রাশিয়ায় ঢুকে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ। ব্রিটিশ কূটনীতিককে এ বার বহিষ্কার করল মস্কো। দু’সপ্তাহের মধ্যে তাঁকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে ক্রেমলিন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, দিন ১৫ আগে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বাসভবনে হামলা চালায় ইউক্রেন। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ইংরেজ কূটনীতিককে তাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিল মস্কো। এর জেরে লন্ডন-ক্রেমলিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পারদ চড়বে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বেশ কিছু দিন ধরেই ব্রিটিশ কূটনীতিক গ্যারেথ স্যামুয়েল ডেভিসের উপর নজর রাখছিল রুশ গুপ্তচরবাহিনী ‘ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস’ বা এফএসবি। তাদের দেওয়া রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই গত ১৫ জানুয়ারি ওই ব্যক্তিকে দেশ থেকে বহিষ্কার করে ক্রেমলিন। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার আগে পর্যন্ত মস্কোর গুপ্তচর সংস্থার নাম ছিল কেজিবি। এফএসবিকে তাদের উত্তরসূরি বলা যেতে পারে, যাকে নিজের হাতে ঢেলে সাজিয়েছেন পুতিন।
গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ডেভিসকে বহিষ্কারের পাশাপাশি এই ইস্যুতে কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছে রুশ বিদেশ মন্ত্রক। পাশাপাশি, ব্রিটিশ দূতাবাসের ‘চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স’ (রাষ্ট্রদূতের অনুপস্থিতিতে দূতাবাসের প্রধানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কূটনীতিক) ডানাই ধোলাকিয়াকে তলব করে মস্কো। স্থানীয় গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছর ৪৫-এর অভিযুক্ত ব্যক্তি ইংরেজদের দূতাবাসের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বিভাগে ‘সেকেন্ড সেক্রেটারি’র ছদ্মবেশে ছিলেন। কী কী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তিনি লন্ডনে পাঠিয়েছেন, তা অবশ্য জানা যায়নি।
‘দ্য মস্কো টাইমস’ আবার জানিয়েছে, তলব পেয়ে তড়িঘড়ি রুশ বিদেশ মন্ত্রকের দফতরে হাজির হন ব্রিটিশ ‘চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স’ ধোলাকিয়া। প্রায় ১৫ ঘণ্টা সেখানে ছিলেন তিনি। বাইরে বেরিয়ে এসে গণমাধ্যমের সামনে অবশ্য মুখ খোলেননি ওই ইংরেজ কূটনীতিক। তবে গাড়িতে ওঠার সময় স্থানীয়দের বিক্ষোভের মুখে পড়েন ধোলাকিয়া। যদিও কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তিনি দফতরে ফিরে যেতেই ব্রিটিশ কূটনীতিকদের চলাফেরার উপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করে ক্রেমলিন, যা নিয়ে আবার বিতর্ক দানা বেঁধেছে।
মস্কোর বিধিনিষেধ অনুযায়ী, এ বার থেকে ব্রিটিশ দূতাবাসের ১২০ কিলোমিটার (৭৫ মাইল) ব্যাসার্ধের বাইরে যেতে হলে আলাদা করে ইংরেজ কূটনীতিকদের নোটিস দিতে হবে। ক্রেমলিন তাতে সবুজ সঙ্কেত দিলে তবেই ওই এলাকার বাইরে পা রাখতে পারবেন তাঁরা। সোভিয়েত জমানায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ পশ্চিমি দুনিয়ার দূতাবাসের কর্মীদের এই ধাঁচের বিধিনিষেধ চালু ছিল। গত ৩৫ বছরে যা অনেকটাই শিথিল করে রুশ প্রশাসন। ডেভিসকাণ্ডের পর কিছুটা বাধ্য হয়েই পুরনো নিয়ম ফেরালেন পুতিন? উঠছে প্রশ্ন।
