৫০ বছর পার করে ফেলেছেন বলিউডে। ৭৫ বছর পূর্ণ করেছেন বর্ষীয়ান এই অভিনেত্রী। গীতিকার জাভেদ আখতারের সঙ্গে বিয়ের চার দশক অতিক্রান্ত শাবানা আজ়মির। ১৯৮৪ সালে জাভেদ ও শাবানা বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন। তার আগে চিত্রনাট্যকার হনী ইরানীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে ছিলেন জাভেদ।
বিবাহিত পুরুষ, তার উপরে তখন হনী ইরানির সঙ্গে সংসার করছিলেন জাভেদ। দুই সন্তানের পিতা। স্বাভাবিক ভাবেই এই বিয়েতে মত ছিল না শাবানার অভিভাবকদের। প্রখ্যাত উর্দু কবি ও গীতিকার কাইফি আজ়মি এবং ভারতীয় মঞ্চজগৎ ও চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী শওকত কাইফি কেউই মেয়ের সিদ্ধান্তে খুশি হতে পারেননি। বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক মেনে নিতে নারাজ ছিলেন শাবানার পরিবার।
জাভেদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ানোর আগেও দু’জনকে মন দিয়েছিলেন বলিউডের অন্য ধারার এই অভিনেত্রী। শ্যাম বেনেগালের পরিচালনায় অভিনয়ে হাতেখড়ি হয়েছিল শাবানার। ১৯৭৪ সালে ‘অঙ্কুর’ ছবি দিয়ে হিন্দি ছবির জগতে পা রাখেন তিনি। তার পর থেকে নানা চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। বরাবরই তাঁকে স্পষ্টবক্তা বলে চেনে বলিউড। বলিপাড়ার গুঞ্জন, পাঁচ দশক অভিনয় পেশায় কাটিয়ে দেওয়া শাবানা অভিনয় শুরু করার আগেই মন দিয়ে বসেছিলেন এক অভিনেতাকে।
) মঞ্চাভিনেতা বেঞ্জামিন গিলানির প্রেমে পড়েছিলেন ছাত্রী থাকাকালীনই। পুণের ‘ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া (এফটিআই)’য় শাবানার সহপাঠী ছিলেন বেঞ্জামিন। ৭০-এর দশকে একে অপরের প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছিলেন শাবানা ও বেঞ্জামিন। পুণের ক্লাসে বেঞ্জামিনের সহপাঠী ছিলেন নাসিরুদ্দিন শাহ এবং টম অল্টারের মতো অভিনেতা।
মূলত মঞ্চেই সফল ছিলেন বেঞ্জামিন। সিনেমার পাশাপাশি টিভি শোতেও অভিনয় করেছেন তিনি। তাঁর প্রথম ছবি ছিল ‘আলাপ’ (১৯৭৭)। তিনি ‘হমদম’ (২০০৫), ‘বারা আনা’ (২০০৯),‘ জয় হো! ডেমোক্র্যাসি’ (২০১৫)-এর মতো ছবিতে কাজ করেছিলেন। সাম্প্রতিক হিট ছবি বলতে ‘বাজীরাও মস্তানী’।
১৯৭৪ সালে শাবানা প্রথম সেলুলয়ে়ডের পর্দায় মুখ দেখান। শোনা যায়, সেই বছরই বাগ্দান সম্পন্ন হয়েছিল প্রেমিক বেঞ্জামিনের সঙ্গে। শাবানার প্রথম ছবি ‘অঙ্কুর’ বক্সঅফিসে সাফল্যের মুখ দেখে। শাবানা হলেন সেই বিরল অভিনেত্রী যিনি প্রথম ছবিতে অভিনয় করেই জাতীয় পুরস্কার জিতেছিলেন। সাফল্য ও খ্যাতি হাত ধরাধরি করে এসেছিল শাবানার জীবনে।
