয়রিজ়’ জঙ্গিদের গুপ্তঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে আমাদের সেনা। পর্দার আড়ালে থেকে এই সন্ত্রাসবাদীদের মদত দিচ্ছে ভারত।’’ পরে আরও এক ধাপ এগিয়ে ইজ়রায়েলের নামও জোড়েন তাঁরা।
আফগানিস্তান সীমান্ত লাগোয়া পাকিস্তানের খাইবার-পাখতুনখোয়া প্রদেশে দীর্ঘ দিন ধরেই সক্রিয় রয়েছে তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) নামের এক বিদ্রোহী গোষ্ঠী। পাক ফৌজের খাতায় তাঁদেরই নাম ‘ফিতনা আল-খোয়ারিজ়’। রাওয়ালপিন্ডির অভিযোগ, ইচ্ছাকৃত ভাবে এই সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দিচ্ছে কাবুল। শুধু তা-ই নয়, ভারতের টাকায় ইজ়রায়েলি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির হাতিয়ার কিনে করাচির মতো শহরে হামলা চালাচ্ছে তাঁরা।
সম্প্রতি রেডিয়ো পাকিস্তানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ডঃ আবদুল্লা গুল। তাঁর কথায়, ‘‘কাবুল ও ইসলামাবাদের মধ্যে যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার জন্য দায়ী অপবিত্র ত্রিশক্তি জোট। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইজ়রায়েল সফর করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ঠিক তার পরেই আমাদের উপর হিন্দুকুশের ওপার থেকে হামলা শুরু হয়। ফলে কারা ষড়যন্ত্রকারী, সেটা স্পষ্ট।’’
গুলের দাবি, আফগান তালিবানের সাহায্যে পাকিস্তানকে নিশানা করা ভারত ও ইজ়রায়েলের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। ইসলামাবাদকে কাবুলের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে ব্যস্ত রাখতে চায় তারা। এতে ইহুদিদের পক্ষে ইরানকে ধ্বংস করা অনেক বেশি সহজ হবে। আর নয়াদিল্লি চেষ্টা করবে কাশ্মীর (পড়ুন পাক অধিকৃত জম্মু-কাশ্মীর) দখলের। তাঁর এই যুক্তির প্রতিধ্বনি শোনা গিয়েছে রাওয়ালপিন্ডির একাধিক অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসারের গলায়।
এ ব্যাপারে সরকারের পাশে দাঁড়িয়ে লাগাতার মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছে ইসলামাবাদের গণমাধ্যম। ফলে পাক নিউজ় চ্যানেলগুলির টক শো’র হট টপিক দাঁড়িয়েছে ভারত-ইজ়রায়েল-আফগানিস্তানের ‘বন্ধুত্ব’। উদাহরণ হিসাবে ক্যাপিটাল টিভি ও জিয়ো নিউজ়ের কথা বলা যেতে পারে। এ ছাড়া এই তিন রাষ্ট্রকে নিশানা করে একাধিক প্রবন্ধও প্রকাশ করছে সেখানকার বেশি কিছু দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা।
চলতি বছরের জুনে ‘ভারত, আফগানিস্তান ও ইজ়রায়েল জোট’ শিরোনামে একাধিক টক শো’র আয়োজন করে ক্যাপিটাল টিভি। সেখানে হাজির ছিলেন বেশ কয়েক জন সাবেক সেনাকর্তা ও কূটনীতিক। অন্য দিকে জিয়ো নিউজ় তাদের অনুষ্ঠানের নাম দেয় ‘ভারত-ইজ়রায়েল-আফগান আঁতাঁত: বিশ্বশান্তির পক্ষে হুমকি’। এ বছরের মার্চে ‘ভারত-ইজ়রায়েল-আফগানিস্তান কৌশলগত যোগসূত্র: গোয়েন্দা সহযোগিতা, চিনবিরোধী প্রতিরোধ এবং পাকিস্তান নিরাপত্তা সঙ্কট’ নামে প্রবন্ধ প্রকাশ করে ইসলামাবাদের আর একটি গণমাধ্যম।
