Bengali Literature

ঋতুবদল

ক্রমশ জিনিয়া অনির্বাণের বন্ধু হয়ে উঠেছে। পাশে থেকেছে। হাতের উপর হাত রেখে বুঝিয়েছে, অনির্বাণ একা নয়।

সীমা জানা
শেষ আপডেট: ০৩ মে ২০২৬ ০৮:৪২
ছবি: মহেশ্বর মণ্ডল।

ছবি: মহেশ্বর মণ্ডল।

সিদ্ধান্ত যা নেওয়ার, নিয়েই ফেলেছে অনির্বাণ। এ বার সংযুক্তাকে জানিয়ে দেওয়ার পালা। অনির্বাণ জানে, এক কথায় সংযুক্তা তাকে ছেড়ে দেবে না। ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করবে, চেঁচামেচি করবে, পুলিশের ভয় দেখাবে। যা ইচ্ছে করুক, কিন্তু অনির্বাণকে তার সিদ্ধান্ত থেকে এক চুলও নড়াতে পারবে না। বারো বছরের বিবাহিত জীবনের প্রথম দুটো বছর বাদ দিলে বাদবাকিটা তো জ্বলেই এসেছে সে। লড়তে লড়তে বাঁচাটা যেন যুদ্ধক্ষেত্রের সমান হয়ে উঠেছে। বাকি জীবনটা জিনিয়ার সঙ্গে সুখে কাটাতে চায় অনির্বাণ।

জিনিয়া ওর সহকর্মী। শিক্ষিতা, সুন্দরী, স্মার্ট। বিয়ের এক মাসের মধ্যেই শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে বাবা-মায়ের কাছে চলে এসেছিল ও। কেন, কার দোষ, সে সব বিষয়ে কোনও প্রশ্নই করেনি অনির্বাণ। কোলিগদের কাছে শুনেছিল, ওর বর নাকি ড্রাগ অ্যাডিক্ট। তার উপর বৌদির সঙ্গে অ্যাফেয়ার ছিল। জিনিয়া নিজে হারিয়েছে বলে একা হওয়ার যন্ত্রণা বোঝে। প্রথম যে দিন ক্যান্টিনে বসে স্রেফ গল্পের ছলে দু’-একটা কথা বলেছিল অনির্বাণ, জিনিয়া ওকে সান্ত্বনা দিয়েছিল, আশা জুগিয়েছিল, “তোমার বৌ নিশ্চয়ই এক দিন তোমার গুরুত্ব বুঝবে। তোমার মতো হাজ়ব্যান্ড ছেড়ে বেশি দূর যাওয়া কোনও মেয়ের পক্ষেই সম্ভব নয়।”

ক্রমশ জিনিয়া অনির্বাণের বন্ধু হয়ে উঠেছে। পাশে থেকেছে। হাতের উপর হাত রেখে বুঝিয়েছে, অনির্বাণ একা নয়। এক জনের ভালবাসা না পেলে জীবন ফালতু হয়ে যায় না! অনির্বাণের শরীর, মন থেকে পরাজয়ের গ্লানি খুঁটে নিয়ে ওকে আর একটা নতুন ভোরের দিকে নিয়ে এসেছে সে। সুতরাং ওর জীবনের উপর অধিকার আছে তার। জিনিয়াকে তা থেকে বঞ্চিত করতে চায় না অনির্বাণ।

“কালই কথা বলব সংযুক্তার সঙ্গে,” ঘুম না-আসা রাতে ছটফট করতে করতে স্থির করল সে।

অফিসে বেরোনোর সময় তুতুল থাকে। অনির্বাণ চায় না, ওর সামনে কোনও সিন ক্রিয়েট হোক। ওদের বিয়ের ছ’বছরের মাথায় তুতুল এসেছিল। ও এখন সবে ছয়। মেয়েরা সাধারণত বাবা-ঘেঁষা হয়, তুতুল মা-অন্ত-প্রাণ। সংযুক্তা অনির্বাণের কথায় রিঅ্যাক্ট করলে তুতুলও মায়ের সঙ্গে কাঁদবে, চেঁচাবে। তাকে থামানোর জন্য সংযুক্তা কতগুলো বাণী আওড়াবে, সামলাতে পারবে না অনির্বাণ। তার চেয়ে বরং যা বলার ফিরে বলবে, তুতুল ঘুমিয়ে পড়লে।

অনির্বাণ বেরোনোর পনেরো-কুড়ি মিনিট পর তুতুল বেরোয়। সংযুক্তা ওকে পুল কারে তুলে দিয়ে আসে। আজও ওকে রেডি করছিল সে। অনির্বাণ সামনে গিয়ে দাঁড়াল। রোজকার মতো বলল, “পাপা বেরোচ্ছে। তুমি সাবধানে যাবে।”

“আমি কিন্তু নেক্সট ক্লাস থেকে তোমার গাড়িতে যাব।” তুতুল বলল।

একটু থমকাল অনির্বাণ। তার পর বলল, “পাপার তো আলাদা রুট!”

