গত কয়েক দিন ধরেই পাক অধিকৃত কাশ্মীরে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে সাধারণ জনতার। ওই অঞ্চলে আর্থিক দুর্দশা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চালাচ্ছে পাক অধিকৃত কাশ্মীর (পিওকে)-এর নাগরিক সংগঠন ‘জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি)’।
পাক অধিকৃত কাশ্মীরে সরকার-বিরোধী সেই বিক্ষোভ ২৪তম দিনে গড়িয়েছে। সম্প্রতি রাওয়ালকোটের ইদগাহ ময়দানে ৮০ হাজারেরও বেশি বিক্ষোভকারী সমবেত হয়েছিলেন। সেখানেই পাকিস্তানে রাষ্ট্রের মদতে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামো সম্পর্কে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করেছেন জেএএসি নেতা সর্দার আমান খান।
খান দাবি করেছেন, মূলত পাকিস্তানের সেনাবাহিনীই কাশ্মীরিদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছিল। জম্মু ও কাশ্মীরে অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাঠিয়েছিল পাক সেনাবাহিনীই। তিনি বলেন, ‘‘পাকিস্তান সেনাবাহিনীই কাশ্মীরিদের হাতে বন্দুক তুলে দিয়েছিল। আর আজ, তারাই আমাদের জঙ্গি বলার ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে।’’
সমাবেশে ভাষণ দেওয়ার সময় খান গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠণ জইশ-এ-মহম্মদের একটি কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন, যেখানে সশস্ত্র অংশগ্রহণকারীরা একে-৪৭ এবং তলোয়ারের মতো অস্ত্র নিয়ে শহরে মিছিল করেছিলেন।
জেএএসি নেতার দাবি, রাওয়ালকোটের ডেপুটি কমিশনারই নাকি সেই র্যালির অনুমতি দিয়েছিলেন এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করেছিলেন। তাঁর কথায়, ‘‘রাওয়ালকোটের ডেপুটি কমিশনার, আপনিই তো এখানে বন্দুক ও তলোয়ার নিয়ে র্যালির আয়োজন করতেন। আপনার কি মনে আছে? আর এখন আপনি আমাদের জঙ্গি বলছেন? আমরাই (বিক্ষোভকারীরা) এই ভূখণ্ডের প্রকৃত উত্তরাধিকারী।’’ আমানের সেই বক্তব্যের পর জনতা করতালির মাধ্যমে তাঁকে সমর্থন জানায়।
অন্য দিকে পাকিস্তান শহবাজ় শরিফের নেতৃত্বাধীন সরকারকে সতর্ক করে আমান এ-ও মন্তব্য করেন যে, যদি তাঁদের আন্দোলনের ৩৮টি দাবি মেনে নেওয়া না হয় বা বাস্তবায়ন না করা হয়, তবে বিষয়টি আর কেবল দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং তা পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানকে পুরোপুরি সরে যাওয়ার দাবিতে এক বৃহত্তর আন্দোলনে পরিণত হবে।
পাক অধিকৃত কাশ্মীরে ক্রমাগত জোরালো হচ্ছে ইসলামাবাদ-বিরোধী প্রতিবাদ। এ অবস্থায় পাক অধিকৃত কাশ্মীরের জনতার ক্ষোভকে আরও পুঞ্জীভূত করার চেষ্টা করছেন জেএএসি-র নেতারা। আগামী দিনে আরও বড় আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা। সেইমতো সাধারণ বাসিন্দাদের প্রস্তুত হওয়ার জন্য আহ্বানও জানিয়েছে জেএএসি।
পাকিস্তানি প্রশাসনের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় রাওয়ালকোটে। সেখানেই নিরাপত্তাবাহিনীর গুলিতে নিহত হন এক ব্যবসায়ী। তার পরে সেই বিক্ষোভ পাক অধিকৃত কাশ্মীরের অন্য শহরগুলিতেও ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি লন্ডনে পাক হাই কমিশন এবং ব্রিটেনে পাকিস্তানের অন্য কূটনৈতিক দফতরগুলির বাইরেও সেই বিক্ষোভের আঁচ ছড়িয়েছে।
মূল্যবৃদ্ধি থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে গত কয়েক মাস ধরেই পাক অধিকৃত কাশ্মীরে অসন্তোষ বাড়ছে বাসিন্দাদের। জুনের প্রথম সপ্তাহে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের রাওয়ালকোটে নিরাপত্তাবাহিনীর গুলিতে এক ব্যবসায়ীর মৃত্যুর পর ক্ষোভ আরও বৃদ্ধি পায়। তার পরেই গত ৫ জুন জেএএসি-কে নিষিদ্ধ করে দেয় প্রশাসন।
তবে তাতে বিক্ষোভ আরও বৃদ্ধি পায়। প্রতিবাদীদের দমন করতে সেই থেকে ধারাবাহিক অভিযান চালাচ্ছে পাকিস্তানি বাহিনী। সূত্রের খবর, মহরমের জন্য তিন দিন অভিযান বন্ধ ছিল। তার পরে গত শনিবার রাত থেকে ফের অধিকৃত কাশ্মীর জুড়ে প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে পাক রেঞ্জার্স। অনেক প্রতিবাদীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে মহিলাও রয়েছেন।
