কোনও উল্কাপাত বা মহাপ্রলয় নয়, প্রয়োজন পড়বে না পরমাণু বোমারও। মানবজাতির অবলুপ্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে মানুষেরই তৈরি ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যাবে প্রযুক্তি। যে ভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দৌড়োতে শুরু করেছে তাতে নিয়ন্ত্রণ বা লাগাম না পরাতে পারলে এই প্রযুক্তি সমস্ত মানবজাতির ‘বিনাশের’ কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাড়বাড়ন্ত মানবসভ্যতাকে যে বিপদের সম্মুখীন করবে, পরমাণু অস্ত্রের আঘাতের চেয়েও তা হবে ভয়ঙ্কর। উন্নত এআই ভুল হাতে পড়লে বা নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করলে তা বিশ্ব জুড়ে বিধ্বংসী সাইবার আক্রমণ বা স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধের সূচনা করতে পারে।
এই আশঙ্কার কথা শুনিয়েছেন খোদ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ। তিনি কৃত্রিম মেধা সংস্থা ওপেনএআইয়ের গভর্ন্যান্স টিমের প্রাক্তন গবেষক ড্যানিয়েল কোকোতাজলো। সম্প্রতি আমেরিকার টিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘দ্য ডেইলি শো’-তে কথা বলতে গিয়ে হতাশার কথাই শুনিয়েছেন তিনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এই গবেষক। তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই ঝুঁকিগুলি প্রকট হতে আর বেশি দেরি নেই। আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও খুব একটা আশাবাদী নন কোকোতাজলো। বরং একটি হতাশাজনক চিত্রই তুলে ধরেছেন তিনি। কী ভাবে দ্রুত উন্নত হওয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাগুলি মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে তা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন এই গবেষক। তাঁর এই সতর্কবার্তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে চলমান বৈশ্বিক উদ্বেগেরই প্রতিফলন।
কোকোতাজলোর বক্তব্যের মূল সুরটি হল, এআই ব্যবস্থাকে যদি মানুষের নৈতিকতা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা না হয়, তবে তা অচিরেই মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ‘আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স’-এর (এজিআই) নিরলস সাধনার চেয়ে নিরাপত্তার অগ্রাধিকারের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন তিনি। কিন্তু এআই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলির উপর আস্থা বজায় রাখতে পারেননি তিনি।
২০২৪ সালের এপ্রিলে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এআই সংস্থা থেকে পদত্যাগ করেন কোকতাজলো। তাঁর ধারণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে ভাবে প্রাথমিক স্তর থেকে এক লাফে শীর্ষে আরোহণ করছে, তাতে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যদি এআই সিস্টেমের লক্ষ্য এবং মানুষের নৈতিকতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকে, তবে এটি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠতে পারে। যদি এআই-এর নিয়ন্ত্রণ মানুষের হাত থেকে চলে যায়, এর পরিণাম মানবজাতির বিলুপ্তি। আর এর আশঙ্কা ৭০ শতাংশের কাছাকাছি। এমনটাই মত কোকোতাজলোর। ‘বিলুপ্তি’ শব্দটির উপর জোর দিতেও শোনা গিয়েছে তাঁকে।
এই ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী মানবজাতিকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুললেও এআই গবেষক জোর দিয়ে বলেছেন যে, এআই-এর গতি শুধু দ্রুতই নয় বরং আগ্রাসী। প্রতি বছর তা আরও বাড়ছে। তিনি বলেন, “এআই-এর অগ্রগতি অত্যন্ত দ্রুত হবে এবং এটি নাটকীয় ভাবে ত্বরান্বিত হবে।” শুধু তা-ই নয়, কৃত্রিম মেধার বাড়বাড়ন্তের সময়সীমাই তাঁর সতর্কবার্তাকে আরও বেশি উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
তাঁর উদ্বেগের মূল কারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে মানবজাতির ক্ষমতা কমে যাওয়া। এই বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে ওপেনএআইয়ের প্রাক্তন গবেষককে। বর্তমানে একটি এআই সিস্টেম বন্ধ করতে হলে তা প্লাগ খুলে ফেলার মতোই সহজ মনে হতে পারে। কিন্তু কোকোতাজলো সতর্ক করেছেন যে, ভবিষ্যতে এই বিকল্প না-ও থাকতে পারে।
