দেখতে দেখতে চার বছর পার। তার পরও থামছে না পূর্ব ইউরোপের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এ-হেন পরিস্থিতিতে ফের এক বার পরমাণু হামলার আশঙ্কা উস্কে দিল মস্কো। ক্রেমলিনের দাবি, গোপনে কিভকে আণবিক হাতিয়ার সরবরাহের ছক কষছে ব্রিটেন ও ফ্রান্স, যা সর্বাত্মক ধ্বংস ডেকে আনতে পারে বলে চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রশাসন। ফলে গোটা দুনিয়ার কপালের ভাঁজ যে চওড়া হচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।
চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেন সংক্রান্ত একটি গোপন রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনে রুশ গুপ্তচর সংস্থা এসভিআর। সেখানে বলা হয়েছে, কিভকে পরমাণু অস্ত্র হস্তান্তরের ব্যাপারে একরকম সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে ব্রিটেন ও ফ্রান্স। সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনাটি কী ভাবে ফাঁস হল, তার সপক্ষে কোনও প্রমাণ অবশ্য দাখিল করেনি মস্কোর ওই গুপ্তচর সংস্থা। একে যুদ্ধের মধ্যে চাপ তৈরির কৌশল বলে পাল্টা তোপ দেগেছেন ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জ়েলেনস্কি। পাশাপাশি, ক্রেমলিনকে মিথ্যাবাদী বলতেও ছাড়েনি তাঁর সরকার।
অন্য দিকে, জনসমক্ষে আনা গোপন রিপোর্টে পরমাণু অস্ত্রের অপসারণ সংক্রান্ত চুক্তির (ট্রিটি অন দ্য নন-প্রলিফারেশন অফ নিউক্লিয়ার ওয়েপন্স বা এনপিটি) কথা উল্লেখ করেছে রাশিয়া। মস্কোর বক্তব্য, ‘‘যাবতীয় আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে আণবিক অস্ত্রের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে ব্রিটেন ও ফ্রান্স। এটা বিশ্বব্যাপী পরমাণু হাতিয়ারের অপসারণ ব্যবস্থাকে বড়সড় ঝুঁকির মুখে ফেলবে।’’ ক্রেমলিনের এই অভিযোগের পর ইউরোপ জুড়ে নতুন করে পড়ে গিয়েছে শোরগোল।
গত শতাব্দীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়া) মধ্যে ‘ঠান্ডা লড়াই’ (কোল্ড ওয়ার) চলাকালীন পরমাণু অস্ত্রের সম্প্রসারণ বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে বিশ্ব। ফলে ১৯৬৮ সালে জন্ম হয় এনপিটির। ওই সময় সংশ্লিষ্ট সমঝোতাটিতে সই করে পাঁচটি আণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। তারা হল আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চিন। চুক্তির শর্ত মেনে, পরমাণু অস্ত্র ‘বন্ধু’ দেশকে সরবরাহ করার ব্যাপারে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা।
রুশ গুপ্তচরদের দাবি, সে সব কথা ভুলে গিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছরের মাথায় ‘বিপজ্জনক’ খেলায় নেমেছে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি ‘নাটক’ মঞ্চস্থ করতে চাইছে তারা। তার চিত্রনাট্য এমন ভাবে সাজানো হচ্ছে, যা দেখে মনে হবে নিজের ক্ষমতায় পরমাণু অস্ত্রের শক্তি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে কিভ। যদিও আসল সত্যি তার থেকে পুরোপুরি আলাদা। জ়েলেনস্কি ফৌজের কাছে গণবিধ্বংসী হাতিয়ারটি পৌঁছে দিতে একাধিক দেশের মধ্যে দিয়ে তা নিয়ে যেতে পারে ওই দুই রাষ্ট্র।
আবার এ ক্ষেত্রে ইংরেজ এবং ফরাসি নাবিকেরা সামুদ্রিক রাস্তা বেছে নিলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। রুশ গুপ্তচর সংস্থা এসভিআরের রিপোর্টে বলা হয়েছে, লন্ডন ও প্যারিস বিশ্বাস করে যে ইউক্রেনের হাতে একটি পরমাণু বোমা বা তথাকথিত ‘নোংরা বোমা’ (ডার্টি বম্ব) থাকলেই রাতারাতি বদলে যাবে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি। তখন সংঘর্ষবিরতির জন্য নিজের শর্তগুলি নিয়ে পুতিনের সঙ্গে দর কষাকষিতে নামতে পারবেন প্রেসিডেন্ট জ়েলেনস্কি, যে তাস বর্তমানে তাঁর আস্তিনে লুকোনো নেই।
