অণুগল্প
Bengali Mini Story

ঠিক একদিন

রাহুলের একতরফা উচ্ছ্বসিত কথা শেষ হওয়ার পর মোবাইলটা মুঠোর মধ্যে ধরে কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকল প্রত্যয়ী।

কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ ০৬:৩১
ছবি: কুনাল বর্মণ।

ছবি: কুনাল বর্মণ।

মোবাইলের রিংটোনের আওয়াজে ধড়ফড় করে ঘুম ভেঙে উঠল প্রত্যয়ী। মোবাইলটা তুলে দেখল, রাহুল ভিডিয়ো কল করছে। রাহুল পৃথিবীর অন্য প্রান্তে রয়েছে। ওদের যখন সকাল, এখানে তখন রাত। রাহুল সময়ের এই ব্যাপারটা খেয়াল রাখে। আর এখন তো গভীর রাত্রি গড়িয়ে ভোর হতে চলল। এই সময়ে ওর ভিডিয়ো কল?

বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির শব্দের মধ্যে একটু নার্ভাস হয়ে প্রত্যয়ী কলটা ধরতেই স্ক্রিনে ফুটে উঠল রাহুল। শুধু রাহুল নয়, ওর সঙ্গে পুরো একটা অন্য ঝলমলে দুনিয়া।

প্রত্যয়ীকে দেখেই সে ছেলেমানুষের মতো একগাল হেসে বলে উঠল, “হাই হানি, ম্যাচ দেখতে যাচ্ছি। ওয়ার্ল্ড কাপ।”

প্রত্যয়ীর চোখে ঘুমের ঘোর কাটেনি। স্ক্রিনে যেন রাহুলকে চিনতে পারছে না। একটা জার্সি পরে রয়েছে। সেটা কোন দলের, প্রত্যয়ী জানে না। রাহুলের মুখের আশপাশ দিয়ে বিভিন্ন দেশের যাদের দেখা যাচ্ছে, তাদের গায়েও কারও কারও রাহুলের মতো জার্সি, কারও অন্য রকম।

রাহুল বলতে থাকল, “কোথায় ম্যাচ দেখতে যাচ্ছি জানো? মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। এবারের ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনালটা এখানেই খেলা হবে। আজ নরওয়ে আর সেনেগালের ম্যাচ আছে। এখানের অফিসের ছেলেরা দল বেঁধে সব দেখতে যাচ্ছে। আমার জন্য একটা টিকিট, জার্সি জোগাড় করে দিয়েছে। এই সুযোগ কেউ ছাড়ে? উফ, না এলে বুঝতেই পারতাম না, বিশ্বকাপ ফুটবলের কী ভাইবস, বুঝলে…”

রাহুলের একতরফা উচ্ছ্বসিত কথা শেষ হওয়ার পর মোবাইলটা মুঠোর মধ্যে ধরে কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকল প্রত্যয়ী। রাহুল দু’সপ্তাহের জন্য অফিসের কাজে নিউ ইয়র্ক গিয়েছে। শেষ বার সন্ধেবেলায় কথা হয়েছিল। সংসারের সাধারণ টুকিটাকি কথা। তখনও বিশ্বকাপ ফুটবল দেখতে যাবে বলে কিছু বলেনি।

প্রত্যয়ীর একটু আশ্চর্য হওয়ারই কথা। কারণ ফুটবল নিয়ে রাহুলের কোনও আগ্রহ আছে, কোনও দিন দেখেনি। সেই রাহুল একটা অচেনা দেশের জার্সি পরে একেবারে স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে যাচ্ছে, আশ্চর্য হওয়ারই কথা। আসলে রাহুল কোনও সুযোগই হেলায় হারাতে দেয় না। ওই যেমন বলল, “এই সুযোগ কেউ ছাড়ে?”