যেহেতু এআই সিস্টেমগুলো প্রতিরক্ষা ও সামরিক নেটওয়ার্কের মতো পরিকাঠামোর গভীরে আরও বেশি করে গেঁথে যাচ্ছে, তাই সেগুলিকে থামানোর যে কোনও প্রচেষ্টা অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে, মানুষ হয়তো বিচ্ছিন্ন যন্ত্রের সঙ্গে নয়, বরং এমন সিস্টেমের সঙ্গে মোকাবিলা করবে যা স্বাধীন ভাবে এবং বৃহৎ পরিসরে কাজ করতে সক্ষম।
উন্নত এআই ভুল হাতে পড়লে বা নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করলে তা বিশ্ব জুড়ে বিধ্বংসী সাইবার আক্রমণ বা স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধের সূচনা করতে পারে, এই আশঙ্কা বেশি করে ভাবাচ্ছে কোকোতাজলো ও তাঁর সমমনস্ক কৃত্রিম মেধা গবেষকদের।
উন্নত এআই ব্যবস্থা যে দিন বুঝতে পারবে যে, তাকে যদি কেউ বন্ধ করে দেয় তবে সে তার লক্ষ্যপূরণ করতে পারবে না, সে দিন সে নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা করতে পারে, আশঙ্কা করছেন তাঁরা। কৃত্রিম মেধা তৈরির সংস্থাগুলি একে অপরের আগে এআই তৈরির দৌড়ে নিরাপত্তার দিকটি উপেক্ষা করছে, এই অভিযোগও করেছেন কোকোতাজলোর মতো বিশেষজ্ঞেরা।
যদি এআই-এর লক্ষ্য মানুষের নৈতিকতা বা নিরাপত্তার সঙ্গে পুরোপুরি না মেলে, তবে সেটি অজান্তেই বড় ক্ষতি করে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষকদের একাংশ। এআই যদি নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে এবং মানুষের দেওয়া ‘অফ সুইচ’ বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে বাধা হিসাবে দেখে, তবে তা বিপজ্জনক হতে পারে।
এআই-এর একা কাজ করার ক্ষমতা রয়েছে। এমনকি মানুষের বুদ্ধিমত্তাকেও ছাপিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার। ফলে বিশ্বব্যাপী ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার করে মানবসত্তাকে টক্কর দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নামতে পারে কৃত্রিম মেধা।
এআই শিল্পে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ার কারণে অনেকেই নতুন নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করছেন। ফলে এর অপব্যবহার ঠেকানো অসম্ভব হয়ে উঠছে। তাঁর দাবি, কৃত্রিম মেধা বিশ্বকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা তা খুঁজে বার করা কঠিন হয়ে পড়বে।
কোকোতাজলোর আশঙ্কা, প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সহজ পথ বেছে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি করতে পারে। যদি কোনও একটি সংস্থা ঝুঁকি মোকাবিলা ও সুরক্ষার জন্য গতি কমায়, তবে অন্যটি হয়তো এগিয়ে যাবে। ফলে এআই শিল্প জুড়ে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা প্রণয়নের কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
ওপেনএআইয়ের প্রাক্তন গবেষক আসন্ন পরিস্থিতি সম্পর্কেও সতর্ক করেছেন, যেখানে এআই আর মানুষের উপর একেবারেই নির্ভরশীল থাকবে না। তাঁর ব্যাখ্যা, ভবিষ্যতের সিস্টেমগুলি তাদের নিজস্ব পরিকাঠামো তৈরি ও পরিচালনা করতে পারবে। সহজ কথায় লাখ লাখ অতি বুদ্ধিমান এআই থাকবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শেষমেশ রোবটচালিত কারখানা তৈরি করতে পারে যা মানুষের সহায়তা ছাড়াই নিজেদের টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হবে।
একাধিক বিশেষজ্ঞ ‘ভবিষ্যদ্বাণী’ করছেন যে, ২০২৭ বা ২০২৮ সালের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রে মানুষের সমতুল্য বুদ্ধি বা ক্ষমতায় পৌঁছোবে। এর পরবর্তী ‘বুদ্ধিমত্তার বিস্ফোরণের’ মধ্যেই বিপদটি নিহিত। যখন কোনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের চেয়ে উন্নত ও উচ্চস্তরের গবেষণা করতে সক্ষম হবে, তখন সেটি নিজের কোড নতুন করে লেখা শুরু করতে পারে। ফলে সেটি কৃত্রিম মেধাকে আত্ম-উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাবে। কয়েক মাসের মধ্যেই মানুষের তত্ত্বাবধানকে সম্পূর্ণ রূপে অগ্রাহ্য করতে পারবে এআই। এর জন্য কয়েক দশক অপেক্ষা করতে হবে না।
ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।