মহাকাশের অসীম রহস্য খুঁজে বার করতে চেয়েছিলেন কেউ, কেউ আবার ছিলেন গোপন পারমাণবিক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। প্রকাশ্যে এসেছে এমনই কয়েক জন বিজ্ঞানীর রহস্যমৃত্যুর খবর। অনেকে আবার স্রেফ উধাও হয়ে গিয়েছেন। এঁদের অনেকেই ইউএফও এবং পারমাণবিক শক্তি নিয়ে গবেষণা করছিলেন।
বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে ২০২৩ সাল থেকে অন্তত ১০ জন বিজ্ঞানী ও গবেষকের মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছে। এত জন বিজ্ঞানীর রহস্যমৃত্যু ও উধাও হওয়ার ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে মার্কিন প্রশাসন। এমনকি এই ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বৃহস্পতিবার পোটাস (প্রেসিডেন্ট অফ ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা) ঘোষণা করেছেন যে, গত তিন বছরে রহস্যজনক ভাবে মারা যাওয়া বা নিখোঁজ হওয়া ১০ জন বিজ্ঞানীকে নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন উঠছে। এই সম্পর্কিত সমস্ত প্রশ্নের জবাব মার্কিন প্রশাসন আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই দিয়ে দেবে বলেও জানিয়েছেন ট্রাম্প। লাস ভেগাসের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে সাউথ লনে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “আমি আশা করি এটা আকস্মিক। কিন্তু আমরা আগামী দেড় সপ্তাহের মধ্যেই সবটা জানতে পারব।”
এই ঘটনার পিছনে কোনও ষড়যন্ত্রের আভাস বা বিদেশি শক্তির হাত রয়েছে কি না তা জানতে চাওয়ায় স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ট্রাম্প টেনে এনেছেন তাঁর পূর্বসূরির প্রসঙ্গ। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে কটাক্ষ করে ট্রাম্প বলেন, “বাইডেনের সময় তো উন্মুক্ত সীমান্ত ছিল, তাই এখানে আসা খুব একটা কঠিন ছিল না।”
ট্রাম্প-বিরোধীদের দীর্ঘ দিন ধরে অভিযোগ ছিল যে, বেশ কিছু হাই-প্রোফাইল বিজ্ঞানী, যাঁরা আধুনিক প্রযুক্তি বা মহাকাশ গবেষণায় যুক্ত ছিলেন, তাঁরা হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর সরকার কোনও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি। এই ঘটনা নিয়ে সম্প্রতি শোরগোল হওয়ায় রহস্যজনক মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার ধারাবাহিক ঘটনা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এই প্রথম বার মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছে।
১৫ এপ্রিল একটি সাংবাদিক সম্মেলনে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিটকে এই সংক্রান্ত প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন যে, ক্রমবর্ধমান এই রহস্যজনক ঘটনাগুলি নিয়ে অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেননি তিনি। ১০টি নিখোঁজ বা মৃত্যুর ঘটনা পরস্পর সম্পর্কিত কি না, সে বিষয়ে অবশ্য লিভিট কোনও সুনির্দিষ্ট উত্তর দেননি। তবে হোয়াইট হাউস এই উদ্বেগজনক ঘটনাগুলি খতিয়ে দেখবে বলে আশ্বাস দেন তিনি। ঠিক তার পর দিনই ট্রাম্পের গলায় একই সুর শোনা যায়।
