ছবি: রৌদ্র মিত্র।
পাশাপাশি দুই দেশ। মাঝে সীমান্ত রক্ষা করছে দুই কাঁটাতার। নো ম্যান’স ল্যান্ডের দু’পাশে দুই কাঁটাতারের মধ্যে প্রায়ই নানা সুখ-দুঃখের কথা হয়। তেমনই এক রাতের কথা—
প্রথম কাঁটাতার: কী রে ভাই, কী খবর! সব ভাল তো?
দ্বিতীয় কাঁটাতার: খবর আর কী, চলছে এক রকম।
প্রথম কাঁটাতার: কী সুন্দর চাঁদ উঠেছে দেখেছিস!
দ্বিতীয় কাঁটাতার: চমৎকার!
প্রথম কাঁটাতার: আচ্ছা, একটা জিনিস খেয়াল করেছিস?
দ্বিতীয় কাঁটাতার: কী?
প্রথম কাঁটাতার: চাঁদটা কিন্তু আমাদের দেশের উপর, সেই হিসেবে ওটা আমাদের চাঁদ, কিন্তু তোদের দেশেও আলো চলে যাচ্ছে, অর্থাৎ আমাদের চাঁদ থেকে তোরা আলো চুরি করে নিচ্ছিস। তোদের লাজলজ্জা বলে কিছু নেই।
দ্বিতীয় কাঁটাতার: ও, শুধু এটা দেখলি! রাত আরও গভীর হলে চাঁদ চলে আসে আমাদের দিকে, তখন তোরা আমাদের চাঁদ থেকে আলো চুরি করে নিস। তখন তোদের লজ্জা কোথায় থাকে!
প্রথম কাঁটাতার: তা হলে তো খুবই সমস্যার কথা। এটার একটা বিহিত করা দরকার।
দ্বিতীয় কাঁটাতার: কিন্তু কী করে?
প্রথম কাঁটাতার: সেটা ভেবে দেখতে হবে। এগুলো তো আন্তর্জাতিক ব্যাপার। তাই, প্রথমেই সম্পূর্ণ বিষয়টা রাষ্ট্রকমিটিতে জানাতে হবে।
দ্বিতীয় কাঁটাতার: রাষ্ট্রকমিটি কী জিনিস ভাই?
প্রথম কাঁটাতার: জানিস না? এরা এমন একটা সংগঠন, যেটা যে কোনও আন্তর্জাতিক সমস্যাকে গুলিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে। এটাই এদের কাজ।
দ্বিতীয় কাঁটাতার: আমি তা হলে রামধনুর কথাটাও বলব। এক দিন দেখি বৃষ্টির পর রামধনু উঠেছে আমাদের আকাশে। কিন্তু একটা অংশ চলে গেছে তোদের দিকে। এটা তো ঠিক নয়।
প্রথম কাঁটাতার: একই জিনিস আমিও দেখেছি। আমাদের দেশের রামধনুর একটা অংশ তোদের দিকে চলে গেছে... অ্যাই, চুপ চুপ!
দ্বিতীয় কাঁটাতার: (ফিসফিস করে) কেন, কী হল আবার!
প্রথম কাঁটাতার: কিসের যেন শব্দ একটা! শুনতে পাচ্ছিস?
দ্বিতীয় কাঁটাতার: কই, আমি তো কিছু শুনতে পাচ্ছি না।
প্রথম কাঁটাতার: ভাল করে শোন, তুই বরাবরই কানে একটু কম শুনিস।
দ্বিতীয় কাঁটাতার: আচ্ছা দাঁড়া, ভাল করে শুনি। ওই, হ্যাঁ তো রে, খুকখুকে একটা কাশির শব্দ পাচ্ছি।
প্রথম কাঁটাতার: একটা লোক দেখছি যে রে! খালি গা, উসকোখুসকো চুল, এত রোগা যে পাঁজরের হাড়গুলো গোনা যাচ্ছে। মাথাটা ঝুঁকে আছে সামনের দিকে। মনে হচ্ছে ওঠার ক্ষমতা নেই।
দ্বিতীয় কাঁটাতার: হ্যাঁ, তাই তো রে। কোথা থেকে এল বল তো! এটা তো নো ম্যান’স ল্যান্ড।
প্রথম কাঁটাতার: মনে হচ্ছে, তোদের দেশের মানুষ। আমাদের দেশে ঢুকতে চায়।
দ্বিতীয় কাঁটাতার: পাগল নাকি, এ নির্ঘাত তোদের দেশের। আমাদের এখানে ঢোকার ধান্দা করছে।
প্রথম কাঁটাতার: আরে, আমাদের দেশের মানুষ খামোকা এখানে আসতে যাবে কেন! আমাদের দেশ, পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশ। প্রচুর সম্পদ। কত উন্নত কৃষি, বাণিজ্য, অর্থনীতি। মানুষ কত আনন্দে আছে! আমাদের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে যাওয়ার প্রশ্নই নেই। তা ছাড়া এমন অপুষ্টিতে ভোগা মানুষ আমাদের দেশের হতেই পারে না।
দ্বিতীয় কাঁটাতার: বললেই হল! তুই কোনও খবরই রাখিস না। এই মুহূর্তে সবচেয়ে উন্নত হল আমাদের দেশ। সমস্ত দিক দিয়ে কত তাড়াতাড়ি উন্নতি করে চলেছে, খবর পাচ্ছিস না? অতি বড় নির্বোধও আমাদের দেশ ছেড়ে অন্য কোনও দেশে যাবে না। অসম্ভব ব্যাপার।
প্রথম কাঁটাতার: ওরে বাবা, তা হলে জলজ্যান্ত লোকটা এল কোথা থেকে! মাটি ফুঁড়ে উঠল নাকি! আচ্ছা দাঁড়া, আমাদের মন্ত্রীমশাইকে একটা ফোন লাগাই। উনি কী বলেন দেখি।
দ্বিতীয় কাঁটাতার: সেই ভাল, ফোন লাগা তোর মন্ত্রীমশাইকে। স্পিকারে দিবি।
প্রথম কাঁটাতার: হ্যালো… হ্যালো… স্যর…
মন্ত্রীমশাই: হ্যাঁ, কী হয়েছে! চিল্লামিল্লি করছিস কেন!
