তিনটি গল্প দিয়ে শুরু করি।
মুখে হাসি নয়, হাতে বেত
গল্প কয়েক বছর আগের। তমালের মামার স্বপ্ন ছিল, শিক্ষক হবেন। স্বপ্নের মতোই ধরা-করা, তোষামোদ, উপঢৌকন ছাড়াই বর্ধমানে কাছে নিত্যানন্দ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ে (নাম পরিবর্তিত) চাকরি জুটে গেল। ভূগোলের শিক্ষক। মামাবাবু তো বিরাট খুশি। এত দিনে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন সত্যি হল। তবে মাস্টারের সংখ্যা কম হওয়ার কারণে শুধু ভূগোল নয়, দরকারে অঙ্ক, ইংরেজি, বাংলাও পড়াতে হবে। পিটি ক্লাসও করাতে হতে পারে। ভূগোল নিয়ে লেখাপড়া শিখে পিটি শেখানোরও সুযোগ হবে জেনে মামা খুবই আহ্লাদিত। শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন গভীর হল।
সমস্যার শুরু দিন পনেরো পর থেকে।
হেডমাস্টার সেদিন স্কুলে টহল দিচ্ছিলেন। লম্বা বারান্দায় জুতোর আওয়াজ গোপন করে ছায়ার মতো হাঁটছিলেন। ক্লাস এইটের কাছাকাছি পৌঁছে গেলেন থমকে। ক্লাসরুম থেকে ছেলেদের হাসির আওয়াজ ভেসে আসে কেন? চাপা হাসি নয়, প্রাণখোলা হাসি। শুধু ছেলেদের নয়, মাস্টারমশাইও হাসছেন! ঘন ভুরু কুঁচকে গেল রাগী হেডমাস্টারের। ক্লাসরুমে হাসাহাসি! নতুন মাস্টার কি তবে ছেলেদের সঙ্গে রসিকতা করছে? ঠাট্টা-তামাশা? পড়ানোর সময় এ কী নিয়মভঙ্গ! প্রথম দিন নিজেকে সামলে রাখলেন হেডমাস্টার। ভাবলেন, নতুন বলে ‘ভুল’ করেছে। নিজেই শুধরে যাবে। কিন্তু ক’দিন পরেই আবার সেই হাসিকাণ্ড! সেদিন ঘটল অন্য ক্লাসে। হেডমাস্টার নিজে দেখেননি, পিওন উপেন এসে নালিশ জানায়।
“স্যর, নতুন মাস্টার ক্লাসে হাসাহাসি করে।”
হেডমাস্টার থমথমে গলায় বললেন, “এক দিন একটু-আধটু হাসি-ঠাট্টা তো হতেই পারে।”
উপেন বলল, “এক দিন নয় স্যর, পরশু দিন ফোর্থ পিরিয়ডে ক্লাস নাইনেও উনি হেসেছেন। নিচু গলায় নয়, জোর গলায়, হা হা আওয়াজ করে। পাশের ঘর এইট থেকে কমপ্লেন হয়েছে।”
হেডমাস্টার রেগে বললেন, “উপেন, এই স্কুলের হেডমাস্টার কে? আমি না তুমি? কমপ্লেন তোমাকে করবে কেন? নিজের কাজে যাও।”
ক’দিন পরে ফের নালিশ। মামা নাকি পিটি ক্লাস করাতে গিয়ে ছাত্রদের একচোট হাসিয়েছেন। এক-দুই-তিন বলে হাত ওঠা-নামায় ছেলেদের বার বার গোলমাল হওয়ায় এই হাসি। এই বিষয়ে নাকি ছেলেদের উৎসাহও দিয়েছেন।
“তালে যেমন মজা, মাঝে মধ্যে তাল গড়বড় হওয়াতেও মজা।”
পরের সপ্তাহে হেডমাস্টার ক্লাস সিক্সের দরজার আড়ালে লুকিয়ে রইলেন। ঘটনা কী নিজের চোখে দেখবেন। কেন এত হাসাহাসি? মিনিট দশ-পনেরো শান্ত ভাবে ক্লাস চলার পর ছেলেরা ‘হো হো’ করে হেসে ওঠে। এই হাসির কারণ নতুন মাস্টারের গ্লোব হাতে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ ক্ষমতার বর্ণনা।
“ছেলেরা, মন দিয়ে দেখো, হাতের এই চকের টুকরো গ্লোবের উপর রাখলাম। এর পর গ্লোবটাকে দিলাম এক চক্কর ঘুরিয়ে, দেখো, চক পড়েছে ছিটকে। পড়েছে তো? আচ্ছা, আমরাও তো এ রকম গোল পৃথিবীর উপর রয়েছি, কিন্তু আমরা কি চকের মতো ছিটকে পড়ছি? পড়লে কী কেলেঙ্কারি হত ভাবো দেখি... এই ধরো, ক্লাসে বসে আছ, ছিটকে চলে গেলে মাঠে... এই ধরো, মাঠে খেলছ, বল ইচ্ছেমতো গড়িয়ে ঢুকে গেল নিজেদেরই গোলপোস্টে...”
