ছবি: কুনাল বর্মণ।
পূর্বানুবৃত্তি: তারাকান্তর জুতোর দোকানে কর্মচারীর কাজ করলেও ভুজঙ্গ আসলে বিভুরই কাজ করে। মাঝে মাঝে বিভুর লোক খদ্দের সেজে পদপল্লব-এ এসে ‘সাত নম্বর বাবল বয়’ চায়। এটা সঙ্কেত। এটা শুনলে ভুজঙ্গকে দোকানের নির্দিষ্ট জায়গা থেকে ‘বি এস’ লেখা জুতোর বাক্স নামিয়ে আনতে হয়। এই ভাবেই বিভুর সার্কিটে প্রবেশ করেছে ভুজঙ্গ। এই দিনও বিভুর জিনিসই ডেলিভারি করতে বাইক নিয়ে বেরিয়েছে ও। লিঙ্গেশ্বর মন্দিরের কাছে হরগৌরী মিষ্টান্ন ভান্ডারের কথা বলা হয়েছে তাকে। সেখানেই কেউ তার কাছ থেকে ব্যাগ নিয়ে নেবে। যথাস্থানে পৌঁছে অবাক হল ভুজঙ্গ। রাস্তায় দেখা সুন্দরী মেয়েটি আর একটি লোক সেখানে অপেক্ষা করে আছে। জানতে পারল, তাদের কাছেই এই ব্যাগটা পৌঁছে দেওয়ার কথা। কাজ সেরে ফেরার পথ ধরল ভুজঙ্গ।
কপালটাই খারাপ। বৃষ্টির গুঁড়োগুলো হঠাৎ বড় বড় ফোঁটায় পড়তে শুরু করেছে। মুহূর্তেই সামনের সব ঝাপসা হয়ে গেল। হাওয়ায় জলের ফোঁটা তিরের মতো এসে তার চোখেমুখে পড়ছে। পথের দু’পাশের বড় বড় গাছের অজস্র পাতায় বৃষ্টির ফোঁটাগুলো এসে পড়ছে, অদ্ভুত একটা শব্দ হচ্ছে। মনে হচ্ছে, নূপুর-পরা অজস্র খরগোশ জঙ্গলের ভিতরে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। ঝমঝম শব্দে ভরে উঠছে বনজঙ্গল।
একটা ঝাঁকড়া গাছ খুঁজছিল ভুজঙ্গ। আপাতত তার নীচে আশ্রয় নিতে হবে। এ রকম তুমুল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাইক চালানো বেশ অসুবিধের। রেনকোট থাকলেও। হেলমেটের জন্য মাথাটা ভেজেনি ঠিকই, কিন্তু জামা, গেঞ্জি, প্যান্ট, জাঙ্গিয়া সব ভিজে সপসপ করছে। নীচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি থেকে বাঁচতে পারে, এমন গাছ আশপাশে দেখতে পেল না ভুজঙ্গ। মাঝে মাঝে জোর বাতাস আসছে যখন, মনে হচ্ছে তার বাইক কাত হয়ে পড়বে। হ্যান্ডেলের গ্রিপ-কভার মুঠোর ভিতরে চেপে ধরে রেখেছে সে।
বাঁ দিকে সাবধানে ঘুরল ভুজঙ্গ। এ রকম ভিজে পথে জোরে টার্ন নিলে যে কোনও সময়ে বিপদ হতে পারে। যারা বেপরোয়া হয়ে চালায়, তাদের কপালে অনেক দুর্ভোগ থাকে। বাইক অ্যাক্সিডেন্টের খবর এখন নিত্যনৈমিত্তিক। বেশির ভাগই চালকের অসাবধানতার জন্য। অল্পবয়সিদের বেপরোয়া ভাব।
বাঁক ঘুরতেই তার চোখে পড়ল সেই সাদা গাড়িটা। একদম পথ-ঘেঁষা একটা শিরীষ গাছের সঙ্গে মুখোমুখি ধাক্কা লেগেছে। সামনের দিকটা একদম দুমড়ে মুচড়ে গেছে। বুকের ভিতরে ধড়াস করে উঠল ভুজঙ্গর। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, অসম্ভব স্পিডে ছিল গাড়িটা। প্রচণ্ড গতিতেই বোধহয় টার্ন নিয়েছিল। ভিজে পথে টায়ার আর পিচের পথ আঁকড়ে রাখতে পারেনি। অত তাড়াতাড়ি গাড়ি কন্ট্রোল করতে পারেনি। সোজা গিয়ে ওই স্পিডেই গাছে ধাক্কা মেরেছে।
