পশ্চিম এশিয়ায় তৈরি হওয়া যুদ্ধ পরিস্থিতির তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু সংঘাত থামার কোনও নামগন্ধ নেই এখনও। একে অপরকে নিশানা করে ক্রমাগত আক্রমণ শানিয়ে যাচ্ছে যুযুধান ইরান ও ইজ়রায়েল-আমেরিকা। বারুদের গন্ধে ভরে উঠেছে তেহরানের আকাশ-বাতাস। সর্ব ক্ষণ সেখানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে লড়াকু জেট, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন।
ইজ়রায়েল-আমেরিকার সাঁড়াশি চাপের মধ্যে পড়ে যুঝতে থাকা ইরান কিন্তু নিজের তেজ কমায়নি। ইজ়রায়েলের তরফে ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসঘাঁটিতে হামলার পর তেহরান আবার বিশ্বের অন্যতম বড় গ্যাসঘাঁটি, কাতারের রাস লাফানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। লড়াইয়ে জোড়া ‘সুপার পাওয়ার’কে নাকানি-চোবানি খাওয়াতে খনিজ তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহণের কৌশলগত সামুদ্রিক রাস্তা হরমুজ় প্রণালীও অবরুদ্ধ রেখেছে তেহরান।
তবে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি যখন তুঙ্গে, তখন সম্পূর্ণ অন্য একটি কারণে খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে ইরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলির তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার কোম শহরে ১৯ বছর বয়সি এক চ্যাম্পিয়ন কুস্তিগির-সহ আরও দুই বিক্ষোভকারীকে প্রকাশ্যে ফাঁসি দিয়েছে সে দেশের সরকার।
বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে ক্ষোভপ্রকাশও করেছেন ইরানের আন্দোলনকর্মীরা। তাঁদের দাবি, জনপ্রিয় কুস্তিগির-সহ দুই বিক্ষোভকারীকে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়ার অর্থ, ভিন্ন মতপ্রকাশ করছেন যাঁরা, তাঁদের উপর সরকারের দমনপীড়ন তীব্র ভাবে বৃদ্ধির ইঙ্গিত।
জানা গিয়েছে, ইরানের ওই কুস্তিগিরের নাম সালেহ মহম্মদি। তাঁকে ইরানের কুস্তিজগতের উদীয়মান তারকা হিসাবে গণ্য করা হত। বৃহস্পতিবার অন্য দুই বিক্ষোভকারী সঈদ দাভোদি এবং মেহেদি ঘাসেমির সঙ্গে ফাঁসি দেওয়া হয় মহম্মদিকে।
২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারির বিক্ষোভে দু’জন পুলিশকে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মহম্মদি, সঈদ এবং মেহেদিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘কোম শহরে জনতার উপস্থিতিতে’ অভিযুক্ত তিন জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
মানবাধিকার সংস্থাগুলির দাবি, মহম্মদিকে নির্যাতনের মাধ্যমে ‘সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা’-সহ বিভিন্ন অভিযোগে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়েছিল, যা ইরানে একটি মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ।
ইরানে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিক থেকে শুরু হয়ে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত চলা দেশব্যাপী অস্থিরতার ঘটনায় প্রথম এই তিন পরিচিত বিক্ষোভকারীকে ফাঁসি দিল ইরানের সরকার।
ইরানের অসরকারি মানবাধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ (আইএইচআরএনজিও) এই ঘটনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, এর পর আরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে পারে।
বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিকে পদক্ষেপ করার আহ্বানও জানিয়েছে আইএইচআরএনজিও। সংস্থাটির দাবি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত আরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া রোধ করতে এবং ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের রক্ষা করতে কূটনৈতিক উপায় ব্যবহার করা।
আইএইচআরএনজিও সংস্থার ডিরেক্টর মেহমুদ আমিরি-মোগাদ্দাম বলেন, “যে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তাঁদের প্রথমে নির্যাতন করা হয়েছিল। বলপ্রয়োগের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল। আর তার ভিত্তিতেই অত্যন্ত অন্যায্য বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে তাঁদের।”
মেহমুদ আরও বলেন, “আমরা এই মৃত্যুদণ্ডগুলিকে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসাবে বিবেচনা করি, যা রাজনৈতিক ভাবে ভিন্ন মত পোষণকারীদের দমনের উদ্দেশ্যে এবং আতঙ্ক সৃষ্টির লক্ষ্যে সংঘটিত হচ্ছে।”
এর পর কী ঘটতে পারে সে বিষয়েও সতর্ক করেছেন মেহমুদ। তাঁর কথায়, ‘‘বিক্ষোভকারীদের গণ-মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। আমরা এক অত্যন্ত বাস্তব এবং আসন্ন ঝুঁকির সম্মুখীন। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিকে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ করতে হবে।” মেহমুদ আরও বলেন, “ইসলামি প্রজাতন্ত্র তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করছে। ইরানের জনগণ মৌলিক পরিবর্তন চায়।”
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’ জানিয়েছে, মহম্মদি-সহ ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত অভিযুক্তদের ‘যথাযথ আত্মপক্ষ সমর্থনের’ সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল এবং স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। সংস্থাটি আরও দাবি করেছে, মামলাটি দ্রুত গতিতে এমন এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যার সঙ্গে অর্থবহ বিচার প্রক্রিয়ার কোনও সাদৃশ্য ছিল না।
ইরানীয় কুস্তিগির এবং মানবাধিকার কর্মী নিমা ফার এই মৃত্যুদণ্ডকে ‘একটি নির্লজ্জ রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড’ বলে অভিহিত করেছেন। আমেরিকার সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ়কে ফার বলেন, “এই মৃত্যুদণ্ড ছিল একটি নির্লজ্জ রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, যা সরকারের ভিন্ন মতকে দমন এবং সমাজকে আতঙ্কিত করার জন্য ক্রীড়াবিদদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের একটি ধারাবাহিক কৌশলের অংশ।”
মহম্মদির ফাঁসি প্রসঙ্গে ২০২০ সালে ইরানীয় কুস্তিগির নাভিদ আফকারির মৃত্যুদণ্ডের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন ফার, যা বিশ্ব জুড়ে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।
মহম্মদির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াসংস্থাগুলিকে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন ফার। তিনি বলেন, “ইরানকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ করতে হবে যত ক্ষণ না তারা বিক্ষোভকারী ও ক্রীড়াবিদদের মৃত্যুদণ্ড বন্ধ করে। প্রহসনমূলক বিচারব্যবস্থা। যাঁরা মুখ খুলছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ বন্ধ করতে হবে।”
সব ছবি: সংগৃহীত।