ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফুলিকে দেখছিল লতিকা। ফুলের মতো সুন্দর মুখখানা ফুলির। আগে সব সময় মুখে হাসি লেগে থাকত। অভাবের সংসারে সেই হাসিটুকুই লতিকার বেঁচে থাকার একমাত্র উৎসাহ ছিল।
ফুলি আর হাসে না। বড় বড় চোখে চার দিকে তাকায়, আর লুকিয়ে পড়তে চায়। কেউ কাছে গেলেই হাত-পা গুটিয়ে, ভীষণ ভয়ে কুঁকড়ে যায়। হাত-পা ছোড়ে, গোঙায়। শুধু লতিকাকে দেখলে হাত বাড়িয়ে চলে আসতে চায়।
হাসপাতালের দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে লতিকা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই নিয়ে কত বার যে ফুলিকে ভর্তি করতে হল! মাঝে তো ভালই হয়ে গিয়েছিল। আবার কখন কী হয়, লতিকা বুঝতে পারে না।
“এই যে! ফুলির মা, যাও ভিতরে যাও। দেখে এসো...” নার্স দিদিমণি খ্যানখেনে গলায় ডাকতেই লতিকার চটক ভাঙল। পায়ে পায়ে ফুলির বেডের কাছে এসে দাঁড়াল। অভাবের সংসারে, রান্নার কাজ করে, তিল তিল করে জমানো পয়সায় মেয়েকে নিয়ে একটু স্বপ্ন দেখেছিল লতিকা। সেই মেয়ে কেমন পাগল-পাগল হয়ে গেছে আজ। সেই দিনের পর থেকেই ধীরে ধীরে কেমন যেন হয়ে গেছে ফুলি।
ফুলির মাথায় পরম স্নেহে হাত বুলিয়ে দিল লতিকা। ফুলি চমকে উঠল। এই রকমই হয়। কখনও সেটা কমে, কখনও বেড়ে যায়। লতিকা খাবার এনেছে খাইয়ে দেবে বলে। তার রান্নার হাত ভাল। তার হোটেলে রাজ্যের লোক এসে খেয়ে যাচ্ছে, আর নিজের মেয়েটা খাবেনি?
“গুচ্ছের আজেবাজে জিনিস খাওয়াবে না ফুলির মা!” টেবিল থেকে নার্স দিদিমণির কড়া নজর। লতিকা মৃদু গলায় বলল, “সব বাড়ির রান্না দিদি।”
“এখনও তো ঠিক হয়নি। সেদিন ওয়ার্ড বয়কে দেখে কী লাফঝাঁপ! ‘ধরতে আসছে,ধরতে আসছে’ করে পালিয়েই যায় আর কী! ওই জন্য তো বেঁধে রাখতে হয়েছে।”
জানে লতিকা। সেদিনের সেই ঘটনার পর থেকেই ভয়টা ফুলিকে জাপ্টে ধরে আছে। না হলে আগে তো মেয়ে হাসিখুশিই ছিল। অস্বাভাবিকতা তো ছিল না কিছু। পরম স্নেহে ফুলির হাতে হাত বুলিয়ে দেয় লতিকা। গজ ব্যান্ডেজের পাকানো দড়ি, খাটের সঙ্গে বাঁধা হাত-পা দেখে, আগে চোখে জল আসত। এক বছর পর, এখন অভ্যেস হয়ে গেছে।
হাসপাতালের বাইরে আসতেই হাতের ব্যাগের মধ্যে তার মোবাইল বেজে উঠল। সস্তার সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল। বিরক্ত মুখে মোবাইলটা দেখল লতিকা। রাঘববাবু। জানে আজ সে হাসপাতালে আসবে, তাও ফোন করেছে। হোটেল হোটেল করে মরে যাচ্ছে একেবারে! ওই তো ছিরির হোটেল! যত মোদো-মাতালদের আড্ডা। তবে লোকটা বিপদের দিনে পাশে ছিল, তাই এই হোটেলের কাজে লতিকা না বলতে পারেনি। আর তার হাতের কষা মাংস, চিলি চিকেনের লোভেই খদ্দেরের আনাগোনা বেশি। লতিকার মাইনেও বেড়েছে।
তবুও রাঘববাবুর শয়তানি যায়নি। কবে উপকার করেছিল, সে জন্য যেন মাথা কিনে রেখে দিয়েছে হারামজাদা। লতিকার মেয়ের কথা ও কি জানে না? জানে, মেয়ের পিছনে খরচ লেগেই থাকে, তবু পয়সার ব্যাপারে ঝোলায়।
‘হ্যালো’ বলতেই ওপাশ থেকে রাঘববাবু বললেন, “বিকেলে তাড়াতাড়ি আসিস।”
ওষুধ কিনতে একগাদা টাকা খরচ হয়ে গেল আজ। এ মাসে হাতে কিছুই প্রায় জমা নেই। রাঘববাবুর টেবিলের সামনে অনেক ক্ষণ বসে আছে লতিকা। তার আগের মাসের টাকা কিছুটা ঝুলিয়ে রেখেছে লোকটা। বলেছিল এই মাসে এক সঙ্গে দিয়ে দেবে। সেটাই চাইতে এসেছে। বাবু বলল, “এত জ্বালাস কেন বল তো? বলেছি তো দিয়ে দেব।”
“আমার তো এখন চাই। ফুলির ওষুধ কিনতে সব শেষ।”
রাঘববাবু ফোনটা রেখে দেঁতো হেসে বললেন, “মেয়েটার পিছনে আর কত খরচা করবি লতি?”
