মারাত্মক তাপপ্রবাহে পুড়ছে ইউরোপ। ইতিমধ্যেই ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে তাপমাত্রার পারদ। ভয়ঙ্কর সেই গরম সহ্য করতে না পেরে প্রাণ হারিয়েছেন ১,৫০০-র বেশি মানুষ। শুধু তা-ই নয়, রাস্তার পিচ, গাড়ির টায়ার, রাবারের জুতো থেকে শুরু করে ট্রামলাইন, এমনকি ট্রাফিক সিগন্যাল পর্যন্ত গলে যাওয়ার ছবি ও ভিডিয়ো প্রকাশ্যে এসেছে। উষ্ণতা মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে প্রথম বিশ্বের আমজনতা ও সরকার।
ইউরোপের এ-হেন তাপপ্রবাহ নিয়ে উদ্বেগপ্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু। তাদের দাবি, চেকিয়া, জার্মানি ও পোল্যান্ডের মতো মহাদেশের মধ্য ও পূর্ব দিকের দেশগুলিতে পারদ গড়ে ৪২ ডিগ্রির আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। ব্রিটিশ, ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের অবস্থা আরও ভয়াবহ। সেখানে সূচক উঠেছে ৪২-৪৩ ডিগ্রিতে। এই গরম সহ্য করতে না পেরে অসুস্থ হচ্ছেন বহু বাসিন্দা, ঘটছে মৃত্যুও।
ইউরোপের তাপপ্রবাহের ভয়াল ছবি ও ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হতে শুরু করেছে। সেখানে রোদে রাখা কড়াইয়ে অনেককে ডিম ভাজতে পর্যন্ত দেখা গিয়েছে। এ ছাড়া দোকানের গলিত চকলেট ও গরমের জেরে ঝুলিয়ে রাখা কলা খসে পড়ার ভিডিয়ো পোস্ট করেছেন নেটাগরিকদের একাংশ। পাশাপাশি, লাইনের ধাতব পাত গলে যাওয়ার জার্মানির কিছু এলাকায় ব্যাহত হয়েছে ট্রাম চলাচল।
গরম থেকে শিশু-কিশোরদের বাঁচাতে স্কুল বন্ধ রেখেছে অধিকাংশ ইউরোপীয় রাষ্ট্র। তাপপ্রবাহ থেকে রক্ষা পেতে বহু জায়গায় অনেকেই সাঁতার কাটছেন নদীতে। দিনের একটা বড় অংশ সুইমিং পুলে কাটানোর বাড়ছে প্রবণতা। জার্মানির রাজধানী বার্লিনে এবং ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে জলকামান ব্যবহার করছে স্থানীয় প্রশাসন। তাতে স্নান করে পথচারীদের প্রায় প্রত্যেককে শরীর ঠান্ডা করতে দেখা গিয়েছে।
ইউরোপীয় এই ‘রাক্ষুসে’ তাপপ্রবাহ নিয়ে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রস অ্যাডানম গেব্রিয়েসাস। তিনি জানিয়েছেন, পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণায়নশীল মহাদেশে পরিণত হয়েছে ইউরোপ। বিশ্ব জুড়ে গড়ে যে হারে তাপমাত্রা বাড়ছে, সেটা এখানে দ্বিগুণ। ফলে ১৫ কোটি মানুষকে চরম তাপপ্রবাহের মধ্যে বাস করতে হচ্ছে। ফলে আরও বাড়তে পারে মৃতের সংখ্যা।
এ ব্যাপারে এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) করা একটি পোস্টে গেব্রিয়েসাস লিখেছেন, ‘‘তাপজনিত চাপকে নীরব ঘাতক বলা হয়। সেটাই ইউরোপীয়দের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। তা ছাড়া ঠান্ডা বা নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ুর কথা মাথায় রেখে বাড়ি, কর্মক্ষেত্র বা বিদ্যালয় ভবন তৈরি করা হয়েছিল। আর তাই তীব্র গরমের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সেগুলির সমস্যা হচ্ছে।’’
এই পরিস্থিতিতে সমাজমাধ্যমে এখানকার নাগরিক উমেদ প্রতাপ সিংহের করা একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে দানা বাঁধে বিতর্ক। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘‘ইউরোপে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও ভারতের ৪৩ ডিগ্রি কি আলাদা? তা হলে এত কান্নাকাটি কিসের? ভারতে তো তাপমাত্রা ৪৮ ডিগ্রিও ছুঁয়ে যায়।’’ তাঁর করা পোস্ট দ্রুত ভাইরাল হতেই এই নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, থার্মোমিটারে একই রকমের তাপমাত্রা দেখালেও বাস্তবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গরম বা ঠান্ডার অনুভূতি আলাদা আলাদা হতে পারে। এর নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। এর মধ্যে সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান, আবহাওয়া, সেখানকার রাস্তাঘাট বা বাড়িঘরের নকশা উল্লেখযোগ্য। এগুলির ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে ইউরোপের মূলগত পার্থক্য রয়েছে।