মাস্টারের এই কথায় ছেলেরা না হেসে পারে? ক্লাস শেষ হতেই মামাকে হেডমাস্টার ডেকে পাঠালেন, “তুমি কি মনে করো বিদ্যালয় হাসাহাসির জন্য তৈরি হয়েছে?”
মামা আমতা-আমতা করে বলেছিলেন, “স্যর, একটু হালকা ভাবে, কৌতুক মিশিয়ে না পড়ালে ছোট ছেলেদের ইন্টারেস্ট হবে কেন?”
হেডমাস্টার আরও কড়া গলায় বললেন, “আমাদের দেশের পণ্ডিত মানুষেরা কি সবাই তার মানে কৌতুকের সঙ্গে, হাসি-ঠাট্টা করতে করতে লেখাপড়া শিখেছিলেন?”
মামা বললেন, “তা কেন হবে? তবে পড়াশোনার পদ্ধতি তো বদলেছে। আমার ক্লাসে তো ছেলেরা খুবই উৎসাহ পায়। আপনি স্যর ওদের জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন। তা ছাড়া, হাসি তো কোনও অপরাধ নয়। ছেলেদের মধ্যে রসবোধ তৈরি হওয়া প্রয়োজন। যে জাতির রসবোধ নেই সেই জাতির উন্নতিও নেই। স্যর, আমার তো মনে হয়, স্কুল-কলেজে নিয়মিত চার্লি চ্যাপলিনের ছবি প্রদর্শন, সুকুমার রায়, পরশুরামের গল্প পাঠ, ডি এল রায়ের হাসির গান শোনানোর ব্যবস্থা থাকা উচিত। চার পাশে হাসি শুকিয়ে যাচ্ছে স্যর...”
হেডমাস্টার অপলক চোখে খানিকটা সময় তাকিয়ে থেকে বললেন, “এ বার থামলে হয় না? হাসি নিয়ে তোমার জ্ঞানগর্ভ ভাষণ নিশ্চয়ই কোনও আলোচনাসভায় গিয়ে শুনব, এখানে নয়। তোমাকে ছাত্রদের মধ্যে রসবোধ জাগ্রত করার চাকরি দেওয়া হয়নি, ভূগোলবোধ জাগ্রত করার কাজে নেওয়া হয়েছে। ভূগোলে কোনও হাসি নেই। তোমাকে এই প্রথম বার বারণ করছি, এবং এটাই শেষ বার।”
তমালের মামা চেষ্টা করেও নিজেকে পুরোটা বদলাতে পারলেন না। ক্লাসের ভিতরে হাসি থামালেন, কিন্তু পথে-ঘাটে, দোকানে-বাজারে, রেলস্টেশনে ছেলেদের সঙ্গে দেখা হলে হাসি চলতেই থাকল। স্কুলের গুরুগম্ভীর কর্তৃপক্ষ এটাও মেনে নিতে পারেনি। এক জন শিক্ষক সব সময়ে শিক্ষক। পথে বেরোলে মুখে হাসি নয়, তাঁর হাতে বেত থাকা উচিত।
শুধুমাত্র হাসির অপরাধে তমালের মামাকে মাস্টারের চাকরি হারাতে হল। তমাল অবশ্য আমাদের বলেছিল, “মামা নিজেই ছেড়ে দিয়েছে। বয়ে গেছে ওখানে থাকতে। মামা কত বড় চাকরি পেয়েছে জানিস?”