ব্রিটিশ কূটনীতিককে বহিষ্কারের ঘোষণার সময় ক্রেমলিনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্রের গলায় ছিল হুঁশিয়ারির সুর। তিনি বলেন, ‘‘মস্কো কখনওই রুশ ভূখণ্ডে ব্রিটিশদের চরবৃত্তি সহ্য করবে না। লন্ডন যদি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও খারাপ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তা হলে আমরা প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত। ইংরেজদের ‘আয়না’ দেখানোর কৌশল আমাদের জানা আছে।’’ এ-হেন হুমকির পাশাপাশি অভিযুক্ত ডেভিসের ছবিও গণমাধ্যমে প্রকাশ করতে দেরি করেনি পুতিন প্রশাসন।
গত বছরের মার্চে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে দুই কূটনীতিককে বহিষ্কার করে মস্কো। ওই সময় এফএসবির একটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানায়, রাশিয়ায় প্রবেশের সময় ক্রেমলিনকে ভুয়ো তথ্য দিয়েছিল ওই দুই ব্যক্তি। তাঁদের মধ্যে ‘গুপ্তচর হিসাবে ধ্বংসাত্মক কাজে জড়িত থাকার’ একাধিক প্রমাণ হাতে পায় ক্রেমলিন। যদিও পুতিন প্রশাসনের যাবতীয় দাবি পত্রপাঠ খারিজ করে দেয় লন্ডন। তখন থেকেই দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন বাড়ছিল।
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রুশ ফৌজ ইউক্রেন আক্রমণ করলে পূর্ব ইউরোপে বেধে যায় যুদ্ধ। লড়াইয়ের প্রথম দিন থেকেই কিভের পাশে এসে দাঁড়ায় ব্রিটেন। মস্কোর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জ়েলেনস্কিকে সাহায্য করতে থাকে ইংরেজ গুপ্তচর সংস্থা এমআই-৬। এতে চোরাগোপ্তা হামলা চালানোর যথেষ্ট সুবিধা পেয়ে যায় তাঁর সেনাবাহিনী। জ়েলেনস্কি ফৌজের ‘গেরিলা যুদ্ধে’ বিভিন্ন রণাঙ্গনে বহু সৈনিক হারায় ক্রেমলিন। এর জেরে চওড়া হতে থাকে পুতিনের কপালের চিন্তার ভাঁজ।
উদাহরণ হিসাবে ক্রাইমিয়ার কের্চ সেতুতে হামলার কথা বলা যেতে পারে। মূল রুশ ভূখণ্ডের সঙ্গে ওই উপদ্বীপের সংযোগ রক্ষাকারী একমাত্র রাস্তাটিকে চিরতরে বন্ধ করার কম চেষ্টা করেনি ইউক্রেন। ২০২২-’২৬ সালের মধ্যে অন্তত তিন থেকে চার বার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সংশ্লিষ্ট সেতুটিকে ওড়ানোর চেষ্টা করে কিভ। কের্চের পিলারে ডুবো ড্রোনেও হামলা চালায় জ়েলেনস্কির ফৌজ। এই ধরনের আক্রমণের পরিকল্পনায় ব্রিটিশ গোয়েন্দা তথ্যের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল তারা, বলছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।
গত বছরের ডিসেম্বরের একেবারে শেষে মস্কোর বেশ কিছুটা দূরে নভগোরোদ এলাকায় পুতিনের বিলাসবহুল বাসভবনে ড্রোন হামলা চালায় ইউক্রেন। রুশ প্রেসিডেন্টের ওখানে যে বাড়িটি রয়েছে, তার পোশাকি নাম ‘গোল্ডেন হাউস’ বা ‘ভালাই’। ঘটনার সময় প্রেসিডেন্ট অবশ্য সেখানে ছিলেন না। সাবেক সেনাকর্তাদের দাবি, ব্রিটিশ গুপ্তচরদের দেওয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে ওই আক্রমণের পরিকল্পনা করে থাকতে পারে কিভ, যাতে কম-বেশি ৯১টা ড্রোন ব্যবহার করেছিল জ়েলেনস্কির ফৌজ।
ইউক্রেনের পাঠানো পাইলটবিহীন যানগুলিকে অবশ্য মাঝ-আকাশেই ধ্বংস করে মস্কোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম)। তার পরই কিভকে কড়া হুঁশিয়ারি দেন রুশ বিদেশমন্ত্রী সর্গেই লেভরভ। যদিও ওই সময় ক্রেমলিনের দাবিকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেয় কিভ। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় জ়েলেনস্কি প্রশাসনের বক্তব্য ছিল, ইউক্রেনের সরকারি ভবনগুলিকে নিশানা করার ফন্দিফিকির খুঁজছে ক্রেমলিন। সেই কারণে এই ধরনের ভুয়ো তথ্য ছড়াচ্ছে পুতিন সরকার।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার বেশ কিছু দিন পর বিদেশি গুপ্তচরদের চিহ্নিত করার কাজ শুরু করে রাশিয়া। দ্য মস্কো টাইমস জানিয়েছে, গত দু’বছরে ক্রেমলিনের ‘হাঁড়ির খবর’ জোগাড় করার অভিযোগে মোট ন’জন কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছেন প্রেসিডেন্ট পুতিন। সেই তালিকার সর্বশেষ নাম হল গ্যারেথ স্যামুয়েল ডেভিস। তবে পূর্ব ইউরোপের দেশটিতে মার্কিন গুপ্তচরবাহিনী ‘সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি’ (সিআইএ) এবং ফ্রান্সের ‘ডিরেকশন জেনারেলে ডে লা সিকিউরিটে এক্সটেরিওরে’ বা ডিজিএসই-র এজেন্টরা সক্রিয় আছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