“তুমি রুট চেঞ্জ করে নেবে।”

“সেই রুটে কোনও অফিস নেই।”

“তা হলে তোমার অফিসের রুটে যে স্কুল আছে, আমি সেখানে পড়ব।”

“পুল কার ভাল তো! তোমার সব ফ্রেন্ড থাকে!”

“না, আমি জানালার ধারে বসব। ওরা আমাকে ওদিকে বসতে দেয় না!”

চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল অনির্বাণ। সংযুক্তা বলল, “ওর তরফে আর কিছু বলার নেই। তুমি কি কিছু বলবে?”

উত্তরের অপেক্ষা না করেই মেয়েকে হিড়হিড় করে টানতে টানতে পাশের ঘরে চলে গেল সংযুক্তা।

কিছু ক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল অনির্বাণ। তুতুল সামনে থাকলে দু’হাত জোড় করে কপালে ঠেকাত আর “দুগ্গা দুগ্গা!” বলত। অনির্বাণের মা এসে সংযুক্তাকে বকেছিলেন, “ও কী বৌমা! ছেলেটা ‘আসছি’ বলে বেরোচ্ছে আর তুমি অমন কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে আছ! দুর্গানাম জপলে না?”

“কোথাও না কোথাও কেউ না কেউ তো জপছে, মা! নইলে এত ভাল হচ্ছে কী করে?”

“তোমাকে বলে বেরোবে, আর অন্য লোকে ঠাকুর ডাকবে?”

“মনের ভিতরে যে থাকে, সে অন্য লোক হবে কেন!”

লাঞ্চ ব্রেকে জিনিয়া মনে করাল, “আজ ছুটির পরে কিন্তু আমরা যাচ্ছি অনি। ভদ্রলোক ফোন করেছিলেন, আমি সেরকমই জানিয়েছি।”

“আজই?” অবাক হয় অনির্বাণ।

“কালই তো কথা হল! আজ না গেলে ওটা হাতছাড়া হয়ে যাবে। এত ভাল পজ়িশনে ফ্ল্যাট আর পাব না।”

“আসব।” জিনিয়ার মন ভাল করার জন্য হেসে বলল অনির্বাণ।

“তার পর ডিনার সেরে বাড়ি ফিরব!” জিনিয়ার শেষ আবদারে ঘাবড়ে গেল অনির্বাণ। তুতুলের পরীক্ষা চলছে। ও যদি না ঘুমিয়ে পাপার জন্য জেদ করে বসে থাকে, মাঝরাতে ঘর মাথায় করবে সংযুক্তা। সারা রাত গজগজ করবে। ঘুমোতে পর্যন্ত দেবে না। তাও যে অন্য ঘরে গিয়ে শোবে, তারও উপায় নেই। কিন্তু সব কিছু থেকে দূরেই যখন সরে যাচ্ছে, ঝামেলা বাড়িয়েই বা কী লাভ। বলল, “আজ ডিনার নয়। পরে কোনও দিন।”

উঠতে যাচ্ছিল অনির্বাণ। এদিক-ওদিক একটু চোখ বুলিয়ে জিনিয়া ওর হাতে আলতো চাপ দেয়, “কথা হয়েছিল কাল কিছু?”

“আজ বলব।”

লাঞ্চ ব্রেকের পরেই বসের সামনে গিয়ে দাঁড়ল অনির্বাণ, “চঞ্চলদা, আজ একটু তাড়াতাড়ি বেরোনো যাবে? কাজ ছিল একটা।”

“টোপর কিনতে যাবে নাকি, লাকি ম্যান?” দাঁত চেপে চেপে বললেন চঞ্চল মাইতি।

চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল অনির্বাণ। চঞ্চল মাইতি সামলে নেওয়ার ঢঙে বললেন, “ডোন্ট মাইন্ড! একই আর্জি নিয়ে জিনিয়া এসেছিল এইমাত্র। তাই মনে হল... ঠিক আছে, যেয়ো।”

কথোপকথনের মাঝে ফোনটা বেজে উঠল, বাটন টেনে ‘হ্যালো’ বলে কয়েক সেকেন্ড থম মেরে থেকে, “আমি এক্ষুনি আসছি...” বলে বেরিয়ে গেল অনির্বাণ।

চঞ্চল মাইতি ডাকলেন, “কী হল অনির্বাণ? এনিথিং রং?”