প্রেমিকার সাফল্যে নাকি খুশি হতে পারেননি বেঞ্জামিন। দূরত্ব বাড়তে থাকে দু’জনের। শেষমেশ মতবিরোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে বাগ্দান ভেঙে যায়। পরে পেশাগত সাফল্যে শাবানার ধারেকাছে আসতে পারেননি বেঞ্জামিন। ১৯৭৭ সালে টম অল্টার এবং নাসিরুদ্দিন শাহের সঙ্গে জুটি বেঁধে একটি থিয়েটার সংস্থা পত্তন করেন বেঞ্জামিন, নাম দেন ‘মটলিজ প্রোডাকশনস’। ১৯৭৯ সালে পৃথ্বী থিয়েটারে তাঁদের প্রথম নাটক ‘ওয়েটিং ফর গোডো’ মঞ্চস্থ হয়। পরে দীর্ঘ দিন ছোট পর্দায় অভিনয় করেছেন বেঞ্জামিন।
বেঞ্জামিনের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের পর শাবানা কেরিয়ারে মন দিয়েছিলেন। আশির দশকে তিনি কেরিয়ারের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিলেন বলা চলে। ‘স্পর্শ’ (১৯৮০), ‘আর্থ’ (১৯৮২), ‘মাসুম’ (১৯৮৩) এবং ‘মান্ডি’ (১৯৮৩) ছবিতে তাঁর অভিনয় সিনেপ্রেমীদের মনে চিরস্থায়ী ছাপ ফেলেছিল। তাঁর অভিনয়ে দর্শক মুগ্ধ হয়েছিলেন। কঠিন চরিত্রগুলিকে নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন স্বচ্ছন্দ ভঙ্গিতেই।
সেই সময়ে চলচ্চিত্রনির্মাণের ভূত মাথায় চেপেছিল এক তরুণের। মামাবাড়ির দিকে প্রত্যেকেই নামজাদা পরিচালক। বলিউড শাসন করা পরিবারগুলির মধ্যে অন্যতম। আনন্দ পরিবার। নবকেতন ফিল্মস প্রযোজনা সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা। দেব আনন্দ, চেতন আনন্দ সম্পর্কে তাঁর মামা। সেই পরিবারেরই ভাগ্নে হয়ে কি ফিল্মি দুনিয়া থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা যায়! ইংল্যান্ডের চাকরির মায়া ছেড়ে ভারতে ফিরে আসেন শেখর কপূর।
১৯৮৩ সালে শেখর তৈরি করলেন ঐতিহাসিক সিনেমা ‘মাসুম’। এরিক সেগালের উপন্যাসকে ভিত্তি করে তৈরি হওয়া সেই সিনেমায় ছিলেন শাবানাও। শোনা যায়, সেই সময়ই ছবির নায়িকার প্রেমে মজেছিলেন ‘মাসুম’-এর পরিচালক শেখর। তবে বলিপাড়ায় এ-ও শোনা যায় যে ‘মাসুম’ তৈরি করার অনেক আগে থেকেই পরস্পরকে চিনতেন শেখর ও শাবানা। প্রথম ছবি সুপার হিট। তার পর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি তারকা পরিবারের সন্তান শেখরকে।
১৯৮৭ সালে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’। তারকাদের অভিনয়, ছবির গান থেকে চিত্রনাট্য সব কিছুই দর্শকের প্রশংসা কুড়োয়। ১৯৯৪ সালে মুক্তি পায় শেখর পরিচালিত ছবি ‘ব্যান্ডিট কুইন’। আশির দশকে বক্সঅফিসে দুর্দান্ত ব্যবসা করে শেখরের ছবি। তিন দশক ধরে এই ছবি দর্শকের মনে জায়গা করে রেখেছে।