প্রথম কাঁটাতার: স্যর, ঘুমোচ্ছিলেন? আপনাকে ডিস্টার্ব করে ফেললাম?
মন্ত্রীমশাই: মারব এক থাপ্পড়। আমার ঘুমোলে চলে! তা হলে দেশের কথা কে ভাববে! ২৪ ঘণ্টাই আমি দেশের কথা ভাবি। দেশবাসীর সুখদুঃখের কথা চিন্তা করি। এখনও এই কথাটা জানিস না?
প্রথম কাঁটাতার: তা অবশ্য ঠিক। আসলে স্যর, এদিকে একটা কাণ্ড ঘটে গেছে।
মন্ত্রীমশাই: কী হল আবার, ওরা কি সীমান্তে সৈন্য মোতায়েন করছে! এত সাহস! আমি আমাদের সৈন্যবাহিনীকে বলছি ওদের গুঁড়িয়ে দিতে। আমাদের বাহিনীর যা ক্ষমতা, পাঁচ মিনিটও লাগবে না।
প্রথম কাঁটাতার: না স্যর, সে-সব কিছু নয়; নো ম্যান’স ল্যান্ডে একটা মরকুটে মানুষকে দেখা যাচ্ছে।
মন্ত্রীমশাই: সে কী রে! ব্যাটা ওখানে ঢুকল কী করে?
দ্বিতীয় কাঁটাতার: সেটাই তো স্যর ঠিক বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে, আমাদের দেশের বাসিন্দা নয়।
মন্ত্রীমশাই: ঠিক আছে, তুই লোকটার একটা ছবি তুলে আমার ওয়টস্যাপে পাঠা।
প্রথম কাঁটাতার: এখুনি পাঠাচ্ছি।
মন্ত্রীমশাই: হুম!
প্রথম কাঁটাতার: দেখলেন স্যর?
মন্ত্রীমশাই: না, না... এ আমাদের দেশের মানুষ হতেই পারে না। হলে আমি ঠিক চিনতে পারতাম।
প্রথম কাঁটাতার: একদম ঠিক বলেছেন স্যর।
মন্ত্রীমশাই: শোন, তুই শুধু কড়া নজর রাখ, যাতে কোনও ভাবেই ঢুকতে না পারে। আমি আপাতত দেশের কথা ভাবি। তেমন কিছু হলে আবার ফোন করিস।
প্রথম কাঁটাতার: ঠিক আছে স্যর।
প্রথম কাঁটাতার: কী রে, সব কথা শুনলি তো?
দ্বিতীয় কাঁটাতার: হ্যাঁ, শুনলাম।
প্রথম কাঁটাতার: এবার!
দ্বিতীয় কাঁটাতার: দাঁড়া, আমি আমাদের মন্ত্রীমশাইকে এক বার ফোন করি। হ্যালো… হ্যালো… স্যর…
*****
দ্বিতীয় কাঁটাতার: আমাদের মন্ত্রীমশাই তো হুবহু একই কথা বললেন রে! তবে তার মধ্যে শুধু একটা কথাই একটু অন্য রকম। তোর মন্ত্রীমশাই বলছিলেন পাঁচ মিনিটে গুঁড়িয়ে দেবেন, আমাদের মন্ত্রীমশাই বললেন, তিন মিনিটে উড়িয়ে দেবেন। বাদবাকি হুবহু এক। ও লোক আমাদের দেশেরও কেউ নয়।
প্রথম কাঁটাতার: তা হলে কী হবে!
দ্বিতীয় কাঁটাতার: কী আবার হবে! মন্ত্রীমশাইয়ের নির্দেশ তো অমান্য করা যাবে না।
প্রথম কাঁটাতার: কিন্তু এভাবে পড়ে থাকলে তো তোদের দেশের হায়নারা ওকে ছিঁড়ে খাবে।
দ্বিতীয় কাঁটাতার: তোদের দেশে হায়না নেই! তারা বুঝি আসবে না!
প্রথম কাঁটাতার: শোন বলি, হায়নাদের কাজ হায়নারা করবে। আমাদের অত মাথা না ঘামালেও চলবে। তার চেয়ে আয়, এই চাঁদের আলোয় আমরা বরং গান গাই।
দ্বিতীয় কাঁটাতার: সে ভাল কথা, কিন্তু কী গান গাইব?
প্রথম কাঁটাতার: একটা দেশাত্মবোধক গান গাওয়া যেতে পারে। যে গান গাইলে, ভিতরে দেশপ্রেম জেগে উঠবে। তুই তোর দেশের একটা গা, আমি আমার দেশের একটা গাই।
দ্বিতীয় কাঁটাতার: খুব ভাল বলেছিস। নে, শুরু কর…
দুই কাঁটাতার যে-যার নিজের মতো গাইতে লাগল। সেই দুর্বল, ক্ষীণজীবী মানুষটা ওদের গান শুনতে পেল কি না, বোঝা গেল না।