আটলান্টিক পারে উড়ে এসে আঘাত হানতে পারে পাকিস্তান ও চিনের ক্ষেপণাস্ত্র। ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গোয়েন্দা রিপোর্ট এবং সামরিক বিশ্লেষণ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। চিন ও পাকিস্তান উভয়েই তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে বলে প্রতিবেদনে প্রকাশ। আর তাতেই সিঁদুরে মেঘ দেখছে পেন্টাগনও।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান (ইউনাইটেড স্টেটস ডিরেক্টর অফ ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স) তুলসী গবার্ড সম্প্রতি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, ভবিষ্যতে পাকিস্তান তাদের দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে এমন একটি আন্তর্মহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা ইন্টার-কন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) অন্তর্ভুক্ত করতে পারে যা আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম। অর্থাৎ এমন ক্ষেপণাস্ত্র, যা পাকিস্তান থেকে ছুড়লে সোজা গিয়ে পড়বে আমেরিকার মাটিতে!
সেনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির কাছে পেশ করা সেই রিপোর্টে গবার্ড দাবি করেছেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলির মূল্যায়নে দেখা গেছে যে, রাশিয়া, চিন, উত্তর কোরিয়া, ইরান এবং পাকিস্তান পারমাণবিক ও প্রচলিত উভয় ক্ষেত্রেই তাদের অস্ত্রভান্ডারকে সমৃদ্ধ করে তুলতে বিশেষ মনোযোগী হয়েছে।
বিভিন্ন ধরনের অভিনব বা প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে উন্নতি করছে পাকিস্তান। এর ফলে অন্য মহাদেশ থেকে উড়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখোমুখি হতে পারে তাঁর মাতৃভূমি, বলে উল্লেখ করেছেন তুলসী।
মার্কিন গোয়েন্দাদের দাবি, ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুরের’ পর চিনের সহায়তা নিয়ে পাকিস্তান নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রাগার আরও সমৃদ্ধ করতে চাইছে। এই তথ্য হাতে পাওয়ার পর ঘুম উড়েছে পেন্টাগনের। রিপোর্টে বলা হয়েছে, রাওয়ালপিন্ডি ফৌজ এমন একটি আইসিবিএম তৈরি করছে, যা মহাদেশীয় সীমানা পার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে পারে। আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলির হাতে এই তথ্য আসার পর নড়েচড়ে বসেছে ওয়াশিংটন।
৫,৫০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে থাকা লক্ষ্যবস্তুকে নিখুঁত নিশানা করতে পারে, এমন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে আইসিবিএম বলা হয়। একটি মহাদেশ থেকে আর একটি মহাদেশে ছোড়া যায় এই ক্ষেপণাস্ত্র। ‘ইন্টারকন্টিনেন্টাল’ বা ‘আন্তঃমহাদেশীয়’ ক্ষেপণাস্ত্র দূরের শত্রুদেশে আঘাত হানতে প্রয়োগ করা হয়।
প্রচলিত সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি এতে পরমাণু অস্ত্রও ব্যবহার করা যায়। পাকিস্তানের হাতে এখনও পর্যন্ত খাতায় কলমে আইসিবিএম নেই। মার্কিন গোয়েন্দারা দাবি করছেন, গোপনে এই শক্তিশালী অস্ত্র তৈরির কাজ চালাচ্ছে ইসলামাবাদ। যে কোনও দিন তারা চমকে দিতে পারে।
২০২২ সালে পাকিস্তান ভূমি থেকে ভূমি মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র শাহীন-৩ পরীক্ষামূলক ভাবে সফল উৎক্ষেপণ করে। ওই মিসাইল ২,৭০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। সেই অস্ত্রে শান দিয়ে তাকে আরও ধারালো করতে চাইছে ইসলামাবাদ। আমেরিকা এবং পাকিস্তানের সম্পর্কের নতুন সমীকরণ কী হবে, তা-ও ভাবাচ্ছে ভূ-রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।
চিনের হাতে ইতিমধ্যেই এমন ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে যা আমেরিকার যে কোনও প্রান্তে আঘাত হানতে সক্ষম। ‘ডংফেং ৪১’ নামের সেই যুদ্ধাস্ত্র চিনের লালফৌজের সবচেয়ে শক্তিশালী ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল বলে ধরা হয়। এর পাল্লা প্রায় ১২,০০০ থেকে ১৫,০০০ কিলোমিটার। এটি দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভব।
সাম্প্রতিক সেই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে চিন বর্তমানে তাদের পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা বাড়িয়ে ৬০০-র উপরে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের ভান্ডার হাজারকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চিনা প্রতিরক্ষা গবেষকেরা এমন প্রযুক্তি তৈরি করছেন যা আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমকে ফাঁকি দিয়ে আছড়ে পড়তে পারে।
