দুর্গম আস্ত পাহাড় কাটতে ‘মাউন্টেন ম্যানের’ সময় লেগেছিল পুরো ২১টা বছর। আর ঝাড়খণ্ডের ‘ওয়াটার ম্যানের’ আরও ছ’টা বছর বেশি। এক একবগ্গা কিশোরের জেদের জন্য গোটা গ্রামে জলের সমস্যা মিটে গিয়েছিল। যদিও তার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল ২৭টা বছর।
আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে একটানা পাগলের মতো একা হাতে মাটি খুঁড়ে গিয়েছিলেন তিনি। কোমর বেঁধে, গাঁইতি নিয়ে ময়দানে নেমে পড়েছিল বছর পনেরোর এক আদিবাসী ছেলে। ২৭ বছরের চেষ্টায় একার হাতে গ্রামের মাঝে একটি পুকুর খুঁড়ে জলের সমস্যা মিটিয়েছেন তিনি। যখন গ্রামে আস্ত পুকুর খুঁড়ে ফেললেন তখন তাঁর বয়স ৪২।
ছত্তীসগঢ়ের কোরিয়া জেলার সাজা পাহাড় গ্রামের বাসিন্দা শ্যাম লাল। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই দেখছেন, জলের সমস্যায় গোটা গ্রাম ধুঁকছে। পানীয় জল তো দূরের কথা, গবাদি পশুর জন্য সামান্য খাবার জলটুকুও মেলে না সেখানে। আক্ষরিক অর্থেই সুখা গ্রাম। ১৯৯০ সালে এক কিশোর স্থির করে নেয় এই জলযন্ত্রণা থেকে গ্রামকে মুক্তি দিতে হবে।
গ্রামে পানীয় জলের উৎস বলতে মাত্র কয়েকটা কুয়ো। তাতে গোটা গ্রামবাসীর জলের চাহিদা মেটে না। বছরের পর বছর ধরে এ ভাবেই জলসঙ্কটে ভুগছিল গ্রামটি। আর এটাকেই ভবিতব্য বলে মেনে নিয়েছিলেন গ্রামবাসীরা। তীব্র জলের অভাব সত্ত্বেও এই ভাবে ধুঁকতে ধুঁকতে বেঁচে থাকতেন গ্রামের বাসিন্দারা।
প্রিয়জনের শোকে পাগল হয়ে ২২ বছর ধরে পাহাড় ভেঙে রাস্তা তৈরি করেছিলেন বিহারের দশরথ মাঝি। ঠিক তেমনই তার পাশের রাজ্য ছত্তীসগঢ়ে এমন ব্যক্তি রয়েছেন, যিনি নিজের কথা না ভেবে গ্রামের বাসিন্দাদের মুক্তি দিয়েছেন জলসঙ্কট থেকে। স্ত্রী নয়, প্রেমিকা বা পরিবারের কারও জন্য নয়, শুধুমাত্র গ্রামের সমস্ত বাসিন্দাদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য তিনি ২৭টা বছর ব্যয় করেছেন। শুধু একটি পুকুর খোঁড়ার জন্য।
গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, জলের সমস্যায় গোটা গ্রাম যখন বিপর্যস্ত, সরকারকে জানিয়েও কোনও লাভ হচ্ছে না, তখন এগিয়ে এসেছিল ওই আদিবাসী কিশোর। সে ঠিক করেছিল নিজেই গ্রামের মাঝে একটি পুকুর খুঁড়ে জলসমস্যা দূর করবে। তার ওই প্রচেষ্টাকে তখন সবাই পাগলামি বলেই ধরে নিয়েছিল।
এর জন্য গ্রামের বাসিন্দাদের কাছ থেকে কম টিপ্পনী শুনতে হয়নি শ্যাম লালকে। তাঁর সঙ্গে এক বারও কেউ কোদাল বা গাঁইতি চালিয়েও সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসেননি। গ্রামের মানুষ এবং গবাদি পশুর কল্যাণের জন্য কারও কোনও সাহায্য ছাড়াই এক একর চওড়া এবং ১৫ ফুট গভীর পুকুর খোঁড়ার কাজ চালিয়ে গিয়েছেন।