‘মাসুম’ ছবির শুটিং চলাকালীন শেখর ও শাবানার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের বন্ধুত্ব প্রেমে পরিণত হয়। শোনা যায়, সাত বছর সম্পর্কে ছিলেন শাবানা ও শেখর। সাত বছরের দীর্ঘ সম্পর্কের সময়ও শাবানা এবং শেখর নিজেদের পেশাগত জীবনে মনোযোগী ছিলেন। কখনও তাঁদের সম্পর্ক চলচ্চিত্রের উপর প্রভাব ফেলতে পারেনি।
তবে, কানাঘুষো শোনা যায়, শাবানা এবং শেখর লিভ-ইন সম্পর্কেও ছিলেন। তাঁদের প্রেমের গল্পের শুরুতে, অনেকে ‘ভবিষ্যদ্বাণী’ করেছিলেন যে এই সম্পর্ক বেশি দিন স্থায়ী হবে না। আবার কেউ কেউ বলেছিলেন দু’জনের প্রেম বা ডেট আসলে ছবির প্রচারের কৌশল ছিল।
বলিপাড়ার গুঞ্জন, একত্রবাসের সময় বেশ কিছু মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল দু’জনের। সেই মতবিরোধ চরমে উঠতেই বিচ্ছেদের পথে হেঁটেছিলেন তাঁরা। বিচ্ছেদের পর শাবানার সঙ্গে পেশাগত দূরত্বও তৈরি হয়ে যায় শেখরের। ৪০ বছর পার করেও তাঁরা দু’জন কখনও একসঙ্গে কাজ করেননি।
শাবানা আজ়মির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পর, মেধা গুজ়রালকে বিয়ে করেন শেখর। কিন্তু ১৯৯৪ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে। এর পর, ‘কভি হাঁ কভি না’ খ্যাত অভিনেত্রী সুচিত্রা কৃষ্ণমূর্তির সঙ্গে প্রেম হয় শেখরের। ১৯৯৯ সালে তাঁরা গাঁটছড়া বেঁধেছিলেন। তাঁদের একটি কন্যাও রয়েছে। কিন্তু সেই সম্পর্কও চিরস্থায়ী হয়নি। শেখর এবং সুচিত্রা ২০০৭ সালে আলাদা হয়ে যান। সিঙ্গল মাদার হিসাবেই সন্তানকে মানুষ করেছেন সুচিত্রা।
দু’টি ব্যর্থ প্রেমের পর শাবানার ভালবাসা আশ্রয় খুঁজে পায় জাভেদের কাছে। একটি সাক্ষাৎকারে জাভেদ জানিয়েছিলেন, শাবানাকে যখন তিনি ঠিকমতো চিনতেনও না তখন থেকেই একটা আকর্ষণ অনুভব করতেন। মনের গোপন কথা তুলে ধরতে গিয়ে জাভেদ স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে প্রথমে আকর্ষণ আসে, পরে ভালবাসা আসে। শাবানার মধ্যে এমন কিছু ছিল যার আর্কষণ এড়ানো অসম্ভব ছিল। কোন মুহূর্তে তিনি অভিনেত্রীর প্রেমে পড়ছিলেন তা ঠিকমতো আজও বুঝে উঠতে পারেননি জাভেদ।
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকে জাভেদ-হনীর সম্পর্কে ভাঙন ধরে। ১৯৭৮ সালে স্বামীর থেকে আলাদা হয়ে যান হনী। ছ’বছরের মেয়ে এবং চার বছরের ছেলেকে নিয়ে একা থাকতে শুরু করেন তিনি। ১৯৮৫ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। তার আগেই ১৯৮৪ সালে শাবানা আজ়মিকে বিয়ে করেন জাভেদ। এখন জাভেদ থাকেন শাবানা আজ়মির সঙ্গে। অতীতের তিক্ততা ভুলে প্রাক্তন স্ত্রী হনীর সঙ্গেও সুসম্পর্ক রয়েছে তাঁর। দুই স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়েই পারিবারিক আড্ডায় মাতেন জাভেদ, কখনও আবার মধ্যাহ্নভোজন সারেন একসঙ্গে।
ছবি: ইনস্টাগ্রাম ও সংগৃহীত।