এই ঘটনায় সবচেয়ে আলোচিত তত্ত্বটি হল, অনেক বিজ্ঞানীকে উচ্চ গোপনীয় গবেষণাগারে (যেমন এরিয়া ৫১) কাজ করার জন্য নেওয়া হয়েছিল, যাঁদের বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। নিখোঁজ বিজ্ঞানীদের নথিপত্রে ভিন্গ্রহের প্রযুক্তি বা ইউএফও সংক্রান্ত গবেষণার যোগসূত্র থাকতে পারে বলে দাবি তুলেছেন ষড়যন্ত্রতত্ত্ববাদীরা।
যদিও আনুষ্ঠানিক ভাবে নির্দিষ্ট নামও গোপন রাখা হয়েছে, তবে জল্পনা রয়েছে যে এর মধ্যে গত কয়েক বছরে আমেরিকা থেকে নিখোঁজ হওয়া পরমাণুবিজ্ঞানী, কৃত্রিম মেধা বিশেষজ্ঞ এবং জৈব প্রযুক্তিবিদদের নাম থাকতে পারে। একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে নিখোঁজ হওয়া গবেষকদের সম্পর্কে বিশদ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, নিখোঁজ হওয়া ও রহস্যজনক ভাবে মৃত ব্যক্তিরা লস অ্যালামোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি, নাসা জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরি এবং এমআইটি প্লাজ়মা সায়েন্স অ্যান্ড ফিউশন সেন্টারের মতো একাধিক গবেষণাকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
২০২৩ সালে নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির গবেষক বিজ্ঞানী মাইকেল ডেভিড হিক্সের মৃত্যু এই জল্পনাকেও উস্কে দিয়েছে যে আমেরিকার বিজ্ঞানীদের ইচ্ছাকৃত ভাবে নিশানা করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ৩০ জুলাই ৫৯ বছর বয়সে মারা যান নাসার ওই বিজ্ঞানী। প্রয়াত হিক্সের মৃত্যুর কোনও সুস্পষ্ট কারণ জানা যায়নি। তিনি ৮০টিরও বেশি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন এবং ডার্ট প্রকল্প, ডিপ স্পেস ১ মিশনে কাজ করেছিলেন।
হিক্স প্রধানত গ্রহাণু সংক্রান্ত অভিযানে কাজ করতেন, যার মধ্যে ডার্ট নামের প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত ছিল। ডার্ট একটি মহাকাশ অভিযান। পৃথিবীর নিকটবর্তী গ্রহাণুগুলির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরীক্ষা করাই এই গবেষণার মূল উদ্দেশ্যে। ধূমকেতু ও গ্রহাণুর ভৌত বৈশিষ্ট্যের বিষয়ে হিক্সের বিশেষত্ব ছিল। বিপজ্জনক গ্রহাণুগুলিকে পৃথিবী থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া যায় কি না তা দেখাই ছিল তাঁর গবেষণার বিষয়।
নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরি বা জেপিএলের মেটেরিয়ালস প্রসেসিং গ্রুপের প্রাক্তন পরিচালক মনিকা রেজা ২০২৫ সালের জুন মাসে হাইকিং করতে গিয়ে নিখোঁজ হন। এখনও তাঁর সন্ধান পাওয়া যায়নি। অবসরপ্রাপ্ত বিমানবাহিনীর জেনারেল উইলিয়াম নিল ম্যাকক্যাসল্যান্ডও ফেব্রুয়ারি মাসে নিখোঁজ হন। তিনি নিউ মেক্সিকোর বাড়ি থেকে চশমা বা ফোন ছাড়াই বেরিয়ে যান।
জেনারেলের অন্তর্ধানকে ঘিরে অদ্ভুত পরিস্থিতিটি ২০২৫ সালের মে থেকে অগস্ট মাসের মধ্যে ঘটা আরও চারটি নিখোঁজ ব্যক্তির ঘটনার সঙ্গে প্রায় হুবহু মিলে গিয়েছিল। উদ্বেগের বিষয় হল, এই চার জনেরই ম্যাকক্যাসল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। রাইট-প্যাটারসন বিমানঘাঁটিতে অবস্থিত মার্কিন বিমানবাহিনীর গবেষণাগারের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত এই বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা। ১৯৪৭ সালের রসওয়েল ইউএফও দুর্ঘটনার পর থেকেই এই গবেষণাগারটি ভিন্গ্রহের প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
