বলিউডের ‘পারফেকশনিস্ট’। ক্যামেরার সামনে অভিনয়ের পাশাপাশি ক্যামেরার পিছনের কাজকর্ম সামলানোতেও সিদ্ধহস্ত। কিন্তু বলিউডের প্রথম সারির এক ছবিনির্মাতা নাকি অভিনেতা আমির খানের ‘সবজান্তা’ আচরণের জন্যই বিরক্ত বোধ করতেন। এমনকি, তাঁর কাছে কাজ করার প্রস্তাব নিয়ে গেলেও আমিরকে নাকি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন শেখর কপূর।
১৯৭৩ সালে শিশুশিল্পী হিসাবে অভিনয় শুরু করেছিলেন আমির। তাঁর বাবা তাহির হুসেন ছিলেন বলিউডের প্রযোজক। হাতেগোনা তিন-চারটি ছবিতে অভিনয়ও করেছিলেন তাহির। কিন্তু ক্যামেরার পিছনে কাজ করার প্রতি বেশি আগ্রহ ছিল আমিরের বাবার।
আমির এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, একটি ছবিনির্মাণের জন্য তাঁর বাবা তাহির অনেকের কাছে টাকা ধার নিয়েছিলেন। ছবিতে অভিনয়ের জন্য যে তারকাদের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তাঁরা কেউ শুটিংয়ের জন্য সময় দিতেন না। অন্য দিকে, টাকা ধার করে ভরাডুবি হয়েছিল তাহিরের।
আমির বলেছিলেন, ‘‘বাবা খুব সরল মনের মানুষ ছিলেন। এত টাকা ধার নেওয়া যে উচিত হয়নি, তা বুঝতে পারেননি। যখন-তখন বাবাকে লোকে ফোন করতেন। বাবা যে টাকা ফেরত দিতে পারছেন না, তা নিয়ে দু’পক্ষের ঝগড়া শুরু হত। আমার একদম ভাল লাগত না।’’
আমির তাঁর জেঠু নাসির হুসেনের অনুপ্রেরণায় অভিনয় শুরু করেছিলেন। ১৯৭৩ সালে নাসিরের পরিচালনায় মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ইয়াদোঁ কি বারাত’ ছবিতে শিশুশিল্পী হিসাবে অভিনয় করেছিলেন তিনি। তার পর ১৯৮৪ সালে ‘হোলি’ ছবির মাধ্যমে প্রথম প্রাপ্তবয়স্ক চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছিলেন আমির।
১৯৯০ সালে ‘তুম মেরে হো’ নামের একটি ছবির চিত্রনাট্যনির্মাণের পাশাপাশি পরিচালনাও করেছিলেন তাহির। সেই ছবিতে পুত্র আমিরকে অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি। আমিরের বিপরীতে জু়টি বেঁধে অভিনয় করেছিলেন বলি অভিনেত্রী জুহি চাওলা।
১৯৮৮ সালে ‘কয়ামত সে কয়ামত তক’ ছবিতে কাজ করে রাতারাতি অভিনেতা হিসাবে জনপ্রিয় হয়ে যান আমির। কিন্তু বাবার মতোই তাঁর আগ্রহ ছিল ক্যামেরার পিছনে। পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন তিনি। আমির এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, পছন্দের ছবিনির্মাতা শেখর কপূরের সঙ্গে কাজ করার স্বপ্ন ছিল তাঁর। কিন্তু আমিরের প্রস্তাব নাকি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন শেখর।
১৯৮৭ সালে শেখরের পরিচালনায় প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’। অনিল কপূর, শ্রীদেবীর পাশাপাশি এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন সতীশ কৌশিক। অভিনয় ছাড়াও ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসাবে কাজ করেছিলেন সতীশ। সেই ছবিতে শেখরের সঙ্গে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন আমিরও।
আমির এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’ ছবির শুটিং চলাকালীন সেটে গিয়েছিলেন তিনি। ছবির সহকারী পরিচালক সতীশের সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমিরের। কিন্তু তিনি গাড়িতে চেপে সেটে গিয়েছিলেন বলে তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন সতীশ।
‘মিস্টার ইন্ডিয়া’র সেটে পৌঁছে আমির দেখেছিলেন, একটি গানের শুটিং চলছে। পাঁচ দিন ধরে গানটির শুটিং চলছিল। তখন তিনি কাজ সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখতে চেয়েছিলেন। কিছু হাতে না পাওয়ায় তিনি নিজেই খাতায়কলমে কাজ করে শেখরকে দেখিয়েছিলেন। কিন্তু শেখর তাঁর কাজের কোনও প্রশংসা করেননি।
আমির বলেছিলেন, ‘‘চিত্রনাট্য সম্পর্কে, শট নেওয়ার আগে চরিত্র বিশ্লেষণ নিয়ে খাতায়কলমে কোনও কাজ হত না। সব কাজ মুখে মুখেই হত। আমি নিজে যখন সেই কাজটা করলাম, তখন কোনও প্রশংসা পেলাম না। বরং আমি গাড়ি নিয়ে সেটে গিয়েছিলাম বলে আমায় ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসাবে কাজের সুযোগ দিলেন না কেউ।’’