নাহ্‌, এখন আর ঘুম আসবে না প্রত্যয়ীর। একটু পরে ভোর হবে। কিন্তু যেরকম বৃষ্টি হচ্ছে, ভোরের মুখ দেখার সুযোগ নেই। অন্ধকার বারান্দায় এল প্রত্যয়ী। এলোমেলো বৃষ্টির জলের ঝাপটা আসছে বারান্দায়। মুখে জলের ছিটে লাগছে। রাহুলের জার্সিটা ভিতরে কিছু একটা নাড়িয়ে দিয়েছে। বুঝতে পারছে না সেটা মনটাকে আকাশের মতো ভারী করে দিয়েছে, নাকি বৃষ্টির মতো ঝুপ ঝুপ করে মনখারাপ নামিয়ে আনছে। হঠাৎ ইন্দ্রর কথা মনে পড়ছে।

হাতের মুঠোর মধ্যে মোবাইল ফোনটা ধরা আছে। খুব ইচ্ছে করছে ইন্দ্রর গলাটা এক বার শুনতে। বুকের মধ্যে কিছু একটা দলা জমে আছে, টের পাচ্ছে। ইচ্ছে করছে চিৎকার করে উঠে দলাটা বার করে দিতে। কিন্তু বৃষ্টির শব্দের অত জোর নেই যে, চিৎকারের আওয়াজকে পুরোপুরি গিলে ফেলতে পারবে।

এমন নয় যে, এই বৃষ্টি-ঝরা অন্ধকার ভোরেই আজ হঠাৎ ইন্দ্রর কথা মনে পড়ছে। আজকাল মাঝে মাঝেই এমন হঠাৎ হঠাৎ মনে পড়ে যায় ইন্দ্রর কথা। কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে খেলার মাঠে ইন্দ্রকে দেখত। রোগা, লম্বা। সব সময় পায়ে বল পাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে থাকা একটা ছেলে। তার পর পায়ে বল পেয়ে সবাইকে কাটিয়ে বলটা গোলের জালে পাঠাতে না পারলে অদ্ভুত শূন্য চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। মুঠোটা আলগা করে এক বার মোবাইলটার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল প্রত্যয়ী। একটা নাম আর নম্বর থাকলেও কিছুতেই সেই নামটায় আঙুল ছোঁয়াতে পারে না প্রত্যয়ী। আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের রাস্তা কত সহজ করে দিয়েছে, তবু কিছু কিছু দূরত্ব যেন কিছুতেই পেরনো যায় না।

ইন্দ্র ওর জীবনের প্রথম প্রেম ছিল। প্রথম প্রেমকে জীবন থেকে মুছে ফেলা হয়তো যায়। তবে সেই প্রেমকে মন থেকে মুছে ফেলার মতো কোনও ইরেজ়ার পৃথিবীতে তৈরি হয়নি। মোবাইল কি সব সময় সত্যি দুটো হারিয়ে যাওয়া মানুষের মধ্যে কথা বলিয়ে দিতে পারে? ইচ্ছে করলেই?

চোখ বন্ধ করে প্রত্যয়ীর মনে হতে থাকল বৃষ্টিভেজা গন্ধের মধ্যে ইন্দ্রর ঘামে ভেজা জার্সির গন্ধ পাচ্ছে আর কানের কাছে ফিসফিস করে শুনতে পাচ্ছে তার গলা, “জানিস প্রত্যয়ী, ঠিক একদিন …”

ইন্দ্রর সব স্বপ্ন ‘ঠিক একদিন...’ দিয়ে শুরু হত। ফুটবল খেলতে ভালবাসতে চাওয়া ছাড়া ওর কাছে শুধু বর্তমান বলতে ছিল প্রত্যয়ী। প্রত্যয়ীকে মাঠের পাশ দিয়ে বাড়ি ফিরতে দেখলে দৌড়ে চলে আসত।

ঘাম-সপসপে জার্সি গায়ে প্রত্যয়ীর পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে ঘাড় উঁচু করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলত, “ঠিক একদিন আমরা দু’জনে মেঘ টপকে কোনও একটা পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে চুপচাপ বসব। আরও কাছ থেকে আকাশ দেখব দু’চোখ ভরে।”

ইন্দ্র আজকের দিনের জন্য বাঁচত না, সব সময় ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকত। সেই আগামী দিনের স্বপ্নগুলোকে ধরার কোনও চেষ্টা দেখেনি প্রত্যয়ী। ‘ঠিক একদিন, ঠিক একদিন...’ শুনতে শুনতে হাঁপ ধরে গিয়েছিল। সম্পর্কটা তাই অবধারিত ভাবেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।

