একসময় মাওবাদীদের ‘লাল সন্ত্রাস’-এর জন্য পরিচিত ছিল এলাকা। মহারাষ্ট্রের সেই গঢ়চিরৌলিতে এখন রাজত্ব অন্য এক ‘লাল’-এর। সেই লাল হল স্ট্রবেরি, যার চাষ ওই অঞ্চলের মানুষদের এত দিন অজানা ছিল। কিন্তু এখন সেই স্ট্রবেরি চাষেই মেতেছেন গঢ়চিরৌলির চাষিরা। চলতি বছর ফসলটি ভাল আয় এনে দিয়েছে ওই এলাকার কৃষকদের।
গঢ়চিরৌলিতে শেষ বার গ্রামবাসীরা যখন ‘সরকারের অস্তিত্ব’ দেখেছিলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী তখন ইন্দিরা গান্ধী! তার পর অর্ধশতক পেরিয়ে গেলেও মহারাষ্ট্রের গঢ়চিরৌলি জেলার ভমরাগঢ় মহকুমার ওই এলাকায় ‘প্রবেশ নিষিদ্ধ’ ছিল পুলিশ-প্রশাসনের। কারণটা হল অধুনা সিপিআই (মাওবাদী) এবং তাদের ‘খণ্ডিত পূর্বসূরি’ জনযুদ্ধের (‘পিপল্স ওয়ার গ্রুপ বা পিডব্লিউজি) জারি করা নিষেধাজ্ঞা।
গত বছর (পড়ুন ২০২৫) ‘রেড করিডর’ (মাওবাদী পরিভাষায়, কমপ্যাক্ট রেভলিউশনারি জ়োন)-এর ভরকেন্দ্র হিসাবে পরিচিত গঢ়চিরৌলির প্রত্যন্ত গ্রাম ফুলনারে অবশেষে গড়ে তোলা হয়েছে পুলিশ ফাঁড়ি। দীর্ঘ ৫০ বছর পরে মাওবাদীদের কমান্ড সেন্টারেই উড়েছে তেরঙা পতাকা। পুলিশ ফাঁড়ির পাশাপাশি গ্রামবাসীদের সাহায্যের জন্য তৈরি হয়েছে প্রশাসনিক কেন্দ্র।
কী ভাবে দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে সশস্ত্র নকশালপন্থী-মাওবাদীদের মুক্তাঞ্চল হয়ে রইল গঢ়চিরৌলির ফুলনার-গুন্ডুরওয়াহি এলাকা? মহারাষ্ট্র পুলিশকর্তাদের মতে, পাহাড়-জঙ্গলে ঘেরা এই দুর্গম উপত্যকা মাওবাদীদের ‘প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ’ হিসাবে কাজ করত। বর্ষাকালে পাহাড়ি খরস্রোতা নদী পার্লকোটার জল বেড়ে যাওয়ায় এবং ঘন ঘন হড়পা বানের কারণে প্রায় সাত মাস তা পারাপার করা যেত না।
নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানগুলিতে মাওবাদী সশস্ত্র শাখা পিএলজিএ (পিপল্স লিবারেশন গেরিলা আর্মি)-র বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন, কোম্পানি এবং মিলিশিয়া দলমের সদস্যেরা মোতায়েন থাকতেন। এলাকা জুড়ে পেতে রাখা হয়েছিল ল্যান্ডমাইন, ডাইরেকশনাল মাইন, বুবি ট্র্যাপ, আইইডি (ইম্প্রোভাইজ়ড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস)-র ‘ফাঁদ’। ফলে যৌথবাহিনীর নাগালের বাইরেই থেকে গিয়েছিল ‘জনতানা সরকার’-এর (মাওবাদীদের নিজস্ব প্রশাসনিক ব্যবস্থা) রাজধানী হিসাবে পরিচিত ফুলনার-গুন্ডুরওয়াহি।
পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ২০২৪ থেকে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ২০২৬ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে ভারতকে ‘মাওবাদী মুক্ত’ করার কর্মসূচি ঘোষণার পরে। ছত্তীসগঢ়, তেলঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশার পাশাপাশি মহারাষ্ট্রের পূর্বের মাওবাদী ঠিকানাগুলিতে ধারাবাহিক ভাবে হানা দিতে থাকে যৌথবাহিনী।
কেন্দ্রীয় বাহিনী সিআরপিএফের জঙ্গলযুদ্ধে প্রশিক্ষিত ‘কোবরা’ ব্যাটালিয়নের পাশাপাশি মহারাষ্ট্র পুলিশের বিশেষ মাওবাদী দমন বাহিনী সি-৬০-এর জওয়ানেরা ধারাবাহিক অভিযান শুরু করেন গঢ়চিরৌলী জেলায়। পরিণামে একের পর এক মাওবাদী নেতা-কর্মী নিহত হন। আত্মসমর্পণে বাধ্য হন দেড় দশক আগে পশ্চিমবঙ্গে নিহত মাওবাদী নেতা মাল্লোজুলা কোটেশ্বর রাও ওরফে কিষেণজির ভাই মাল্লোজুলা বেণুগোপাল রাওয়ের মতো শীর্ষস্থানীয় নেতা।
বস্তুত, গত বছর ৬০ পিএলজিএ গেরিলা-সহ বেণুগোপালের আত্মসমর্পণের পরেই ফুলনার-গুন্ডুরওয়াহিতে ভেঙে পড়েছিল মাওবাদী প্রতিরোধ। তার পরেই সেখানে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় প্রশাসনের কর্তৃত্ব।
সেই গঢ়চিরৌলী জেলা এখন মাওবাদীদের লাল-মুক্ত হলেও, তা অন্য লাল, অর্থাৎ স্ট্রবেরি চাষে ভরে গিয়েছে। গঢ়চিরৌলীর মুলচেরার ভূখণ্ড পাহাড়ি হওয়ায় এখানকার জলবায়ু মহারাষ্ট্রের বিখ্যাত শৈলশহর মহাবালেশ্বরের মতো। মহাবালেশ্বর স্ট্রবেরি উৎপাদনের জন্য পরিচিত।