অবস্থানগত দিক থেকে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে রয়েছে ইউরোপ। ফলে এখানকার মতো ফ্রান্স বা জার্মানিতে সূর্যের রশ্মি সরাসরি মাথার পড়ছে, এমনটা নয়। কিন্তু, দিনের দৈর্ঘ্য ওই এলাকার দেশগুলিতে অনেকটা বেশি। ফলে লম্বা সময় ধরে সূর্যের তাপ সহ্য করতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। তা ছাড়া তীব্র তাপপ্রবাহের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়নি সেখানকার ঘরবাড়ি। এই মুহূর্তে সেটাই সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ।
বছরের বেশির ভাগ সময় ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে ইউরোপের প্রায় কোনও বাড়িতেই নেই ফ্যান, এসি বা কুলারের মতো যন্ত্র। তা ছাড়া ছোট জানলার ঘরে বাস করেন সেখানকার বাসিন্দারা। শীতকালে তাপ ধরে রাখার মতো নকশায় বাড়ি, সরকারি-বেসরকারি অফিস এবং স্কুল-কলেজের ভবন তৈরি করা হয়েছে। ফলে তাপপ্রবাহ শুরু হওয়ায় হাঁসফাঁস অবস্থার মধ্যে পড়তে হচ্ছে আমজনতাকে।
ভারতের বহু শহরে দূষণের মাত্রা অনেক বেশি। ফলে এখানকার বাতাসে সব সময় মিশে থাকে মাত্রাতিরিক্ত ধূলিকণা। যেগুলির জন্য অনেকটাই ছড়িয়ে যায় সূর্যালোক। অন্য দিকে ইউরোপের আকাশ তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি পরিষ্কার। ফলে সরাসরি সূর্যের রশ্মি পৌঁছোয় মাটিতে। এর জেরে লাফিয়ে লাফিয়ে ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে পারদ।
ভারতের ক্ষেত্রে গরম বাড়লেও বায়ু চলাচল স্বাভাবিক থাকে। আবহবিদদের দাবি, ইউরোপের ক্ষেত্রে সেটা হচ্ছে না। গোটা মহাদেশ জুড়ে খুবই ধীর গতিতে বইছে বাতাস। ফলে শরীর ঠান্ডা হচ্ছে না নাগরিকদের। এ ছাড়া আপেক্ষিক আর্দ্রতা হিট স্ট্রোকের কারণ হচ্ছে বলেও মনে করছেন চিকিৎসকদের একাংশ।
এ প্রসঙ্গে মুম্বইয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের কনসালটেন্ট মঞ্জুষা অগ্রবাল বলেছেন, ‘‘স্থাননির্বিশেষে ৪৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা একই শারীরবৃত্তীয় চাপ তৈরি করবে। কিন্তু, ওই গরম কতটা অনুভূত হবে সেটা নির্ভর করবে বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা এবং সরাসরি সূর্যালোকের মতো পরিবেশগত কারণের উপর। এর মধ্যে প্রথমটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’’
ভারতের ক্ষেত্রে বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা বেশি হওয়ার কারণে গরম পড়লেই প্যাচপেচে ঘামে ভিজে যায় শরীর। অন্য দিকে দুর্বল বায়ু চলাচলের কারণে ইউরোপীয়দের ঘাম হচ্ছে অনেক কম। উল্টে লাগাতার তাপ সংগ্রহ করছে শরীর। ফলে বাড়ছে হিট স্ট্রোকের প্রবণতা। বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন চিকিৎসক পাল্লেটি শিবা কার্তিক রেড্ডি। মানুষের অভিযোজন ক্ষমতার কথাও বলতে শোনা গিয়েছে তাঁকে।
রেড্ডির দাবি, প্রধানত ঘামের মাধ্যমে ঠান্ডা থাকে মানবদেহ। ঘাম যখন ত্বক থেকে বাষ্পীভূত হয়, তখন শরীর থেকে বেরিয়ে যায় তাপ। ইউরোপের ক্ষেত্রে তীব্র গরমের মধ্যে আবহাওয়া শুষ্ক থাকায় অতিরিক্ত তাপ ধরে রাখছে শরীর। ফলে দেহের ভিতরে তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ। সেটা হৃদ্যন্ত্র, ফুসফুস বা কিডনি বিকলের কারণ হতে পারে।
তা ছাড়া বছরের বেশির ভাগ সময় তীব্র ঠান্ডার কারণে ইউরোপীয়দের শারীরিক গঠন ভারতীয়দের মতো নয়। ভারতীয়েরা অতিরিক্ত তাপমাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন। গরম বাড়লে সেইমতো পোশাক বা খাওয়াদাওয়া করে থাকেন তাঁরা। অন্য দিকে তাপপ্রবাহ মোকাবিলার উপায় জানা না থাকার কারণে বিপাকে পড়ছে ইউরোপীয়দের একাংশ।
গরম বৃদ্ধি পাওয়ায় ইউরোপীয় দেশগুলির মধ্যে ফ্রান্সে শুরু হয়েছে মৃত্যুমিছিল। সম্প্রতি, সেখানকার ন্যাশনাল ফিউনারেল ফেডারেশনের প্রধান এলিজ়াবেথ শারিয়ার সংবাদসংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘‘দেশব্যাপী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কেন্দ্রগুলোর ৬০ শতাংশ আসন ভর্তি হয়ে গিয়েছে। এটা গ্রীষ্মকালে সাধারণত ৩০-৪৫ শতাংশের মধ্যে থাকে।’’
তীব্র এই গরমের মধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধরত ইউক্রেন আবার অন্য সমস্যায় ভুগছে। লড়াইয়ের জেরে কিভের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র উড়িয়ে দিয়েছে মস্কোর ফৌজ। ফলে প্রায়ই দেশের বড় অংশকে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন করে রাখতে হচ্ছে। তবে হিট স্ট্রোকের কারণে পূর্ব ইউরোপের দেশটি থেকে এখনও কোনও মৃত্যুর খবর আসেনি।
ছবি: রয়টার্স, সংগৃহীত ও প্রতীকী।