পরমাণু বোমা তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল ইউরেনিয়াম। সংশ্লিষ্ট তেজস্ক্রিয় পদার্থটিকে আণবিক হাতিয়ারে বদলে ফেলতে হলে চাই এর শুদ্ধিকরণ। ইউরেনিয়াম ৯০ শতাংশ বা তার বেশি শুদ্ধ হলে সেটা দিয়ে গণবিধ্বংসী হাতিয়ার তৈরি করা যেতে পারে। বোমা তৈরির এই প্রক্রিয়াটিই সবচেয়ে জটিল। অন্য দিকে সামান্য পরিমাণে পরিশুদ্ধ ইউরেনিয়ামের সাহায্যে বানানো যায় নোংরা বোমা বা ডার্টি বম্ব। এটি সাধারণ বিস্ফোরক ব্যবহার করে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে দিতে পারে, বলছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা
ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছরের মাথায় এসভিআর প্রকাশিত এই রিপোর্টের দু’রকম অর্থ খুঁজে বার করেছেন সাবেক সেনাকর্তাদের একাংশ। তাঁদের দাবি, গোপনে পরিশুদ্ধ বা এনরিচ ইউরেনিয়াম কিভকে সরবরাহের পরিকল্পনা থাকতে পারে ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের। আবার তাদের থেকে নোংরা বোমার (ডার্টি বম্ব) সরঞ্জাম হাতে পাওয়ার সুযোগ রয়েছে জ়েলেনস্কি বাহিনীর। তবে পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আস্ত আণবিক বোমা ইউক্রেনে পাঠানোর মতো সিদ্ধান্ত লন্ডন ও প্যারিসের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক কর্তাদের পক্ষে নেওয়া বেশ কঠিন।
২৪ ফেব্রুয়ারি এই ইস্যুতে মুখ খোলেন ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেশকভ। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা আলোচনার মাধ্যমে ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি চাইছি। কিভের কাছে কোনও পরমাণু হাতিয়ার থাকতে পারে না, আমাদের প্রাথমিক শর্তগুলির মধ্যে যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে লন্ডন ও প্যারিসের ঝুঁকিপূর্ণ চিন্তাভাবনা গোটা পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ অন্য দিকে ঘোরাতে পারে। পশ্চিমি শক্তিগুলির এই ধরনের দ্বিমুখী নীতি আমাদের অন্য কিছু ভাবতে বাধ্য করবে।’’
রাশিয়ার এই অভিযোগের পর পাল্টা বিবৃতি দিয়েছে ইউক্রেনের বিদেশ মন্ত্রক। জ়েলেনস্কি প্রশাসনের দাবি, যুদ্ধের মধ্যে মনগড়া ও অযৌক্তিক কথা বলে কিভের মনোবল ভাঙতে চাইছে মস্কো। পরে এ ব্যাপারে সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে ইউক্রেনীয় মুখপাত্র হিওরহি তিখি বলেন, ‘‘আমরা আন্তর্জাতিক আইনকে সব সময় সম্মান করে এসেছি। পরমাণু হাতিয়ারের ঝুঁকি সম্পর্কে কিভ ওয়াকিবহাল। ফলে আনুষ্ঠানিক ভাবে ক্রেমলিনের গোয়েন্দা রিপোর্টের বিরোধিতা করা হচ্ছে। বিশ্বমঞ্চেও এই মিথ্যাচার তুলে ধরা হবে।’’
প্রায় একই সুর শোনা গিয়েছে মস্কোর ফরাসি দূতাবাস থেকে। রাশিয়ার আরবিসি নিউজ়কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে সেখানকার এক আধিকারিক বলেন, ‘‘প্যারিস কখনওই এই ধরনের কোনও অবিমৃশ্যকারী সিদ্ধান্ত নেয় না বা নিচ্ছে না। অযথা মিথ্যাচার বন্ধ করুক ক্রেমলিন।’’ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এ ব্যাপারে এখনও পর্যন্ত মুখে কুলুপ এঁটে আছে ব্রিটেনের কিয়ের স্টার্মার সরকার। অতীতে বার বার জ়েলেনস্কিকে হাতিয়ার দিয়ে সাহায্য করতে দেখা গিয়েছে তাদের।
চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে পরমাণু অস্ত্রের মহড়া চালায় রুশ ফৌজ। বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজ়ান্ডার লুকাশেঙ্কোকে পাশে নিয়ে কম্পিউটারে তা প্রত্যক্ষ করেন পুতিন। ক্রেমলিন জানিয়েছে, রণতরী, যুদ্ধবিমান ও ডুবোজাহাজ থেকে আণবিক হাতিয়ার ছুড়ে গা ঘামিয়েছে দুই দেশের সেনা। প্রতিটা ক্ষেত্রেই নির্ভুল দক্ষতায় নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত হেনেছে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র। মস্কোর পরমাণু অস্ত্রের অভিমুখ কি ইউক্রেনের দিকে? ওই মহড়ার পর চড়তে শুরু করেছে সেই আশঙ্কার পারদ।