সেদিনও টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল। ইন্দ্র বলেছিল, “দেখিস, ঠিক একদিন এমন একটা বড় মাঠে খেলতে নামব, যেখানে গ্যালারি আকাশ পর্যন্ত উঠে যাবে। তুই কিন্তু গ্যালারিতে বসে আমার জন্য গলা ফাটাবি। তার পর যখন গোল করব, হাজার হাজার গলার ‘গোওওল’ চিৎকার ঢেউয়ের মতো ভাঙলেও তার মধ্যে তোর গলাটা ঠিক চিনে নেব…”

সেদিন ধৈর্যের সব বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল প্রত্যয়ীর। ইন্দ্রকে বলা শেষ কথাগুলো আজও মনে আছে, “ফিউচার টেন্সে নয়, আগে প্রেজ়েন্ট টেন্সে বাঁচতে শেখ, ইন্দ্র। ফুটবল ছেড়ে আগে নিজের কেরিয়ার তৈরি কর।”

ইন্দ্র চুপ করে, মুখ ছোট করে দাঁড়িয়ে গিয়ে ভিজছিল, আর ছাতা মাথায় প্রত্যয়ী হাঁটার গতি বাড়িয়ে এগিয়ে গিয়েছিল। কিছু কিছু বিচ্ছেদ ঝগড়ায় শেষ হয় না, ক্লান্তিতে নিঃশব্দে, দূরত্বে শেষ হয়। গোছানো জীবন চেয়েছিল প্রত্যয়ী। আজকের জন্য। ঠিক যেমন রাহুলের কাছে সব কিছু পেয়েছে। আর কোনও কিছুই ‘ঠিক একদিন’-এর বন্ধনীতে আটকে নেই। তবু আজকাল ইন্দ্র কেন যে ওই দুটো শব্দ নিয়ে মাঝে মাঝে মাথার মধ্যে ফিরে এসে ভনভন করে, জানে না প্রত্যয়ী। বুঝে উঠতে পারে না কিছুতেই।

মোবাইলটা বেজে উঠল। আবার রাহুলের ভিডিয়ো কল। কলটা ধরতেই রাহুল বলল, “দ্যাখো এক বার...” রাহুল মোবাইলটা চার দিকে ঘোরাচ্ছে। স্টেডিয়াম-ভর্তি রংবেরঙের মানুষ।

“একদিন ঠিক তোমাকেও আমি এই ভাইবসটা দেখাতে একটা স্টেডিয়ামে নিয়ে আসব। পরের ওয়ার্ল্ড কাপটা শুনছি হবে স্পেন, পর্তুগাল আর মরক্কোতে। শতবর্ষের ওয়ার্ল্ড কাপ। ঠিক তোমাকে কোনও একটা দেশে নিয়ে আসব…” গলায় উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ছে রাহুলের।

রাহুলের কলটা কখন ছেড়েছে, খেয়াল নেই প্রত্যয়ীর। হাতের মুঠোয় ধরা আছে নিশ্চুপ মোবাইলটা। রাহুল যখন বলেছে, নিশ্চয়ই নিয়ে যাবে। ও লক্ষ্যপূরণ করতে পারে, কিন্তু স্বপ্নপূরণ? স্বপ্নপূরণ করার জন্য আগে একটা স্বপ্ন দেখা দরকার। ভিতরে দলাটা আরও পাকাচ্ছে প্রত্যয়ীর।

বাইরে এখনও বৃষ্টি পড়ছে। আকাশে আলো ফোটেনি, তবে অন্ধকার অনেকটা পাতলা হয়ে এসেছে। বৃষ্টির শব্দ মিশিয়ে ফিসফিস করে প্রত্যয়ী বলতে যাচ্ছিল, ‘ঠিক একদিন তোকে ফোন করেই ফেলব রে ইন্দ্র...’ এমন সময় হঠাৎ কড়াৎ করে একটা বাজ পড়ল আর প্রত্যয়ীর ভিতরের দলাটা গলার শিরা ফুলিয়ে বেরিয়ে এল, “গোওওওল...”


আরও পড়ুন