“তা কী করব? ফেলে দেব? আমার মেয়ে, আমাকেই তো দেখতে হবে। ফালতু না বকে টাকাটা দ্যান।”
“আজ তোকে এমন লাগছে কেন বল তো লতি? সেজেছিস যে খুব?”
লতিকার বুকের ভিতর দপ করে উঠল। এই চাউনি লতিকার চেনা। এই চোখ দিয়ে যেন গিলে খায় ছেলেগুলো। তার ফুলিকেও তো খেয়েছিল। সে-সব কথা মনে পড়লেই মাথায় আগুন জ্বলে।
লতিকাদের বস্তির কাছেই বাড়ি ছিল ওই ছেলেটার, ন্যাপলা বলে ডাকত সবাই পাড়াতে। এক দিন ইস্কুল থেকে দৌড়তে দৌড়তে ফিরেছিল ফুলি।
“কী হয়েছে রে! হাঁপাচ্ছিস কেনে?” জানতে চেয়েছিল লতিকা।
ফুলি ভয়ে তুতলে যা বলেছিল তা হল, ওই ন্যাপলা ওকে রোজ স্কুলে যাতায়াতের পথে বিরক্ত করে। লতিকার কপালে ভাঁজ পড়ছিল সেই দিন থেকে। ঘরে মেয়ে থাকা যেন সাক্ষাৎ বিপদ। কিন্তু তা-ই বা কেন হবে? তার মেয়েটা কী দোষ করেছে? রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে লতিকা জিজ্ঞেস করেছিল, “তোকে কী করেছে?”
ফুলি বলেছিল, “ডাকে। কথা বলতে চায়। ওরা ভাল নয় মা।”
“ও-রা মানে?”
“ওই ন্যাপলার সঙ্গে থাকে কয়েকটা ছেলে, রোজ বাজে ভাবে তাকায়, হাসাহাসি করে, বাজে কথা বলে... আমার খুব ভয় করে মা।”
“তোকে কী বলেছে?”
“বলে ওর সঙ্গে বেড়াতে যেতে। আজ হাত ধরে টানছিল মা। আমি আর ইস্কুল যাব না।”
“রাস্তায় কেউ কিছু বলেনি? সবাই কি চোখে ঠুলি পরে থাকে নাকি?”
“ওরা নাকি পার্টির ছেলে, তাই কেউ কিছু বলে না।”
“তোদের ইস্কুলের দিদিমণিদের বলিস নাই?”
“বলেছি মা। দিদিরা বলেছেন, ইস্কুলের মধ্যে কিছু তো করে নাই। ইস্কুলের বাইরে কোথা কী হচ্ছে, ওঁরা দেখতে পারবেন না।”
রাগের চোটে লতিকার ইচ্ছে করেছিল, সব ক’টার মাথা ভেঙে দিয়ে আসে! গিয়েছিল লতিকা, কোনও কাজ হয়নি, কেউ লতিকার কথা কানে তোলেনি। যেমন ছেলে, তেমনই তার বাড়ির লোক।
তার পর এক দিন ফুলি ইস্কুল থেকে ফিরল না। থানা-পুলিশ, বহু খোঁজাখুঁজি করে ফুলিকে পরের দিন দুপুরে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল অনেকটা দূরে, রাস্তার ধারে নয়ানজুলিতে। ক্ষতবিক্ষত, নগ্ন, যেন একদলা মাংসপিণ্ড।
থানায় কমপ্লেন হয়েছিল। হাসপাতালে ভর্তি অবস্থাতেই ফুলি কোনও রকমে ন্যাপলার নাম বলেছিল। ন্যাপলাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ। কেস-কাছারি করবে ভেবেছিল, কিন্তু উকিলদের মারপ্যাঁচ বুঝতে পারেনি লতিকা। তার উপর মেয়েটাকে হাসপাতালে রেখে এসেছে। কোর্ট না হাসপাতাল— কোন দিক সামলাবে লতিকা, একা হাতে? এই সব ব্যাপারে কে আসবে তার পাশে? যারা ছিল, তারাও একে একে সরে পড়ল। লতিকার মনের ভিতর যখন রাগ ঝলকে ওঠে, মনে হয় খুন করে দেয়! যাকে হাতের সামনে পাবে তাকে! তাতে জেল ফাঁসি, যা হয় হবে!
