ভিন্গ্রহীদের খুঁজে বার করার ভার প্রতিরক্ষা দফতরের। ভিন্গ্রহী এবং বহির্জাগতিক প্রাণ কিংবা ভিন্গ্রহীদের যান, সমস্ত বিষয়গুলি নিয়ে গোপন ফাইল শনাক্ত করে তা জনসমক্ষে নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, সরকারের হাতে যত গোপন নথি রয়েছে তা প্রকাশ করে দেওয়া হবে। ভিন্গ্রহীদের অস্তিত্ব নিয়ে বহু দিনের বিতর্কের আগুন উস্কে দিয়েছেন প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।
ভিন্গ্রহীদের অস্তিত্ব নিয়ে সম্প্রতি একটি পডকাস্টে মুখ খুলেছেন আমেরিকার ৪৪তম প্রেসিডেন্ট। পৃথিবীর বাইরে যে প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে, তা একবাক্যে স্বীকার করে নিয়েছেন ওবামা। এমনকি তাদের চোখে না দেখলেও তারা যে রয়েছে তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেছেন, ‘‘ভিন্গ্রহীরা বাস্তব। যদিও আমি কখনও চাক্ষুষ করিনি।”
ভিন্গ্রহীদের অস্তিত্ব নিয়ে বিতর্ক হবে আর তাতে এরিয়া ৫১-এর উল্লেখ থাকবে না, তা এককথায় অসম্ভব। বহু দশক ধরে ষড়যন্ত্রতত্ত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই এরিয়া ৫১। সেই নিষিদ্ধ ও রহস্যময় অঞ্চলটি সম্পর্কেও উল্লেখ করেছেন বারাক ওবামা। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন যে, তিনি বিশ্বাস করেন বহির্জাগতিক জীবনের অস্তিত্ব আছে। এর পরেই তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট পদে থাকার সময় তিনি কখনও এর কোনও প্রমাণ দেখেননি। এমনকি তাদের এরিয়া ৫১-এ রাখা হয়নি বলে দাবি করেছেন ওবামা।
এরিয়া ৫১-এ এমন কোনও পরিকাঠামো নেই যেখানে মাটির নীচে বাইরের গ্রহের কাউকে লুকিয়ে রাখা সম্ভব, যদি না সেখানে কোনও বড়সড় ষড়যন্ত্র হয়ে থাকে, আর সেই তত্ত্বটি মার্কিন প্রেসিডেন্টের গোচরে না আনা হয়। এমনটাই জানান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক দলের সদস্য। তিনি প্রেসিডেন্ট পদে থাকাকালীন এমন কোনও প্রমাণ পাননি বলে জানিয়েছেন ওবামা।
এলিয়েন বা ভিন্গ্রহীদের অস্তিত্ব বিষয়ে বর্তমান ও প্রাক্তনের বিবৃতি নিয়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছে গোটা বিশ্বে। এমনিতেই ভিন্গ্রহীদের নিয়ে নানা মতবাদ, তত্ত্বের ছড়াছড়ি রয়েছে মানবগ্রহে। অনেকেই মনে করেন ব্রহ্মাণ্ডে তো বটেই, এই সৌরমণ্ডলেরই কোনও না কোনও দিকে রয়েছে ভিন্গ্রহীরা। তারা যে শুধু কোনও একটা গ্রহেই রয়েছে, এমনও নয়।
অনেকে মনে করেন, পৃথিবীর বুকেও যুগযুগান্ত ধরে নেমেছে তারা। বহু প্রাচীন সভ্যতা নাকি এই ভিন্গ্রহীদের দান বলে দাবি ওঠে প্রায়শই। অনেকে বলেন, এখনও পৃথিবীর বুকে রয়েছে ভিন্গ্রহীরা। কোথায় রয়েছে? ষড়যন্ত্রতত্ত্ববাদীদের দাবি, সেই জায়গা মার্কিন মুলুকের এরিয়া ৫১। এরিয়া ৫১ ছাড়া ভিন্গ্রহী নিয়ে কোনও আলোচনাই যেন সম্পূর্ণ হয় না।
