ইরানের সামরিক ক্ষমতাকে গুঁড়িয়ে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে আমেরিকা-ইজ়রায়েল। উদ্দেশ্য, তেহরানের ধর্মীয় সরকারকে উৎখাত করে প্রজাতন্ত্রী শাসনব্যবস্থা কায়েম করা। গায়ের জোরে ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে সরিয়ে দিতে একে একে সে দেশের শীর্ষনেতাদের হত্যা করছে ইজ়রায়েল-আমেরিকা। সামরিক ঘাঁটি এবং পরমাণুকেন্দ্রে আঘাত হানছে ওয়াশিংটন।
ইরানের ‘এলিট’ শিয়া ফৌজ ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড’ বা আইআরজিসি এবং বাসিজ বাহিনীকে অস্ত্রসমর্পণ করার হুঁশিয়ারি দিয়ে চলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্য দিকে, আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের হামলায় ৩৬ বছর ধরে ইরান শাসনকারী আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ছটফট করছে তেহরান।
আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের হামলায় খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পদে এসেছেন খামেনেই-পুত্র মোজতবা খামেনেই। বাবার মৃত্যুর পর যাবতীয় রাজপাট চলে এসেছে তাঁর হাতে। আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত আইআরজিসির নিয়ন্ত্রণও মোজতবার হাতেই রয়েছে।
তেহরানের ধর্মীয় শাসনকে উৎখাত করার লক্ষ্যে মোজতবা-সহ ইরানের প্রথম সারির নেতাদের সরিয়ে দিতে উঠেপড়ে লেগেছে আমেরিকা ও ইজ়রায়েল। ইরানের শীর্ষ স্তরের নেতাদের ‘নির্মূল’ করাই লক্ষ্য বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সরকারের।
আইআরজিসির কমান্ডার এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী-সহ ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পরিকল্পিত ভাবে অপসারণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইজ়রায়েল। দেশটির ক্ষমতাকাঠামোর বেশ কয়েক জন উচ্চ পর্যায়ের নেতা-মন্ত্রীকে ইতিমধ্যেই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছে ইহুদিরা।
একাধিক সূত্র দাবি করেছে, আয়াতোল্লা খামেনেইয়ের উপর যে হামলা হয়, সেই হামলাতেই গুরুতর জখম হয়েছেন নতুন সর্বোচ্চ নেতা। কারণ গত ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি মোজতবাকে। যদিও ইরান বার বার দাবি করেছে, মোজতবা জীবিত এবং সুস্থ আছেন। সম্প্রতি, মোজতবাকে নিয়ে একটি ভিডিয়োও প্রকাশ্যে এনেছে তেহরান। যদিও তার সত্যাসত্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এই অবস্থায় শিয়া মুলুকটি এমন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে সামরিক শক্তির চেয়ে ‘নেতৃত্বের সঙ্কট’ বেশি করে ভাবাচ্ছে তাদের। একে একে শীর্ষনেতৃত্ব সরে যাওয়ার ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা নড়বড়ে হয়ে উঠেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশের আশঙ্কা, এটি ইরাক এবং সিরিয়ায় জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস (ইসলামিক স্টেট, আইসিস বা দায়েশ নামেও পরিচিত)-এর জন্মের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইরাকের মতো পরিস্থিতির প্রতিচ্ছবিও দেখা দিতে পারে ইরানে।
ইরানি নেতৃত্বের আকস্মিক মৃত্যু এবং সামরিক বাহিনী আইআরজিসি কাঠামোয় ভাঙন দেখা দেওয়ার ফলে ১৬ লক্ষ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে একটি শাসনতান্ত্রিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। যখন কোনও কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র তার সীমান্ত পাহারা দিতে বা মৌলিক পরিষেবা প্রদান করতে ব্যর্থ হয়, তখনই ‘ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া’, অর্থাৎ আইএসের মতো গোষ্ঠীগুলির বাড়বাড়ন্ত দেখা যায়।
২০২৬-এর মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ইরানে বিশৃঙ্খলার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে ইরাক ও সিরিয়ার সুন্নি ধর্মাবলম্বী জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস। আইএস (খোরাসান গোষ্ঠী) ইতিমধ্যেই ইরান যুদ্ধের ঘোলাজলে নেমে মাছ ধরার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক হামলায় বাস্তুচ্যুত লক্ষ লক্ষ মানুষের মধ্য থেকে তারা সদস্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করছে বলেও সূত্রের দাবি।
