এক মাস অতিক্রান্ত। থামার কোনও লক্ষণ নেই ইরান যুদ্ধের। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সংঘাত শেষ করার কথা বললেও এখনও পর্যন্ত এই লড়াই বন্ধের কোনও রফাসূত্রের ইঙ্গিত মিলছে না। চার সপ্তাহ পেরিয়েও সাবেক পারস্য ফৌজের মনোবল চূর্ণ করতে পারেনি ‘সুপার পাওয়ার দেশ’-এর ফৌজ। পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকা-ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে সমান তালে লড়ে চলেছে তেহরান।
যুদ্ধ মানেই যুযুধান দেশগুলির অর্থব্যবস্থায় আঘাত। অর্থব্যবস্থার স্বাস্থ্যহানি ঘটানোর পাশাপাশি মানবসম্পদের হানি যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণাম। যুদ্ধ করতে হলে তার খরচ তো আছেই, কিন্তু তা মোট আর্থিক ক্ষতির একটি অংশমাত্র। যুদ্ধের অন্যান্য আর্থিক ক্ষতির তালিকা দীর্ঘ। যদি মানবসম্পদ বা রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর ক্ষতির মতো জিনিসগুলিকে হিসাবের বাইরেও রাখা যায়, তবে যুদ্ধের অন্যতম ক্ষতি হল, একাধিক দেশের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়া।
আর দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে চললে তার জন্য সামরিক প্রস্তুতি জোরদার রাখতেই হয়। তার জন্য প্রয়োজন বিপুল টাকা। যেহেতু বাজেটের স্বাভাবিক ঊর্ধ্বসীমা রয়েছে, ফলে প্রতিরক্ষা খাতে খরচ বাড়াতে গেলে অন্য খাতে টান পড়বেই। তাই এই লড়াইয়ে দু’পক্ষেরই হচ্ছে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি, অসংখ্য প্রাণহানি। জলের মতো খরচ হচ্ছে জনগণের করের টাকা।
এই যুদ্ধের বিরতির আপাতত কোনও সম্ভাবনাই খুঁজে পাচ্ছেন না আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞেরা। ফলে যুদ্ধের জন্য দু’পক্ষের ভাঁড়ার থেকে খরচের পরিমাণ অনেক গুণ বাড়বে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেহাল দশা সাধারণ জনতার। সমগ্র বিশ্ব জুড়ে যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব টের পাচ্ছে আমজনতা।
যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে ইরানি জনতার উপর। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে। মার্কিন ও ইজ়রায়েলি হানায় অন্তত ১,৯৩৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। আহত হয়েছেন ২৪,৮০০ জনেরও বেশি মানুষ।
যুদ্ধের বলি হয়েছেন আট মাস থেকে ৮৮ বছরের নাগরিকেরা। তেহরান জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে হাজার হাজার নারী ও শিশু রয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ-র তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র-ইজ়রায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে ইরানে প্রায় ৩,৩০০ জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ১,৪৬৪ জন অসামরিক নাগরিক। এঁদের মধ্যে অন্তত ২১৭টি শিশু রয়েছে।
পরোক্ষ সংঘাতে জড়িয়ে পড়া দেশের ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যানও যথেষ্ট ভয় পাইয়ে দেওয়ার মতো। বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিম এশিয়ার এই যুদ্ধে ৪,৫০০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। ইজ়রায়েল ও ইরান ছাড়াও বাহরিন, কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি-সহ বেশ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশও আক্রমণের শিকার হচ্ছে।
ইরানের সামরিক অভিযানের সঠিক ব্যয় কত তা নিয়ে কোনও সুনির্দিষ্ট বা সরকারি তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ইরান সরকার তাদের সামরিক বাজেট বা যুদ্ধের খরচ সম্পর্কে গোপনীয়তা বজায় রাখে। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে একটি খরচের কাঠামোর আভাস দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে। তাতে দেখা গিয়েছে যুদ্ধের ময়দানে টিকে থাকার জন্য জলের মতো টাকা খরচ করছে তেহরান ও ওয়াশিংটন।
সেই প্রতিবেদনগুলিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরান যে পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করছে, তার উৎপাদন ব্যয় এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচ মার্কিন অস্ত্রের তুলনায় বহুলাংশে কম। সস্তার ড্রোন আর কম খরচের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র— এই দিয়েই সুপার পাওয়ারের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে ইরানি ফৌজের কমান্ডারেরা। আমেরিকার কয়েক কোটি ডলারের আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থাও মুখ থুবড়ে পড়েছে ইরানি হামলায়।
পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধে টমাহক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষার ইন্টারসেপ্টর রকেট বহুল পরিমাণে ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিটির আনুমানিক দাম ১০-৩০ লক্ষ ডলার। অন্য দিকে, মাত্র ৮-১০ লক্ষ ডলার খরচ করে এক একটি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে ইরান।
ইরানি ড্রোন, বিশেষ করে বহুল আলোচিত শাহিদ-১৩৬ দিয়ে বাজিমাত করছে তেহরান। যুদ্ধক্ষেত্রে এই ড্রোনের কার্যকারিতা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত এবং স্বল্প মূল্যের জন্য এটিই ইরানের ভরসার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। প্রতিটি শাহিদ-১৩৬ ড্রোন তৈরি করতে আনুমানিক ২০,০০০ থেকে ৫০,০০০ ডলার খরচ হয়। কিছু বিশ্লেষক আবার বিশেষ পরিস্থিতিতে এর উৎপাদন খরচ ১০,০০০ থেকে ৩৫,০০০ ডলারের আশপাশে হতে পারে বলেও মত দিয়েছেন।
এর সাহায্যে পশ্চিম এশিয়ার একাধিক মার্কিন ঘাঁটি এবং দূতাবাসে নির্ভুল আক্রমণ শানিয়েছে তেহরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর’ বা আইআরজিসি। এর মধ্যে অন্যতম হল বাহরিনের নৌসেনা ছাউনি। সেখানে শাহেদ আছড়ে পড়ার পর দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা গিয়েছে। এই সস্তার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে উপসাগরীয় এলাকায় আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী রেডার ব্যবস্থাকে উড়িয়েছে আইআরজিসি।
অন্য দিকে ‘সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি’র তথ্য অনুসারে, ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ’গুলি (বিশ্বের বৃহত্তম বিমানবাহী জাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ও অন্যতম বৃহৎ আব্রাহাম লিঙ্কন) পরিচালনা করতে প্রতি দিন প্রায় ৬৫ লক্ষ ডলার বা ৫৮ কোটি টাকা খরচ হয়। কারণ এই ধরনের রণতরীগুলি একা ভ্রমণ করে না। সঙ্গে থাকে ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী যুদ্ধজাহাজ, দূরপাল্লার ইন্টারসেপ্টর ইত্যাদি।
২০-৫০ হাজার ডলারের ড্রোন ধ্বংস করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র বা ইজ়রায়েলের ব্যবহৃত প্যাট্রিয়ট বা অন্যান্য আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের একেকটির দাম ২০ থেকে ৪০ লক্ষ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। ইরানে হামলার প্রথম দিনেই আমেরিকার খরচ হয় প্রায় ৭৭ কোটি ৯০ লক্ষ মার্কিন ডলার, ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।
যখন ইরান একসঙ্গে অনেকগুলি ড্রোন (‘সোয়ার্ম’ বা দলবদ্ধ ভাবে) নিক্ষেপ করে, তখন প্রতিপক্ষকে বাধ্য হয়ে প্রতিটি ড্রোন ধ্বংস করতে লক্ষ লক্ষ ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র খরচ করতে হয়। এতে বহু গুণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে আমেরিকার। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে ১,০০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। অন্য দিকে ইজ়রায়েলি বিমানবাহিনী আরও ৭৫০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর দু’সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইজ়রায়েল মোট ১৫ হাজার হামলা চালানোর দাবি করেছে। যুদ্ধের দশম দিন থেকে হামলার গতি কমে প্রতি দিন ৩০০-৫০০ লক্ষ্যবস্তুতে নেমে এসেছে। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র মাত্র এক মাসে ৮৫০টিরও বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে, যা তাদের বার্ষিক উৎপাদনের চেয়ে অনেক বেশি।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পেন্টাগন প্রতি দিন ১ হাজার কোটি ডলার খরচ করছে। ইরান যেখানে প্রায় ১৯ লক্ষ টাকা মূল্যের ড্রোন ব্যবহার করছে সেই ড্রোনকে প্রতিহত করতে ১২ কোটি থেকে ৩৭.৯ কোটি টাকা মূল্যের ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করছে। সংঘাতের মাত্র প্রথম ছয় দিনেই আমেরিকার কোষাগার থেকে ১১ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছিল বলে পেন্টাগনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ইরানের যুদ্ধের জন্য হোয়াইট হাউস আরও ১৯ লক্ষ কোটি টাকা চাইছে। পেন্টাগনের সাবেক বাজেট কর্মকর্তা এলেইন ম্যাককাসকারের মতে, যুদ্ধের প্রথম তিন সপ্তাহে যুদ্ধজনিত ক্ষয়ক্ষতি এবং সেই ক্ষতিপূরণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ১৩,২৮১ কোটি টাকা থেকে ২৭,৫১০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে বলে সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ জানিয়েছে।
ছবি: সংগৃহীত ও এ আই সহায়তায় প্রণীত।