যা অবস্থা, কারও বেঁচে থাকার কথা নয়। গাড়ির ভিতর থেকে কোনও শব্দ শুনতে পেল না ভুজঙ্গ। গাছের পাশে গিয়ে তার বাইক দাঁড় করাল। তুমুল বৃষ্টির মধ্যেই নেমে গাড়ির পাশে গিয়ে দাঁড়াল। গাড়ির বনেট বলে আর কিছু নেই। ধাক্কায় সামনের ডান দিকের দরজা খুলে ঝুলে আছে। বাঁ দিকে সামান্য কাত হয়ে আটকে আছে গাড়িটা। নাকে রক্তের গন্ধ পেল ভুজঙ্গ।
উইন্ডস্ক্রিনের পুরোটাই ভেঙে গুঁড়ো-গুঁড়ো হয়ে গেছে। ডান দিকের উইন্ডো-গ্লাসও ভাঙা। ভাঙা জানালা দিয়ে উঁকি দিল ভুজঙ্গ। পুরো ড্যাশবোর্ড এগিয়ে এসে দু’জনকে পিষে দিয়েছে। সেই বাব্ল বয় রক্তমাংসের একটা পিণ্ড হয়ে দলা পাকিয়ে পড়ে আছে। মেয়েটার মাথাটা বাঁ দিকের জানালার ভাঙা কাচ দিয়ে কিছুটা বাইরে বেরিয়ে আছে। কোমর থেকে শরীরের নীচের অংশ আটকে আছে সিট আর ড্যাশবোর্ডের মাঝে। সমস্ত মুখে বিন্দু বিন্দু রক্তের ফোঁটা জমে আছে। বোধহয় অজস্র ভাঙা কাচের টুকরো ঢুকে আছে তার মুখ জুড়ে।
হাত-পা কাঁপছিল ভুজঙ্গর। এ রকম অ্যাক্সিডেন্টের পরে কারও বেঁচে থাকার কথা নয়। কী করবে সে এখন? টেনে-হিঁচড়ে বডিদুটো বার করে আনবে? পুলিশে ফোন করবে? বিভুকে জানাবে?
এ সব কিছুই করল না ভুজঙ্গ। সে নিজেই একটা গোপন কাজে এসেছিল। পুলিশ এসে খুঁচিয়ে হয়তো তার এখানে আসার কারণ জেনে নেবে। বিপদে পড়ে যাবে সে। গন্ধ শুঁকে বিভু পর্যন্ত পুলিশ পৌঁছলেও বিভু ঠিক ম্যানেজ করে নেবে। তার শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। ফেঁসে যাবে ভুজঙ্গ।
মেয়েটার মুখটা আর এক বার দেখল ভুজঙ্গ। যেন চন্দনের বদলে রক্ত দিয়ে সাজানো রয়েছে মুখটা। একটা হাতের মুঠোয় সেই বিগ-শপারের হাতল আটকে রয়েছে। ওর ভিতরেই রয়েছে অ্যাটাচিটা। কে জানে তার ভিতরে কী আছে! গাড়িটার ওপাশে গেল ভুজঙ্গ। জানালার ভাঙা কাচ টেনে টেনে কিছুটা খুলল। হাত ঢুকিয়ে মেয়েটার হাতের মুঠো থেকে ছাড়িয়ে নিল বিগ-শপার। কী মনে করে পকেট থেকে রুমাল বার করে আলতো করে মুখটা মুছিয়ে দিল। ভিজে রুমাল।
মুখটা পরিষ্কার হলে ভুজঙ্গ দেখল, গালে সামান্য মেচেতার দাগ আছে। ভুজঙ্গ টের পেল, তার শরীর জেগে উঠছে। আশ্চর্য! মরা বটে এখন। একটু আগেও কী সুন্দর ছিল। কে জানে সত্যিই মরেছে কি না! হয়তো এখনও প্রাণ আছে। হাসপাতালে নিলে হয়তো বেঁচেও যেতে পারে। থাক। এখানে এখনও কেউ তাকে দেখেনি। রক্তমাখা রুমাল পথে কোথাও জঙ্গলে ফেলে দেবে। কিন্তু ভুজঙ্গর কাছে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ওই রুমাল ছিল। ওই রুমালের গন্ধে তার অসম্ভব উত্থান হত।
