হরমুজ় প্রণালী অবরুদ্ধ করে ইজ়রায়েল ও আমেরিকার বিরুদ্ধে আক্রমণের ঝাঁজ বাড়াচ্ছে ইরান। ফলে বিশ্ব জুড়ে ঊর্ধ্বমুখী অপরিশোধিত খনিজ তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের আঁচে পুড়ছে ভারতীয় অর্থনীতিও। এ-হেন পরিস্থিতিতে আশার কথা শোনাল সৌদি আরব। অবরুদ্ধ হরমুজ়কে ‘বুড়ো আঙুল’ দেখিয়ে সম্পূর্ণ অন্য রাস্তায় তরল সোনা ও এলপিজির (লিক্যুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সরবরাহ শুরু করেছে রিয়াধ। এতে বিপদের মধ্যেও নয়াদিল্লি কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারছে বললে অত্যুক্তি হবে না।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত পশ্চিম এশিয়ার উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলি হরমুজ় প্রণালী দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করত অপরিশোধিত খনিজ তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস। পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের সংযোগকারী ওই সরু একফালি সামুদ্রিক রুটটি ছিল দুনিয়ার ২০ শতাংশ তরল সোনা সরবরাহের ব্যস্ততম রাস্তা। কিন্তু, লড়াই বাধতেই তড়িঘড়ি তা বন্ধ করে তেহরান। এই অস্থিরতার মধ্যে বাইপাস হিসাবে ‘পূর্ব-পশ্চিম অপরিশোধিত তেল পাইপলাইন’ নেটওয়ার্ককে আঁকড়ে ধরেছে সৌদি প্রশাসন।
আরব দুনিয়ায় রিয়াধের ‘পূর্ব-পশ্চিম অপরিশোধিত তেল পাইপলাইন’ আবার পেট্রোলাইন নামে বেশি পরিচিত। প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার লম্বা ওই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আবকাইক তেল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করেছে সৌদি সরকার। বর্তমানে সেখান দিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তরল সোনা রফতানি করছে ওই উপসাগরীয় রাষ্ট্র। শুধু তা-ই নয়, ইয়ানবু থেকে ৬০ লক্ষ ব্যারেল তেল নিয়ে পশ্চিম ভারতীয় বন্দরের পথে রওনা হয়েছে একটি ট্যাঙ্কার।
১৯৭৯ সালে বিপ্লবের পর ইসলামীয় প্রজাতন্ত্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে ইরান। এর ঠিক এক বছরের মাথায় (পড়ুন ১৯৮০ সাল) তেহরান আক্রমণের নির্দেশ দেন প্রতিবেশী ইরাকের কিংবদন্তি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেন। সেই লড়াই ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত চলেছিল। সংঘর্ষের বছরগুলিতে খনিজ তেলের বাণিজ্য চালানো কঠিন হয়ে পড়লে হরমুজ়ের বাইপাস খুঁজে পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে সৌদি প্রশাসন। আর ঠিক তখনই ‘পূর্ব-পশ্চিম অপরিশোধিত তেল পাইপলাইন’ নির্মাণের পরিকল্পনা করে রিয়াধ।
১৯৮১ সালে পেট্রোলাইনের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হয়। ওই বছর থেকেই হরমুজ়ের পাশাপাশি লোহিত সাগর দিয়ে ইউরোপ, আফ্রিকা, ভারতীয় উপমহাদেশ এবং দূর-প্রাচ্যের দেশগুলিতে খনিজ তেল পাঠানো শুরু করে সৌদি সরকার। যদিও বেশির ভাগ তরল সোনা হরমুজ় দিয়েই সরবরাহ করত রিয়াধ। তবে ভাগ্যের ফেরে ৪৫ বছর পর ‘পূর্ব-পশ্চিম অপরিশোধিত তেল পাইপলাইন’ই সংশ্লিষ্ট আরব মুলুকটির রফতানি বাণিজ্যের প্রধান লাইফলাইন হয়ে উঠেছে।
