পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের চারপাশে পরিচালিত একটি সমীক্ষায় প্রমাণ মিলল মাটির নীচে চাপা পড়া প্রত্নতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষের। খোঁজ পাওয়া গিয়েছে সুড়ঙ্গের মতো দেখতে একটি কাঠামোরও।
খবর, ওই সমীক্ষায় বেশ কিছু প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভের উপস্থিতির ইঙ্গিতও পাওয়া গিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করছেন, ওই স্মৃতিস্তম্ভ দ্বাদশ শতাব্দীতে তৈরি জগন্নাথ মন্দির তৈরির পূর্ববর্তী বা সমসাময়িক হতে পারে।
২০২২ সালে আইআইটি গান্ধীনগর পরিচালিত গ্রাউন্ড পেনিট্রেটিং রেডার (জিপিআর) সমীক্ষার একটি খসড়া প্রতিবেদনে ওই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মন্দিরের চারপাশের এলাকায় সুড়ঙ্গ-সহ কাঠামোগত ধ্বংসাবশেষের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে।
ভূগর্ভস্থ ওই কাঠামোর উপাদান শনাক্ত করার জন্য সমীক্ষকেরা ৫ মিটার গভীরতা পর্যন্ত অনুসন্ধান চালিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ‘জগন্নাথ হেরিটেজ করিডর’ প্রকল্পের অংশ হিসাবে ‘ওড়িশা ব্রিজ কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন (ওবিসিসি)’ ওই সমীক্ষা পরিচালনা করে। দায়িত্ব দেওয়া হয় আইআইটি গান্ধীনগরকে।
২০২২ সালের এপ্রিলে হেরিটেজ করিডর প্রকল্পের কাজ চলার সময় এমার মঠের কাঠামোর কাছে কাজ চলছিল। কাজ চলাকালীন ওই জায়গা থেকে একটি সিংহের ভাঙা ভাস্কর্য খুঁজে পায় ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (এএসআই)। মনে করা হয়েছিল, ওই সিংহের কাঠামো গঙ্গা রাজবংশের।
তার পরেই সমীক্ষা শুরু হয়। সেই সমীক্ষাতেই ওই কাঠামোর খোঁজ মিলেছে। সমীক্ষা সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “জগন্নাথ মন্দিরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে একটি বিশাল কাঠামোর বিন্যাস কোনও ধরনের সুড়ঙ্গ বা জলপথের পরিকাঠামোর ইঙ্গিত দেয়। কারণ এটি মন্দির এবং সমুদ্রসৈকত থেকে শুরু হয়ে সেখানেই শেষ হয়েছে।”
মন্দিরের দক্ষিণ-পূর্ব বা অগ্নি কোণের এলাকাটি এমার মঠের একাংশ, নরসিংহ মন্দির, বুধি মা মন্দির এবং জগন্নাথ মন্দির সংলগ্ন সড়ক নিয়ে তৈরি।
আইআইটি গান্ধীনগরের সমীক্ষায় এ-ও বলা হয়েছে, “ওই এলাকায় যে বিশাল কাঠামোর ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে তা সর্বোচ্চ ৬ মিটার চওড়া এবং প্রায় ৯০ মিটার দীর্ঘ।’’
প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ওই কাঠামো একটি ভূগর্ভস্থ পথ বলে মনে হচ্ছে, যা হয় একটি প্রাচীন জল নিষ্কাশন ব্যবস্থা অথবা একটি সুড়ঙ্গের মতো কাঠামো। মন্দিরচত্বরের সঙ্গে এর কোনও সংযোগ আছে কি না তা খুঁজে বার করার জন্য আরও গবেষণার প্রয়োজন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্প্রতি এক তথ্য অধিকার কর্মীর হাতে আসা ওই তথ্যগুলি দ্বাদশ শতাব্দীর মন্দির চত্বরের বাইরের দেওয়ালের ৭৫ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে মাটির নীচে চাপা পড়া স্থাপত্য কাঠামোর উপস্থিতির দিকে ইঙ্গিত দেয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্নতত্ত্ববিদ সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, প্রাচীনকালে এই ধরনের সুড়ঙ্গগুলো হয় গোপন পথ অথবা জল নিষ্কাশনের নালা হিসাবে ব্যবহৃত হত। ওই প্রত্নতত্ত্ববিদের কথায়, “মন্দিরের আশপাশের এলাকায় আরও সুড়ঙ্গ রয়েছে, করিডরের কাজের সময় সেগুলির অবশেষ দেখা গিয়েছে।”
অন্য দিকে সমীক্ষা সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই ধরনের ভূগর্ভস্থ ধ্বংসাবশেষ শুধুমাত্র মন্দিরের নিকটবর্তী এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সমগ্র পুরী জুড়ে বিস্তৃত।
এর আগে জগন্নাথ মন্দির পরিক্রমা প্রকল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি খননকার্যে অন্য একটি ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছিল। এমনকি, শ্রীক্ষেত্রের মাটির নীচে একটি ঐতিহাসিক বসতির সম্ভাব্য অস্তিত্বের ইঙ্গিতও নাকি পাওয়া গিয়েছে।
জানা গিয়েছে, এমার মঠ, নৃসিংহ মন্দির, বুধি মা মন্দির এবং সংলগ্ন রাস্তার অংশ-সহ বিভিন্ন স্থানে মোট ৪৩টি ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য শনাক্ত করা হয়েছে, যা ২১.৬ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এ ছাড়াও বিভিন্ন সময় খননকাজ চলার সময় ওই এলাকা থেকে মাটি এবং ধাতব বাসনপত্রের মতো প্রত্নবস্তু-সহ দৈনন্দিন ব্যবহারের অন্যান্য সামগ্রীও উদ্ধার করা হয়েছে।
সব ছবি: সংগৃহীত।