বিগ-শপার থেকে অ্যাটাচি বার করল ভুজঙ্গ। ব্যাগটা জানালার কাচে ঝুলিয়ে দিল। হয়তো এর ভিতরেই অ্যাটাচিটা ছিল। অ্যাক্সিডেন্টের পর ভাঙা জানালা দিয়ে ছিটকে কোথায় জঙ্গলে ছিটকে পড়েছে, কে জানে। পাশের ওই নালাতেই পড়তে পারে। তুমুল বৃষ্টিতে এখন প্রবলবেগে জল বইছে। সেখান থেকে জলের তোড়ে কোথায় ভেসে গেছে। হয়তো জর্দা নদী হয়ে আরও বড় নদীতে ভেসে যাবে। তার পর আরও দক্ষিণে, হয়তো এক দিন সমুদ্রেই গিয়ে পৌঁছবে। সবাই সে রকমই ভাববে— ভুজঙ্গ তা-ই ভেবেছিল।
বাইকের পিছনের বক্সে অ্যাটাচি কেস ভরে নিল ভুজঙ্গ। পকেট থেকে রক্তে ভেজা রুমাল বার করে নাকের সামনে ধরে প্রবল জোরে শ্বাস টানল। পিছনে পড়ে রইল ভাঙাচোরা একটা গাড়ি আর দু’টো মৃতদেহ। বাইকে স্টার্ট দিল ভুজঙ্গ।
৩
খোলা জানালা দিয়ে বাইরের আকাশ সামান্য দেখা যাচ্ছে। কালো স্লেটের মতো রং। সকাল থেকে সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। রুগ্ণ, ফ্যাকাশে একটা আলো ছড়িয়ে আছে পৃথিবী জুড়ে। এ রকম মলিন দিনে মনোতোষের খুব মন খারাপ হয়। মৃত্যুর কথা মনে পড়ে খুব। পলাশগুড়ির বকুলডাঙায় শিবুকাকাদের বাড়িতে থাকার সময় এক বার ফাঁসির মড়া দেখেছিল। বাড়ির পিছনে ছোটসিঁদুরে আমগাছের মগডালে ভজন ঘোষ ঝুলে আছে। সেও এক বৃষ্টির সকাল। সকাল হয়েও সেদিন সকাল হয়নি। বকুলডাঙা জুড়ে মনখারাপের আলো।
ভিড় থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে মনোতোষ দেখেছিল, অনেক উঁচু ডাল থেকে একটা মানুষ ঝুলে আছে। ভজন ঘোষ— সবাই বলাবলি করছিল। একটা অস্বাভাবিক গন্ধ নাকে এসেছিল তার। পরিচিত কোনও গন্ধ দিয়ে তার তুলনা করা যায় না। পরে মনোতোষ বুঝেছিল, ওটা বাসি মড়ার গন্ধ। বাকি জীবনে অনেক বার দিব্যি জলজ্যান্ত অনেক মানুষের গায়ে এই গন্ধ পেয়েছে মনোতোষ।
সেদিন শিবুকাকাদের বাড়ির পিছনের আমবাগানে ভিড়ের ভিতরে দাঁড়িয়ে আরও কিছু আলগা কথা শুনেছিল মনোতোষ। ভোররাতে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, সুতরাং তার আগেই ভজন ঘোষ গাছে উঠে পড়েছিল। বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলে পিছল গাছে অত উঁচুতে ওঠা সম্ভব নয়। কেউ কেউ বলছিল, তারা জানত ভজা আত্মঘাতী হবে। কিছু দিন ধরে আওরা-বাওরার মতো ঘুরে বেড়াত। কেউ তাকে গভীর রাতে দেখেছে, ঘাটের সিঁড়িতে বসে আছে। কেউ আবার কুসুমসারির মনসাতলায় দেখেছে। তার চোখের কোণে কালি, জামাকাপড়ের হুঁশ নেই, কে জানে কতকাল চুলে চিরুনি পড়ে না। আপনমনে