কাতারের রাজপরিবার থেকে মহার্ঘ এক উপহার পেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রাজকীয় সেই উপহারের ঝলক বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছেন স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট। মার্কিন সর্বাধিনায়কের আকাশবিহারের জন্য অত্যাধুনিক ও বিশ্বের ‘সবচেয়ে মূল্যবান’ বিমানটি উপঢৌকন হিসাবে পাঠিয়েছে কাতারের রাজপরিবার। বিশাল বোয়িং ৭৪৭ বিমানটিকে আপাতত নতুন সরকারি বিমান (এয়ার ফোর্স ওয়ান) হিসাবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াশিংটন।
নামেই বিমান, আসলে সেটিকে ‘উড়ন্ত হোয়াইট হাউস’ বললেও অত্যূক্তি হয় না। বাণিজ্যিক ভাবে ব্যবহৃত একটি বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমানের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৪০ কোটি ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় ৩,৩৯৫ কোটি টাকা)। উপহার হিসাবে পাওয়া মার্কিন প্রশাসনের মূল্যবান উপহারের মধ্যে অন্যতম হতে চলেছে এই বিমানটি।
মার্কিন বিমানবাহিনী জানিয়েছে, মার্কিন সর্বাধিনায়কের জন্য বিমানটি ব্যবহার করার আগে শীঘ্রই তার ‘চূড়ান্ত পরীক্ষা’ বা ‘কমিশনিং ফ্লাইট’ শুরু করা হবে। বোয়িং থেকে অর্ডার করা নতুন বিমানগুলো সরবরাহ না হওয়া পর্যন্ত (সম্ভবত ২০২৮ সাল পর্যন্ত) কাতারের জেটটি একটি ‘সেতু’ বিমান হিসাবে কাজ করবে।
বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে বিমান ব্যবহার করেন, সেটি মূলত বোয়িং ৭৪৭-২০০ সিরিজ়ের উপর ভিত্তি করে তৈরি দু’টি বিশেষ বিমান। এগুলো দীর্ঘ দিন ধরে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ ও প্রযুক্তিগত ভাবে উন্নত বিমান হিসাবে পরিচিত। তবে এই বিমানগুলির বয়স বেড়ে যাওয়ায় কয়েক বছর ধরেই নতুন প্রজন্মের বিমান কেনার পরিকল্পনা করছিল মার্কিন প্রশাসন।
‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ নামটি আসলে নির্দিষ্ট কোনও বিমানের নাম নয়। মার্কিন বিমানবাহিনীর যে কোনও বিমান যখন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বহন করে, তখন সেটি ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ নামে পরিচিত হয়। তবে সাধারণ ভাবে এই নামটি প্রেসিডেন্টের ব্যবহৃত বিশেষ বোয়িং বিমানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছে।
বর্তমানে যে বিমানগুলিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভ্রমণ সারেন, তা কোনও দুর্গের থেকে কম নয়। তার অন্দরমহল থেকে সুরক্ষা ব্যবস্থা, সব কিছুই ‘এ ওয়ান’। তিন ভাগে ভাগ করা আছে বিমানের অন্দরমহল। সব মিলিয়ে এলাকা চার হাজার বর্গফুট। এর সিংহভাগ প্রেসিডেন্ট এবং ফার্স্ট লেডির জন্য বরাদ্দ। তাতে আছে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত ডাইনিং রুম এবং কনফারেন্স রুম। এ ছাড়াও বিমানে প্রশাসনের প্রবীণ সদস্যদের জন্য আলাদা অফিস থাকে।
বিমানের ভিতরে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত ডাইনিং রুম ছাড়াও আছে আরও একটি খাবার জায়গা। সেখানে একসঙ্গে ১০০ জন বসে খেতে পারেন। সিনিয়র সদস্য এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি এবং বিমানের কর্মীদের জন্য আলাদা বসার জায়গাও আছে।
বিমানের জ্বালানি ধারণক্ষমতা এতটাই যে, তা সারা বিশ্বে চক্কর দিতে পারবে। প্রয়োজনে মাঝ-আকাশে জ্বালানি ভরেও নিতে পারবে। অন্য বিমানের মতো জ্বালানি ভরতে অবতরণের কোনও প্রয়োজনই নেই। অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির যোগাযোগের মাধ্যম রয়েছে বিমানে। ফলে যে কোনও সময় বিমানে বসেই হোয়াইট হাউসকে জরুরি নির্দেশ দিতে পারেন প্রেসিডেন্ট। বিমানের গতিবিধির উপর আলাদা করে সব সময়ই হোয়াইট হাউস নজরও রাখতে পারে।
কাতারের উপহার দেওয়া নতুন বিমানটি হল একটি ৭৪৭-৮ আই জাম্বো জেট। জেট বিমানটির লাল, সাদা ও গাঢ় নীল রং আমেরিকার পতাকার রঙের অনুকরণে করা হয়েছে। বিমানটির লেজেও একটি ঢেউখেলানো মার্কিন জাতীয় পতাকা রয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগকে দেওয়া বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমানটি সরাসরি প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের উপযোগী নয়। এটিকে একটি বিশেষ সামরিক মানের বিমান হিসাবে গড়ে তুলতে ব্যাপক পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একটি অসামরিক বিমানকে ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এর মতো নিরাপদ ও অত্যাধুনিক উড়ন্ত কমান্ড সেন্টারে পরিণত করা একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া।