অনির্বাণ তত ক্ষণে অনেকটা এগিয়ে গেছে, শুনতে পেল না।

অনির্বাণ পৌঁছনোর অনেক আগেই রাস্তার লোকজন সংযুক্তাকে ইমার্জেন্সিতে অ্যাডমিশন করিয়ে দিয়েছিল। ওটি-তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ওকে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল অনির্বাণ। এক জন এসে বলে গেল, “এখানে দাঁড়াবেন না স্যর, ওয়েটিং রুমে গিয়ে বসুন।”

পায়ে পায়ে ওয়েটিং রুমে এল ও। সংযুক্তার বোন সুদীপ্তা কোণের চেয়ারে বসে আছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে ও। মৃদুল ওকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। অনির্বাণ জানেও না, সংযুক্তার ঠিক কী অপারেশন হচ্ছে! ওর হয়ে মৃদুল বন্ড সই করে দিয়েছে। ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল অনির্বাণ। ওকে দেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল মৃদুল, “বসুন অনির্বাণদা।” পাশের ফাঁকা চেয়ারটায় বসল অনির্বাণ। খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কী ভাবে হল?”

“মায়া সুদীপ্তাকে ফোন করেছিল। বলল, গেট থেকে বেরিয়ে রাস্তা পেরোনোর সময়। অন্যমনস্ক ছিল বোধহয়। কোমরের উপর দিয়ে…” মায়া ওদের বাড়িতেই থাকে। বাড়ির নানা কাজকর্মে সাহায্যকারিণী। মৃদুলের বর্ণনার মাঝেই ডুকরে উঠল সুদীপ্তা। দু’দিকের রগ চেপে ধরে চোখ বন্ধ করল অনির্বাণ।

মিনিট কুড়ি হয়ে গেছে। মৃদুল গেল ওটি-র সামনে। কয়েক মিনিটের মধ্যে ফিরে এসে বলল, “কত সময় লাগবে, ঠিক করে বলা যাচ্ছে না। টিম ঢুকেছে।” এক ভাবে মুখ নামিয়ে বসেছিল অনির্বাণ। মৃদুল বলল, “অনির্বাণদা, ইনশিয়োরেন্সের ফাইল-টাইল আনাতে হবে বোধহয়। নার্সিংহোম খোঁজ নিচ্ছিল। আমি বলেছি, কর্পোরেট কার্ড আছে। অফিসে ইনফর্ম করবেন এক বার?”

“ওরা আসছে। তুতুলের কাছে কে আছে?” উদ্বিগ্ন হয় অনির্বাণ।

“মা আর বুবাই। তুতুলটা খুব কান্নাকাটি করছে। থেঁতলে যাওয়া শরীরটা দেখেছে তো! কেন যে ওকে দেখাতে গেল মায়া!”

“এক বার ওর কাছ থেকে ঘুরে আসি?” জিজ্ঞাসু চোখে মৃদুলের দিকে তাকাল অনির্বাণ।

“এখানে যদি ডক্টররা খোঁজেন? আপনি থাকুন, আমি বরং সুদীপ্তাকে রেখে আসছি। দিদিকে বেডে দিলে কাল নিয়ে আসব।” ওরা বেরোনোর আগেই অফিসের গাড়ি ঢুকল। চঞ্চল মাইতি অনির্বাণকে বকলেন, “তখনই বলবে তো! আমি ডাকলাম...”

“আমি আসার আগেই ওরা ওকে ওটি-তে নিয়ে নিয়েছিল।”

“তা হোক। এ-সব পরিস্থিতি সামলানো চাট্টিখানি কথা নাকি? যাক, সনাতনের সঙ্গে তুমি একটু কফি খেয়ে এসো।”

“আগে ডক্টরের সঙ্গে কথা... ”

“আমি আছি, যাও। সেনাপতি নিজে না ঠিক থাকলে যুদ্ধ সামলাবে কী করে? স্টেডি হতে হবে তো?”

