বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কাই সত্যি হল। বুদ্বুদ ফাটল সোনা-রুপোয় বিনিয়োগের। উল্কাগতিতে নামল দুই ধাতুর দাম। বছরের শুরুতে যে গতিতে উত্থান শুরু হয়েছিল, তার বিপরীত চিত্র দেখা দিল জানুয়ারির শেষ লগ্নে। ভারতে কেন্দ্রীয় বাজেটের ঠিক দু’দিন আগে নজিরবিহীন ভাবে কমতে শুরু করল দুই ধাতুর দাম। গত ২৪ ঘণ্টায় অনেকটাই সস্তা হল বাজার মাত করে রাখা দুই মহার্ঘ ধাতু।
শুক্রবার কলকাতায় ১০ গ্রাম খুচরো পাকা সোনার দাম ৮৫০০ টাকা কমে হয়েছে ১,৬৯,৯৫০ টাকা। রুপোর দামে প্রতি কেজিতে একধাক্কায় কমেছে ৩৪১৫০ টাকা। এক কেজি রুপোর দাম হয়েছে ৩ লক্ষ ৫১ হাজার ২৫০ টাকা। গোটা পৃথিবী জুড়ে দাম পড়েছে সোনা, রুপো ও ক্রিপ্টোমুদ্রার। দামের এই পতনের ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ৩ লক্ষ কোটি টাকা উধাও হয়ে গিয়েছে বলে বাজার সূত্রে খবর।
৩০ জানুয়ারি সকালে বাজার খুলতেই ৬৭ হাজার টাকা পড়ে গিয়েছিল রুপোর দাম। ১৭ শতাংশ দামের পতন লক্ষ করা গিয়েছিল সকালের দিকেই। ফলে এক কেজি রুপোর দাম ৩ লক্ষ ৩২ হাজারে এসে দাঁড়ায়। পরে অবশ্য দামের সূচকে সামান্য ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা যায়। দিনের শেষে ১২ শতাংশ কমে গিয়ে থিতু হয় রজত। একই ধারা দেখা গিয়েছিল সোনার ক্ষেত্রেও। রুপোর ইটিএফে ৩৪ শতাংশ পতনের সাক্ষী থেকেছে বাজার।
বিশেষজ্ঞেরা অবশ্য বুদ্বুদ ফাটার আশঙ্কার কথা আগে থেকেই শুনিয়ে রেখেছিলেন। তাঁরা জানিয়েছিলেন, কোনও কিছুর দামকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হলে সেই বেলুন যে কোনও সময় ফাটতে পারে। তাঁরা মনে করছেন, সোনা ও রুপোর দাম প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে গিয়েছে।
তীব্র জল্পনা ও অতিরিক্ত প্রচারের কারণে এই দুই ধাতুর দাম আকাশছোঁয়া। ঐতিহ্যশালী সম্পদ দু’টিকে ঘিরে বুদ্বুদের মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক অবস্থা বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকির পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। বিশ্ব জুড়ে রুপোর দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করেছিলেন বাজার বিশেষজ্ঞেরা।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, রুপোর দামে তেজি ভাব অব্যাহত থাকায় মুনাফা ঘরে তুলতে শুরু করেছেন বিনিয়োগকারীরা। তারই ফলশ্রুতি এই পতন। লাভের লক্ষ্মী ঘরে তুলতে অনেকেই রুপোর ইটিএফ বেচতে শুরু করেছেন। তাতেই হু-হু করে কমছে দাম। দাম চড়ার পরে মুনাফা ঘরে তোলার একটা প্রবণতা থাকে লগ্নিকারীদের মধ্যে।
বিভিন্ন লগ্নিকারী সংস্থার বিশেষজ্ঞেরা জানিয়েছেন, এই হঠাৎ বৃদ্ধির মূল কারণ শক্তিশালী ডলার। ডলারের মূল্যবৃদ্ধিও সোনা এবং রুপোর দামের উপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। রুপোর দামের ধরাশায়ী হওয়ার মূল কারণ হল শর্ট সেলিং। খুচরো বিনিয়োগকারীরা তাড়াহুড়ো করে মুনাফা বিক্রি করতে শুরু করেন। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, সোনা ও রুপোর দামের পতনের পিছনে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক দুই ক্ষেত্রের একাধিক কারণ কাজ করছে।
বেশ কয়েক মাস ধরে সোনা ও রুপোর দাম ঊর্ধ্বমুখী। ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে সোনা ও রুপো নিরাপদ বিনিয়োগ বলে মনে করছেন অনেকে। সেই ট্রেন্ডের দিকে ঝুঁকে অধিকাংশ বিনিয়োগকারীর কাছে এই সম্পদের চাহিদা বেড়েছে। বিশ্বব্যাপী এবং অভ্যন্তরীণ, উভয় বিষয়ই হলুদ ও সাদা ধাতুর দামবৃদ্ধিতে ইন্ধন জোগাচ্ছে।
ভারতেও একই অবস্থা। রুপোর ইটিএফে বিনিয়োগে দু’-তিন গুণ লাভের কারণে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীরা বন্ড ও স্টক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। খুচরো লগ্নিকারীরাও রুপো কিনতে চোখ বন্ধ করে ঝাঁপাচ্ছেন। বৈদ্যুতিক গাড়ি, বৈদ্যুতিন পণ্য-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে রুপোর ব্যবহারও তার চাহিদা বাড়াচ্ছে। অথচ চিনের রুপো রফতানিতে কড়াকড়ি বিশ্ববাজারে জোগান কমিয়েছে।
শিল্পের প্রয়োজনে রুপোর চাহিদা বরাবরই বেশি ছিল। এখন সোনার বিকল্প দামি ধাতু হিসাবেও তার কদর বাড়ছে। সেই তুলনায় জোগান কম থাকায় দাম বাড়ছে লাফিয়ে। লগ্নিকারীদের একাংশও এখন সুরক্ষিত গন্তব্য হিসাবে রুপোর মতো ধাতুকে বেছে নিচ্ছেন। মিউচুয়াল ফান্ড সংস্থাগুলি তাতে পুঁজি ঢালছে।