ইউক্রেনের যুদ্ধের চার বছরের মাথায় বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে রুশ পার্লামেন্ট ফেডারেল অ্যাসেম্বলি। বিদেশের মাটিতে থাকা সৈন্য ব্যবহারের সবুজ সঙ্কেত দিয়েছে মস্কোর সর্বোচ্চ আইনসভা। ফলে বেলারুশের জমি ব্যবহার করে ইউক্রেনের উপর আক্রমণের ঝাঁজ বাড়াতে পারে ক্রেমলিন। সে ক্ষেত্রে উত্তর দিকে একাধিক এলাকা হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা থাকছে কিভের। সব মিলিয়ে সাঁড়াশি চাপে জ়েলেনস্কির উপর চাপ বাড়ানোর কৌশল যে পুতিন নিচ্ছেন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি পরমাণু অস্ত্রের মহড়া নিয়ে একটি বিবৃতি দেয় ক্রেমলিন। মস্কো জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট যুদ্ধাভ্যাসে ‘হাইপারসনিক’ (শব্দের পাঁচ গুণের চেয়ে গতিশীল) এবং ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্রের উৎক্ষেপণ সফল ভাবে সম্পন্ন হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, মহড়ার শেষে সেনা অফিসারদের অভিনন্দন জানান খোদ প্রেসিডেন্ট পুতিন। বিশ্লেষকদের দাবি, এর মাধ্যমে পশ্চিমি দুনিয়াকে বিশেষ বার্তা দিতে চাইছে রাশিয়া। এককথায় তাঁর দাবি মানতে দুনিয়াকে বাধ্য করানোই পুতিনের মূল উদ্দেশ্য।
একসময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল ইউক্রেন। কিন্তু, ১৯৯১ সালে কমিউনিস্ট প্রজাতন্ত্রটির পতন হলে জন্ম হয় ১৫টি পৃথক রাষ্ট্রের। ওই সময় রাশিয়ার থেকে আলাদা হয়ে যায় কিভ। ২১ শতক আসতে আসতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট ‘নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন’-এ (নেটো) যোগ দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে ইউরোপের রুটির ঝুড়ি হিসাবে খ্যাত ইউক্রেন। সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতিবাদ করে মস্কো। পশ্চিমের শত্রুবাহিনী একেবারে দরজার সামনে চলে আসুক, চায়নি ক্রেমলিন।
২০১৪ সালে ইউক্রেনের থেকে ক্রাইমিয়া উপদ্বীপ ছিনিয়ে নেয় পুতিনের ফৌজ। এর পর নেটোয় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ব্যাপারে আরও বেশি তদ্বির শুরু করে কিভ। মস্কোর দেওয়া একাধিক হুঁশিয়ারিতেও কোনও কাজ হয়নি। ফলে ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশটিতে সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন পুতিন। তার জেরে দু’পক্ষের মধ্যে বেধে যায় যুদ্ধ। গত চার বছরে ইউক্রেনের বেশ কিছুটা এলাকা দখল করেছে ক্রেমলিনের সেনা।
গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেওয়ার পর থেকেই যুদ্ধ থামানোর ব্যাপারে জোর দিতে থাকেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ ব্যাপারে আলাস্কায় পুতিনের সঙ্গে একপ্রস্ত আলোচনাও সেরেছেন তিনি। তবে এখনও কোনও সমাধানসূত্র বার হয়নি। এই অবস্থায় ইউক্রেনের হাতে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের পরমাণু অস্ত্র তুলে দেওয়ার গুঞ্জন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কথা বলা হবে বলে জানিয়েছেন ক্রেমলিনের পদস্থ কর্তা ইউরি উশাকভ।
আগামী ২৯ ফেব্রুয়ারি সুইৎজ়ারল্যান্ডের জেনেভায় ফের এক বার ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে আলোচনায় বসবে রাশিয়া। ঠিক তার আগে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলল মস্কোর গুপ্তচরবাহিনী। এর জেরে দর কষাকষিতে কতটা এগিয়ে থাকলেন পুতিন, তার উত্তর দেবে সময়।
সব ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।