পশ্চিম আমেরিকার নেভাদা মরুভূমির একটি অংশে রয়েছে এই রহস্যেঘেরা জায়গাটি। লাস ভেগাস থেকে ৮৩ কিলোমিটার দূরে গ্রুম লেকের ধারে রয়েছে এরিয়া ৫১। এই জায়গার বিশেষত্ব হল, এখানকার ভিন্গ্রহের প্রাণের অস্তিত্বের কাহিনি। কাহিনিগুলি কতটা সত্যি, কতটা মিথ্যা তা জানা না গেলেও আমেরিকার সেনাবাহিনী যে সব সময় এই জায়গাটিকে লোকচক্ষুর আড়ালে রাখতে চায়, তা স্পষ্ট হয়েছে বহু বার।
মরুভূমির মাঝে এক সমতল ভূমি, যেখানে প্রচুর পরিমাণে নুন ও অন্যান্য খনিজ পাওয়া যায়। সম্পূর্ণ সমতল হওয়ায় এরিয়া ৫১-এর গ্রুম লেক এলাকাকেই বিমানের রানওয়ে হিসাবে ব্যবহার করা শুরু হয়। তৈরি হয় ওয়ার্কশপ, হ্যাঙারও। তিন মাসের মধ্যেই তৈরি হয়ে যায় বাঁধানো রানওয়ে, কন্ট্রোল টাওয়ার। এরিয়া ৫১-এর হ্যাঙ্গার ১৮-কে নিয়েই জল্পনা রয়েছে সবচেয়ে বেশি। ষড়যন্ত্রতত্ত্ববাদীদের মতে, ভিন্গ্রহীদের নিয়ে আমেরিকার সরকার গোপন প্রকল্প চালায় ওই জায়গাতেই।
এরিয়া ৫১ নিয়ে প্রথম জল্পনা শুরু হয় একটি বিমান দুর্ঘটনার পর। সেটি ছিল ১৯৪৭ সাল। রোসোয়েল বিমান দুর্ঘটনার পর কানাঘুষো হতে থাকে যে দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমানের চালক কোনও মানুষ ছিল না। বরং ভিন্গ্রহীরাই চালকের আসনে ছিল। আবার অনেকের মতে, সে দিন প্লেন নয়, উড়েছিল একটি স্পেসশিপ। ভিতরে ছিল নাজ়িদের গবেষণাগারে তৈরি অদ্ভুত চেহারার ‘মানুষের মতো’ এক প্রাণী।
এই এলাকাটিতে জনসাধারণের প্রবেশাধিকার কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। সতর্কতামূলক চিহ্ন, সাবধানবাণী ইতিউতি ছড়ানো। রয়েছে সশস্ত্র প্রহরী এবং ইলেকট্রনিক্স নজরদারি ব্যবস্থাও। সাধারণ মানুষের নজর থেকে দূরে সরিয়ে রাখার সমস্ত সুরক্ষা উপকরণ দিয়ে মোড়ানো এই এলাকাটি। এমনকি এর উপর দিয়েও কোনও বিমানের উড়ে যাওয়া নিষিদ্ধ। একমাত্র উপগ্রহচিত্রে ধরা পড়ে এরিয়া ৫১-এর উপস্থিতি।
রাশিয়া ও আমেরিকার ‘ঠান্ডা যুদ্ধের’ সময় এরিয়া ৫১ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ইউ২ এবং এসআর৭১ ব্ল্যাকবার্ডের মতো বিমানের পরীক্ষার ক্ষেত্র হিসাবে তৈরি করা হয়েছিল এটিকে। মার্কিন সরকার ২০১৩ সাল পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক ভাবে এই ঘাঁটির অস্তিত্ব স্বীকার করেনি। ১৯৫০-এর দশকের গোড়ার দিকে শুরু হয়েছিল ভিন্গ্রহী সংক্রান্ত ষড়যন্ত্রতত্ত্বগুলি।
গত কয়েক বছর ধরে ভিন্গ্রহীদের যান বা ‘আনআইডেন্টিফায়েড অবজেক্টের’ (ইউএফও) প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। ২০১৭ সালে পেন্টাগনের একটি গোপন কর্মসূচি প্রকাশ্যে আসে। তাতে বলা হয়েছিল, সামরিক কর্মীরা কিছু কিছু অস্বাভাবিক দৃশ্যের কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতেই তার তদন্ত করা হয়।
তার পর ২০২২ সালে, মার্কিন কংগ্রেস ৫০ বছরের মধ্যে প্রথম ইউএফও নিয়ে শুনানি করে। এমনকি জানা যায় যে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দফতর পেন্টাগনও মাঝ-আকাশে ঘটে যাওয়া অজ্ঞাত ও রহস্যজনক ঘটনা জানার জন্য একটি কার্যালয় খুলে বসেছিল।
