বিদেশে উচ্চশিক্ষা, চাকরি থেকে পর্যটন। ভিন্ রাষ্ট্রে যেতে যে নথিগুলির প্রয়োজন, পাসপোর্ট তার মধ্যে অন্যতম। আর তাই অনেকেই একে নাগরিকত্বের প্রমাণ বলে মনে করেন। যদিও সম্প্রতি সেই ভুল ভেঙে দিয়েছে বিদেশ মন্ত্রক। একটি বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, পাসপোর্ট নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। স্বাভাবিক ভাবেই উঠছে একটি প্রশ্ন। তা হলে কোন নথিতে প্রমাণ হবে ভারতের নাগরিকত্ব?
চলতি বছরের ২৪ জুন ১৪তম পাসপোর্ট সেবা দিবসের অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট নথিটি নিয়ে চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেন বিদেশ মন্ত্রকের এক পদস্থ কর্তা। তিনি বলেন, ভারতীয় পাসপোর্ট মূলত একটা ভ্রমণ-নথি। একে নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসাবে গণ্য করা উচিত নয়। বিদেশে থাকাকালীন এটি ভারতীয়দের জাতীয়তাবাদের প্রমাণ দিলেও নাগরিকত্ব নির্ধারণের পৃথক আইনি পদ্ধতি রয়েছে। তাঁর ওই মন্তব্যের পর তুঙ্গে ওঠে বিতর্ক।
বিরোধীদের বক্তব্য, ব্যাপক ঝাড়াই-বাছাইয়ের পর পাসপোর্ট দিয়ে থাকে বিদেশ মন্ত্রক। তা হলে কেন একে নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসাবে গণ্য করা হবে না। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই মুখ খুলেছেন প্রবীণ আইনজীবী তথা রাজ্যসভার কংগ্রেস সাংসদ কপিল সিব্বল। অন্য দিকে, আমজনতার মধ্যে আবার জাতিসত্তা (ন্যাশনালিটি) ও নাগরিকত্ব (সিটিজ়েনশিপ) নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
এই বিষয়ে সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে সিব্বল লিখেছেন, ‘‘তা হলে কোন নথিটি নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসাবে কাজ করবে? ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনে (স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর) প্রশাসনের তরফে নাগরিকত্বের প্রমাণ চাওয়া হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে কী করবেন এ দেশের বাসিন্দারা? না কি ভোট থেকে বঞ্চিত হতে হবে। ফলস্বরূপ বিজেপি নির্বাচন জিতবে। সুপ্রিম কোর্টই এর বিচার করুক।’’
একই কথা বলতে শোনা গিয়েছে এআইএমআইএম-এর প্রধান তথা লোকসভার বিরোধী সাংসদ আসাদউদ্দিন ওয়াইসিকেও। কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তিতে একটি কার্ডের উপর ‘ভারতীয় জনতা পার্টি’ লেখা ছবি সমাজমাধ্যমের দেওয়ালে পোস্ট করে তিনি লেখেন, ‘‘কেন্দ্রের অবস্থান থেকে এটা স্পষ্ট যে, কোনও নথিই ভারতের নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। ২০৩০ সালের মধ্যে একমাত্র বিজেপির দলীয় সদস্যপদই হয়তো নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসাবে স্বীকৃতি পাবে।’’
এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন গীতিকার জাভেদ আখতারও। তাঁর কথায়, ‘‘বিদেশ মন্ত্রক অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পাসপোর্ট বিলি করে থাকে। সংশ্লিষ্ট নথির জন্য পুলিশ যাচাই প্রক্রিয়া (ভেরিফিকেশন) বাধ্যতামূলক। তা হলে কি ভারতীয় নাগরিক নিশ্চিত না হয়েই পাসপোর্ট দেওয়া হচ্ছে? এটা তো অযৌক্তিক! সরকার বিষয়টা স্পষ্ট করুক।’’
জাভেদ আখতারের ওই মন্তব্যের পরই ২৫ জুন এর ব্যাখ্যা দেয় কেন্দ্র। ১৯৬৭ সালের পাসপোর্ট আইনের ২০ নম্বর ধারার উল্লেখ করে বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, ভারতীয় নাগরিক না হলেও এক ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট নথি পেতে পারেন। জনস্বার্থে সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার সরকারের আছে। সে ক্ষেত্রে কোনও রকম নথি ছাড়াই তাঁকে পাসপোর্ট দিতে পারে প্রশাসন।