“ইনশিয়োরেন্সের লোকজন হয়তো কিছু কোয়্যারি করতে পারে...”

“ও-সব নিয়ে ভেবো না। ওদিকটা আমি সামলে নেব।”

এখনও লাল আলো জ্বলছে। অনেক ক্ষণ অপেক্ষার পর সবাই ফিরে গেছে। মৃদুলকে রেখে বুবাই আসছে। মোবাইল বার করে সময় দেখল অনির্বাণ, ন’টা কুড়ি। সংযুক্তা এখনও ওটি-তে। ওয়েটিং রুমটা প্রায় ফাঁকা। শেষ খবরের জন্য অপেক্ষা করছে যারা, তারা ছাড়া কেউ নেই। সবাইকে এক বার ভাল করে দেখল অনির্বাণ। প্রত্যেকের চোখেমুখে অদ্ভুত ঘোর। কখনও কখনও মাইক্রোফোনে দু’-এক জনের নাম ডাকা হচ্ছে। শঙ্কিত মুখে তারা উঠে যাচ্ছে রিসেপশনের দিকে। যেন প্রবল ভাবে বাঁচতে চাওয়া কোনও এক জনকে জোর করে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অসহায় লাগছে অনির্বাণের। ঠিক সেই মুহূর্তে দেওয়াল ফুঁড়ে ভেসে এল, “সংযুক্তা সাহার বাড়ির লোক কে আছেন, চার নম্বর ওটি-র সামনে চলে আসুন।”

অসম্ভব শক্তিতে পা দুটো টেনে ধরেছে কেউ। তার ক্ষমতা অনির্বাণের চেয়ে বহুগুণ। আহ্বান আর গন্তব্যের মাঝামাঝি একটা খাদে আটকে ছিল ও। কয়েক মিনিটের চেষ্টায় রিসেপশনে গিয়ে পৌঁছল অনির্বাণ। এক জন নার্স ওকে অপেক্ষা করতে বলে ভিতরে গেল, মেয়েটির পিছনে এক জন বেরিয়ে এলেন। নর্মাল ড্রেস, কিন্তু বোঝা যায় উনি ডক্টর।

“আপনি পেশেন্টের হাজ়ব্যান্ড?”

ঘাড় নাড়ল অনির্বাণ।

“কোমরের নীচটা সাংঘাতিক ইনজিয়োরড। হিপ জয়েন্টের কাছে দু’-তিনটে হাড় প্রায় গুঁড়িয়ে গিয়েছে। আমরা চেষ্টা করেছি, বাকিটা ভাগ্য।”

“নিজের পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে পারবে তো?” যেন অনির্বাণ নয়, ওর অন্তরসত্তা কাতর প্রশ্ন করল।

“হয়তো পারবে, তবে পেশেন্ট ফুল সেন্সে এলেই বোঝা যাবে, ঠিক কতটা ক্ষতি হয়েছে। নার্ভগুলো খুব খারাপ ভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল।”

“এখন এক বার দেখা যাবে?”

“সবে ওটি শেষ হল। পেশেন্ট এখন অবজ়ারভেশনে। লং টাইম ওটি তো, অনেক ক্ষণ ঘুমোবে। ওখানেই ওয়েট করুন। এরা ডেকে নেবে।” তার পর একটু ভেবে বললেন, “আসুন? এই দরজার বাইরে থেকে চোখ রাখুন। ভিতরে আজকে অ্যালাও করবে না বোধহয়।” অনির্বাণ দেখল, অজস্র তার আর নলের ভিতর আবছা একটা শরীর কুয়াশামাখা হয়ে পড়ে আছে।

মাটির দিকে ঝুঁকে ছিল জিনিয়া। চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া পুরু দানাগুলো ঘাসের ডগায় শিশিরের মতো জমছে। ওর হাতে হাত রাখল অনির্বাণ। হাতটা সরিয়ে নিল জিনিয়া। অভিমানী স্বরে বলল, “আর একটু সময় নাও। সেরে উঠুক, তার পর?”

“আমি যদি সংযুক্তা আর তুতুলকে এ অবস্থায় ছেড়ে আসি, তুমিও আমাকে আর ভরসা করতে পারবে না, জিনি।”

“শুধু সে জন্য?”

