মহাজাগতিক ঘটনার একটি অংশ হল গ্রহণ। প্রকৃতির নিয়ম মেনেই বছর বছর আমরা এই দৃশ্য দেখতে পাই। কখনও আংশিক, কখনও পূর্ণগ্রাস, আবার কখনও বলয়গ্রাস গ্রহণ। হিন্দু ধর্মে সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী, রাহু ও কেতু যখন সূর্য ও চন্দ্রকে গ্রাস করে তখন যথাক্রমে সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ হয়ে থাকে।
সূর্যগ্রহণ হয় অমাবস্যায় এবং চন্দ্রগ্রহণ হয় পূর্ণিমায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সব সময় গ্রহণ দেখা যায় না। সাধারণত চন্দ্র, পৃথিবী এবং সূর্যের অবস্থানের তারতম্যের কারণে বিভিন্ন প্রকার সূর্যগ্রহণ পরিলক্ষিত হয়।
পৃথিবী, সূর্য এবং চন্দ্র মহাকাশে নিজ কক্ষপথে অবিরত পরিভ্রমণকালে সূর্য, চন্দ্র এবং পৃথিবী এক সরলরেখায় অবস্থান করলে, অর্থাৎ, চন্দ্র, পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যে অবস্থানকালে কিছু সময়ের জন্য চন্দ্রের ছায়া পৃথিবীতে পড়লে সূর্যগ্রহণ ঘটে।
২০২৬ সালটি গ্রহণের দিক থেকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৬ সালে চারটি গ্রহণ রয়েছে— দু’টি সূর্যগ্রহণ এবং দু’টি চন্দ্রগ্রহণ। এ বছরের প্রথম সূর্যগ্রহণটি ঘটে ১৭ ফেব্রুয়ারি। এটি ছিল বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ। এই গ্রহণে চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢাকতে পারে না, ফলে সূর্যের চারদিকে একটি উজ্জ্বল বলয় বা ‘রিং অফ ফায়ার’ দেখা যায়। দক্ষিণ আমেরিকা এবং ইউরোপের কিছু অংশ থেকে দৃশ্যমান হয় গ্রহণটি।
এর পর মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে ৩ মার্চ আরও একটি চন্দ্রগ্রহণ হয়। এটি বছরের প্রথম চন্দ্রগ্রহণ। পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদ পৃথিবীর ছায়ায় সম্পূর্ণ ঢেকে যায় এবং অনেক সময় লালচে আভা ধারণ করে। একে ‘ব্লাড মুনও’ বলে।
একই ভাবে পরবর্তী সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণের মধ্যে ব্যবধান থাকবে প্রায় এক পক্ষকালের। সূর্যগ্রহণ হওয়ার ১৬ দিনের মধ্যে ঘটবে চন্দ্রগ্রহণ। চলতি বছরের ১২ অগস্ট পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের পর ২৮ অগস্ট আংশিক চন্দ্রগ্রহণ প্রত্যক্ষ করবেন পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশের অধিবাসী।
জ্যোতিষ শাস্ত্রমতে, অল্প সময়ের ব্যবধানে ঘটা দু’টি গ্রহণের ঘটনা অশুভ ফলদায়ক। এই ধরনের মহাজাগতিক ঘটনা দেশের ও জনসাধারণের উপর বিস্তর প্রভাব ফেলে। জোড়া সূর্যগ্রহণকে কঠিন সময়ের লক্ষণ হিসাবে দেখা হয়, যা দেশের সরকার বা সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে। বাস্তবে, প্রায়শই জনসাধারণকেই এর ফল ভোগ করতে হয়।
রাশিয়া-ইউক্রেনের মতো দীর্ঘ সংঘাত থেকে শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইজ়রায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ। সব ক’টিই বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক ডামাডোল ও অস্থিরতার ইঙ্গিত বহন করছে। সংঘাতের উত্তেজনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা আরও বড় সঙ্কটের আশঙ্কাকে উস্কে দিচ্ছে।
প্রাচীন মেসোপটেমীয়, চিনা এবং ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্রে সূর্যকে রাজশক্তি বা শাসনের প্রতীক হিসাবে দেখা হত। তাদের মতে, সূর্য যদি ‘আক্রান্ত’ হয় (অর্থাৎ গ্রহণ লাগে), তবে তা দেশের অধিপতি বা শাসনব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা নির্দেশ করে।
একই বছরে একাধিক সূর্যগ্রহণ হলে তা বিশ্বের নেতা ও নাগরিকদের মধ্যে সংঘাতের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তা থেকে বিক্ষোভ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। সেই সঙ্কটগুলি সরাসরি দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে।
এই সংঘাতগুলি বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেছে, যার ফলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে। ভারত-সহ অনেক দেশে অসময়ের বৃষ্টি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষকদের ফসল নষ্ট হচ্ছে। জ্যোতিষশাস্ত্র অনুসারে, এই ধরনের ঘটনা গ্রহের অশুভ অবস্থান এবং গ্রহণের প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত।
গ্রহণের সময় সূর্য ও চন্দ্রের পাশাপাশি রাহু ও কেতুর অবস্থান প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে, ফলে আবহাওয়ায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে। প্রাচীন জ্যোতিষশাস্ত্রীয় দর্শনে রাহু ও কেতুকে ছায়াগ্রহ হিসাবে বর্ণনা করা হয়। গ্রহণের সময় গ্রহ দু’টির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
জ্যোতিষশাস্ত্র এবং প্রাচীন লোকবিশ্বাসে গ্রহণকে সব সময়ই পরিবর্তনের বা বড় কোনও ঘটনার সঙ্কেত হিসাবে দেখা হয়েছে। বিশেষ করে যখন খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে দু’টি গ্রহণ ঘটে, তখন ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে নানা ধরনের তত্ত্ব সামনে আসে।
তবে অনেকের মতে এই ধরনের যুক্তিগুলি প্রাচীন আকাশ পর্যবেক্ষণের একটি সংস্কৃতি। আধুনিক সময়ে এগুলোকে ভয়ের কারণ হিসাবে না দেখে ইতিহাসের একটি অংশ এবং মহাজাগতিক বিস্ময় হিসাবে দেখাই যুক্তিযুক্ত।
ছবি: সংগৃহীত।