এ প্রসঙ্গে পাক ফৌজের অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার গাজানফার আলি শাহ বলেছেন, ‘‘আমাদের ঘিরতে হাত মিলিয়েছে ভারত ও ইজ়রায়েলের গুপ্তচর সংস্থা র’ (রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং) ও মোসাদ। নয়াদিল্লির যে দূতাবাস কাবুলে রয়েছে, সেখান বসেই যাবতীয় পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তাঁদের কথাতেই এ দেশে হামলা চালাচ্ছে তালিবান জঙ্গিরা। খাইবার-পাখতুনখোয়া ও বালোচিস্তানে হাওয়া পাচ্ছে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন।’’
২০২১ সালে তালিবান নেতৃত্ব দ্বিতীয় বারের জন্য ক্ষমতায় আসার পর থেকে আফগানভূমিতে মানবিক সাহায্য পাঠাচ্ছে ভারত। নয়াদিল্লির এই পদক্ষেপকেও কটাক্ষ করেছেন পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজ়া আসিফ। তাঁর দাবি, ‘‘চিকিৎসা সরঞ্জামের বাক্সে ভরে ইজ়রায়েলি ড্রোন পঠান লশকরের হাতে তুলে দিচ্ছে মোদী সরকার। সেগুলিই আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে কাবুল।’’ গোটাটাই ইহুদিদের চক্রান্ত বলে এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করেছেন তিনি।
সমাজমাধ্যমে খোয়াজা আসিফ লিখেছেন, ‘‘ইরানের উপর হঠাৎই জোর করে যুদ্ধ চাপিয়ে দিল। এর অর্থ হল, পাকিস্তানের সীমান্ত পর্যন্ত ইহুদি প্রভাব বিস্তার। ভারতও চাইছে আফগান ও ইজ়রায়েলের সাহায্যে আমাদের ঘিরে ফেলতে। ইসলামাবাদকে একটা করদ রাজ্যে পরিণত করতে চায় দিল্লি। সেই চেষ্টা স্বাধীনতার পর থেকেই করে আসছে হিন্দুস্থান।’’
পশ্চিমি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশ পাকিস্তানের এই যুক্তিকে পুরোপুরি খারিজ করতে নারাজ। তাঁদের দাবি, আফগানিস্তানের সঙ্গে ঐতিহাসিক ভাবে ভারত ও রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকে তালিবানের উত্থানের সময় তাদের বিরোধী গোষ্ঠী নর্দান অ্যালায়েন্সকে সমর্থন করে নয়াদিল্লি ও মস্কো। আহমেদ শাহ মাসুদের নেতৃত্বে ‘কাবুলিওয়ানার দেশ’টির উত্তর ও মধ্যভাগের পঞ্জশির উপত্যকা তাঁরা নিয়ন্ত্রণ করত।
১৯৯৯ সালে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের আইসি-৮১৪ যাত্রিবাহী বিমান ছিনতাই করে কান্দাহার নিয়ে যায় পাক জঙ্গিদের একটি দল। ওই সময় সন্ত্রাসবাদীদের আফগান ভূমি ব্যবহারের অনুমতি দেয় তৎকালীন তালিবান নেতৃত্ব। ফলে বাধ্য হয়ে যাত্রীদের প্রাণ বাঁচাতে মাসুদ আজহার-সহ তিন জঙ্গিকে ছাড়তে বাধ্য হয় নয়াদিল্লি। মুক্তি পেয়েই পাকিস্তানে আশ্রয় নেয় আজ়হার। সেখানে তাঁর হাতে জন্ম হয় জইশ-ই-মহম্মদ নামের কুখ্যাত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর।
২০০১ সালে ৯/১১ হামলার পর আফগানিস্তান আক্রমণ করে মার্কিন ফৌজ। ফলে হিন্দুকুশের কোলের দেশ ছাড়তে হয় তালিবান নেতৃত্বকে। পরবর্তী ২০ বছর কাবুলে ছিল আমেরিকার ‘পুতুল’ সরকার। তাকে অবশ্য গোড়া থেকেই সমর্থন জানায় নয়াদিল্লি। ২০২১ সালে পঠানভূমি থেকে সেনা প্রত্যাহার করে ওয়াশিংটন। ফলে ফের সেখানে ক্ষমতায় ফেরে তালিবান নেতৃত্ব। এতে বেশ উৎসাহিত হয় পাকিস্তান।