উল্লেখ্য, জুনের শুরুতে এই অস্থিরতা শুরু হওয়ার পর থেকে অধিকৃত কাশ্মীরে অন্তত ৪২৫ জন প্রতিবাদীকে গ্রেফতার করেছে বাহিনী। প্রতিবাদীদের সঙ্গে নিরাপত্তাবাহিনীর বেশ কয়েক দফা সংঘর্ষও হয়েছে। তাতে এখনও পর্যন্ত অন্তত ২২ জন নিহত হয়েছেন বলে খবর।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পাকিস্তানি সরকারের বিরুদ্ধে অধিকৃত কাশ্মীরের সাধারণ জনতার ক্ষোভকে সংগঠিত করতে তৎপর হয়েছে জেএএসি। সংগঠন নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও নিজেদের প্রতিবাদ কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে তারা।
চলতে থাকা বিক্ষোভ সামলাতে পাক অধিকৃত কাশ্মীরে মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দিয়েছে ইসলামাবাদ। সাধারণ বাসিন্দাদের উপর বিভিন্ন বিধিনিষেধও চাপানো হয়েছে। এর জেরে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী, খাবার এবং ওষুধ জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের বাসিন্দাদের।
সূত্রগুলো আরও অভিযোগ করেছে যে, সর্দার আমান খান-সহ বিভিন্ন আন্দোলনকারী এবং জেএএসি সদস্যদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিত্যপণ্যের দাম কমানো, সুশাসন ও জরুরি পণ্য সরবরাহের নিরবচ্ছিন্ন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতার এবং ব্যাপক দমন-পীড়ন চালানোর আইনি ভিত্তি হিসাবেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে।
এর মধ্যেই ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে ইসলামাবাদকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। পাক অধিকৃত কাশ্মীরে সরকার-বিরোধী বিক্ষোভ এক নাটকীয় মোড় নেয় মঙ্গলবার। বিক্ষোভকারীরা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে সেই ভূখণ্ড ‘পাকিস্তানের অংশ নয়’ এবং তাঁরা হুঁশিয়ারি দেন, ইসলামাবাদ যদি এই অঞ্চলে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ ব্যাহত করতে থাকে, তবে তাঁরা টিকে থাকার জন্য ‘অন্য পথ’ বেছে নিতে বাধ্য হবেন।
রাওয়ালকোটের ইদগাহ ময়দানেই মন্তব্যগুলি করা হয়। বিক্ষোভকারীরা রেশন ও অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় সামগ্রী সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী ব্যাঘাতের যে অভিযোগ তুলেছেন, তার প্রেক্ষিতেই জনগণের এই ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
জেএএসি নেতা আমানই বলেছিলেন, ‘‘আমাদের আপনাদের রেশনের প্রয়োজন নেই। বরং আপনাদেরই আমাদের প্রয়োজন।’’ তিনি সতর্ক করেন, ‘‘সরবরাহ ব্যবস্থা যদি অবরুদ্ধই থাকে, তবে বাসিন্দারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে অন্য পথ খুঁজতে বাধ্য হবেন।’’ পাশাপাশি জেএএসি নেতারা ভারতের সঙ্গে আরও জোরালো সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়ে সতর্কবার্তা দেন।
প্রতিক্রিয়াটি মূলত পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফের সাম্প্রতিক মন্তব্যের সরাসরি জবাব বলে মনে করেছেন অনেকে। তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে রাওয়ালকোট এবং মিরপুরের বাসিন্দারা ‘আসল কাশ্মীরি নন’। তাঁর এই মন্তব্য পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর জুড়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয় এবং ইসলামাবাদ ও ওই অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতৃত্বের একাংশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্বকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
এর মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, বিদ্রোহীদের এই ‘অন্য পথ’ কী সত্যিই ভারত? তা হলে কি ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চাইছেন জেএএসি নেতারা? ভারতের সঙ্গে পিওকে-কে মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন? যদিও জেএএসি নেতারা বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট ভাবে কিছু জানাননি।
সব ছবি: সংগৃহীত।