বিংশ শতকের মাঝামাঝি জাপানের কিটাকিউশু ছিল ভারী শিল্পের, বিশেষ করে ইস্পাত ও রাসায়নিক শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। অতিরিক্ত কলকারখানার ধোঁয়ায় বছরভর এখানকার আকাশ ঢেকে থাকত কালো ধোঁয়ায়। কলকারখানার বর্জ্য জলে কিটাকিউশুর ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ডোকাই উপসাগরের জলও হয়ে ওঠে বিষবৎ। মাছ তো দূরের কথা, ব্যাক্টেরিয়াও বাঁচতে পারত না সেই দূষিত জলে।
৬০-এর দশকে ধীরে ধীরে জনসাধারণের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে রাসায়নিক দূষণ। প্রশাসনের দৃষ্টি ফেরানোর জন্য আওয়াজ তুলতে শুরু করেন এলাকার বাসিন্দারা। বিশেষ করে স্থানীয় মহিলারা। কারণ তাঁদের সন্তানদের মাথার উপর নেমে আসছিল বিপদের খাঁড়া।
জাপানি মহিলারা দলবদ্ধ হয়ে কলকারখানা এবং প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেন। দূষণ সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করেন। জনমতের চাপে পড়ে কারখানাগুলি দূষণ কমাতে বাধ্য হয়। সেই থেকেই ইকো টাউন বা পরিবেশবান্ধব শহরের তকমা জোটে কিটাকিউশুর।
শহরটির সঙ্গে পরমাণু বোমা হামলার ইতিহাসের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৪৫ সালের ৯ অগস্ট নাগাসাকিতে ‘ফ্যাট ম্যান’ নামের যে পরমাণু বোমাটি ফেলা হয়েছিল, তার প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল কিটাকিউশু শহরের কোকুরা এলাকা। কারণ কোকুরা তখন জাপানের অন্যতম বড় সামরিক অস্ত্র কারখানার ঘাঁটি। বোমাবহনকারী মার্কিন বি-২৯ বিমানটি যখন কিটাকিউশুর আকাশে পৌঁছোয়, তখন সেখানে ঘন মেঘ এবং ধোঁয়া ছিল। দৃশ্যমানতা কম থাকায় নাগাসাকিতে বোমাটি ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রতিকূল আবহাওয়াই শহরটিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিল।
ভারতেই গড়ে উঠতে চলেছে একটি জাপানি শহরের প্রতিরূপ। ভারতের দক্ষিণের রাজ্য তেলঙ্গানাতে গড়ে উঠতে চলেছে কিটাকিউশুর আদলে পরিবেশবান্ধব শিল্পনগরী। লক্ষ্য সবুজায়ন। সে কারণে জাপানি শহরের মডেল অনুসরণ করে নগরায়ন হবে এ দেশের মাটিতেই।
হনশু এবং কিউশু দ্বীপের সংযোগস্থলে অবস্থিত পাঁচটি ছোট শহর নিয়ে গঠিত এই ইকো টাউন বা পরিবেশবান্ধব শিল্পনগরীটির পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ব জুড়ে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাহিদা মেটাতে জাপানের কিটাকিউশু শহর থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছে বিশ্বের বহু দেশ। বাদ যায়নি ভারতও।
ভারতেই গড়ে উঠতে চলেছে একটি জাপানি শহরের প্রতিরূপ। ভারতের দক্ষিণের রাজ্য তেলঙ্গানাতে গড়ে উঠতে চলেছে কিটাকিউশুর আদলে পরিবেশবান্ধব শিল্পনগরী। লক্ষ্য সবুজায়ন। সে কারণে জাপানি শহরের মডেল অনুসরণ করে নগরায়ন হবে এ দেশের মাটিতেই।
হায়দরাবাদের কাছে বিশাল জমির ওপর গড়ে উঠবে একটি অত্যাধুনিক ‘ইকো-টাউন’। সেই প্রকল্পে হাত দিয়েছে তেলঙ্গানা সরকার। এই প্রকল্পে সহায়তার জন্য তেলঙ্গানা ও কিটাকিউশুর মধ্যে একটি পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তি বা মউ স্বাক্ষরিত হয়েছে ২০২৫ সালেই।
সরকারি একটি বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতে শহরটি পুনর্নির্মাণে সহায়তা করার জন্য ভারতের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে সহযোগিতা করবে জাপান সরকার। পূর্বপ্রস্তাবিত প্রকল্পে এটি প্রায় ৮০ একর জুড়ে গড়ে তোলার কথা ছিল। সাম্প্রতিক খবর অনুযায়ী, রাঙ্গা রেড্ডি জেলার বান্দা রাভিরিয়ালায় শহরটি প্রায় ৫০০ একর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
কিটাকিউশু মূলত ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা চক্রাকার অর্থনীতির মডেলে অনুসরণ করে পরিচালিত হয়। এখানে বিশাল একটি এলাকা জুড়ে বিভিন্ন পুর্ননবীকরণ কেন্দ্র বা রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট রয়েছে। যেখানে পুরনো টেলিভিশন, ফ্রিজ, গাড়ি এবং প্লাস্টিক পুনর্নবীকরণ করে নতুন কাঁচমাল তৈরি করা হয়।