তমালের মামা যত বড়ই চাকরিতে যোগ দিন না কেন, ‘হাসি’ কিন্তু বড় ধাক্কা খেল। যে হাসিয়েছিল সে জানল, হাসি অপরাধ, আর যারা হাসতে শিখছিল তারা জানল, হাসতে মানা।
যে হাসি হাসি নয়
এ বার দ্বিতীয় গল্প। গল্পটি সুমিতাভর। আটাশ বছরের সুমিতাভ সান্যাল। ভাল চাকরি করে। কাজে দক্ষ হওয়ায় উন্নতি হচ্ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। এক সময়ে সামনে এল বড় লাফের সুযোগ। সবাই জানে, এই লাফেও ছেলে সফল হবে। বিভাগীয় প্রধান তার কাজে খুশি। খুশি না হয়ে উপায় নেই। ছেলের ফাঁকি তো নেই-ই, বরং দায়িত্বে সে অতিরিক্ত। কাজের ফাঁকেও গল্পগুজব, হাসি-ঠাট্টা নেই, নেই ক্রিকেট খেলা, ওয়েব সিরিজ় নিয়ে উত্তেজনা, নেই পরচর্চা, অফিসের অতি পরিচিত ‘কাঠিচর্চা’। যত ক্ষণ অফিসে, তত ক্ষণই সে ডেস্কে। সামনে ল্যাপটপ খোলা। কখনও গম্ভীর, কখনও চিন্তিত, কখনও চশমার ডাঁটি কামড়ে ফাইলের জট থেকে বেরোনোর পথ খুঁজতে ব্যস্ত। এতে সহকর্মীদের অল্প কয়েক জন গর্বিত, অনেকেই ঈর্ষান্বিত, তবে বেশির ভাগই ‘বাড়াবাড়ি হচ্ছে’ ভেবে কুপিত। সুমিতাভ কোনও দিকে না তাকিয়ে ‘কাজেতে ঢালিয়া দিনু মন’ নিয়ে চলতে থাকে। বস মাঝেমধ্যে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। পিঠে হাত রেখে বলেন, “আজ বাড়ি যাও। বাকিটা কাল এসে দেখবে না-হয়।”
সুমিতাভ কাঁচুমাচু মুখে বলে, “হিসাবে একটা বড় গোলমাল রয়ে গেছে। এই ফাইলটা ঠিক করে যাব স্যর।”
হঠাৎই ঘটল অঘটন। বিভাগের প্রধান বদলি হলেন। নতুন বস মানুষ ভাল, সমস্যা একটাই। কর্মীদের কাছ থেকে কাজের চেয়েও বেশি হাত কচলানো হাসিটি চান। কথায় কথায় ‘সস’ এর মতো ছড়িয়ে দিতে হবে এই হাসির মতো দেখতে হাসি। দন্তবিকাশে গদগদ ভক্তি, করতালিও। হাসি দিয়ে করতালিকে এক কথায় কী বলা যাবে? হাসতালি? মন্দ কি? দফতরের কয়েক জন আবার বিশ্বাস করতে শুরু করল, বসের যাবতীয় অন্যায়ই হচ্ছে ন্যায়, ত্রুটি হচ্ছে ঠিক, অকারণ ধমক আসলে স্নেহ। এদের ভিতরে হাসি ঘাপটি দিয়ে থাকে। বিশ্বাসে যদি বস্তু মিলায়, হাসিতে নয় কেন? ফলে কারও বেলায় ‘বস দেখানো মিথ্যে হাসি’ এক সময় ‘সত্যি হাসি’ হয়ে যায়। বসও আপ্লুত। ‘বদসি যদি কিঞ্চিদপি দন্তরুচিকৌমুদী’। সুতরাং শুধু ‘কাজ’ নয়, চাই ‘হাসতালি’, দেখতেই হোক, আর দেখাতেই হোক।
শুষ্কং কাষ্ঠং সুমিতাভ এই হাসির কাছে সহজেই পরাভূত হল এবং সম্ভাব্য প্রোমোশনটি তার কানের পাশ দিয়ে হাসতে হাসতে কেটে পড়ল।
বলাই পালের হাসি ফুরোল
