পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার এক মাসের মাথায় ভেঙে খান খান তৃণমূল কংগ্রেস। অন্য দিকে নতুন করে ফাটল ধরেছে উদ্ধব ঠাকরে গোষ্ঠীর শিবসেনায়। হঠাৎই ‘বেপাত্তা’ হয়ে গিয়েছেন সেখানকার ছয় সাংসদ। অচিরেই তাঁরা শিবসেনার একনাথ শিন্ডে গোষ্ঠীতে যোগ দেবেন বলে তুঙ্গে উঠেছে জল্পনা। পশ্চিমবাংলা ও মরাঠাভূমির দাপুটে দুই দলের এ ভাবে ডুবে যাওয়ার নেপথ্যে দু’জন যুবনেতাকে চিহ্নিত করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
বিশেষজ্ঞদের চোখে, তৃণমূল ও শিবসেনা উদ্ধব গোষ্ঠীর ভাঙনে ‘দায়ী’ ওই দুই যুবনেতা হলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও আদিত্য ঠাকরে। প্রথম জন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। তা ছাড়া ঘাসফুল শিবিরের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের পদেও রয়েছেন তিনি। অন্য দিকে ওরলির বিধায়ক আদিত্য বর্তমানে মহারাষ্ট্র বিধানসভায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন শিবসেনার উদ্ধব গোষ্ঠীকে। দু’জনের বিরুদ্ধেই ভূরি ভূরি অভিযোগ তুলেছেন দলের বর্ষীয়ান নেতা-কর্মীরা।
২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম শাসনকে সরিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা দখল করে তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী হন দলের সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র অভিষেক তখনও সে ভাবে রাজনীতির আঙিনায় পা রাখেননি। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে তাঁকে ডায়মন্ড হারবারের টিকিট দেন ‘দিদি’। রাজ্য জুড়ে তখন জোড়া ফুলের তুমুল হাওয়া। তাতে ভর করেই একবারে সংসদীয় রাজনীতির আঙিনায় পা রাখেন দলের ‘যুবরাজ’।
পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখলের বছরে প্রথা ভেঙে ব্রিগেডে ২১ জুলাইয়ের ‘শহিদ দিবস’ পালন করে জোড়াফুল শিবির। সেই মঞ্চেই আত্মপ্রকাশ করে ‘তৃণমূল যুবা’ নামের একটি সংগঠন, যার দায়িত্ব অভিষেকের কাঁধে তুলে দেন মমতা। ওই সময় যুব তৃণমূলের সভাপতি ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। যুব ও যুবার মধ্যে ফারাক অস্পষ্ট হওয়ায় দু’জনের মধ্যে বাড়তে থাকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। ওই সময় থেকেই নানা ইস্যুতে ছড়ি ঘোরানোর অভিযোগ উঠতে থাকে অভিষেকের বিরুদ্ধে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, এর জেরে কিছু দিনের মধ্যেই দু’টি গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে যায় দল। শেষে পরিস্থিতি মোকাবিলায় হস্তক্ষেপ করেন মমতা। তৃণমূল যুব থেকে শুভেন্দুকে সরিয়ে সৌমিত্র খাঁকে দায়িত্ব দেন তিনি। কিন্তু, তাতেও সমস্যার সমাধান হয়নি। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের আগে প্রথমে শুভেন্দু এবং পরে সৌমিত্র দু’জনেই যোগ দেন বিজেপিতে। এর জেরে যুব ও যুবাকে মিশিয়ে দলীয় সংগঠনে নিজের জায়গা পাকা করতে কোনও সমস্যা হয়নি অভিষেকের।