বর্জ্য থেকে শক্তি আহরণের জন্য শহরের বর্জ্য পুড়িয়ে সেই তাপ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। প্রথমে শহরের সব বাড়ি এবং কলকারখানা থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। কিটাকিউশুতে বর্জ্যকে অত্যন্ত সর্তকতার সঙ্গে আলাদা করা হয় (দাহ্য, অদাহ্য, প্লাস্টিক ইত্যাদি)। শুধুমাত্র দাহ্য বর্জ্যগুলো এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে পাঠানো হয়।
একটি বিশাল ফার্নেস বা চুল্লিতে এই বর্জ্যগুলো উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ানো হয়। বর্জ্য পোড়ানোর ফলে নির্গত ধোঁয়া সরাসরি বাতাসে ছাড়া হয় না। বর্জ্য পোড়ানোর ফলে যে প্রচণ্ড তাপ উৎপন্ন হয়, তা দিয়ে চুল্লির চারপাশে থাকা পাইপের জলকে উত্তপ্ত করা হয়। এই জল তাপে ফুটে বাষ্প তৈরি হয়।
উচ্চ চাপের বাষ্পের সাহায্যে বিশাল টারবাইনকে ঘোরানো হয়। টারবাইনটি একটি জেনারেটরের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এ থেকে যান্ত্রিক শক্তিকে বিদ্যুৎশক্তিতে রূপান্তরিত করা হয়। এই বিদ্যুৎ পরে শহরের গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। জাপানে জায়গার খুব অভাব। বর্জ্য পুড়িয়ে ফেললে এর আয়তন প্রায় ৯০ শতাংশ কমে যায়। ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করার জন্য খুব অল্প জায়গার প্রয়োজন হয়।
এটি কয়লা বা তেলের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমায়। পোড়ানোর পর যে ছাই অবশিষ্ট থাকে, কিটাকিউশুতে তা সিমেন্ট তৈরি বা রাস্তা নির্মাণের উপকরণ হিসাবে ব্যবহার করা হয়। ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা হয় ‘জিরো ইমিশন’ বা শূন্য নির্গমন।
কিটাকিউশু সমুদ্রের তীরে অবস্থিত হওয়ায় এখানে বাতাসের গতিবেগ অনেক বেশি। সমুদ্রের অগভীর অংশে বিশাল বিশাল উইন্ড টারবাইন বসানো হয়েছে। একে বলা হয় ‘অফশোর উইন্ড ফার্ম’। ভূখণ্ডের তুলনায় সমুদ্রের ওপর বাতাস বেশি স্থিতিশীল এবং শক্তিশালী হওয়ায় তা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আদর্শ। সমুদ্রের তীরে বিশাল উইন্ড মিলের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ তৈরি করা হয়।
পুরো শহরটি সৌরবিদ্যুৎ এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য শক্তিতে চলে। এ ছাড়া সেখানে সমস্ত বৈদ্যুতিক যানবাহনেরজন্য রয়েছে চার্জিং স্টেশন এবং পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থা। আবাসিক এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ এবং হাইড্রোজ়েন শক্তির স্মার্ট ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। ভারতে যে শহরটি গড়ে ওঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে সেটির পরিকাঠামোর ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে বলে খবর।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডি এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ডি শ্রীধর বাবুর লক্ষ্য এই প্রকল্পের মাধ্যমে তেলঙ্গানাকে ‘নেট জ়িরো’ লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ দূষণের মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনা। সে রাজ্যের কংগ্রেস সরকারের দাবি, বিগত কয়েক মাস ধরে সরকারের নিরন্তর প্রচেষ্টার ফলে প্রায় ৩ লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ এসেছে। তেলঙ্গানায় জাপান আরও বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী।
সরকারি সূত্রে খবর, জাপানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে হায়দরাবাদ ও কিটাকিউশুর মধ্যে সরাসরি বিমান পরিষেবা চালুর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হবে। তবে শহরের প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হতে ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে অনুমান সরকারি কর্তাদের।
ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।