৩০ লক্ষ একর জায়গা নিয়ে গড়ে ওঠা কঠোর সুরক্ষাকবচে মোড়া এলাকাটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহার করে। এরিয়া ৫১ ঘিরে চূড়ান্ত গোপনীয়তার কারণে একে ঘিরে বেশ কিছু গুজবও রটেছে। সবচেয়ে চলতি গুজব হল, হ্যাঙ্গারটিতে চালক-সহ ভিন্গ্রহীদের ভেঙে পড়া একটি যান, প্রযুক্তি এবং বহির্জাগতিক জীবনের প্রমাণ সংরক্ষণ করে রাখা রয়েছে। অনেকের আবার ধারণা, অতি গোপন মহাকাশ কর্মসূচি নিয়ে গবেষণা চলে ওই জায়গায়।
স্বাভাবিক ভাবেই এরিয়া ৫১ ভিন্গ্রহী যান সংরক্ষণের দাবি নস্যাৎ করেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। ভিতরে কোনও ভিন্গ্রহীদের আটকে রাখা হয়নি বা ইউএফও রাখা হয়নি বলে জানায় মার্কিন প্রশাসন। ১৯৫৫ সালে যুদ্ধবিমানের পরীক্ষামূলক উড়ান শুরু হওয়ার পর থেকেই এরিয়া ৫১-এ ইউএফও বা ভিন্গ্রহী যান দেখতে পাওয়া নিয়ে ভূরি ভূরি জল্পনা তৈরি হতে শুরু করে।
একাধিক বাণিজ্যিক বিমানের চালক দাবি করেছেন, এত উচ্চতায় কোনও বিমানের ওড়া অসম্ভব। বিমানের এত উচ্চতায় ওড়ার ঘটনা ভিন্গ্রহীদের অস্তিত্বের যুক্তি আরও জোরালো করেছিল সে সময়। স্বঘোষিত পদার্থবিদ বব লাজার দাবি করেছিলেন, তিনি ১৯৮৯ সালে এরিয়া ৫১-এর একটি গোপন স্থানে কাজ করতেন। এস-৪ নামের সেই জায়গাটি এতটাই গোপনীয় ছিল যে সেটির অবস্থান ঠিক কোথায় তা ঠাহর করতে পারেননি বব ও তাঁর সহকর্মীরা।
বিমানছাউনিতে লাজার নাকি উড়ন্ত চাকতি দেখতে পেয়েছিলেন। তরল টাইটানিয়ামের অনুরূপ পদার্থ দিয়ে তৈরি সেই যন্ত্রগুলি পার্থিব জগতে তৈরি হতে পারে না বলে দাবি লাজারের। যানগুলিতে নাকি শক্তি সরবরাহ করা হচ্ছিল অ্যান্টিম্যাটার রিঅ্যাক্টরের মাধ্যমে। জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছিল এমন একটি পদার্থ যার নাম ‘এলিমেন্ট-১১৫’। এই পারমাণবিক সংখ্যা বিশিষ্ট রাসায়নিক উপাদানটি ২০০৩ সালে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন।
এরিয়া ৫১ আসলে কী, সেই সম্পর্কে জনগণের ধারণা বেশ কম। কাঁটাতারের ওই পারে কী রয়েছে তা অগোচরেই থেকে গিয়েছে আমজনতার। ধারণা থেকেই পরবর্তী কালে জন্ম নিয়েছে নানা জল্পনা। ষড়যন্ত্রতত্ত্ববাদীদের দাবি, নিষিদ্ধ এলাকায় ভূগর্ভস্থ বিশাল বিশাল বাঙ্কার গড়ে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। আর সেখানে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে অত্যাধুনিক বিমানের আনাগোনা। সেগুলিকে নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে এমন ভাবে রাখা হয় যাতে স্যাটেলাইটের মাধ্যমেও হদিস পাওয়া সম্ভব না হয়।
এই বিতর্কিত ও বিচ্ছিন্ন এলাকাটি নিয়ে আমেরিকার সরকার প্রথমে খুব একটা বেশি মুখ না খুললেও তথ্য স্বাধীনতার অধিকার আইন অনুযায়ী বেশ কিছু তথ্য জানাতে বাধ্য হয়। ১৯৫০ সালের শেষ ভাগে ‘ইউ-২’ প্রোজেক্ট বন্ধ হয়ে গেলেও এরিয়া ৫১-কে কিন্তু কঠোর নিরাপত্তায় মুড়ে রাখা হয়েছে আজও। নির্দিষ্ট একটি সীমা অবধিই সাধারণ মানুষ যেতে পারেন। কাঁটাতারের ওই পারে কী রয়েছে তা অগোচরে থেকে গিয়েছে আজও।
ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত