আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের হামলায় ৩৬ বছর ধরে ইরান শাসনকারী আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা কে হবেন, তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে ওঠে। এক ক্ষণস্থায়ী ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয় শিয়া অধ্যুষিত রাষ্ট্রে। প্রয়াত ‘সুপ্রিম লি়ডার’ খামেনেইয়ের কোনও মনোনীত উত্তরসূরি ছিলেন না।
দেশের শাসনব্যবস্থা চালানোর জন্য প্রাথমিক ভাবে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ানকে নিয়ে তিন সদস্যের একটি কাউন্সিল গঠন করেছিল তেহরান। সেই তিন সদস্যের কাউন্সিলের বাকি দু’জন ছিলেন আলিরেজা আরাফি ও বিচারপতি গোলাম হোসেইন মোহসেনি এজেই। তাঁদের হাতে ছিল শাসনের অন্তর্বর্তী দায়িত্ব। অন্তর্বর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল আলিরেজ়া আরাফির নাম।
তবে ইরানের সর্বোচ্চ পদে বসার সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয় আলিরেজ়া আরাফির। কারণ ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতার শূন্যপদে বাছা হল আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের দ্বিতীয় পুত্র মোজতবা খামেনেইকে। ইরানের সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল সূত্রে খবর, সে দেশের তিন সদস্যের অন্তর্বর্তী কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত, খামেনেই পরিবারের হাতেই থাকবে ইরানের শাসনভার। যদিও আনুষ্ঠানিক কোনও ঘোষণা করেনি তেহরান।
আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের হামলায় খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর ইরান সরকার ৪০ দিনের শোক ঘোষণা করেছে। ৮৬ বছর বয়সি এই নেতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ছটফট করছে তেহরান। শত্রু দেশকে লক্ষ্য করে পশ্চিম এশিয়ায় থাকা একের পর এক সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইরানের সামরিক বাহিনী।
৫৬ বছরের মোজতবার হাতেই অঘোষিত ভাবে রয়েছে পারস্য উপসাগরীয় দেশটির শিয়া ফৌজ ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড’ (আইআরজিসি) বাহিনীর দায়িত্ব। পাশাপাশি, বিভিন্ন শিয়া মুসলিম সংগঠনের শীর্ষ পদেও রয়েছেন তিনি। সরকার এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলিতে খামেনেইয়ের পর তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল সবচেয়ে বেশি।
মহম্মদ রেজ়া শাহ পহেলভিকে কুর্সি থেকে উৎখাতের ইরানি বিপ্লবের নেপথ্যে অন্যতম কারিগর ছিলেন আলি খামেনেই। তাঁদের আন্দোলনেই পতন ঘটে রাজতন্ত্রের। সেই জায়গায় ‘ইসলামীয় প্রজাতন্ত্র’ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে তেহরান। রাতারাতি ক্ষমতার কাছাকাছি চলে যান আলি খামেনেই।
দ্বিতীয় পুত্র মোজতবার বয়স তখন মাত্র ১০। বাবার আদর্শ তাঁর শিশু মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। পশ্চিমি সংস্কৃতিকে পুরোপুরি মন থেকে মুছে ফেলে শিয়া কট্টরপন্থাকে আঁকড় ধরতে তাঁর বেশি সময় লাগেনি। ইসলামি প্রজাতন্ত্র অবশ্য দীর্ঘ দিন ধরেই পরিবারতন্ত্রের বিরোধিতা করে আসছে। সূত্রের খবর, আইআরজিসি-র চাপেই মোজতবার হাতে ইরানের শাসনভার তুলে দিতে সম্মত হয়েছে কমিটি।
সাবেক পারস্যে ক্ষমতার শীর্ষে উঠে আসছেন কে, সেই আলোচনার সঙ্গে আরও একটি বিষয় নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে জনমানসে। ইরানের দুই পূর্ববর্তী শাসনকর্তার নামের সঙ্গে জুড়ে থাকা ‘আয়াতোল্লা’ শব্দটি নিয়ে। এটি কি কোনও নামের অংশ, পদবি না কি উপাধি? আর উপাধি হলে এটা কারা ব্যবহার করতে পারেন?
আরবি এবং ফারসি ভাষা থেকে উদ্ভূত ‘আয়াতুল্লাহ’ বা ‘আয়াতোল্লা’ শব্দটি ঈশ্বর বা ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রতীক। শিয়া ইসলামের উচ্চপদস্থ ধর্মগুরুদের এই সম্মানসূচক উপাধি দেওয়া হয়ে থাকে। বলে রাখা ভাল এটি কোনও পারিবারিক পদবি নয়। বরং যোগ্যতার ভিত্তিতে দেওয়া একটি উপাধি। ব্যক্তির ধর্মীয় গভীরতা ও জ্ঞানের পরিধিকে সূচিত করে এই উপাধিটি।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এই উপাধিটির ব্যাপক প্রচলন ঘটে। তার আগে ইরানে সাফাভিদ রাজবংশের কারণে এটি আরও বিশিষ্ট হয়ে ওঠে। সাফাভিদ রাজবংশ (১৫০১–১৭৩৬) ছিল আধুনিক ইরানের অন্যতম প্রভাবশালী শিয়া মুসলিম রাজবংশ। এই রাজবংশই শিয়া ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে সাবেক পারস্য দেশে। আয়াতোল্লা মহম্মদ বাকির আল-মজলিসির মতো সুপণ্ডিতেরা শিক্ষার মর্যাদাকে সুদৃঢ় করার চেষ্টা করেন। ফলে উপাধিটি আনুষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল।
এই উপাধিটি সাধারণত তাঁদেরই দেওয়া হয় যাঁরা ইসলামি আইনশাস্ত্র এবং ধর্মতত্ত্বের উপর বিস্তৃত গবেষণা করেছেন। ‘আয়াতোল্লা’রা আধ্যাত্মিক নেতার ভূমিকা পালন করার পাশাপাশি শিয়া সমাজে নৈতিকতা ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনের দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন, এই উপাধি অর্জনের জন্য সাধারণত বছরের পর বছর শিক্ষার প্রয়োজন হয়।
১৯৭৮-’৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়। এই বিপ্লবের ফলে ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ইরানি রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। রাতারাতি শিয়া কট্টরপন্থী ধর্মীয় একটি দেশে পরিণত হয় পারস্য উপসাগরের কোলের এই রাষ্ট্র। ইরানের এই ইসলামীয় বিপ্লবের জনক ছিলেন রুহুল্লা মুসাভি খোমিনি।
শাহের শাসন শেষ হওয়ার পর রুহুল্লা খোমেইনি হন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা বা আয়াতোল্লা। বিপ্লবের পর খোমিনি ব্যাপক প্রভাব অর্জন করেন, যার ফলে দেশে একটি ধর্মতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। যুদ্ধ শেষের এক বছরের মাথায় মারা যান ইসলামীয় প্রজাতন্ত্রের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লা খোমিনি। পরবর্তী কালে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন আলি খামেনেই, যিনি ইরানে কট্টরপন্থাকে আরও বাড়িয়েছেন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
ইরানের জটিল ক্ষমতা ভাগাভাগির শিয়া ধর্মতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সর্বোচ্চ নেতা। রাষ্ট্রের সমস্ত বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার তাঁরই। দেশটির সামরিক বাহিনী এবং শক্তিশালী বিপ্লবী গার্ডের সর্বাধিনায়ক হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
পরিবার গঠনেরও অনুমতি থাকে আয়াতোল্লা উপাধি বহনকারী ব্যক্তিদের। খামেনেই ও তাঁর স্ত্রী মানসুরেহের ছয় সন্তান। প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার পরিবার তেহরানেই বসবাস করতেন। ইজ়রায়েল ও মার্কিন যৌথ হামলায় খামেনেইয়ের সঙ্গে তাঁর পরিবারের কয়েক জন সদস্য নিহত হন।
আলি খামেনেইয়ের দ্বিতীয় পুত্র বছর ৫৬-র মোজতবার জন্ম ইরানের মাশহাদ শহরে। সালটা ছিল ১৯৬৯। শৈশবের সাত বছর সাবেক পারস্যের উত্তর-পশ্চিমের সারদাশত এবং মাহাবাদ শহরে কাটে তাঁর। স্থানীয় গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান-ইরাক যুদ্ধের শেষ এক বছর, অর্থাৎ ১৯৮৭-’৮৮ সালে লড়াইয়ের ময়দানে ছিলেন মোজতবা। তখন সদ্য ১৮ বছরে পা দিয়েছেন তিনি।
আয়াতোল্লা খামেনেইয়ের উত্তরসূরি নির্বাচিত হলেও (সরকারি ভাবে ঘোষিত নন) তাঁকে সর্বোচ্চ নেতা বা আয়াতোল্লার খেতাব দেওয়া হবে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়। প্রতি আট বছর অন্তর নির্বাচিত অভিজ্ঞ শিয়া ধর্মগুরুদের নিয়ে গঠিত ইরানি সংস্থা ‘অ্যাসেমব্লি অফ এক্সপার্ট’ পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে। ৮৮ সদস্যের এই সংস্থার প্রার্থীদের অনুমোদন দেয় দেশটির সাংবিধানিক পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘গার্ডিয়ান কাউন্সিল’।
২০২৪ সালে ‘গার্ডিয়ান কাউন্সিল’ ইরানের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিকে বিশেষজ্ঞ পরিষদের নির্বাচন থেকে নিষিদ্ধ করে। কারণ তাঁকে কট্টর শিয়াপন্থী না বলে মধ্যপন্থী বলে দাগিয়ে দিয়েছিল কাউন্সিল। হাসানের প্রশাসন ২০১৫ সালে বিশ্বের পরাশক্তিগুলির সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল।
১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর থেকে সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ে ক্ষমতার হস্তান্তর কেবল এক বারই হয়েছে। ১৯৮৯ সালে ইরাকের সঙ্গে আট বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ইরানকে নেতৃত্ব দেওয়ার পর ১৯৮৯ সালে যখন ৮৬ বছর বয়সে আয়াতোল্লা রুহুল্লা খোমেইনি মারা যান তখন।
সব ছবি: সংগৃহীত।