বাজার বিশেষজ্ঞদের দাবি, সোনা-রুপোর দামবৃদ্ধি স্বাভাবিক। সেই জন্যই লগ্নির মাধ্যম হিসাবে তা ভরসাযোগ্য। তবে এখন তা চড়ছে একটু বেশি গতিতে। অনিশ্চয়তা আর অস্থিরতায় বিশ্ববাজারে দাম বাড়ছে সোনার। তার প্রভাব পড়ছে দেশে। ডলারের নিরিখে টাকার তলানিতে ঠেকা দাম আমদানির খরচ বাড়াচ্ছে।
বাজারে রুপোর চাহিদা ও জোগানের মধ্যে বিশাল তফাত দেখা যাচ্ছে, যে কারণে তার দাম চড়ছে। রুপোর এই দামের বিরাট পার্থক্যের কারণ হল চিনে রুপোর ব্যাপক চাহিদা। বিশ্বের অন্যতম বড় রুপোর ভান্ডার রয়েছে চিনে। গত কয়েক বছরে ধীরে ধীরে বিশ্ববাজারে সরবরাহও কমিয়েছে চিন। রুপোর ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বছরের শুরু থেকেই উঠেছে ধাতুটির দাম।
ওয়াকিবহাল মহলের বক্তব্য, রুপোর দামে রেকর্ড অধোগতির পিছনে কাজ করছে মার্কিন ফেডেরাল রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত। আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কটির বর্তমান চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল পদত্যাগ করার পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত কে হবেন তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে ওঠার কারণেও বিশ্ববাজারে সাদা ধাতুর দামে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
ফেড রিজ়ার্ভের সুদ কমানো নিয়ে বিরোধ তুঙ্গে উঠেছিল জেরোম ও ট্রাম্পের। ডলারের স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে ও মার্কিন অর্থনীতির হাল পোক্ত করতে সুদের হার না কমানোর পক্ষে জোর সওয়াল করে আসছেন জেরোম। রাজনৈতিক কারণে সমানে এর বিরোধিতা করে আসছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। মনে করা হচ্ছে, ট্রাম্পের সঙ্গে তুমুল মতবিরোধের কারণে ফেডের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে যেতে হচ্ছে জেরোমকে। তাঁর জায়গায় কেভিন ওয়ার্শকে নিয়ে আসছেন ট্রাম্প।
সেই খবর প্রকাশিত হওয়ার পরই ডলার শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ডলারের অবমূল্যায়নের কারণে যাঁরা সোনা-রুপোর মতো মূল্যবান ধাতুতে পুঁজি ঢেলেছিলেন, সে সব বিক্রি করে তা পুনরায় ডলারে বিনিয়োগ করতে চাইছেন। এমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের। এই প্রবণতার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এশীয় বাজারেও।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে, এর আগেও রুপোর নজিরবিহীন দামবৃদ্ধির পর হঠাৎ করেই সেই বুদ্বুদ ফেটে গিয়ে দাম একেবারে তলানিতে চলে গিয়েছে। ৯০ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে গিয়েছিল রুপোর দাম। তাই রুপোর রেকর্ড দাম বৃদ্ধির পরে তা বেচে দেওয়ায় একঝটকায় লাভের মুখ দেখতে পেয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। বাজার বিশেষজ্ঞদের অন্য পক্ষ বলছেন এখনই শঙ্কিত হওয়ার তেমন কারণ নেই।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, সোনা ও রুপোর দামের পতনের পিছনে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক দুই ক্ষেত্রের একাধিক কারণ কাজ করছে। মূলত ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং শিল্পক্ষেত্রের চাহিদার কারণে ধাতুটির দাম বাড়ছিল। নিরাপদ লগ্নি হিসাবে তাকে দেখছিলেন লগ্নিকারীরা। সঙ্গে ছিল জোগান ও চাহিদার অসামঞ্জস্য। তার ফলেই দাম বাড়ছিল। এখন লগ্নিকারীদের একাংশ মুনাফা ঘরে তুলছেন। তার ফলে কমছে দাম।
তাঁদের মতে আগামী এক সপ্তাহ রুপো ও সোনার দামের লেখচিত্রে উত্থান-পতন জারি থাকবে। তার পরে আবার দামে ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা যাবে। দামি ধাতুর দাম কমলে তাতে বিনিয়োগ করার প্রবণতা ফিরে আসবে। ঠিক যেমন শেয়ার বাজারে লক্ষ করা যায়।
জানুয়ারির শুরু থেকে বর্তমানে সোনার দাম ১৯ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। সেখানে রুপোর দাম ৩৭ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যে ভাবে প্রতি বছর সোনা-রুপোর দাম বেড়েছে তাতে বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিয়োয় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে শঙ্কার তেমন কোনও কারণ দেখছেন না বাজার বিশ্লেষকদের একাংশ।
সব ছবি: সংগৃহীত