শ্যাম লালের কাটা পুকুরের সেই জলে এখন তৃষ্ণা মিটছে গোটা গ্রামের। তবে মাঝে কেটে গিয়েছে ২৭টা বছর। বর্তমানে শ্যাম লাল পঞ্চাশের দোরগোড়ায়। তাঁর কথায়, ‘‘আমার এই কাজে কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেনি। সরকার বা গ্রামবাসীদের মধ্যে কেউ না। কিন্তু আমি আমার লক্ষ্যে অবিচল ছিলাম।’’
চিরিমিরির নীচে একটি টিলার কাছে অবস্থিত সাজা পাহাড়ে ২০১৭ সালেও বিদ্যুৎ বা পাকা সড়কের বন্দোবস্ত করা সম্ভব হয়নি। গ্রামবাসীদের জন্য জলের একমাত্র উৎস ছিল দু’টি কুয়ো। এই গ্রাম যে এলাকায় অবস্থিত সেখানকার জমি শুষ্ক হওয়ায় জলের দেখা পাওয়া দুষ্কর।
সেই রুক্ষ, পাথুরে জমি খুঁড়ে জলের সন্ধান করা কোনও পাহাড় ডিঙোনোর চেয়ে কম কিছু নয়। যতই কষ্টসাধ্য কাজ হোক, শ্যাম লাল এই দীর্ঘ সময়ে এক দিনও হাল ছেড়ে দিতে রাজি হননি। নিজের গ্রামের মানুষও তাঁর কাণ্ড দেখে তাঁকে পাগল বলে দাগিয়ে দিয়েছিলেন একসময়। তবু নিজের সংকল্পে অটল ছিলেন আদিবাসী পরিবার থেকে উঠে আসা শ্যাম লাল।
গোটা সাজা পাহাড়ের কাছে এখন শ্যাম লালই ‘হিরো’। গ্রামবাসী রামশরণ বার্গারের কথায়, ‘‘ওই পুকুর এখন গ্রামের সবাই ব্যবহার করেন। আমরা সকলেই শ্যাম লালের কাছে কৃতজ্ঞ।’’
শ্যাম লালের কাজের স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার। দশ হাজার টাকা দিয়ে তাঁকে পুরস্কৃত করেছেন স্থানীয় বিধায়ক শ্যামবিহারী জয়সওয়াল। শ্যাম লালের কাজের প্রশংসা করেছেন জেলাশাসক নরেন্দ্র দুগ্গলও। তাঁর কথায়, ‘‘গ্রামবাসীদের জন্য শ্যাম লালের অবদান সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। আমি তাঁকে সব রকম ভাবে সহায়তা করার চেষ্টা করব।’’
শ্যাম লালের মতো আরও এক জন মানুষ রয়েছেন যিনি সমস্ত গ্রামবাসীদের এক করে পাহাড়ের পাদদেশে একটি বাঁধ দিয়ে জলাশয় গড়ে তুলেছিলেন। তিনি বিহার, ছত্তীসগঢ়ের পড়শি রাজ্য ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা সিমন ওঁরাও। রাঁচী থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে বেরো ব্লকের ছোট গ্রাম খাকসিটোলিতে থাকেন তিনি।
জলসঙ্কট থেকে মুক্তি পেতে সিমনের তত্ত্বাবধানে প্রথমে একটি জলাশয় বানান গ্রামবাসীরা। তাতে বর্ষায় জলের ভারে ফাটল ধরে যায়। তিন বারের চেষ্টায় শক্তিশালী বাঁধ দিয়ে একটা জলাশয় গড়ে তোলেন। সেই জলাশয় আজও চাষাবাদে সাহায্য করে চলেছে গ্রামবাসীদের।
সব ছবি: সংগৃহীত।