মাঠেঘাটে ঘুরে বেড়ায় আর আপনমনে হাসে। কোন কথা মনে পড়ায় তার হাসি পায়— লোকজন বুঝতে পারে না। কিসের যে দুঃখ ছিল, কেউ তার সন্ধান পেল না। দিব্যি নাকি রাতের খাওয়া সেরে নতুন বৌ নিয়ে শুয়ে ছিল। কোন পোকা কামড় দিল যে, বৌ ফেলে নিঃসাড়ে উঠে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ল। মানুষের মন, কোন কথায় যে বেঁচে থাকায় ঘেন্না ধরে যায়— কে বলতে পারে।
এসব কথা ছেঁড়া-ছেঁড়া শুনেছিল মনোতোষ। গলায় দড়ি বেঁধে উঁচু জায়গা থেকে ঝুলে পড়লে মরণ নির্ঘাত। পায়ের তলায় মাটি খুঁজে পাওয়া যায় না। সামনে আঁকড়ে ধরার জন্য বাতাস ছাড়া আর কিছু নেই। এক ফোঁটা বাতাসের জন্য প্রাণটা আঁকুপাকু করে। চোখ ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসে। অনেক সময় ঘাড় মটকে যায়।
শরীরের একটা নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আছে। প্রাণটুকু চলে গেলে এই শরীর বডি হয়ে যায়। তাই শরীর তখন দেহ থেকে বিষাক্ত পদার্থ বার করে দেয়, যদি তাতে প্রাণ বাঁচে। তাই মলমূত্র বেরিয়ে আসে। চোখে কুটো পড়লে তাই অটোম্যাটিক জল আসে নোংরা বার করে দেওয়ার জন্য। নাকে ধুলো ঢুকলে হাঁচি আসে। প্রাণের দীপটুকু যাতে জ্বলতে পারে, সেই ব্যবস্থা প্রাণ নিজেই করে নেয়। লাইফ সায়েন্সের টিচার মনোতোষ লাহিড়ি এখন সব বুঝতে পারে। সেদিন সে মৃত্যুর গন্ধ পেয়েছিল।
আমবাগান থেকে ফিরে আসার পর তার মাঝে মাঝেই মনে হত, কষ্ট হলেই সে গলায় দড়ি দেবে। বাতাসে তার শরীর দুলবে। সবাই বলাবলি করবে— আহা রে, বড় কষ্ট ছিল ছেলেটার। ভাবত— দেখি না কী হয়। এই ভাবনা থেকে এক বার এক ছিপি ফিনাইল খেয়ে দেখেছিল মনোতোষ।
শিবুকাকা বলেছিল, “মন্টু, শুনেছিস না ভজা ঘোষ সুইসাইড করেছে। বাবা বলেছে গাছটা কেটে ফেলবে। আত্মাটা তো গাছেই থাকবে। সুইসাইডের আত্মা মুক্তি পায় না। গয়ায় গিয়ে পিন্ডি দিতে হয়।”
“আমার মনে হয় ওই গাছের কাঠ কেউ কিনবে না। সবারই ভয় আছে।”
“ধুস! গাছ কেটে ফেললে তো আত্মাটা ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাবে। তুই দেখেছিস, ভজার বডি?”
“দেখেছি। সাদা পাজামা পরা ছিল। খালি গা। গাছের গোড়ায় চটিদুটো সুন্দর করে সাজানো ছিল। পুলিশ নাকি বলেছে সুইসাইড না-ও হতে পারে। কোনও গোপন শত্রু ছিল ভজনের। আগে গলা টিপে মেরেছে। তার পর গাছের ডালে ঝুলিয়ে দিয়েছে।”
“ধ্যাৎ, একটা মরা মানুষকে টেনে হিঁচড়ে গাছের অত উপরে তোলা সহজ নাকি? এক বার মরার জেদ চাপলে কেউ ঠেকাতে পারে না। আচ্ছা মন্টু, মরতে যাওয়ার আগে কেউ চপ্পলদুটো সুন্দর করে সাজিয়ে রাখে? একদম সমান সমান?”