“বাকিটা তোমার শুনতে ভাল লাগবে না।”

“তাও বলো।”

“আমি এখন থেকে ওদের সঙ্গেই বাঁচতে চাই।”

“এত সেলফিশ তুমি!”

“আমি নিজেকে এক জন প্রেমিক হিসেবেই দেখেছি, এক জন পুরুষ হিসেবে, পিতা হিসেবেও আমার ভূমিকা ছিল, সেটা নিয়ে ভাবিইনি কখনও। এখন সেই অপরাধ শুধরে নেওয়ার সময় এসেছে। তাকে অগ্রাহ্য করতে পারব না।”

“আমাদের রিলেশন নিয়ে তুমি রিগ্রেট করছ!”

“অনেক দিয়েছ তুমি আমাকে। সেই দেওয়ার এত জোর ছিল, আরও অনেক দেওয়াকে অগ্রাহ্য করেছি আমি। এখন আর আমার নেওয়ার ক্ষমতাই নেই। সব দেওয়ার উদ্‌যাপন এক রকম হয় না জিনি! যখন অফিসে বেরোই, সংযুক্তার চোখেমুখে তখন থাকে আমার ফেরার অপেক্ষা। ওই নির্ভরতা, ওই প্রার্থনাই আমাকে ওর দেওয়া। নিজেকে সার্থক মনে হয়।”

একটু থামল অনির্বাণ। তার পর বলল, “মাঝে মাঝে কী মনে হয় জানো, অ্যাক্সিডেন্টটা খানিকটা আয়নার কাজ করেছে। ওটা আমার ভিতরের আমিকে আমার কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছে। বুঝিয়ে দিয়েছে, ওদের বাদ দিয়ে আমার কোনও অস্তিত্ব হওয়া সম্ভবই না।”

“আমাদের এত বছরের সম্পর্ক, সব মিথ্যে?”

“মিথ্যে নয়, ভুল। তোমার জন্য নয়, আমার জন্য। আমি সংযুক্তার সঙ্গেও ভুল করেছি, তোমার সঙ্গেও।”

“আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না, অনি!” দু’হাতের তালুতে মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলল জিনিয়া। ওর মাথায় হাত রাখল অনির্বাণ। বলল, “আমি নিজেকে ওদের থেকে আলাদা করতে পারব না, জিনি। সংযুক্তা রাতের ওষুধটাও নিজে হাতে খায় না। এক মুখ জল নিয়ে বসে থাকে। আমি ট্যাবলেটটা টুপ করে মুখে ফেলে দিলে ও গিলে নেয়। তুতুল ওর ছোট্ট একটা পা আমার বুকের উপর তুলে আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমোয়। রোজকার এই দৃশ্যগুলোর একটাও কল্পচিত্র নয়। সত্যি। আমার জীবনের একমাত্র ও শেষ সত্যি। সংযুক্তার পায়ের উপর দিয়ে চলে গিয়েছিল যে গাড়ি, সে তোমার অনির পুরো শরীরটার উপর দিয়ে চলে গেছে, জিনি! আজ যাকে দেখছ, সংযুক্তা আর তুতুলের হাতে তার পুনর্জন্ম হয়েছে।”

“এখন আমি কী করব?”

“আমাদের সম্পর্কের মৃত্যুর ভিতরে তুমিও নতুন করে জন্মাবে। আমার শুভেচ্ছা রইল। ওরা ছাড়া আমার দ্বিতীয় কোনও গন্তব্য নেই!”

দু’জনেই চুপ করে বসেছিল। অনির্বাণ বলল, “এ বার আমাকে উঠতে হবে জিনি, দেরি হলে তুতুলটা না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়বে।”

হেঁটে যাচ্ছিল অনির্বাণ। এক বারও পিছন ফিরে তাকায়নি ও। মুখ তুলে ওর দিকে তাকিয়ে রইল জিনিয়া। সারা দিনের কাজের শেষে ক্লান্ত এক জন পুরুষ তার প্রিয়জনের কাছে ফিরে যাচ্ছে, এই ধারণাটুকু ছাড়া আর কোনও দিক থেকেই অনির্বাণকে চেনা লাগে না জিনিয়ার। তবে এটা বুঝতে পারে যে, যত চেষ্টাই করুক, ওর অভিমুখ বদলানো অসম্ভব। প্রিন্সেপ ঘাটে নেমে আসা অন্ধকার সরিয়ে সেও পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল বড় রাস্তার দিকে।

আরও পড়ুন