সেই দৌড়ে শামিল রাশিয়াও। গবার্ডের আশঙ্কা এশিয়া ও ইউরোপের দুই সুপার পাওয়ার দেশ এমন উন্নত হাতিয়ার তৈরি করে ফেলেছে যা মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে বা এড়িয়ে যেতে সক্ষম। এই দুই দেশ ছাড়াও আমেরিকার জন্য হুমকি হয়ে উঠছে দক্ষিণ এশিয়ার আরও একটি দেশ। কিম জং উনের দেশ ডেমোক্র্যাটিক পিপল্স রিপাবলিক অফ কোরিয়া বা উত্তর কোরিয়া।
সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির সামনে তুলসী জানিয়েছেন, বর্তমানে ওয়াশিংটনের জন্য সরাসরি হুমকি হতে পারে এমন ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা প্রায় ৩,০০০। গোয়েন্দা সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে সম্মিলিত ভাবে এই সংখ্যাটি প্রায় ৫ গুণেরও বেশি বেড়ে ১৬,০০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। গোয়েন্দাপ্রধানের উদ্বেগ বাড়ছে উত্তর কোরিয়াকে নিয়ে। কারণ উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়া ও চিনের সম্পর্ক দিন দিন আরও মাখো মাখো উঠছে।
তুলসীর আশঙ্কা, এই তিন মিত্রদেশের গলাগলি বৈশ্বিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুতর প্রভাব ফেলবে। বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রতিবেদন অনুসারে মস্কোর তৈরি আইসিবিএমের ওয়াশিংটনের মাটি ছুঁতে প্রায় ২৫ মিনিট সময় লাগবে। চিনা আইসিবিএম প্রায় ৩০ মিনিটে পৌঁছোয়। উত্তর কোরিয়ার তৈরি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ৩০-৪৫ মিনিটে পৌঁছোয়। কোরীয় ক্ষেপণাস্ত্রের পেলোডের ক্ষমতা বেশি ও অন্যদের তুলনায় লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ক্ষমতা নিখুঁত।
২০২৪ এবং ২০২৫ সালে ইউক্রেন যুদ্ধে উত্তর কোরিয়া সেনা এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ দিয়ে রাশিয়াকে সহায়তা করার ফলে তাদের সম্পর্ক এখন অনন্য উচ্চতায়। এর বিনিময়ে উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার কাছ থেকে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এবং মহাকাশ গবেষণার সহায়তা লাভ করছে। অন্য দিকে, উত্তর কোরিয়াকে চিন যে বৈদেশিক সাহায্য করে থাকে তার অর্ধেকই হল আর্থিক সাহায্য।
ওয়াশিংটন মনে করে, পিয়ংইয়ংয়ের প্রধান অর্থনৈতিক অভিভাবক বেজিংই। এই তিনটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ যখন একে অপরকে সামরিক ও প্রযুক্তিগত ভাবে সাহায্য করে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য তা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। এই তিন শক্তির সঙ্গে পাকিস্তান যোগ দিলে আমেরিকার পাশাপাশি নয়াদিল্লির রক্তচাপ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক মহল।
‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মাধ্যমে পাকিস্তানের জঙ্গিঘাঁটিগুলিতে হামলা চালায় ভারত। ধ্বংস করে দেওয়া হয় একাধিক ঘাঁটি। টানা চার দিন ভারত এবং পাকিস্তানের সেনা সংঘাত চলার পর সংঘর্ষবিরতি হয়েছে। তবে দুই দেশের সম্পর্ক এখনও তলানিতে। সূত্রের খবর, ভারতের সঙ্গে সংঘাতের পর অস্ত্রভান্ডার আরও শক্তিশালী করতে সচেষ্ট হয়েছে পাকিস্তান।
এই অবস্থায় দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পাকিস্তানের হাতে এলে তা নয়াদিল্লিরও উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন। সে ক্ষেত্রে আমেরিকা এবং পাকিস্তানের সম্পর্কের নতুন সমীকরণ কী হবে, তা-ও ভাবাচ্ছে ভূ-রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।
দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ভান্ডার বৃদ্ধিতে পিছিয়ে নেই ভারতও। ভারতীয় সেনাবাহিনীর স্ট্র্যাটেজিক ফোর্সেস কম্যান্ড (এসএফসি)-র অস্ত্রভাঁড়ারে ঠাঁই পেতে চলেছে পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম অগ্নি-৫। ‘ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র’ অগ্নি-৫ পাঁচ হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। অর্থাৎ, ভারত থেকেই এই ক্ষেপণাস্ত্র চিনের রাজধানী বেজিংঙে আঘাত হানতে পারে! খাতায় কলমে আমেরিকা, চিন, রাশিয়া, ফ্রান্স ও উত্তর কোরিয়া ছাড়া আর কোনও দেশের হাতে এই পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নেই।
সব ছবি: সংগৃহীত।