“জানো শিবুকাকা, আমারও এ রকম হয়। দেয়ালে কোনও ক্যালেন্ডার বা ছবি একটু বেঁকে থাকলেও আমি ধরতে পারি। খুব অস্বস্তি হয়। হাত নিশপিশ করে ঠিক করে দেওয়ার জন্য। স্নান করে উঠোনের তারে যখন গামছা মেলে দিই, দু’পাশে এক ইঞ্চিও কমবেশি হয় না। একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখি। সমান সমান না হওয়া পর্যন্ত আমার ভাল লাগে না।”
“বাবা বলেছে, বাগানের বড় গাছ সব বিক্রি করে দেবে। বাগানটা ফাঁকা হয়ে যাবে। মন্টু, তুই মরা মানুষের গন্ধ পেয়েছিস? আমি পেয়েছি।”
এই ঘটনার সাত দিন বাদে এক সন্ধেবেলায় মনোতোষ ভেবেছিল আত্মা দেখবে। চৈত্র মাসের দুপুরে ঘূর্ণি উঠলে ছেঁড়া কাগজ, প্লাস্টিক, শুকনো পাতা নিয়ে গরম বাতাসের একটা স্রোত পাক খেয়ে যখন উপরে উঠে যায়, তখন তার ভীষণ ইচ্ছে করে ঘূর্ণির ঠিক মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াতে। তার প্রবল ইচ্ছে হয় রেল ব্রিজের উপর থেকে নীচের জলে লাফ দিতে— কারও কাছে এই ইচ্ছের কথা সে কখনও বলেনি। কে জানে তারই শুধু এমন ইচ্ছে হয় কি না! তাকে পাগল বলবে সবাই, সে জানে। তবু কী এক প্রবল টান আসে রেল ব্রিজ থেকে নীচে নদীর জলে। ঢাউস একটা ঘুড়ি বানিয়ে সেটায় চড়ে ভেসে যেতে ইচ্ছে করে পলাশগুড়ি ছাড়িয়ে, শিলিগুড়ি পেরিয়ে তিনধারিয়ার দিকে। ইচ্ছে করে, গলায় দড়ি দিলে কেমন লাগে, জানতে। সবাই বলে, প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার কথা। কোথা দিয়ে বেরোয় প্রাণ! কোন পথ দিয়ে! জানতে ইচ্ছে করে মনোতোষের।
শিবুকাকা সে রাতে সবাইকে ছায়াবাজি দেখিয়েছিল। মনোতোষের ক্লাস সেভেন, শিবুর এইট। নাজিরহাটের নেতাজি কলোনি থেকে মনোতোষরা এসে উঠেছিল রামপ্রিয় সান্যালের বাড়িতে। আঙুলের কারসাজিতে সাদা কাপড়ে প্রজাপতি, হরিণ, কান-নাড়ানো খরগোশ, কুকুর দেখে মনোতোষ শিবুকে পারলে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে। এ বাড়িতে একটা ময়ূর ছিল। পিছনের বাগানে ঘুরে বেড়াত। পোকামাকড় খেত। কখনও বাড়ির উঠোনে এসে পেখম তুলে দাঁড়াত। বড়মা তখন গমের দানা ছড়িয়ে দিত। দেখতে কী সুন্দর, অথচ কী বিচ্ছিরি গলার আওয়াজ। প্রথম দিন শুনে বিশ্বাসই হয়নি এটা ময়ূরের ডাক।
