মাত্র এক মাসে ১৮০ ডিগ্রি মত পরিবর্তন! প্রথমে ‘না’ বলে তার পর ভারতকেই কাছে টানল আমেরিকা, যার জেরে শুল্কসংঘাতের আবহে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা ‘প্যাক্স সিলিকা’ নামের জোটে শামিল হতে যাচ্ছে নয়াদিল্লি। ওয়াশিংটনের এ-হেন ‘উদারতায়’ কতটা লাভবান হবে কেন্দ্র? বিরল খনিজ থেকে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপের মতো ক্ষেত্রগুলিতে কাটিয়ে উঠতে পারবে অতিরিক্ত চিন-নির্ভরতা? এ দেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের ঘোষণার পর এই সমস্ত প্রশ্নের চুলচেরা বিশ্লেষণে ব্যস্ত বিশেষজ্ঞমহল।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্যাক্স সিলিকা’ জোটে ঢুকে পড়া ভারতের জন্য ‘গেম চেঞ্জার’ হতে চলেছে। কারণ, যে গতিতে কৃত্রিম মেধা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) প্রযুক্তিতে গণপ্রজাতন্ত্রী চিন (পিপল্স রিপাবলিক অফ চায়না) দাপট দেখাচ্ছে, তাতে আগামী দিনে বিপদ বাড়তে পারে নয়াদিল্লির। তা ছাড়া বিরল খনিজের ব্যাপারে বেজিং ‘ব্ল্যাকমেল’ করতে পারে, এই আশঙ্কাও রয়েছে। ওই ধরনের পরিস্থিতিতে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারের জন্য ‘প্যাক্স সিলিকা’ যে ত্রাতা হয়ে উঠবে, তা বলাই বাহুল্য।
উদাহরণ হিসাবে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপের কথা বলা যেতে পারে। কৃত্রিম মেধা, বৈদ্যুতিন গাড়ি, মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরঞ্জাম নির্মাণে এটি অন্যতম অপরিহার্য উপাদান হিসাবে স্বীকৃত। এই চিপ তৈরি করতে আবার চাই বিরল খনিজ, যার নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ভাবে আছে চিনের হাতে। বর্তমানে বছরে ২ লক্ষ ৭০ হাজার টন বিরল খনিজ উৎপাদন করছে বেজিং। ফলে বৈদ্যুতিন সরঞ্জামের নির্মাণ প্রক্রিয়া সচল রাখতে ড্রাগনভূমি থেকে তা বিপুল পরিমাণে আমদানি করতে হচ্ছে নয়াদিল্লিকে।
ভারতের কোথাও বিরল খনিজের ভান্ডার নেই, এ কথা ভাবলে ভুল হবে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ দেশের মাটির গভীরে লুকিয়ে আছে প্রায় ৮৫.২ লক্ষ টন বিরল ধাতু। কিন্তু, প্রযুক্তিগত সমস্যার জেরে বছরে মাত্র ২,৯০০ টন উত্তোলন করতে পারছে নয়াদিল্লি। ফলে চিন থেকে সংশ্লিষ্ট খনিজগুলির আমদানি বাড়াতে এক রকম বাধ্য হয়েছে কেন্দ্র। ‘প্যাক্স সিলিকা’ নয়াদিল্লির এই নির্ভরশীলতা কাটানোর তাস হয়ে উঠবে, বলছেন বিশ্লেষকেরা।
গত আর্থিক বছরে (পড়ুন ২০২৪-’২৫) প্রায় ৫৪ থেকে ৫৭ হাজার টন বিরল খনিজ আমদানি করে ভারত। এর ৯৩ শতাংশই চিনের থেকে কিনেছে নয়াদিল্লি। ২০২৫ সালে হঠাৎ করেই সংশ্লিষ্ট ধাতুগুলির এ দেশে রফতানির উপর ছ’মাসের নিষেধাজ্ঞা জারি করে বেজিং। এতে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভারতের বৈদ্যুতিন গাড়ি বা ইভি (ইলেকট্রিক ভেহিকল) শিল্প। বিরল ধাতুর তৈরি চুম্বকের অভাবে সেগুলির উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয় একাধিক শিল্পসংস্থা। ওই সময় চেষ্টা করেও কোনও বিকল্প উৎসের খোঁজ পায়নি নয়াদিল্লি।
গত বছরের অগস্ট-সেপ্টেম্বরে ‘সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা’ বা এসসিও-র (সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজ়েশন) বৈঠকে যোগ দিতে চিনে যান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেখানে ড্রাগনভূমির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয় তাঁর। এর পর ফের নয়াদিল্লিকে বিরল খনিজ রফতানি করা শুরু করে বেজিং। তবে সংশ্লিষ্ট ধাতুগুলি বিক্রির সময় চাপিয়ে দেয় কড়া শর্ত। সেখানে বলা হয়েছে, কোনও অবস্থাতেই তাঁদের থেকে কেনা বিরল খনিজ অত্যাধুনিক হাতিয়ার তৈরিতে ব্যবহার করতে পারবে না নয়াদিল্লি।
বিরল খনিজের ব্যাপারে ‘চিনা শৃঙ্খল’ কেটে ফেলতে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ‘ন্যাশনাল ক্রিটিক্যাল মিনারেল মিশন’-এ অনুমোদন দেয় কেন্দ্রের মোদী মন্ত্রিসভা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আগামী সাত বছর ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিরল খনিজের খোঁজ চালাবে একাধিক সংস্থা। পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট ধাতুগুলির পরিশোধন ও বিপুল পরিমাণে উত্তোলনের দিকেও নজর রাখতে চাইছে সরকার। সব কিছু ঠিক থাকলে ২০৩০-’৩১ সালের মধ্যে এ ব্যাপারে বেজিঙের উপর নির্ভরশীলতা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা যাবে বলে আশাবাদী কেন্দ্র।
বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, ‘প্যাক্স সিলিকা’তে যোগ দিলে বিরল খনিজ আমদানির জন্য অস্ট্রেলিয়ার মতো নিরাপদ সরবরাহকারীর দিকে ঝোঁকার সুযোগ পাবে নয়াদিল্লি। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ধাতুগুলির উত্তোলন ও পরিশোধনের জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর করতে পারে জাপান ও নেদারল্যান্ডস। তা ছাড়া বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনাও রয়েছে। সে ক্ষেত্রে ভারতের পক্ষে যে মোনাজ়াইট এবং থোরিয়ামের মতো বিরল ধাতুগুলির নিষ্কাশন ও প্রক্রিয়াকরণ অনেক সহজ হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
গত বছরের ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে কৌশলগত অংশীদারদের নিয়ে ‘প্যাক্স সিলিকা’ গঠনের কথা ঘোষণা করে আমেরিকা। তখন অবশ্য ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলির তালিকা থেকে ভারতের নাম বাদ দিয়েছিল ওয়াশিংটন। নতুন এই জোটটির সাহায্যে মূলত সিলিকন উপত্যকার সরবরাহ শৃঙ্খলকে সমৃদ্ধশালী, নিরাপদ এবং উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন হিসাবে গড়ে তুলতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র, যার মধ্যে থাকছে বিরল খনিজ, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ এবং কৃত্রিম মেধা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) পরিকাঠামো।
‘প্যাক্স সিলিকা’র ঘোষণার পর একটি বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার জানায়, এর মাধ্যমে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে আমেরিকা। শুধু তা-ই নয়, এর মাধ্যমে ওয়াশিংটনের অংশীদারেরা কৃত্রিম মেধার যুগে প্রবেশের সুযোগ পেতে চলেছে বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীতে জায়গা পেয়েছে জাপান, রিপাবলিক অফ কোরিয়া (দক্ষিণ কোরিয়া), সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস, ব্রিটেন, ইজ়রায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং অস্ট্রেলিয়া।
এদের বাদ দিলে রিপাবলিক অফ চায়না বা তাইওয়ান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশ এবং কানাডাকে নিয়ে ‘প্যাক্স সিলিকা’ গঠন করেছে আমেরিকা। এতে যোগ দিতে ‘অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা’ বা ওইসিডির (অর্গানাইজ়েশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) ৩৮টি সদস্য রাষ্ট্রকেই আমন্ত্রণ জানায় ওয়াশিংটন। সংশ্লিষ্ট সংগঠনটির সদস্যপদ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, কানাডা এবং ইইউ-এর। কৌশলগত অংশীদারদের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে একমাত্র ভারতকেই ব্রাত্য রেখেছিল মার্কিন সরকার।
আগামী দিনে ‘প্যাক্স সিলিকা’র লক্ষ্য কী হতে চলেছে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে আমেরিকা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন জানিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি হোক বা বিরল খনিজ, অনেক ক্ষেত্রে অন্য রাষ্ট্রের উপর যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদারদের প্রবল ভাবে নির্ভরশীলতা বেড়েই চলেছে। এর মাধ্যমে সেটা কমিয়ে আনার চেষ্টা করবে ওয়াশিংটন। তা ছাড়া এই গোষ্ঠীর দেশগুলি সম্মিলিত ভাবে রূপান্তরমূলক প্রযুক্তির বিকাশ এবং ব্যবহারের দিকে নজর দেবে।