প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিমানকে সম্ভাব্য সব ধরনের হুমকি মোকাবিলার উপযোগী করে তৈরি করা হয়। নতুন বিমানটিতে উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, শত্রুপক্ষের নজরদারি বা আক্রমণ শনাক্ত করার প্রযুক্তি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর ব্যবস্থা যুক্ত করা হবে। তবে এ সব প্রযুক্তির বিস্তারিত তথ্য সাধারণত গোপন রাখা হয়। কারণ তা জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
একটি অসামরিক বোয়িং ৭৪৭-কে সামরিক মানের রাষ্ট্রপ্রধানের বিমানে পরিণত করতে পরিকাঠামোগত পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই এবং প্রতিরক্ষা বিভাগের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এর আগে বিমানটির প্রতিটি প্রযুক্তিগত অংশ পরীক্ষা করা হবে, যাতে এটি মার্কিন প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত কঠোর মানদণ্ড পূরণ করতে পারে।
২০২৫ সালে কাতারের পক্ষ থেকে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগকে দেওয়া বোয়িং ৭৪৭ বিমানটিকে রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যবহারের উপযোগী করতে ব্যাপক সামরিক রূপান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এতে উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, গোপন যোগাযোগ প্রযুক্তি, জরুরি রসদ সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের ক্ষমতা বাড়ানোর উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, নতুন সংস্করণের বিমানটির অভ্যন্তরভাগ প্রশস্ত এবং এতে বাদামি চামড়ায় মোড়া আসন রয়েছে। বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, আসনগুলিকে সম্পূর্ণ ভাবে শুইয়ে দেওয়া যায়। সিটবেল্টে প্রেসিডেন্টের সিলমোহর, কাঠের বিস্তৃত প্যানেল এবং একাধিক যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। বিমানে রয়েছে প্রেসিডেন্সিয়াল সুট, মেডিক্যাল ইউনিট, সম্মেলন কক্ষ এবং দু’টি রান্নাঘর, যেখানে একসঙ্গে ১০০ জনের খাবার প্রস্তুত করা যায়।
‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ শুধু যাত্রীবহনের বিমান নয়, এটি আদতে উড়ন্ত ‘প্রেসিডেন্সিয়াল কমান্ড সেন্টার’। যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা আন্তর্জাতিক সঙ্কটের সময় প্রেসিডেন্টকে সামরিক কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়। সেই কারণে নতুন বিমানটিতে উপগ্রহের মাধ্যমে অত্যন্ত সুরক্ষিত যোগাযোগ ব্যবস্থা, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং উন্নত ডেটা নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হবে।
বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের জন্য দু’টি বিশেষ ভাবে পরিবর্তিত বোয়িং ৭৪৭-২০০বি বিমান বরাদ্দ রয়েছে। সামরিক পরিভাষায় এগুলি ‘ভিসি ২৫ এ’ নামে পরিচিত। ১৯৯০ সালের শুরু থেকে এই বিমানগুলিই মার্কিন প্রেসিডেন্টের কমান্ড সেন্টার হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে দীর্ঘ দিনের ব্যবহারে বিমানগুলির রক্ষণাবেক্ষণ আরও জটিল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।
নতুন প্রজন্মের বিমান প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত এই সমস্যা মোকাবিলায় মার্কিন বিমানবাহিনী একটি ‘ব্রিজ’ কর্মসূচি নিয়েছে। এর লক্ষ্য হল পুরনো বহরের উপর চাপ কমানো এবং প্রেসিডেন্টের জন্য সব সময় একটি নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও অত্যাধুনিক উড়ন্ত ‘কমান্ড সেন্টার’ প্রস্তুত রাখা।
বিষয়টি নিয়ে আমেরিকার রাজনৈতিক মহলের অন্দরে বিতর্কও উঠতে শুরু করেছে। বিদেশি সরকারের কাছ থেকে এত মূল্যবান বিমান উপহার নেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপত্তা ও স্বার্থের প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন ট্রাম্প-বিরোধীরা। সমালোচকদের মতে, একটি বিদেশি রাষ্ট্রের দেওয়া বিমানকে প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের উপযোগী করতে হলে অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন। অন্য দিকে ট্রাম্প সমর্থকদের যুক্তি, সঠিক পরীক্ষা ও পরিবর্তনের মাধ্যমে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি মূল্যবান সম্পদে পরিণত হতে পারে।
সব ছবি: সংগৃহীত।