আর এক পদার্থবিদ কার্ল গ্রিলমায়ারকে ফেব্রুয়ারিতে তাঁর বাড়ির বারান্দায় হত্যা করা হয়েছিল। জেপিএল-এর আরও এক বিজ্ঞানী ফ্র্যাঙ্ক মাইওয়াল্ড ২০২৪ সালের জুলাই মাসে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর কারণের কোনও ব্যাখ্যা আজও অপ্রকাশিত। এই মাইওয়াল্ড ছিলেন হিক্সের দীর্ঘ দিনের সহকর্মী।
২০২৫ সালে লস আলামোস ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির দু’জন পারমাণবিক কর্মী রহস্যজনক পরিস্থিতিতে তাঁদের বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে যান। গবেষেণাগারের দীর্ঘ দিনের কর্মী অ্যান্টনি চাভেজ এবং প্রশাসনিক সহকারী মেলিসা ক্যাসিয়াসকে শেষ বার তাঁদের মানিব্যাগ বা ফোনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ছাড়াই বাড়ি থেকে বার হতে দেখা গিয়েছিল। তার পর থেকে যেন কর্পূরের মতো উবে গিয়েছেন এই দু’জন।
বোস্টনের ফিউশন এনার্জির গবেষক নুনো লুইরেরো ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নিজের বাড়িতে নিহত হন। হত্যাকারী ছিলেন তাঁরই প্রাক্তন সহপাঠী, পর্তুগালের নাগরিক ক্লডিয়ো নেভেস ভ্যালেন্তে। সবশেষে ক্যানসার গবেষক জেসন থমাস। কয়েক মাস আগে নিখোঁজ হওয়ার পর গত মাসে (মার্চ, ২০২৬) ম্যাসাচুসেটসের একটি হ্রদ থেকে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।
মার্কিন গোয়েন্দাসংস্থা এফবিআই-এর প্রাক্তন সহকারী পরিচালক ক্রিস সোয়েকার ‘ডেলি মেল’কে একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে এই ধরনের মামলাগুলিকে সন্দেহের আতশকাচের নীচে ফেলে তদন্ত করা উচিত। সোয়েকারের বদ্ধমূল ধারণা, বিদেশি গোয়েন্দাসংস্থাগুলি কয়েক দশক ধরে মার্কিন প্রযুক্তির উপর কড়া নজর রেখে আসছে। এই তদন্ত সুষ্ঠু ভাবে পরিচালিত হলে বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের অন্তর্ধান বা রহস্যজনক পরিস্থিতির জন্য কারা দায়ী, তা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে।
সোয়েকার তাঁর সন্দেহের তালিকায় চিন, রাশিয়া, ইরান, এমনকি আমেরিকার তথাকথিত ‘বন্ধু’ রাষ্ট্র বলে পরিচিত পাকিস্তান, দক্ষিণ কোরিয়াকেও (রিপাবলিক অফ কোরিয়া) রেখেছেন। প্রাক্তন এই গোয়েন্দার দাবি, এই দেশগুলি মার্কিন প্রযুক্তি হাতানোর মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, এই বিজ্ঞানীদের কাজের মধ্যে একটি সাধারণ যোগসূত্র ছিল। তাঁরা মূলত ইউএফও বা ভিন্গ্রহের যান, নিউক্লিয়ার ফিউশন এবং অ্যাডভান্সড অ্যারোস্পেস টেকনোলজি নিয়ে কাজ করছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একাংশ মনে করছেন, এটি কাকতালীয় ঘটনা নয়। বরং একটি নির্দিষ্ট গুপ্ত অভিযান বা ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে। বেশ কয়েক জন আইনপ্রণেতা এই ঘটনায় সরাসরি এফবিআই-এর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। তাঁদের মতে, এটি আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বিশাল সঙ্কট ডেকে আনতে পারে। কারণ নিখোঁজ হওয়া প্রত্যেকেই দেশের অতি গোপনীয় গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।