এ প্রসঙ্গে দেওয়া বিবৃতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্তা বলেছেন, ‘‘আমাদের অংশীদারদের মধ্যে কৃত্রিম মেধার ব্যাপারে একটা ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। জাতীয় স্বার্থে এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য একটা নিরাপদ সরবরাহ শৃঙ্খল, বিশ্বস্ত প্রযুক্তি এবং কৌশলগত পরিকাঠামোর প্রয়োজন আছে। সেটাই ‘প্যাক্স সিলিকা’র মাধ্যমে গড়ে তোলা যাবে।’’
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একাংশ ‘প্যাক্স সিলিকা’কে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় সামরিক জোট ‘উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা’ বা নেটোর (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজ়েশন) সঙ্গে তুলনা করেছেন। সরকারি বিবৃতিতে আমেরিকা বলেছে, এই গোষ্ঠী কাউকে বিচ্ছিন্ন বা একঘরে করার জন্য তৈরি হচ্ছে না। কৃত্রিম মেধার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন অংশীদারদের প্রতিযোগিতামূলক সমৃদ্ধি চায়। ভারতকে পাশে না পেলে সেটা যে কোনও ভাবেই সম্ভব নয়, তা বুঝতে সময় লাগেনি যুক্তরাষ্ট্রের।
‘প্যাক্স সিলিকা’র বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন মার্কিন প্রশাসনের অর্থনীতি বিষয়ক দফতরের আন্ডার সেক্রেটারি জ্যাকব হেলবার্গ। তাঁর কথায়, ‘‘বিংশ শতাব্দী ছিল তেল ও ইস্পাতের। ২১ শতকে সেই জায়গা ধীরে ধীরে নিচ্ছে কম্পিউটার ও কৃত্রিম মেধা বা এআই। সেই জন্যেই সেমিকন্ডাক্টর ও বিরল ধাতুর এত গুরুত্ব। সেই সরবরাহ শৃঙ্খল ঠিক রাখতে ‘প্যাক্স সিলিকা’র মতো জোট উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবে। এতে নয়াদিল্লির অন্তর্ভুক্তি ভারত-মার্কিন অংশীদারির ঐতিহাসিক মাইলফলক হতে যাচ্ছে।’’
চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি ভারতে আসেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিয়ো গোর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসাবে তাঁর যথেষ্ট পরিচিতি আছে। নয়াদিল্লি পৌঁছে গত ১২ জানুয়ারি আমেরিকার দূতাবাস থেকে বড় ঘোষণা করেন গোর। বলেন, ‘‘আগামী মাসে প্যাক্স সিলিকার পূর্ণ সদস্য হিসাবে ভারতকে আমন্ত্রণ জানাবে ওয়াশিংটন।’’ ২০২৫ সালের নভেম্বরে হোয়াইট হাউসে এ দেশের রাষ্ট্রদূত হিসাবে শপথ নেন তিনি।
ট্রাম্পের দূত হিসাবে গত বছরের অক্টোবরেই ভারতে এসেছিলেন গোর। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী মোদী, বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বা এনএসএ (ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইসার) অজিত ডোভালের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। তা সত্ত্বেও ডিসেম্বরে ‘প্যাক্স সিলিকা’ গঠনের সময় নয়াদিল্লি ব্রাত্য থাকায় অবাক হয়েছিল আন্তর্জাতিক মহল। শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত মান-অভিমান সরিয়ে রেখে পুরনো ‘বন্ধু’কে ফের কাছে টানলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
এ বছরের ১২ জানুয়ারি ‘প্যাক্স সিলিকা’য় যোগ দেয় কাতার। দোহার অন্তর্ভুক্তির সময় সংশ্লিষ্ট জোটটির অর্থ ব্যাখ্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকার কাছে ‘প্যাক্স’ শব্দটির অর্থ শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি। আর ‘সিলিকা’ হল সেই সমস্ত যৌগ যা সিলিকনে পরিশোধিত হয়। এতে প্রবেশের পর কৃত্রিম মেধা প্রযুক্তির ব্যবহারে নয়াদিল্লি কতটা এগিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার।
সব ছবি: সংগৃহীত।