তিন নম্বর গল্প। এই গল্পের মূল চরিত্র বলাই পাল। বলাই পাল ‘অল্পেই খুশি’ টাইপ ছাপোষা মানুষ। নিজের নামের মতোই পুরনো ঘরানায় তার জীবনযাপন। উত্তর কলকাতার গলিতে, প্রপিতামহের রেখে যাওয়া মস্ত ছাদ আর ছড়ানো উঠোনের বাড়ি। সেখানে জীবনের চল্লিশ বছর কাটিয়ে সন্তুষ্ট চল্লিশ বছরের বলাই পাল। ইঁদুরদৌড়ের দুনিয়ায় নিজের ‘মোটের উপর টেনটুনে চলে যায়’ বেতনের চাকরি নিয়ে তৃপ্ত। সকালে বাজারে তাজা ঝিঙে-পটল, খাবি খেতে থাকা মাছ ব্যাগে পোরা ছাড়া উচ্চাশা তেমন কিছু নেই। সকালে এক প্রস্ত, সন্ধেয় এক প্রস্ত গলির মোড়ে আড্ডা, মাঝেমধ্যে ময়দানে মোহনবাগানের ম্যাচ দেখতে যাওয়া, শনিবার রাতে ঈষদুষ্ণ জলে ঈষৎ পানাসক্তি ছাড়া শখ বলতে তেমন কিছু নেই। এতেই বলাই পাল খুশি, এতেই বলাই পালের মুখে হাসি। সেই হাসি আবার কখনও-সখনও অট্টহাসি হয়ে গলিতে পাক মারে। এটাই তার বৈশিষ্ট্য। সদানন্দে থাকা মানুষ। পাড়ার বন্ধু, অফিসের সহকর্মীরা তাই বলাই পালকে কাছে চায়। আড্ডা, ময়দান, নেমন্তন্নবাড়ি, সে না গেলে চলবে না। কে হাসবে, কে হাসাবে? রসগোল্লার রসে জিভ খুশি হয়, মন যে ভরে না।
ক’মাস হল সেই বলাই পালের হাসি ক্রমশ নিবে আসছে। নিজে হাসছে কম, অন্যকে হাসাচ্ছে কম। সবাই চেপে ধরলে, যে টাইপ ‘হাসিতে হাসি কম, দুঃখ বেশি’, সেই টাইপ হাসছে। বলছে, “ও কিছু নয়। শরীরটা ঠিক জুতে নেই।” সবাই বুঝতে পারছে, বলাই পাল বানিয়ে বলছে। কিছু লুকোচ্ছে।
লুকোচ্ছে তো বটেই। তার প্রবাসে-বিদেশে থাকা শরিকি ভাইবোনেরা জানিয়েছে, তারা সোনার চেয়ে দামি জমি নষ্ট করা ছড়ানো উঠোনের যুগে পড়ে নেই। তারা গলির বাড়িটি বেচে দিতে চায়। অর্থাৎ চার পুরুষের ভিটে থেকে উৎখাত হওয়ার সময় এসেছে। এ দিকে কন্যাটি পরীক্ষায় মোটের উপর ভালই রেজ়াল্ট করেছে। তাকে আরও পড়াতে হবে। আগেকার দিনে লেখাপড়ায় ভাল মানে নানা স্কলারশিপে বিনে পয়সায় আরও বেশি পড়া, এখন লেখাপড়ায় ভাল হলে বেশির ভাগ সময়েই বিপদ। কয়েক লক্ষ টাকা খরচের ধাক্কা। কলেজে পড়া পুত্র আবার মোটরবাইকের আবদার ধরেছে। সে নাকি আওয়াজ তুলে ছুটতে চায়। বাড়িতে অশান্তি করছে। এর সঙ্গে পুত্রকন্যাদের মায়ের চাহিদা একটি মোবাইল ফোনের। সেই ফোন তিনি স্ট্যান্ডে বসিয়ে বাসন মাজা, কাপড় কাচা, ঘর ঝাঁটের শিক্ষামূলক ভিডিয়ো বানাবেন। বান্ধবীরা বলেছে, এতে নাকি ভাল রোজগারের সুযোগ আছে। তেমন হলে ডলার, পাউন্ড, ইউরো এসে যাবে। তাই দামি ফোন চাই।
এর পরেও ছাপোষা বলাই পালের হাসি বাসি ফুলের মতো নেতিয়ে যাবে না?
মাননীয় পাঠক, হাসি-বিষয়ক এই তিন গল্প শুধু তমালের মামা, সুমিতাভ সান্যাল বা বলাই পালের গল্প নয়। এই তিন গল্প অনেকের। নিত্যানন্দ স্মৃতি বিদ্যালয়, সরকারি বা বেসরকারি অফিসের কোনও দফতর, উত্তর কলকাতার গলি টপকে এই গল্পেরা ছড়িয়ে রয়েছে। এরা আমাদের পরিচিতজন। কে জানে, কখনও হয়তো বা আমরা নিজেরাই! দুনিয়া জুড়ে হাসি ফুরিয়ে যাচ্ছে, শুকিয়ে যাচ্ছে। কখনও হাসি ‘অপরাধ’, কখনও ‘মিথ্যে হাসি’র কদর বেশি। কখনও ‘গদগদ হাসি’তে অন্যায়কে মেনে নিয়ে হাসিকে অপমান করা হচ্ছে, কখনও আবার সাধ্যের বাইরের সাধ মেটাতে হাসিমুখ গোমড়া। হাসি পালিয়ে যাবে না তো কী করবে?