আমিরের কথায়, ‘‘আমি বাসে, ট্রেনে, এমনকি হেঁটেও যাতায়াত করেছি। গাড়়িটা আমার নিজের ছিল না। সে দিন আরও অনেক জায়গায় যেতে হত বলে গাড়িটা ভাড়া নিয়েছিলাম। কিন্তু এটা তো কোনও কারণ হতে পারে না।’’ পরে শেখরের দিকে আঙুল উঠলে ছবিনির্মাতা স্পষ্ট করে তাঁর সত্য জানান।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে শেখর বলেন, ‘‘আমি আমিরকে কোনও কাজ থেকে বাদ দিইনি। সতীশ দিয়েছিলেন। ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’ ছবির প্রথম সহকারী পরিচালক ছিলেন তিনি। আমিরের গাড়ি নিয়ে সেটে যাওয়া পছন্দ হয়নি তাঁর। সে কথা আমায় জানিয়েও ছিলেন।’’
সতীশ নাকি শেখরকে বলেছিলেন, ‘‘আমি ছবির প্রথম সহকারী পরিচালক। আমিই গাড়িতে যাতায়াত করি না। সেখানে ছবির দ্বিতীয় সহকারী পরিচালক যদি গাড়িতে যাওয়া-আসা করেন, তা হলে কেমন লাগে বলুন দেখি!’’ এই প্রসঙ্গে শেখরের মন্তব্য, ‘‘ভালই হয়েছে আমির ক্যামেরার পিছনে কাজের সুযোগ পাননি। সহকারী পরিচালকেরা কখনও সফল অভিনেতা হতে পারেন না।’’
আমির ক্ষোভপ্রকাশ করে জানিয়েছিলেন যে, শেখর যে কাজের প্রশংসা করেননি সে কাজ দেখে তাঁর জেঠু নাসির ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। পরে নাসিরের ‘মঞ্জিল মঞ্জিল’ এবং ‘জবরদস্ত’ ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসাবে কাজ করেছিলেন আমির। কানাঘুষো শোনা যায়, শেখর নাকি আমির অভিনীত একটি ছবিকে মুক্তির পথও দেখাননি।
বলিপাড়া সূত্রে খবর, ‘টাইম মেশিন’ নামে কল্পবিজ্ঞান ঘরানার একটি ছবি পরিচালনা করেছিলেন শেখর। আমিরের পাশাপাশি সেই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন রেখা, নাসিরুদ্দিন শাহ এবং গুলশন গ্রোভারের মতো বলি তারকারা। ১৯৯২ সালের দিকে এই ছবির শুটিং শুরু হয়েছিল।
বলিউডের গুঞ্জন, ‘টাইম মেশিন’ ছবির চিত্রনাট্য হলিউডের বিখ্যাত সিনেমা ‘ব্যাক টু দ্য ফিউচার’ দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিল। ছবিটির ৭৫ শতাংশ শুটিং শেষ হয়ে গিয়েছিল। তখনই ছবিটির কাজ থামিয়ে দিয়েছিলেন শেখর।
কানাঘুষো শোনা যায়, নতুন ধরনের ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন বলে ‘টাইম মেশিন’ ছবিটি নিয়ে বেশ উৎসাহী ছিলেন আমির। কিন্তু শেখর সেই ছবির কাজ থামিয়ে বিদেশে চলে গিয়েছিলেন। ছবিটির কাজও অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।
বলিপাড়ার অধিকাংশের দাবি, ছবিটির বাজেট নিয়ে সমস্যা হওয়ার কারণে আর কাজ এগোতে পারেননি শেখর। বলিউড থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে বিদেশে চলে গিয়েছিলেন। আবার একাংশের দাবি, আমিরের ‘সবজান্তা’র মতো আচরণই নাকি শেখরের কাছে ক্রমশ বিরক্তির কারণ হয়ে উঠছিল।
শেখর তাঁর ঘনিষ্ঠমহলে নাকি জানিয়েছিলেন, আমিরের প্রতিটি বিষয়ে প্রশ্ন করার অভ্যাস এবং পরিচালনার কাজে হস্তক্ষেপ করার প্রবণতা পছন্দ নয় পরিচালকের। অন্য দিকে, আমিরও নাকি শেখরের কাজের ‘অগোছালো’ পদ্ধতি দেখে বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন।
বলিপাড়া সূত্রে খবর, আমির শুটিং চলাকালীন সব সময় চিত্রনাট্যের খুঁটিনাটি এবং শট দেওয়ার আগে প্রতিটি দৃশ্যের স্পষ্ট ধারণা রাখা পছন্দ করেন। সেটে যাওয়ার আগেও প্রতিটি শট নিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত হতে চান। অন্য দিকে, শেখরের কাজ করার পদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।
শেখর আগে থেকে কোনও বিষয় নিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতেন না। সেটে পৌঁছে শুটিং চলাকালীনও শেষ মুহূর্তে দৃশ্য পরিবর্তন করে ফেলতেন তিনি। কাজের ধরন এবং সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থাকার কারণে আমির এবং শেখরের মধ্যে পেশাদারি দূরত্বের সৃষ্টি হয়।
সব ছবি: সংগৃহীত।