তা হলে প্রশ্ন, কী ভাবে প্রমাণ হবে ভারতের নাগরিকত্ব? বিশেষজ্ঞদের দাবি, একটি সুনির্দিষ্ট নথিতে সেটা প্রমাণ করা সম্ভব নয়। ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনের উপর ভিত্তি করে এটি ঠিক করে থাকে ভারত সরকার। পাঁচ রকম ভাবে এক ব্যক্তি ভারতের নাগরিক হতে পারেন। তার মধ্যে অন্যতম হল জন্মসূত্রে ও উত্তরাধিকার সূত্রে নাগরিকত্ব। এ ছাড়া অন্যান্য পদ্ধতিও রয়েছে।
আইন অনুযায়ী, ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে ১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের মধ্যে এ দেশে জন্মগ্রহণ করা যে কোনও ব্যক্তিই ভারতের নাগরিক। তাঁর মা-বাবার নাগরিকত্ব যাই হোক না কেন। ১৯৮৭ সালের ১ জুলাই থেকে ২০০৪ সালের ৩ ডিসেম্বরের মধ্যে জন্ম হলে মা-বাবার মধ্যে কোনও একজনকে ভারতের নাগরিক হতে হবে। তার পরে জন্ম হলেও একই নিয়ম। তবে সে ক্ষেত্রে মা-বাবার মধ্যে কেউ বেআইনি অনুপ্রবেশকারী হলে চলবে না।
ভারতের বাইরে জন্ম হলে এক ব্যক্তি উত্তরাধিকার সূত্রে এ দেশের নাগরিকত্ব পেতে পারেন। ভারতীয় নাগরিকদের স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান এমনকি ভারতীয় বংশোদ্ভূতেরা এ দেশের নাগরিক হিসাবে নাম নথিবদ্ধ করতে পারেন। পাশাপাশি, টানা ১২ বছর এ দেশে থাকলে প্রাকৃতিক নিয়মে এক ব্যক্তি নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য।
এ ছাড়া দেশের বাইরে কোনও এলাকা ভারত অধিগ্রহণ করলে সেখানকার বাসিন্দারা এ দেশের নাগরিকত্ব পেতে পারেন। উল্লেখ্য, যাঁরা জন্মসূত্রে নাগরিক, তাঁদের নাগরিকত্ব প্রমাণের আলাদা নথি নেই। তবে আইনি বিবাদ হলে জন্মের শংসাপত্র বা তার প্রমাণস্বরূপ অন্য সরকারি নথি দিতে পারেন তিনি।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশিকা অনুযায়ী, উত্তরাধিকার সূত্রে নাগরিকত্ব পেতে আবেদনকারী পাসপোর্ট ব্যবহার করতে পারেন। তবে আধার কার্ড, ভোটার কার্ড বা ড্রাইভিং লাইসেন্সের মতো নথিগুলি নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। এগুলি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বাসস্থানের প্রমাণপত্র হিসাবে চিহ্নিত হয়ে থাকে।
অনাবাসী ভারতীয় (ওভারসিজ় সিটিজ়েন অফ ইন্ডিয়া বা ওসিআই) হলে এবং তাঁর পাঁচ বছরের ওসিআই কার্ড থাকলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ভারতের নাগরিক হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন। তবে নয়াদিল্লি কখনওই দ্বৈত নাগরিকত্ব স্বীকার করে না। তাই ওসিআই কার্ডধারী ভারতীয় বংশোদ্ভূতেরা কিছু সুবিধা পেলেও নাগরিকত্ব পেতে সরকারি ভাবে তাঁর আবেদন করা বাধ্যতামূলক।
নাগরিকত্ব ও জাতিসত্তার মধ্যে আবার একটা পার্থক্য রয়েছে। জাতিসত্তা হল একটা ব্যাপকতর ধারণা। এটি জন্মসূত্রে, দত্তক গ্রহণের মাধ্যমে, বিবাহ বা বংশানুক্রমে এক ব্যক্তি পেয়ে থাকেন। অন্য দিকে নাগরিকত্ব হল রাষ্ট্র ও ব্যক্তির মধ্যের একটি সুনির্দিষ্ট আইনি সম্পর্ক। এটি অর্জন করা যায়। জাতিসত্তা অর্জন করা সম্ভব নয়।
একটি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি বুঝে নেওয়া যেতে পারে। ধরা যাক, একজন জার্মান ভারতীয় নাগরিকত্ব নিলেন। তার পরেও তাঁকে জার্মান হিসাবে চিহ্নিত করায় কোনও সমস্যা নেই। জাতীয়তাবাদ কেবলমাত্র জন্মসূত্রে অধিকার করা যায়, অন্য কোনও ভাবে নয়।
আইনগত ভাবে এক ব্যক্তি একাধিক দেশের নাগরিকত্ব পেতে পারেন। উদাহরণ হিসাবে পাকিস্তানের কথা বলা যেতে পারে। সেখানকার বাসিন্দারা একই সঙ্গে পাকিস্তান ও ব্রিটেন বা আমেরিকার নাগরিক হতে পারেন। ভারতে অবশ্য এই নিয়ম নেই।
অন্য দিকে কোনও ব্যক্তির জাতিসত্তা কখনওই একাধিক হতে পারে না। অর্থাৎ, একজন ভারতীয় সব সময়ের জন্যেই ভারতীয়। তিনি এ দেশের নাগরিক না হয়ে আমেরিকার হলেও জাতিসত্তার দিক থেকে তিনি ভারতীয়ই থাকবেন।
ছবি: সংগৃহীত, প্রতীকী ও এআই সহায়তায় প্রণীত।