বাছা, হাসো তো দেখি
গুরুগম্ভীর ভাবে বলতে গেলে, যে অভিব্যক্তি খুশি, আনন্দ, কৌতুক, রসবোধকে প্রকাশ করে, তাকেই বলে হাসি। এই সংজ্ঞা যে মানতেই হবে এমন কোনও মাথার দিব্যি নেই। আনন্দের অভিব্যক্তি নানাবিধ হতে পারে। সাধারণ ভাবে, একটা মানুষ হাসছে কি না, সে কথা তার চোখমুখের চেহারা বলে দেয়। বইতে এমনটাই লেখা। কেউ বলে, হাসি হল পেশি আর স্নায়ুর কম্ম। তারা নেই তো মুখে হাসিও নেই। এই কাজে নিবেদিতপ্রাণ দুই পেশি ‘জাইগোমেটিকস মেজর’ আর ‘অরবিকুলারিস ওকুলি’-র নাম অনেকেরই জানা। আর স্নায়ুটি হলেন ‘সিএন৭’। সহজ ব্যাখ্যা, স্নায়ু হয়ে মস্তিস্কে সঙ্কেত পৌঁছলে দুই পেশির টানাটানি শুরু হয়। ঠোঁটের দু’টি পাশ ছড়িয়ে পড়ে, চোখের কোণ হয়ে যায় সরু, নাকের পাটা ফোলে। বোঝা যায়, ‘তিনি হেসেছেন’।
হাসির উপাদানে কেউ যখন আনন্দিত, আহ্লাদিত, উচ্ছ্বসিত হয়, তখনই মস্তিস্ক আদেশ দেয়, ‘বাছা, হাসো তো দেখি’। শুধু ঠোঁট, চোখ, নাক নয়, আমাদের স্বরয়ন্ত্রটিও এই ফুর্তিতে যোগ দেয়। দাপাদাপি শুরু করে। ‘হা হা’, ‘হো হো’, ‘হি হি’। সাড়া দেয় শরীরও। কেঁপে ওঠে, দুলে ওঠে, অনেক সময় গড়াগড়িও দেয়। সুকুমার রায়ের হিজিবিজবিজের গড়াগড়ি দিয়ে হাসার কথা বাঙালি কি কখনও ভুলতে পারবে?
এ-সব তো সিলেবাসের কথা। হাসি যে কেবল দাঁত বার করে, শরীর দুলিয়েই হবে, এমনটাও নয়। এমন হাসিও রয়েছে, বাইরে থেকে দেখা যায় না। সে-হাসি মনে মনে হাসি। কখনও মুচকি, কখনও তুফান। যেমন, ক্ষমতাশালীর বুদ্বুদ্সম আস্ফালন দেখে অনেক সময়ই শরীরের ভিতর হাসি পাক দেয়। মূর্খ যখন বিদ্বানের ভান করে, জ্ঞানকে তুচ্ছ করে, আগ বাড়িয়ে পণ্ডিতি দেখাতে গিয়ে পা হড়কে আছাড় খায়, তখন প্রাণের ভিতর হাসি টগবগিয়ে ওঠে। কিন্তু প্রকাশ করতে ভয় হয়। বেশির ভাগ ক্ষমতাশালী নিজেকে নিয়ে হাসাহাসি পছন্দ করেন না। ইদানীং তো ব্যঙ্গ, শ্লেষ, কার্টুনচিত্রেও শাস্তির বিধান হয়েছে। হাসানোর অপরাধে ব্যঙ্গচিত্রী, কমেডিয়ানকে হাজতে থাকতে হয়।
হাসি কখনও রহস্যময়ীও। নইলে আনন্দাশ্রু হয়ে সে চোখের জলে প্রকাশ পায় কেমন করে? প্রেমিকের নার্ভাস আচরণে প্রেমিকার মুখ-টেপা হাসিতে ‘জাইগোমেটিকস মেজর’ নামের পেশিটির করার কিছু থাকে কি? একেবারেই নয়। যেমন থাকে না, ‘আজি এ মধুর সাঁঝে কাননে ফুলের মাঝে/ হেসে হেসে বেড়াবে সে, দেখিব তায়’। এর সঙ্গে রয়েছে ঢুলুঢুলু চোখের তৃপ্তির হাসি, লাফে, ডিগবাজিতে প্রাপ্তির হাসি, ঠোঁটের কোণে জয়ের হাসি।
তাই কে হাসে, কখন হাসে, কী ভাবে হাসে— সব জানতে পারা মোটেই সহজ কম্ম নয়। যেমন মুখে আঁকা হাসি মানেই যেমন হাসি নয়, তেমনই যে মানুষটা থমথমে মুখে হেঁটে চলেছে, মনে মনে সেও যে হাসছে না, তা কে বলতে পারে?