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে ১৮টি আসন জেতে বিজেপি। সঙ্গে সঙ্গে ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাককে রাজ্যে নিয়ে আসেন অভিষেক। ওই সময় এর মাথায় ছিলেন প্রশান্ত কিশোর। ২০২১ সালে ভ্রাতুষ্পুত্রকে দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেন মমতা। তত দিনে অবশ্য গরু ও কয়লা পাচারের মতো মারাত্মক অপরাধমূলক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠে গিয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অভিষেকের উত্থান অবশ্য তার পরেও থেমে যায়নি। উল্টে ২০২১ সালের ভোটে ২০০-র বেশি আসন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা পায় তৃণমূল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, এর জেরে দলের রাশ পুরোপুরি চলে যায় তাঁর হাতে। অভিযোগ, ক্ষমতা পেয়ে বর্ষীয়ান নেতাদের একেবারেই সম্মান দেখাননি তিনি। ফলে পরবর্তী কালে শিবির বদলান তাপস রায়, অর্জুন সিংহ বা সোনালি গুহের মতো ‘দিদি’র একনিষ্ঠ সৈনিকেরা।
এ বছরের বিধানসভা ভোটে দলের ভরাডুবির পরও দাপট কমেনি অভিষেকের। ফলঘোষণার কিছু দিনের মাথায় জয়ী বিধায়কদের সঙ্গে একটি বৈঠক করেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা। সেখানে উঠে দাঁড়িয়ে অভিষেকের প্রতি ‘আনুগত্য’ প্রকাশ করতে হয় তাঁদের। পরে এই নিয়ে প্রশ্ন তোলেন উলুবেড়িয়া পূর্বের জনপ্রতিনিধি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। ফলে দল থেকে বহিষ্কৃত হতে হয় তাঁকে, যেটা জোড়াফুল শিবিরের ভাঙনের অন্যতম বড় কারণ, বলছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।
অভিষেকের মতো শিবসেনায় আদিত্যের উত্থানও ধূমকেতুর মতো। বাবা উদ্ধবের হাত ধরে রাজনীতির আঙিনায় পা রাখেন কিংবদন্তি বালাসাহেব ঠাকরের বড় নাতি। প্রথমেই দলের যুব সংগঠনের দায়িত্ব পান তিনি। সালটা ছিল ২০১০। এর সাত বছরের মাথায় মুম্বই জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হন আদিত্য। ২০১৮ সালে দীর্ঘ দিনের সৈনিকদের দূরে সরিয়ে রেখে তাঁকেই দলের নেতা করেন উদ্ধব।
২০১৯ সালের মহারাষ্ট্র বিধানসভা ভোটে ওরলি থেকে জেতেন আদিত্য। ওই নির্বাচনে বিজেপির সঙ্গে জোট ছিল শিবসেনার। ফলপ্রকাশের পর মন্ত্রীত্বের ভাগাভাগি নিয়ে দুই দলের মধ্যে তৈরি হয় মতপার্থক্য। ফলে তড়িঘড়ি ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির (এনসিপি) অজিত পওয়ারের সমর্থন নিয়ে সরকার গড়ে পদ্মশিবির। মুখ্যমন্ত্রী হন দেবেন্দ্র ফডণবীস। উল্টো দিকে উদ্ধব যোগাযোগ করেন কংগ্রেসের সঙ্গে।
এ-হেন জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে খুব দ্রুত অজিতকে ঘরে ফেরাতে সক্ষম হয় এনসিপি। ফলে পতন হয় ফডনবীশ সরকারের। এ বার কংগ্রেস ও এনসিপির সমর্থন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হন উদ্ধব ঠাকরে। ছেলে আদিত্যকে বেশ কয়েকটি দফতরের দায়িত্ব দেন তিনি। সেগুলি হল, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন, পর্যটন, প্রোটোকল এবং উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা।
প্রশাসন থেকে সংগঠন, সব জায়গায় আদিত্যের প্রভাব বৃদ্ধিকে একেবারেই ভাল চোখে দেখেননি শিবসেনার দীর্ঘ দিনের সৈনিকদের একাংশ। আর তাই একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বে বিদ্রোহী ব্লক তৈরি করেন তাঁরা। এর জেরে ২০২২ সালে আড়াআড়ি ভাবে দু’ভাগে ভেঙে যায় দল। দুই তৃতীয়াংশ বিধায়ককে সঙ্গে নিয়ে বিজেপিকে সমর্থন জানান একনাথ। ফলে ক্ষমতা হারাতে হয় উদ্ধবকে।
