প্রচলিত মত অনুযায়ী, বার্লিন প্রাচীরের পতন এবং প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সঙ্গে সঙ্গে সাম্যবাদ (কমিউনিজ়ম) বিলুপ্তির পথে চলে যায়। বর্তমানে ভারতেও লাল পতাকার প্রতাপ সে ভাবে দেখা যায় না বললেই চলে। কিন্তু দেশেরই এক প্রত্যন্ত গ্রামকে ছুঁতে পারেনি অন্য কোনও রাজনৈতিক পতাকার রং।
কার্ল মার্কস থেকে ভ্লাদিমির লেনিন, তামিলনাড়ুর এই গ্রামে এখনও সকলেই ‘জীবিত’। আট থেকে আশি, গ্রামের সকলেই সাম্যবাদের বুলি আওড়ান। শরীরের লাল রক্তের মতো, এই গ্রামের লোকজনের মনেও বইছে সাম্যবাদী মতবাদের লাল আভা।
কথা হচ্ছে তামিলনাড়ুর বন্নিবেলমপট্টী গ্রাম নিয়ে। দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই গ্রামের মানুষজন সাম্যবাদকে নিজেদের প্রতি দিনের জীবনের অংশ বানিয়ে এগিয়ে চলেছেন। সাম্যের গান গাওয়াই এঁদের জীবনের মূল আদর্শ।
দেশে সাম্যবাদের প্রদীপের সলতে যখন নিবু নিবু, সেই সময় দাঁড়িয়েও তামিলনাড়ুর বন্নিবেলমপট্টীর মানুষেরা বাড়ির দেওয়াল থেকে ছাদ, সমস্ত কিছু লাল পতাকায় মুড়িয়ে রাখছেন। সে গ্রামে আজ পর্যন্ত অন্য কোনও রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শ দাঁত ফোটাতে পারেনি বললেই চলে।
তামিলনাড়ুর সেই গ্রামে সাম্যবাদের মন্ত্র ছড়াল কে? ফিরে যেতে হয় উনিশ শতকের মাঝামাঝি। তার আগে পর্যন্ত এই গ্রামের মানুষেরা জমিদারের অধীনে জীবন কাটাতেন। তাঁদের জমিতে চাষাবাদ করে দিন চলত গ্রামের মানুষদের।
একসময় বন্নিবেলমপট্টীর বাসিন্দাদের গণতন্ত্র সম্বন্ধে কোনও ধারণাই ছিল না। মতামত পোষণ করার ক্ষমতা যে সব শ্রেণির মানুষেরই রয়েছে, সেটা তাঁরা ভাবতেই পারতেন না।
ভেম্বুলু নামের এক ব্যক্তি ১৯৫২ সালে বন্নিবেলমপট্টী ছেড়ে কাজের উদ্দেশ্যে তন্জাবুরের পথে পাড়ি দেন। সেখানে গিয়ে সাম্যবাদের সঙ্গে পরিচয় ঘটে ভেম্বুলুর। তাঁর হাত ধরেই বন্নিবেলমপট্টীর মাটিতে সাম্যবাদের প্রবেশ ঘটে।
তিন বছর পর ভেম্বুলু নিজের গ্রাম বন্নিবেলমপট্টীতে ফিরে আসেন। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে সিপিআই দ্বারা আয়োজিত মাদুরাইয়ের সপ্তুরে সংঘটিত ‘অল ইন্ডিয়া এগ্রিকালচারাল কনফারেন্সে’ অংশ নেন। তাঁদের ভাবধারায় পরিবর্তন দেখা যায়। তাঁরা বোঝেন যে জমিদারের শাসন মুখ বুজে সহ্য করার দিন শেষ। তাঁদের এ বার নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে হবে।
গ্রামের বাসিন্দাদের মতে, সেই সময় জমিদারের সঙ্গে তাঁদের অধিকারের লড়াইয়ে সাম্যবাদীরা (কমিউনিস্ট) তাঁদের পাশে দাঁড়ান। ঝামেলা করে নয়, শান্তির সঙ্গে প্রতিবাদ করে এবং আইনি পথে কী ভাবে নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে হয় তার শিক্ষা সাম্যবাদীরা তাঁদের দেন।
১৯৬০ সাল থেকে বন্নিবেলমপট্টীর গ্রামবাসীরা ছেলে-মেয়ের নামও বিখ্যাত সাম্যবাদীদের নামে রাখতে থাকেন, যে ধারা এখনও জীবিত রয়েছে। কার্ল মার্কস এবং লেনিনের নামের সঙ্গে মিল রেখে সেই গ্রামের মেয়েদের নাম রাখা হয় মার্ক্সিনা এবং লেনিনা। স্তালিন এবং চে গেভারাও সেই নামের তালিকা থেকে বাদ যায়নি।
সেই গ্রামের প্রায় সকলের জীবিকাই কৃষিকাজনির্ভর। কিছু মানুষ ছোটখাটো শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু তাঁদের আর অপরের অধীনে থেকে কাজ করতে হয় না। এখন তাঁরা নিজের মতো করে, নিজেদের জমিতে কাজ করেন। বৈভবে জীবন কাটাতে না পারলেও, তাঁদের জীবন শান্তি রয়েছে। প্রতিবেশীর সঙ্গে রয়েছে সম্প্রীতির বন্ধন। এতেই তাঁরা খুশি, তেমনটাই জানিয়েছেন বন্নিবেলমপট্টীর গ্রামবাসীরা।
সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বন্নিবেলমপট্টীর এক বাসিন্দা ভি মুরুগান, ওরফে স্তালিন জানিয়েছেন, তিনি ছোট বয়স থেকে সাম্যবাদী। অন্য কোনও মতাদর্শে বিশ্বাস করার কথা কখনও তাঁর ভাবনাতেই আসেনি।
সেই গ্রামের বাচ্চাদের ছোট থেকেই সাম্যবাদী সাহিত্য পড়ায় উৎসাহ দেন গ্রামের বড়রা। বর্তমানে এটি তাঁদের সংস্কৃতির অংশ। তাঁরা চান গ্রামের বাচ্চারা ছোট বয়স থেকেই সামাজিক সমস্যা সম্বন্ধে সচেতন থাকুক। সাম্যবাদের রাজনীতি যেন তাদের মনেও কম বয়সে জায়গা করে নেয়, এটাই অভিভাবকদের কামনা।
বন্নিবেলমপট্টীর বড়রা চান সেই গ্রামের প্রত্যেক শিশু জানুক যে তাঁদের পূর্বপুরুষেরা কেমন দিন কাটিয়ে এসেছেন। তাঁদের লড়াইয়ে সাম্যবাদের অবদান ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী কালে সে সকল শিশু যখন বড় হবে, তখন তারাও যেন গ্রামের সাম্যবাদের এই ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, সেটাই লক্ষ্য।
তামিলনাড়ুতে বর্তমানে তলপতি বিজয়ের টিভিকে সরকার সরকার গড়লেও বন্নিবেলমপট্টীর জনগণ এখনও সাম্যবাদ আঁকড়ে বসে রয়েছেন। সেই গ্রামের পঞ্চায়েত এখনও লাল রঙে ঢাকা। ভবিষ্যতে তাঁদের এই ঐতিহ্য উত্তরপুরুষেরাও বজায় রাখতে পারেন কি না তা সময়ই বলতে পারবে।
সব ছবি: সংগৃহীত এবং এআই সহায়তায় প্রণীত।