যত হাসি তত কাণ্ড
এমন ভাবনার কারণ নেই যে, সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদরা শুধুই মানুষের দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন, অবহেলা-অপমান নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন আর মানবজাতির চোখের জল মোছার চেষ্টা করেছেন। জ্ঞানী-গুণী, পণ্ডিতেরা হাসিকেও হেলাফেলা করেননি। অজস্র গবেষণা হয়েছে, কাটাছেঁড়া করা হয়েছে বিস্তর। কেন হাসি, কত হাসি, কী ভাবে হাসি তার অন্দরে-অন্তরে ঢুঁ দিয়েছেন। লাইব্রেরি হাতড়ালে আর ইন্টারনেটে সাইট ঘাঁটলে সেই সব গবেষকদের কাজের খোঁজ মিলবে। তার পরেও একটু ঝালিয়ে নেওয়া যাক। হাসিকে চিনতে না পারলে সে যে হারিয়ে যাচ্ছে, তা বোঝা যাবে কী করে?
তমালের মামার ছেড়ে আসা বিদ্যালয়ে হেডমাস্টার কেমন ছিলেন, তা খানিক আঁচ করা গিয়েছে। ছাত্রের মুখে হাসি দেখলে বেত নাচিয়ে কটমট চোখে বকাঝকা করাটাই তাঁর চরিত্রের সঙ্গে মানায়। তিনি তো বকুনি দেবেনই— “আগে বল কেন হাসলি? হাসলি কেন বল আগে... নইলে তোর এক দিন কী আমারই এক দিন, থুড়ি এই বেতেরই এক দিন।”
তবে ছাত্রদের শারীরিক নিগ্রহের পাট চুকেছে। চিরকালই এমন অনেক মাস্টার, দিদিমণি রয়েছেন, যাঁদের স্নেহ-ভালবাসা ছেলেমেয়েদের কাছে মণিমুক্তোর মতো। ছেলেমেয়েদের হাসিমুখ তাঁদের সবচেয়ে বড় সুখ। বেতের হাতবদল হয়েছে, “কেন হাসলি, আগে বল কেন হাসলি?” এই শাসানি এখন যাঁরা দেয়, তাঁরা রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে বসেন। বেত চেহারা বদলে বোমা হয়ে হাসি-আনন্দে ভরা শিশুদের স্কুলের উপর আছড়ে পড়ে, বেত দুর্নীতি হয়ে রোজগারহীন করে মানুষকে, তার ঘরের হাসি মুছে দেয়, বেত নির্মম নির্দয় হয়ে বৃদ্ধ-বৃদ্ধার মুখের হাসি মুছে টেনে রাস্তায় এনে লাইনে দাঁড় করায়। বলে, “নিজের পরিচয় দাও। বলো তুমি কে?’”
হাসির কার্য-কারণ গবেষকরা খুঁজেছেন, খুঁজে চলেছেন। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতো মানুষ যেমন কাজ করেছেন, তেমন কাজ করেছেন পল একম্যান, ওরিয়ানা আরগন, রবার্ট প্রোভিনের মতো স্নায়ুবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানীরা। ডেসমন্ড মরিস তাঁর ‘ম্যান ওয়াচিং’ আর অ্যাঙ্গাস ট্রাম্বল তাঁর ‘আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব দ্য স্মাইল’ গ্রন্থে হাসির চমকপ্রদ সব ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কেউ বলছেন, হাসি হল মানুষের আনন্দ, খুশি, কৌতুক, রসবোধ উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ। কেউ বলেছেন, হাসি মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। অনেকটা হাই তোলার মতো। কেউ বলছেন, আনন্দ, সুখের প্রকাশ তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, সামাজিক বন্ধন শক্তিশালী করাটাই হাসির মূল দায়িত্ব। এক জনের হাসিমুখ অন্যকে কাছে ডাকে। কারও মতে, মানসিক উদ্বেগ, আবেগকে সামলে দেওয়ার উপায়টি হাসি। খানিক হো হো, হি হি করলেই মন হালকা। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, যত হাসি তত হরমোন। হাসলে তারা ঝাঁকুনি দেওয়া গাছের ফুলের মতো টুপটাপ ঝরে পড়ে। এন্ডোরফিন, অক্সিটোসিন, ডোপামিন, সেরোটোনিন হরমোনেরা হেসে ওঠে। কেউ সুখের সন্ধান দেয়, কেউ আনন্দ এনে মনকে করে ভাল, কেউ মেজাজকে রাখে ফুরফুরে।
আহা, হাসিতে কতই না কাণ্ড!