অভিষেক ও আদিত্যের মধ্যে আরও একটি জায়গায় মিল খুঁজে পেয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। দু’জনের মধ্যেই চলচ্চিত্র জগৎকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছে। ফলে সিনেদুনিয়ার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অনেকেই তাঁদের বিরুদ্ধে তুলেছেন স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বা কণ্ঠরোধ করার মতো মারাত্মক অভিযোগ, ক্ষমতার দম্ভে যা একেবারেই গায়ে মাখেননি তাঁরা।
২০২০ সালে রহস্যজনক ভাবে মৃত্যু হয় অভিনেতা সুশান্ত সিংহ রাজপুতের। মুম্বইয়ের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে উদ্ধার হয় তাঁর দেহ। এর পরই সিনেদুনিয়ার সঙ্গে ড্রাগচক্রের জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে আদিত্যকে পরোক্ষ ভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করান কঙ্গনা রানাওয়াত। কয়েক দিনের মাথায় বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ তুলে তাঁর বাড়ি ও অফিস ভেঙে দেয় বৃহন্মুবই মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন। ওই নির্দেশ উদ্ধব-পুত্রই দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন বলিউডের ‘কুইন’।
প্রায় একই ছবি দেখা গিয়েছে এ রাজ্যের ক্ষেত্রেও। তৃণমূলের সরকারের একাধিক কাজের সমালোচনা করায় ‘বয়কট’-এর মুখে পড়তে হয় রুদ্রনীল ঘোষ, অনির্বাণ ভট্টাচার্য-সহ একাধিক অভিনেতা-অভিনেত্রীকে। পাশাপাশি, জোড়াফুল শিবিরের বিরুদ্ধে টাকা তোলার অভিযোগও তুলেছেন টলিউডের টেকনিশিয়ানদের একাংশ। তাঁদের দাবি, অভিষেকের নির্দেশে গোটাটাই নিয়ন্ত্রণ করতেন টালিগঞ্জের প্রাক্তন বিধায়ক তথা মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ও তাঁর ভাই স্বরূপ।
শিবসেনার উদ্ধব গোষ্ঠীর দাবি, শিবির বদল করতে ফোন বন্ধ রেখেছেন সঞ্জয় দিনা পাটিল, সঞ্জয় দেশমুখ, নাগেশ পাতিল অষ্টিকার, ওমরাজে নিম্বালকর, ভাউসাহেব ওয়াকচৌরে এবং সঞ্জয় যাদব। এ ছাড়া শিন্ডে সেনায় যোগ দিতে পারেন বিদ্রোহী রাজভাউ ওয়াজ়েও। এর জন্য সাংসদপিছু ৫০ কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে বলে বিস্ফোরক মন্তব্য করতে শোনা গিয়েছে সঞ্জয় রাউতকে।
চলতি বছরের ১৪ জুন দল ভাঙাতে বিজেপি এবং একনাথ শিন্ডে ‘অপারেশন টাইগার’-এ নেমেছে বলে প্রথম বার গণমাধ্যমে মুখ খোলেন উদ্ধব। তাঁর দাবি, ইতিমধ্যেই বিদ্রোহীদের সঙ্গে দিল্লিতে বৈঠক সেরেছেন শিন্ডে-পুত্র শ্রীকান্ত। কিছু দিনের মধ্যেই লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লাকে চিঠি দেবেন তাঁরা। তৃণমূলের সংসদীয় দলে ফাটল ধরানোর ক্ষেত্রেও এই ধরনের টাকার খেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কৃষ্ণনগরের ঘাসফুল সাংসদ মহুয়া মৈত্র।
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে দলের ভরাডুবির পর কুলগোত্রহীন ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েনস পার্টি অফ ইন্ডিয়ায় (এনসিপিআই) অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন তৃণমূলের ২০ জন সাংসদ। ভোটে পরাজয়ের জন্য অভিষেক ও আইপ্যাককে খোলাখুলি ভাবে দোষারোপ করছেন তাঁরা। ঘাসফুলের বিদ্রোহীদের নেতৃত্বে রয়েছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। মহুয়ার অভিযোগ উড়িয়ে তিনি জানিয়েছেন, দলবদলে কোনও টাকার লেনদেন হয়নি।
তৃণমূল ও শিবসেনার উদ্ধব গোষ্ঠী বাদ দিলে সমাজবাদী পার্টিতেও ভাঙন ধরার ইঙ্গিত দিয়েছেন উত্তরপ্রদেশের অপসারিত মন্ত্রী ওমপ্রকাশ রাজভর। দলের শীর্ষনেতা অখিলেশ অবশ্য জানিয়েছেন, দল মজবুতই রয়েছে। তবে কেউ ভয় পেলে তিনি পালিয়ে যাবেন।
সব ছবি: সংগৃহীত।