বিশ্লেষকদের দাবি, ইসলামাবাদ মনে করেছিল এ বার ভারতের বিরুদ্ধে ‘জিহাদ’ বা সরাসরি সংগ্রামে নামবে আফগানিস্তানের তালিবান। তাই বিমানবাহিনী পাঠিয়ে পঞ্জশির দখলে তাঁদের সাহায্য করেন পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের (ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স) তৎকালীন প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়েজ় হামিদ। যদিও বাস্তবে সেটা হয়নি। উল্টে কিছু দিনের মধ্যেই ‘ডুরান্ড লাইন’কে কেন্দ্র করে দু’তরফে বাড়তে থাকে উত্তেজনা।
১৮৯৩ সালে অবিভক্ত ভারত ও আফগানিস্তানের মধ্যে সীমানা নির্ধারণে ‘ডুরান্ড লাইন’ টানে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার। ১৯৪৭ সালে জন্ম হওয়ার পর যাকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত বলে মান্যতা দেয় পাক প্রশাসন। কিন্তু, তালিবান নেতৃত্ব কখনওই সেটা মেনে নেয়নি। ফলে দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় আসার পর এই নিয়ে ইসলামাবাদের সঙ্গে কাবুলের বিবাদ তুঙ্গে ওঠে। বিশ্লেষকদের দাবি, তখনই নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির দিকে হাত বাড়ায় তারা।
১৯৭৯ সালে সামরিক অভিযান চালিয়ে আফগানিস্তান দখল করে সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া)। এর জেরে ভয়ঙ্কর এক গৃহযুদ্ধের মধ্যে পড়ে হিন্দুকুশের কোলের দেশ। ওই সময় লাখ লাখ আফগান শরণার্থী পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয় পাকিস্তানে। তালিবান ক্ষমতায় আসার দু’বছরের মাথায় (পড়ুন ২০২৩ সালে) তাঁদের বিতাড়িত করে ইসলামাবাদ। এতে আরও জটিল হয় দু’পক্ষের সম্পর্ক।
গত বছরের (২০২৫ সাল) অক্টোবরে ভারতসফর করেন তালিবান সরকারের ভারপ্রাপ্ত বিদেশমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি। চলতি বছরের ২৭ মে রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক ও প্রযুক্তিগত চুক্তি করে আফগান সরকার। বিশেষজ্ঞদের দাবি, এর জেরে মস্কোর আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থা পেতে পারে তাঁরা। সে ক্ষেত্রে পাক ফৌজের পক্ষে ‘কাবুলিওয়ালার দেশে’ বোমাবর্ষণ করা যে কঠিন হবে, তা বলাই বাহুল্য।
অন্য দিকে রাষ্ট্র হিসাবে ইজ়রায়েলকে এখনও মর্যাদা দেয়নি পাকিস্তান। উল্টে ধর্মীয় কারণেই ইহুদিদের চিরশত্রু বলে মনে করে ইসলামাবাদ। সম্প্রতি, তেল আভিভকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করতে দেখা গিয়েছে তাদের। সেটা পশ্চিমের প্রতিবেশীর পতনের বড় কারণ হতে পারে। এ-হেন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের যাবতীয় অভিযোগ খারিজ করে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় কড়া বার্তা দিয়েছে নয়াদিল্লি। পাশাপাশি আফগানিস্তানে হামলার নিন্দা করেছে মোদী সরকার।
ছবি: সংগৃহীত ও প্রতীকী।