বলিউডে ‘ধুরন্ধর’ ঝড় উঠেছে। সুপারহিট হয়েছে ছবিটি। বক্সঅফিসে আয়ের নিরিখে বহু রেকর্ড ভেঙেছে সেই ছবি। জনপ্রিয় হয়েছে রণবীর সিংহ, অক্ষয় খন্না এবং মাধবন অভিনীত চরিত্রগুলি।
গত বছরের ৫ ডিসেম্বর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে ‘ধুরন্ধর’। পাকিস্তানের লিয়ারি শহরে গ্যাংস্টারদের ঘটনা উঠে এসেছে সেই ছবিতে। পাশাপাশি, ২৬/১১ মুম্বই বিস্ফোরণের ঘটনাও দেখানো হয়েছে এই ছবিতে।
তবে ‘ধুরন্ধর’ ছবিতে সব চরিত্রের মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয়তা পেয়েছে রেহমান বালোচ ওরফে রহমান ডাকাত চরিত্রটি। চরিত্রটিতে অভিনয় করে হইচই ফেলেছেন অক্ষয় খন্না। তাঁর বলা সব ডায়লগ এবং নাচের কায়দা ভাইরাল হয়েছে। পাকিস্তানে একসময় সত্যিই রহমান ডাকাত নামে এক গ্যাংস্টার ছিলেন। ‘ধুরন্ধর’ ছবির চরিত্রটি তাঁর জীবনের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।
‘ধুরন্ধর’ নিয়ে দেশ জুড়ে আলোড়নের মধ্যেই ভারতে এ বার বাস্তবের রহমান ডাকাতের খোঁজ পাওয়া গেল। ইতিমধ্যেই কুখ্যাত সেই অপরাধী আবিদ আলি ওরফে রাজু ওরফে আব্বাস আলি ওরফে রহমান ডাকুকে গ্রেফতার করেছে সুরত পুলিশের অপরাধদমন শাখা।
পুলিশ সূত্রে খবর, মধ্যপ্রদেশের ভোপালের ইরানি ডেরা এলাকার গ্যাংস্টার ছিলেন আবিদ। পাকিস্তানের রহমানের মতো ভোপালের রহমানও সংগঠিত অপরাধের কিংপিন। তাঁর অপরাধের শাখা-প্রশাখাও বিভিন্ন ভাবে বিস্তৃত ছিল। একাধিক গ্যাং ছিল তাঁর। একাধিক রাজ্যে ‘ওয়ান্টেড’ও ছিলেন তিনি।
পুলিশ গোপন সূত্রে জানতে পারে, ভোপালের ইরানি ডেরা এলাকার গ্যাংস্টার আবিদ গোপনে সুরতে প্রবেশ করেছেন। খবর পেয়েই দ্রুত পদক্ষেপ করে সুরতের অপরাধদমন শাখার কর্তা জেএন গোস্বামী এবং তাঁর দল। এর পর ধাওয়া করে কোনও গুলি বিনিময় ছাড়াই আবিদকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, মোট ছ’টি গ্যাং ছিল আবিদ ওরফে রহমান ডাকুর। প্রতিটি গ্যাংয়েরই মূল মাথা ছিলেন তিনি। ১২ থেকে ১৪টি রাজ্যে বিস্তৃত এবং সক্রিয় ছিল তাঁর অপরাধের নেটওয়ার্ক।
ডাকাতি, তোলাবাজি থেকে ছদ্মবেশ ধারণ করে অপরাধ, জোর করে জমি দখল— সমস্ত ধরনের অপরাধেই হাত পাকিয়েছিল আবিদের গ্যাংগুলি। আবিদের অনুপস্থিতিতে গ্যাংগুলি পরিচালনার দায়িত্ব ছিল তাঁর ভাই জাকির আলির কাঁধে।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, অপরাধের পরিকল্পনা করলেও অপরাধস্থলে নিজে খুব কমই উপস্থিত থাকতেন আবিদ। তবে কোন গ্যাং কোন রাজ্যে কখন সক্রিয় হবে এবং কাকে ‘টার্গেট’ করা হবে, তার সমস্ত পরিকল্পনা তিনিই করতেন।