‘মাওবাদী-মুক্ত’ হওয়ার পর থেকে তাই স্ট্রবেরি চাষে মেতেছেন গঢ়চিরৌলীর চাষিরা। ওই অঞ্চলের কৃষকদের সাহায্য করার জন্য জেলা কৃষি বিভাগের একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ হিসাবে স্ট্রবেরি চাষ চালু হয়েছিল।
এখন সেই উদ্যোগ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। গঢ়চিরৌলীর অনেক কৃষক এখন স্ট্রবেরি চাষ শুরু করেছেন তাঁদের জমিতে। উল্লেখ্য, গঢ়চিরৌলীতে যে স্ট্রবেরি উৎপাদিত হয়, তা প্রতিবেশী ছত্তীসগঢ়ের রাজনন্দগাঁও জেলা থেকে আনা একটি প্রজাতি।
কিন্তু মহারাষ্ট্রের ওই অঞ্চলে স্ট্রবেরি কী ভাবে একটি লাভজনক চাষে পরিণত হল? কৃষি কর্মকর্তা বিকাশ পাতিলকে উদ্ধৃত সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, একটি জেলা উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে একটি ছোট পরীক্ষা হিসাবে স্ট্রবেরি শুরু হয়েছিল গঢ়চিরৌলীতে। কিন্তু চাষ শুরুর পর স্ট্রবেরি ভাল মুনাফা এনে দেয় কৃষকদের। সেই শুরু।
পাতিল বলেন, ‘‘আমরা জেলায় একটি উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে পরীক্ষামূলক ভাবে স্ট্রবেরি চাষ শুরু করেছিলাম। আমরা ৫০ জন কৃষককে স্ট্রবেরি চাষ করতে দিয়েছিলাম এবং তাঁরা সকলেই সফল। ২০১৯ সালে এই ধারণাটি প্রথম আমাদের মাথায় আসে।’’
পাতিল আরও বলেন, ‘‘আমরা লক্ষ করেছিলাম যে এখানকার চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকা সত্ত্বেও রাজনন্দগাঁওয়ের কৃষকেরা স্ট্রবেরি চাষ করছেন। আমরা কিছুটা গবেষণা করে কৃষকদের পরীক্ষামূলক ভাবে স্ট্রবেরি চাষ করতে উৎসাহিত করি। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে এখানে স্ট্রবেরি চাষ করা সম্ভব এবং আমরা শীতকালীন জাতটি বেছে নিয়েছি যা এই তাপমাত্রায় টিকে থাকতে পারে।’’
পাতিলের কথায়, ‘‘মহারাষ্ট্র সরকারের অধীনে আমরা পরিস্থিতি বদলে দিয়েছি। কৃষকেরা এখন স্ট্রবেরি চাষ করে অন্যান্য ফসলের তুলনায় বেশি আয় করছেন।’’
প্রাথমিক ভাবে সাফল্য আসার পর উৎসাহিত হয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এখন আরও বেশি কৃষককে স্ট্রবেরি চাষে সহায়তা করার পরিকল্পনা করছেন। কৃষকদের এই ফল চাষের পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি চাষের কারণে গঢ়চিরৌলীর অর্থনৈতিক পরিবর্তনের দিকেও নজর রাখা হচ্ছে প্রশাসনের তরফে।
নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে গঢ়চিরৌলীর স্ট্রবেরি চাষি দীপক কালিদাস কর্মকার জানিয়েছেন, গত কয়েক বছর ধরে এই ফসল থেকে নিয়মিত আয় হচ্ছে তাঁর। তাঁকে দেখে অন্য কৃষকদেরও স্ট্রবেরি চাষে আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে দাবি করেছেন দীপক।
সংবাদমাধ্যমে দীপক বলেন, ‘‘আমি তিন বছর ধরে স্ট্রবেরি চাষ করছি এবং গত দু’বছর খুব ভাল ফলন হয়েছে। এ বার ফলন কিছুটা কম হলেও তা বেশ ভাল হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন সাহায্য করেছে। আমি এ বছর ইতিমধ্যেই ৫০,০০০ টাকার স্ট্রবেরি বিক্রি করেছি।’’
দীপক আরও বলেন, ‘‘আমি গত দু’-তিন বছর ধরে স্ট্রবেরি চাষ শুরু করেছি এবং এ বছর অন্তত ৫০ জন কৃষক স্ট্রবেরি চাষ করছেন। আগামী বছর আরও বেশি ফলন পাওয়া যাবে। কারণ আরও বেশি কৃষক এই ফসল চাষ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এটি চাষ করলে কৃষকদের ভাল লাভ হয়।’’
গঢ়চিরৌলী যখন বিদ্রোহ এবং হিংসার ছায়া থেকে বেরিয়ে আসছে, তখন জেলার কৃষকেরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই রচনা করছেন। ওই অঞ্চলে এখন মাওবাদীদের ত্রাস কমার ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে যেমন শান্তি ফিরেছে, তেমনই স্বাভাবিক হয়েছে জীবনযাপন। পাশাপাশি, লাল ফসলের কারণে অর্থনৈতিক দিক দিয়েও লাভবান হয়েছেন সাধারণ মানুষ।
সব ছবি: সংগৃহীত।