সিরিয়া থেকে আইএসকে নির্মূল করতে দীর্ঘ দিন ধরেই সক্রিয় আমেরিকা। জঙ্গি হামলায় দুই মার্কিন সেনা আধিকারিকের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে গত মাসেই ওই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সিরিয়ায় বড় হামলা চালানো হয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও সে কথা ঘোষণা করেছিলেন।
আইএস ২০১৪ সাল থেকে ইরাক এবং সিরিয়ায় প্রভাব বিস্তার করলে ইরান সেখানে তাদের সামরিক উপদেষ্টা ও বাহিনী (কুদস ফোর্স) পাঠিয়ে আইএস-বিরোধী যুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নজরদারি সংস্থাগুলির মতে শিয়া-নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধ অক্ষ’ (হিজ়বুল্লা, ইরাকস্থিত পিএমএফ) যদি কোনও ভাবে ভেঙে পড়ে, তবে সুন্নি চরমপন্থী গোষ্ঠী সেই শূন্যস্থান পূরণের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে।
গোষ্ঠীর নতুন সদস্যদের উগ্রপন্থায় দীক্ষা দেওয়ার জন্য এই সংঘাতকে একটি সাম্প্রদায়িক শুদ্ধিকরণ অভিযান হিসাবে প্রচার করতে শুরু করেছে তারা। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, দেশের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি ব্যস্ত থাকার সুযোগ নিয়ে সিরিয়ায় আইএস সেলগুলি সক্রিয় হয়েছে। ইতিমধ্যেই ‘প্রতিরোধের এক নতুন অধ্যায়’-এর সূচনা করে ফেলেছে তারা।
২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের পতনের ফলে ইরাকে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা আল কায়েদা এবং আইএস-এর মতো জঙ্গি সংগঠনগুলিকে শক্তিশালী করেছিল। আইএস জঙ্গিরা ‘ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া/লেভান্ত’ পরিচয় থেকে এখন নিজেদের অধিকৃত ইরাক আর সিরিয়ার অংশকে নাম দিয়েছে ইসলামিক স্টেট। এদের মন্ত্রই হল ‘হয় ইসলাম নয় মৃত্যু’।
ইরান তার ‘প্রক্সি’ বা আঞ্চলিক বন্ধুদের মাধ্যমে পশ্চিম এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে আসছে দীর্ঘ দিন ধরে। এখন সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার কারণে তাদের সংগঠনগুলির দিকে নজর দেওয়ার ফুরসত মিলছে না আইআরজিসির। যুদ্ধের কারণে ইরানের অর্থনীতি চাপের মুখে পড়ার ফলে এই গোষ্ঠীগুলোর অর্থসাহায্যও কমে আসছে বলে একাধিক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
ইরানের কুর্দস বাহিনী আপাতত নিজেদের সীমান্ত রক্ষায় বেশি মনোযোগী। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই যুদ্ধ দীর্ঘ মেয়াদে চললে সিরিয়া এবং ইরাকে কুর্দদের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়তে পারে, যা ভবিষ্যতে অরাজকতা তৈরি করবে। ইরানে মার্কিন-ইজ়রায়েল উত্তেজনা আইএসকে পুনর্গঠনের সুযোগ করে দিচ্ছে বলেও মত তাঁদের।
ইরান সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি, যারা একসময় জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মনোনিবেশ করেছিল, তারা এখন পশ্চিম এশিয়া থেকে মার্কিন সেনাদের বিতাড়িত করার দিকে মনোযোগ দিয়েছে। অন্য দিকে, আইএস গোষ্ঠীর স্লিপার সেলগুলি ইরাক এবং সিরিয়ায় অতর্কিত হামলা তীব্রতর করেছে বলে খবর।
ইরানের এই পরিস্থিতি কেবল একটি মাত্র দেশের সমস্যা নয়। পুরো পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে দিতে পারে এই পরিস্থিতি। তেমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের। ইরান-ইজ়রায়েল বা ইরান-আমেরিকা সংঘাতের ফলে ইরাক ও সিরিয়া থেকে মার্কিন বা আন্তর্জাতিক জোটের সেনারা যদি নিজেদের সুরক্ষায় বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তবে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানগুলি থমকে যাবে। আর সেই সুযোগই নাকি খুঁজছে আইএস। বিশেষজ্ঞদের একাংশও মনে করছেন, আইএসের মতো গোষ্ঠীগুলো সব সময়ই এমন ‘পাওয়ার ভ্যাকুয়াম’ বা ক্ষমতার শূন্যতার অপেক্ষায় থাকে।
মনে করা হচ্ছে, উদ্ভুত পরিস্থিতি থেকে ইরানকে বাঁচাতে সক্রিয় শাসক হিসাবে নিজেকে প্রমাণ করা উচিত মোজতবার। আর যদি মোজতবা তা প্রমাণ করতে না পারেন, তা হলে ইরান এখন যে পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে, তাতে আইআরজিসি সরাসরি সামরিক শাসন জারি করতে পারে। পাশাপাশি ইরান বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ ভাঙনের মুখে পড়তে পারে বলেও মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
সব ছবি: সংগৃহীত