হাসিরা সব গেল কোথায়
বইয়ে কথায়, খুশি, আনন্দ, কৌতুক, রসবোধে হাসি পায়। তারা স্নায়ুতে, পেশিতে, হরমোনে সাড়া ফেলে, মেতে ওঠে। মন হাসে, মুখ হাসে, শরীর হাসে। আবার কেউ অন্য কথা বলতেই পারে।
“ধুত্তোরি, নিকুচি করেছে এত হিসাবের। অত কারণ বুঝি নে বাপু, পেশি-স্নায়ু-হরমোন জানি নে, পাচ্ছে হাসি, হাসছি তাই।”
কেন পাচ্ছে হাসি? সমাজের, জীবনের, ধরে বেঁধে মানিয়ে চলা নিয়মকানুনের অসঙ্গতি, মানুষের উদ্ভট আচরণ, মিছে হামবড়াই, অনর্থক অহঙ্কার দেখলে হাসি তো পাবেই! কোনও কোনও সময়ে অন্যায়, অবিচার দেখেও পেটে গুড়গুড়িয়ে হাসি ওঠে। সে হল রাগের হাসি। আসলে ‘অন্যায়’ দেখে তো হাসি নয়, হাসি অন্যায় যে করে তাকে দেখে। অন্যায় করেও বুক ফুলিয়ে থাকা যে অতি নিম্নমানের কমেডি! হাসি পাবে না!
তবে হাসিতে ভাটা এসেছে। উপাদানেরা সব হয় হারিয়ে যাচ্ছে, নয়তো পড়ছে ধামাচাপা। সে গবেষকদের ঠিক করে দেওয়া উপাদানই হোক, আর ‘ইচ্ছে হচ্ছে তাই হাসছি’ মেজাজেরই হোক। দুনিয়া জুড়ে যা হচ্ছে তাতে খুশি, আনন্দ, কৌতুকেরা লজ্জায় মুখ লুকিয়েছে। এখন ‘কান্না’রই রমরমা, সে-ই দাপিয়ে বেড়ায়। দূরেই থাকুক আর ঘরের পাশেই, সেই কান্না কানে আসবেই, আসছেও। ঘরবাড়ি হারানো পিতার কান্না, ধর্ষিতা কন্যাকে কোলে নিয়ে মায়ের কান্না, উদ্বাস্তু হওয়া অসহায় মানুষের কান্না, মানুষের কর্মহীন হয়ে পড়ার কান্না, বিশ্বাস করে হাত ধরা নেতা মন্ত্রীর চরম বিশ্বাসঘাতকতার কান্না, ধর্মের হানাহানিতে, জাতপাত-কুসংস্কারে অপমানিত হওয়ার কান্না। এত কান্নাকে ঠেলে সরিয়ে বেচারি হাসি মানবিকতার ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে আসবে কী ভাবে? দুনিয়ার কোন হাসির সাহিত্য, আনন্দের সিনেমা, খুশির গান, থিয়েটার, কোন কৌতুক, রসিকতা, সূক্ষ্ম রসবোধ বালিশের মতো কানে চেপে ধরলে এই কান্না ঢাকা যায়? এমন কোনও অট্টহাসি কি আছে, যা পৃথিবী জুড়ে বেজে ওঠা যুদ্ধের দামামা শুনতে দেবে না? খিদে বাড়চ্ছে, খাবার নেই। অসুখ বাড়ছে, চিকিৎসা নেই। অস্থিরতা বাড়ছে, শান্ত করার ভালবাসা নেই। হানাহানির আগুন নেবানোর জল কোথায়? কেউ যদি প্রশ্ন করে, “কেন? হাসি তো রয়েছে? সে কি দুর্বল?” জবাবে বলতে হয়, প্রকৃতি হাসিকে এই ক্ষমতা দেয়নি। সে নিরীহ, শান্তিপ্রিয়। চুপিসাড়ে ভালবাসতে পারে। মনের আগুন নেবাতে পারে, গুলি, বোমা, ক্ষেপণাস্ত্রের আগুন নয়।
সভ্যতা তার নিষ্ঠুরতম হাসিতে মেতেছে। হত্যালীলার হাসি। স্কুলে ঢুকে বালক-বালিকা, কিশোর-কিশোরীকে বন্দুকের গুলিতে ঝাঁঝরা করতে শিখেছে সে। শিশুদের স্কুলে বোমা ফেলতে শিখেছে। এই হাসি তো মানুষের নয়, পশুর। এন্ডোরফিন, অক্সিটোসিন, ডোপামিনের মতো খুশি-আনন্দের হরমোনেরা ভয়ে লুকিয়ে পড়েছে।