এই হল পলাশগুড়ি। এর উপর দিয়ে রোজ কত বাস যায়। কোচবিহার, মাথাভাঙা, দিনহাটা, বক্সিরহাট। বাজারে বকুলতলা মিষ্টান্ন ভান্ডারের সামনে ধুলো উড়িয়ে বাসগুলো এসে দাঁড়ায়। দোকানের ছেলেটা জল ছিটিয়ে ধুলো মারে। নোংরা কাপড় দিয়ে আলমারির কাচ মোছে। ড্রাইভার হর্ন দিলেই কাস্টমার খাওয়া ফেলে দৌড়ে এসে বাসে ওঠে। শিবুকাকা বলেছে, ড্রাইভারের সঙ্গে দোকান মালিকের সাঁট আছে। নইলে, আরও তো দোকান আছে, এখানেই কেন বাস দাঁড়ায়! রাতে ট্রাকগুলো যায়। দূর থেকে তার হর্নের শব্দ শুনতে পায় মন্টু। হর্নগুলো যেন হারমোনিয়ামের মতো সারেগামা বাজায়। শিবুকাকা বলেছে পলাশগুড়ি নাকি অনেক কালের পুরনো জায়গা। সে-ই রামায়ণ-মহাভারতের সময়কার। পুকুর কাটাতে গিয়ে প্রায়ই ঠাকুরের মূর্তি ওঠে মাটির তলা থেকে। বড় শহর থেকে অফিসার, প্রফেসর এসে ছবি তুলে নিয়ে যায়। এ কি মহানন্দা পারের নেতাজি কলোনি! টিনের বেড়া, খাপরার চাল, খাটা পায়খানা। তারা যে এ বাড়িতে আশ্রিত, এই বোধ মনোতোষের তখনও ভাল করে হয়নি। ডাক্তারজেঠা, বড়মা কিংবা শিবুকাকাদের খুব আপন বলেই মনে হত। ডাক্তারজেঠাকে অবশ্য অনেক দিন বাদে বাদে দেখতে পেত সে। তিনি অনেক দূরের কোনও চা-বাগানের ডাক্তারবাবু। সবাই ভয় পেত তাকে। মন্টুর কিন্তু তাঁকে দেখে কোনও দিন ভয় করেনি। ভালই লাগত। তার আর শিবুকাকার পাতে মাছের পিস কখনও ছোট-বড় দেখেনি সে। একটু বড় হওয়ার পর কোথাও একটা সূক্ষ্ম ভেদ টের পেত।
মনোতোষের গোপন বাসনা ছিল, শিবুকাকার থেকে আঙুলের কায়দা শিখবে। শিবুকাকা পাত্তাই দিল না। সে রাতে শিবুকাকা ছায়াবাজি দেখালেও মনোতোষের চোখে ভাসছিল, একটা মানুষ গাছের ডাল থেকে ঝুলছে। সে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল। তার বুকের ভিতরে একটা ভাঙচুরের শব্দ হচ্ছিল। দেখি না কী হয়!
আকাশে তখন শুক্লপক্ষের অষ্টমীর চাঁদ। পিছনের বাগানে ঘাসের উপর আলোছায়ার আলপনা। সেই দৃশ্য এক বার দেখল মনোতোষ। এই সুন্দর আলপনা তার বুকের ভিতর কিছু একটা ভাঙচুর ঘটিয়ে দিল। পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়েছিল ছোটসিঁদুরে আমগাছের গোড়ায়। তার পর অনেক বার তার পায়ের চটিজোড়া সাজাতে চেয়েছিল। হাতদুটো কাঁপছিল। ছোট-বড় হয়ে যাচ্ছিল। কিছুতেই সন্তুষ্ট হচ্ছিল না মনোতোষ। এভাবে, বিশৃঙ্খলায় কি আর মন ভরে!
কী বোকা ছিল তখন! নইলে কেউ, ‘দেখি তো কী হয়!’ ভেবে গলায় দড়ি দেওয়ার কথা ভাবে! গাছের উপর থেকে আচমকা এক কর্কশ চিৎকারে তার সমস্ত লোম খাড়া হয়ে উঠল। প্রচণ্ড ভয়ে দৌড়ে পালিয়ে এসেছিল বাড়িতে। তার পর মনে পড়েছিল, ওটা ময়ূরের ডাক। সেই রাতেই ময়ূরটা গাছে উঠে বসে ছিল। আর, সে তো দড়ি নিয়েই যায়নি। অত উঁচু গাছে সে বোধহয় উঠতেও পারত না। তবু কে যেন তাকে ঠেলে নিয়ে গিয়েছিল ওই গাছের কাছে।
ক্রমশ