পুলিশ এই গ্যাংগুলির কার্যকলাপ অত্যন্ত সংগঠিত বলে বর্ণনা করেছে। তদন্তকারীরা এ-ও জানিয়েছেন, আবিদের গ্যাং মূলত প্রবীণ নাগরিকদেরই নিজেদের লক্ষ্যবস্তু করত। পুলিশ এবং গোয়েন্দাদের ছদ্মবেশে বিভিন্ন বাড়িতে ঢুকে গয়না এবং নগদ টাকা লুট করত এই গ্যাং।
অভিযোগ, পুলিশ সেজে শুনশান এলাকায় ভুয়ো ব্যারিকেড তৈরি করে যানবাহন তল্লাশি করা এবং মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করার ক্ষেত্রেও সিদ্ধহস্ত ছিল আবিদের গ্যাং। বেশ কয়েকটি অভিযানের সময় এই গ্যাং আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করত বলেও অভিযোগ।
শুধু চুরি, ডাকাতি বা তোলাবাজি নয়, খুনের চেষ্টার মতো অপরাধেও নাকি অভিযুক্ত ছিলেন আবিদ। পুলিশ সূত্রে খবর, তাঁর এবং তাঁর ভাইকে নিয়ে গোপন তথ্য পুলিশের হাতে দেওয়ার সন্দেহে ভোপালের সাংবাদিক সাবির আলিকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করেছিলেন আবিদ।
পুলিশ জানিয়েছে, আবিদ ওরফে রহমান ডাকু এবং তাঁর সহযোগীরা পরিচিত ছিলেন বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্যও। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে উপার্জন করা অর্থ দিয়ে দামি গাড়ি, বাইক কিনতেন তাঁরা। একাধিক ঘো়ড়াও নাকি ছিল আবিদের কাছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, ডিসেম্বরের শেষের দিকে ভোপালের ইরানি ডেরা এলাকায় আবিদকে খোঁজার জন্য চিরুনিতল্লাশি শুরু করে পুলিশ। কিন্তু পুলিশি অভিযানের খবর পেয়েই গা-ঢাকা দেন তিনি। সেই অভিযানে ১৫০ জনেরও বেশি জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আটক করা হয় ৪৪ জনকে।
পুলিশ জানিয়েছে, এর পর মধ্যপ্রদেশ থেকে মহারাষ্ট্র-সহ বিভিন্ন রাজ্যে ঘুরে অবশেষে গুজরাতের সুরতে পৌঁছোন আবিদ। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে দ্রুত পদক্ষেপ করে সুরতের অপরাধদমন শাখা। এর পর অনেক ক্ষণ ধাওয়া করে গ্রেফতার করা হয় আবিদ ওরফে রহমান ডাকুকে।
পুলিশ সূত্রে খবর, আবিদ ছাড়া তাঁর গ্যাংয়ের আরও কয়েক জন সদস্যকে অস্ত্র-সহ গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারির সময় আবিদের গ্যাংগুলির বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজ্যে কমপক্ষে ১০টি গুরুতর ফৌজদারি মামলা নথিভুক্ত ছিল। ছ’টির বেশি রাজ্যের পুলিশ আবিদকে খুঁজছিল।
আবিদের গ্রেফতারিকে সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি বড় সাফল্য হিসাবে বর্ণনা করেছেন সুরতের পুলিশকর্তা ভবেশ রোজ়িয়া। তিনি জানিয়েছেন, অপরাধের চক্র এবং কার্যক্রম সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে আবিদকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বিস্তারিত ভাবে তদন্ত করা শুরু হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সব ছবি: সংগৃহীত।