শুধু কি যুদ্ধবিগ্রহ, হানাহানিই দায়ী? হাসির গোড়ায় জল দিতে আমরাও কি ভুলে যাইনি? ভাবিনি কি, হাসির কোনও দাম নেই? অবশ্যই ভেবেছি। নিজের স্বার্থপরতায় অন্যের হাসি কেড়ে নিতে আমরা যে ছুরিটি পকেটে নিয়ে ঘুরছি, কখনও তার নাম দিয়েছি, ‘মানুষ হওয়া’, কখনও বলেছি, ‘কেরিয়ার’, কখনও বলেছি ‘আখের গোছাও’। কখনও হাসতে হাসতে বৃদ্ধ বাবা-মাকে অবহেলা করেছি, তাঁদের সম্পত্তি কেড়েছি হাসতে হাসতে। কখনও হাসিকে নিয়ে গিয়েছি হাত-কচলানো পদলেহনে। হেসেছি কেউ পড়ে গিয়ে চোট পেলে, হেসেছি পরের সর্বনাশে। হাসিকে হারিয়েছি লোভের হাতছানিতে। কখনও হাসিকে ব্যবহার করেছি খুশি করতে, কখনও রাগাতে, কখনও অপমানে। হাসিকে বলেছি, “তুমি হাসি ছাড়া সব কিছু।”
পাছে মাথা খাটিয়ে রস অনুভব করতে হয়, হাসি যে জীবনের গভীর, গভীরতম সুখ, তা বুঝতে হয়, তাই ঠুনকো, হালকা, নিম্নরুচির জোক, স্থূল স্ট্যান্ডআপ কমেডি, মিম, অশ্লীল কৌতুকে খুশি থেকেছি। পাশের জনের হাসি কেড়ে মোবাইল ফোনে পচা রাজনীতির পচা ঠাট্টা দেখে আপনমনে হেসে নিজেকে ‘রসিকশ্রী’ উপাধি দিয়েছি। নির্লজ্জ হয়ে ভেবেছি, প্রতিবাদের কী প্রয়োজন? এই তো হাসলাম, এ কি যথেষ্ট নয়?
এর পরেও হাসি বেচারি লেজ গুটিয়ে পালাবে না তো কী করবে?
তবে সবটা অন্ধকার নয়
গল্প দিয়ে শুরু করেছিলাম। আর একটা গল্প দিয়েই শেষ করি না-হয়। সংক্ষিপ্ত গল্প।
হরিপদ থাকে আড়ংভাঙা গ্রামে। বছর চল্লিশ-বিয়াল্লিশ বয়স। নিজের জমিজমা কিছু নেই, অন্যের জমিতে জনমজুর খাটে। ভাঙা বাড়িতে বাস। যেদিন কাজ পেল চালে-ডালে ফুটিয়ে নিল, সঙ্গে পারলে কুমড়োর ফালি। যেদিন কাজ পেল না, চায়ের গেলাসে এক মুঠো মুড়ি ফেলে চুমুক দিল। হরিপদ কারও সাতে-পাঁচে নেই। ঝামেলা, হইচই এড়িয়ে থাকা, ভিতু মানুষ হরিপদ। হরিপদরা যেমন হয়। এমন মানুষকে গ্রামের লোকের অনেক সময় মনে থাকে না। মেলায়, পুজোপার্বণে, বাড়ির বিয়ে, অন্নপ্রাশনে নেমন্তন্ন করতে ভুলে যায়।
হরিপদ সেদিন গিয়েছিল সদরে। কিছু টাকা পাওয়ার ছিল। কাজের বকেয়া মজুরি। টাকা তো পেলই না, অপেক্ষা করে ফিরতেও রাত হল। পুকুরপাড়ের অন্ধকার পথ ধরে হাঁটছিল ক্লান্ত হরিপদ। হঠাৎই ঝোপের আড়াল থেকে ভেসে আসা বালিকার চাপা গোঙানি শুনে থমকে দাঁড়ায় সে। কী করবে? চলে যাবে? ভিতু হরিপদর তাই তো উচিত। তবু সে হিসাবে গোলমাল করে ফেলে। এই গোলমাল তাকে মানায় না। এর পর একটা বড়সড় বাঁশের টুকরো জোগাড় করে বোকা লোকটা ঢুকে পড়ে ঝোপের ভিতরে।
পরদিন সকালে পুলিশ আসে হরিপদর ভাঙা ঘরে। কিশোরী মালতীকে বাঁচাতে গিয়ে গ্রামের যে মাতব্বরটিকে বাঁশ দিয়ে বেধড়ক পিটিয়েছে হরিপদ, সে বাঁচবে কি না সন্দেহ। বাঁচলেও বাকি জীবন ভাঙা হাত-পায়ে থাকতে হবে। এর পরও পুলিশ হরিপদকে ধরে নিয়ে যাবে না? তার রোগাভোগা কোমরে পুলিশের মোটা দড়ি। তবে মালতী ভাল আছে, তার কোনও ক্ষতি হয়নি শুনে হরিপদ চলেছে হাসতে হাসতে। আর গোটা আড়ংভাঙা গ্রামের মানুষ তার পিছু নিয়েছে হাসিমুখে।
কে বলে হাসি হারিয়ে গিয়েছে?