সূত্রের খবর, এই সমস্ত বিদেশি গুপ্তচরবাহিনীর মোকাবিলায় এফএসবির পাশাপাশি আরও দু’টি গোয়েন্দা সংস্থাকে মাঠে নামিয়েছেন পুতিন। তারা হল এসভিআর এবং জিআরইউ। এদের মধ্যে প্রথমটি শত্রু দেশের সামরিক ও রাজনৈতিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজ করে থাকে। অন্য দিকে, রুশ ফৌজের জন্য গুপ্তচরবৃত্তি করে জিআরইউ। দ্বিতীয় সংস্থাটির বিরুদ্ধে পশ্চিমি দেশগুলিতে বহুল পরিমাণে সাইবার হামলা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। যদিও কখনও তা স্বীকার করেনি ক্রেমলিন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-’৪৫) পরবর্তী সময়ে দেশে দেশে সংঘাত এড়াতে তৈরি হয় একগুচ্ছ আইন, যার মধ্যে অন্যতম হল ১৯৬১ সালের ভিয়েনা কনভেনশন। সেখানে দূতাবাসের কূটনীতিকদের উপর ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। ডেভিসকে তাই গ্রেফতার করেনি ক্রেমলিন। তবে ওই আইন মেনে তাঁর কূটনৈতিক স্বীকৃতি বাতিল করেছে পুতিন প্রশাসন। বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে যা জানাতে ভোলেনি মস্কো।
কূটনীতিকের ছদ্মবেশে শত্রু দেশে গুপ্তচর পাঠানোর অভিযোগ কিন্তু রয়েছে মস্কোর বিরুদ্ধেও। আমেরিকা-সহ পশ্চিমি দুনিয়ার অভিযোগ, সোভিয়েত জমানায় তাদের দূতাবাসের কর্মীদের উপর কড়া নজরদারির হুকুম দেন কিংবদন্তি জোসেফ স্টালিন। সেই পরম্পরায় কখনও ছেদ পড়েনি। শুধু তা-ই নয়, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স বা পশ্চিম ইউরোপের কোনও বাসিন্দার রাশিয়ায় বেড়াতে যাওয়াকেও সন্দেহের চোখে দেখেছে ক্রেমলিন। বহু ক্ষেত্রে তাদের উপরেও চরবৃত্তি চালাতে কসুর করেনি কেজিবি বা তার উত্তরসূরি এফএসবি।
২০১৮ সালে রুশ গুপ্তচর সের্গেই ভিক্টোরোভিচ স্ক্রিপালকে বিষপ্রয়োগে ‘হত্যার চেষ্টা’র খবর প্রকাশ্যে এলে ইউরোপ জুড়ে শুরু হয় হইচই। গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকে এই সামরিক গোয়েন্দা কর্তাকে ব্রিটেনে পাঠায় ক্রেমলিন। খুব অল্প দিনের মধ্যেই সেখানকার নাগরিকত্ব পেয়ে যান স্ক্রিপাল। পরে অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে ওঠে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ। ২০০৪ সালে তাঁকে গ্রেফতার করে এফএসবি। বিচারে ১৩ বছরের কারাদণ্ড হয় তাঁর।
রুশ জেলে বন্দি থাকাকালীন স্ক্রিপালের সঙ্গে দেখা করতে আসেন তাঁর মেয়ে ইউলিয়া। এর কয়েক দিনের মধ্যেই বিষ প্রয়োগে তাঁদের দু’জনকেই হত্যার চেষ্টা হয় বলে মস্কোর বিরুদ্ধে ওঠে অভিযোগ। তবে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় প্রাণে বেঁচে যান তারা। ২০১৮ সালের মে মাসে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান স্ক্রিপাল। তাঁর মেয়ে অবশ্য আগেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পেরেছিলেন।
জীবনের প্রথম পর্বে পুতিন নিজেও ছিলেন এক জন গুপ্তচর। কেজিবির এজেন্ট হয়ে দীর্ঘ দিন পূর্ব জার্মানিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে তাঁর। এ ছাড়া উচ্চশিক্ষার ‘অছিলায়’ বেশ কিছু দিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও কাটিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট। ফলে তাঁর চোখকে ফাঁকি দেওয়া একেবারেই সহজ নয়। ফলে মস্কোর অন্দরমহলে উঁকি মারতে ব্রিটিশ এমআই-৬ অন্য কোনও রাস্তা নেয় কি না, সেটাই এখন দেখার।
সব ছবি: সংগৃহীত।