ন্যাপলা তাড়াতাড়িই ছাড়া পেয়ে গেল। কিন্তু মেয়েটা পুরোপুরি সুস্থ হল না। এমনিতে স্বাভাবিক, কিন্তু লোকজন এলে ভয়ে কুঁকড়ে যায় ফুলি, কথা বলে না। মাঝে মাঝেই ভয় পেয়ে যায়, “ধরবে, ধরবে...” করতে করতে বাড়ির ভিতরে লুকিয়ে পড়ে।
দিশাহারা লতিকা বাধ্য হয়ে পুরনো আস্তানা ছেড়ে উঠে এসেছিল বাইপাসের ধারে। রাঘববাবু না থাকলে জায়গাটা সে পেত না। লোকটা সুবিধের নয়, পার্টির লোকজনের সঙ্গে ওঠাবসা। কিন্তু লতিকা তার হাতের রান্নার জোরে ওর ওই ছিরির হোটেলে কাজ পেয়েছে একটা। কাছেই তার নতুন ঝুপড়ি, তাই রাতের দিকেও হোটেলের রান্না সে করে দেয়। দু’পয়সা বেশি আসে।
“রাতে কয়েকটা ছেলেপুলে আসবে, বুঝলি?” কুতকুতে চোখে রাঘববাবু বললেন, “সব পার্টিরই ছেলে। একটু খাওয়াদাওয়া করবে। দেখিস, যেন অসুবিধে না হয়...”
তা জানে লতিকা! ওই মাংস দিয়ে মদ গিলতেই এই এত দূরে আসা। লতিকা রান্নাঘরের দিকে এগোল। রান্নাঘরের ফ্রিজ খুলে, গামলা থেকে কিছুটা মাংস খামচে তুলে নিল।
রান্নাঘরের দেওয়ালে যে চৌকোনা খোঁদলটা আছে, তার ভিতর দিয়ে খাবার ঘরটা দেখা যায়। লতিকার সামনে কড়াইয়ে টগবগ করে ফুটছে মাংসের ঝোল। আর গরম লাভার মতো ফুটছে তার ভিতরটা। জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে খাবার ঘরের দিকে। এক কোণে টেবিলে চারটে মদের বোতল খুলে কিছু পশুর সঙ্গে বসে আছে ন্যাপলা। কর্কশ খ্যাকখ্যাক করে হাসিতে হেলে যাচ্ছে, গড়িয়ে পড়ছে, নর্দমার জলের মতো মুখের ভাষা বেরিয়ে আসছে অনর্গল। হোটেলের বাইরে ওদের বাইকগুলো রাখা, সেটাও কিছুটা নজরে আসছে।লতিকা কড়াইয়ের দিকে চেয়ে রইল। দপদপ করে জ্বলা গ্যাসের আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে তার ভিতর। কত জন ছিল সেদিন? এরা সবাই? এরা সবাই মিলে ছিঁড়ে খেয়েছিল তার মেয়েটাকে?
লতিকা খুলে ফেলল তার ছোট্ট ব্যাগখানা। আজই কিনেছে, প্রায় বারোশো টাকার ওষুধ। একটা ট্যাবলেটেই সারা দিন ঘুমোয় তার মেয়ে। দ্রুত হাতে ট্যাবলেটগুলো বার করে ফেলল লতিকা। প্রেসক্রিপশন ছাড়া দিতে চায় না, বলে, আত্মহত্যা করে নাকি এই দিয়ে। আলাদা আলাদা দোকান থেকে নিতে হয়েছে। দ্রুত হামানদিস্তায় ট্যাবলেটগুলো ফেলে, শরীরের সমস্ত রাগ উজাড় করে দিয়ে পিষে ফেলল নিমেষে। লতিকার হাতে এখন মিহি পাউডার, সে মিশিয়ে দিচ্ছে রান্না হয়ে যাওয়া কড়াইয়ের মাংসে, বোতলের পানীয়তে। মাংসটা ভাগ করে, রান্নার বাসনকোসন ভাল করে ঘষে ঘষে ধুয়ে নিল লতিকা। কষা মাংসের গন্ধে ম-ম করে উঠেছে রাঘববাবুর হোটেল। থার্মোকলের প্লেটে কষা মাংসের উপর, কুচো লঙ্কা, ধনেপাতা ছড়িয়ে দিয়েছে লতিকা। টেবিলে সার্ভ করার ছেলেটা প্লেটগুলো নিয়ে গেল। বুভুক্ষু জন্তুগুলো বসে আছে জ্বলজ্বলে চোখে, মাংস খাবে বলে।
সেদিনই একটু বেশি রাতের কথা। হাসপাতালের এমার্জেন্সিতে ডেডবডি ঢুকেছে দুটো। মদ খেয়ে বাইক চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনা। স্পট ডেড। পার্টির ছেলে। এলাকায় চেনা। যেমন বিষাক্ত, তেমনই বজ্জাত।
মানসিক রোগীর ওয়ার্ড থেকে ফেরার পথে এক ঝলক দেখল লতিকা। ট্রলির উপর রক্তাক্ত শরীরে, দুমড়ে মুচড়ে পড়ে আছে ন্যাপলা। একটা মাংসপিণ্ডের মতোই দেখাচ্ছে।