গোড়ার দিকে সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কটির মাধ্যমে ইয়ানবু বন্দরে আসত ১৮ লক্ষ ৫০ হাজার ব্যারেল খনিজ তেল। কারণ, পেট্রোলাইনে ৪৮ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ ব্যবহার করা হয়েছিল। গত শতাব্দীর ৯০-এর দশকে এই ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করে রিয়াধ। সেই লক্ষ্যে ৪৮-এর বদলে সেখানে লাগানো হয় ৫৬ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ। পাশাপাশি, দ্বিতীয় একটি লাইন যুক্ত করে ওই নেটওয়ার্ককে আরও সম্প্রসারিত করে সৌদি প্রশাসন। এর জেরে বৃদ্ধি পেয়েছে পেট্রোলাইনটির ধারণক্ষমতা।
হরমুজ় অবরুদ্ধ হওয়ার আগে পর্যন্ত পূর্ব-পশ্চিম অপরিশোধিত তেল পাইপলাইন দিয়ে দিনে ২৮ লক্ষ ব্যারেল তেল পৌঁছোচ্ছিল লোহিত সাগরের বন্দরে। সৌদি প্রশাসনের দাবি, এর সর্বাধিক ধারণক্ষমতা ৭০ লক্ষ ব্যারেল। ধীরে ধীরে তরল সোনার পরিবহণকে সেই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে রিয়াধ। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন সৌদির রাষ্ট্রায়ত্ত তেলসংস্থা আরামকোর চিফ এগ্জ়িকিউটিভ অফিসার আমিন নাসের।
নাসের বলেছেন, ‘‘যুদ্ধের কারণে হরমুজ় পুরোপুরি অবরুদ্ধ হবে, সেটা কোনও দিনই ভাবা হয়নি। কিন্তু, এখন বাইপাস রাস্তাই ভরসা। নইলে আন্তর্জাতিক বাজারে খনিজ তেলের দামের দৌড় থামানো যাবে না। জ্বালানি সঙ্কটে দুনিয়া জুড়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। সেই কারণে পেট্রোলাইনে তরল সোনার সরবরাহ ইতিমধ্যেই দ্বিগুণ করা হয়েছে। আর কয়েক দিনের মধ্যে একে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে।’’
সৌদির রাষ্ট্রায়ত্ত তেলসংস্থা আরামকো জানিয়েছে, লোহিত সাগর দিয়ে রফতানির জন্য ইয়ানবু বন্দরে দিনে পাঠানো হচ্ছে প্রায় ৫০ লক্ষ ব্যারেল কাঁচা তেল। এ ছাড়া পশ্চিম উপকূলের শোধনাগারগুলি ওই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দিনে ২০ লক্ষ ব্যারেল তেল পাচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় ইয়ানবুতে হঠাৎ করেই তিন গুণ বেড়েছে তেল ট্যাঙ্কারের ভিড়। সেখান দিয়ে ‘আরব এক্সট্রা’ এবং ‘আরব এক্সট্রা লাইট’ শ্রেণির অপরিশোধিত তরল সোনা সরবরাহ করছে রিয়াধ।
স্বাভাবিক অবস্থায় সৌদি প্রশাসন দিনে প্রায় ৭০ লক্ষ ব্যারেল কাঁচা তেল রফতানি করছিল। হরমুজ় অবরুদ্ধ হওয়ার পর এক ধাক্কায় সেটা ৩০-এ নেমে আসে। তার পরই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় লোহিত সাগরের বাইপাস রুটের বাণিজ্যে জোর দেয় রিয়াধ। এর মাধ্যমে তরল সোনার ৭০ শতাংশ সরবরাহ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে তারা, যেটা ভারতের মতো জ্বালানিনির্ভর দেশের জন্য অত্যন্ত ভাল খবর।
তবে বাইপাস রুটে তেল রফতানি চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে রয়েছে বেশ কয়েকটা কাঁটা। হরমুজ়ের মতোই সেখানে আছে বাব এল মান্দেব নামের একটি প্রণালী। সংশ্লিষ্ট সামুদ্রিক রাস্তাটি লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরকে সংযুক্ত করেছে। প্রণালীটিকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে ইয়েমেন। যেখানকার প্যালেস্টাইনপন্থী হুথি বিদ্রোহীদের দীর্ঘ দিন ধরেই পর্দার আড়াল থেকে মদত দিয়ে যাচ্ছে তেহরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, অতীতে বহু বার বাব এল মান্দেব আটকানোর চেষ্টা করেছে হুথি বিদ্রোহীরা। লোহিত সাগর থেকে পণ্যবাহী জাহাজ অপহরণের ভূরি ভূরি অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশের অনুমান, আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের উপর চাপ বজায় রাখতে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তাদের সক্রিয় করবে ইরান। তখন ওই রাস্তায় অপরিশোধিত খনিজ তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের পরিবহণ যে কঠিন হবে, তা বলাই বাহুল্য।
দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের শুরু থেকেই সৌদি আরব, আমিরশাহি, কাতার, কুয়েত, বাহারিন এবং ওমানের মতো আরব মুলুকগুলির অপরিশোধিত তেলের শোধনাগার এবং গ্যাসঘাঁটিকে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনে নিশানা করছে ইরান। সাবেক সেনাকর্তারা মনে করেন, আইআরজিসির পক্ষে রিয়াধের ওই পেট্রোলাইন উড়িয়ে দেওয়া একেবারেই কঠিন নয়। তা ছাড়া ইয়ানবুতেও আগুন ঝরাতে পারে তেহরানের দূরপাল্লার একাধিক হাতিয়ার।
এই পরিস্থিতিতে খবরের শিরোনামে চলে এসেছে আরও একটি বাইপাসের প্রসঙ্গ। সেটা হল, আবু ধাবি অপরিশোধিত তেল পাইপলাইন বা অ্যাডকপ (আবু ধাবি ক্রুড অয়েল পাইপলাইন)। আরব দুনিয়ায় এটি হাবশান-ফুজ়াইরাহ পাইপলাইন নামে বেশি পরিচিত, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪৮ মাইল। এর মাধ্যমে হাবশানের তেল শোধনাগার থেকে ওমান উপসাগরের ফুজ়াইরাহ বন্দর পর্যন্ত খনিজ তেল পরিবহণ করে থাকে আমিরশাহি প্রশাসন।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ফুজ়াইরাহ বন্দরটি হরমুজ় প্রণালীর বাইরে হওয়ায় ওই রাস্তা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সরবরাহ বজায় রেখেছে আবু ধাবি। আবু ধাবি জানিয়েছে, অ্যাডকপের মোট ধারণক্ষমতা ১৮ লক্ষ ব্যারেল। তবে বর্তমানে এটি ১৫ লক্ষ ব্যারেল তরল সোনা সরবরাহ করছে বলে জানা গিয়েছে। আমিরশাহি একে সর্বোচ্চ পর্যায় নিয়ে যাবে কি না, তা অবশ্য স্পষ্ট নয়।
খনিজ তেলের থেকেও ভারতের জন্য বেশি চ্যালেঞ্জ তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের আমদানি। এত দিন তার সিংহভাগ নয়াদিল্লিকে সরবরাহ করছিল কাতার। হরমুজ় বন্ধ থাকায় তা একরকম বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তবে সেখানেও রয়েছে একটি বিকল্প রুট, যার নাম ডলফিন গ্যাস পাইপলাইন। সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কটি কাতার থেকে শুরু হয়ে আমিরশাহি ঘুরে ওমানে গিয়েছে।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে হরমুজ় দিয়ে দিনে প্রায় দু’কোটি ব্যারেল খনিজ তেলের পরিবহণ চলত। জ্বালানি বিশ্লেষকেরা মনে করেন, পেট্রোলাইন এবং অ্যাডকপ পাইপলাইনের সেই সরবরাহ বজায় রাখার সক্ষমতা রয়েছে। তবে আইআরজিসির ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সেই হিসাব বদলাতে পারে। আর তাই সংশ্লিষ্ট পাইপলাইনগুলির নিরাপত্তা বাড়িয়েছে সৌদি, আমিরশাহি ও কাতার প্রশাসন।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের জেরে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ইতিমধ্যেই ব্যারেলপ্রতি ১০৪ টাকা ছাপিয়ে গিয়েছে। চলতি বছরের মার্চে খনিজ তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। এই অবস্থায় ভারত ও বিশ্বের অধিকাংশ দেশেরই ভরসা হরমুজ়ের বাইপাস। ইরান বা হুথি বিদ্রোহীরা সেই রাস্তাও বন্ধ করলে সরাসরি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়বে নয়াদিল্লি? সংঘাতের আবহে বাড়ছে সেই জল্পনাও।
সব ছবি: সংগৃহীত।