Evolution of Names

নামের আমি নামের তুমি

উইলিয়াম শেক্সপিয়ার নামকে গুরুত্ব না দিলেও রবীন্দ্রনাথ কিন্তু এ বিষয়ে ছিলেন ভারী সংবেদনশীল। বাঙালি নাম কী ভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে, দেখলে বিস্মিত হতে হয়। 

সপ্তর্ষি রায় বর্ধন
শেষ আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩৩
মনীষী: উইলিয়াম শেক্সপিয়ার ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

মনীষী: উইলিয়াম শেক্সপিয়ার ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ফাইল চিত্র।

নামে কী-ই বা যায় আসে— লিখেছিলেন শেক্সপিয়ার। গোলাপকে যে নামেই ডাকা হোক, সে বরাবরই সুগন্ধময়। ষোড়শ শতকীয় শেক্সপিয়ারিয়ান ট্রাজেডির পাতা থেকে জন্ম নিয়ে জুলিয়েটের এই উক্তি কালপ্রবাহে পরিণত হয়েছে এক সর্বজনীন উদ্ধৃতিতে। নাম না থাকার পরিণাম ভয়ঙ্কর, সে কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন হোক বা পেটো মস্তানের নাম নিউটন! নাম থাকলেই সুরূপা অথবা কুরূপার বেশে থাকবে সুনাম আর বদনাম। কখনও বা পরবে সে বে-নামের ছদ্মবেশ। সুতরাং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের পরিচয় বহন করে নাম। রামের থেকে শ্যাম আলাদা, সীতার থেকে গীতা— জিন-ক্রোমোজ়োমের জৈবিক হিসেব-নিকেশ যদি বা হয়ে থাকে এই বিভিন্নতা সৃষ্টির মূল কারণ, নাম বা নেম বা নমেন হল তার নিশানদিহি বাহ্যিক পরিচিতি।

মানবসমাজে নামকরণের প্রয়োজন হল কেন, এ নিয়ে বেশি তত্ত্বতালাশ না করে রবীন্দ্রনাথের শরণাপন্ন হওয়া যাক। তিনি বলেছিলেন, “নামকে যাঁরা নামমাত্র মনে করেন আমি তাদের দলে নই।” ১৮৩৩ সালে শান্তিনিকেতনের শিক্ষক অজিতকুমার চক্রবর্তীর কন্যা অমিতার (পরে ঠাকুর) নামকরণ উপলক্ষে তাঁর উপলব্ধি ছিল এ রকম— “আরও একটি জন্ম ইহার বাকি আছে, এবার ইহাকে মানবসমাজের মধ্যে জন্ম লইতে হইবে। নামকরণের দিনই সেই জন্মের দিন। একদিন রূপের দেহ ধরিয়া এই কন্যা প্রকৃতির ক্ষেত্রে আসিয়াছিল, আজ নামের দেহ ধরিয়া এই কন্যা সমাজের ক্ষেত্রে প্রথম পদার্পণ করিল। জন্মমাত্রে পিতামাতা এই শিশুকে স্বীকার করিয়া লইয়াছে, কিন্তু এ যদি কেবলই ইহার পিতামাতারই হইত তবে ইহার আর নামের দরকার হইত না, তবে ইহাকে নিত্য নূতন নূতন নামে ডাকিলেও কাহারও ক্ষতিবৃদ্ধি ছিল না। কিন্তু এ মেয়েটি নাকি শুধু পিতামাতার নহে, এ নাকি সমস্ত মানবসমাজের, সমস্ত মানুষের জ্ঞান প্রেম কর্মের বিপুল ভাণ্ডার নাকি ইহার জন্য প্রস্তুত আছে, সেইজন্য মানবসমাজ ইহাকে একটি নামদেহ দিয়া আপনার করিয়া লইতে চায়।”

‘মনুস্মৃতি’-তে সমাজের চার শ্রেণির নামকরণের সুস্পষ্ট নির্দেশ আছে। যেমন, ব্রাহ্মণের মঙ্গলসূচক নামের উপর অধিকার (লক্ষ্মীধর); ক্ষত্রিয়ের নামে শক্তির দ্যোতনা (বীরবাহু, ছত্রপতি); সম্পদের সঙ্কেত বৈশ্যের নামে (ধনপতি) আর সেবার মনোভাব শূদ্রের নাম জুড়ে (নরদাস, চরণদাস)। বাংলা নামের ক্ষেত্রটি সুপরিসর। সময়ের সঙ্গে সে পাড়ি দিয়েছে পরিবর্তনের পথে। আটপৌরে থেকে উন্নীত হয়ে পড়েছে আধুনিকতার আভরণ।

একটা সময় ছিল, যখন নাম রাখা হত মূলত দেবদেবী, মহাপুরুষ, সাধু, সন্তদের নামে। এতে এক ঢিলে মারা যেত দুই পাখি। নিজের উপাস্য দেবদেবী বা সম্প্রদায়গত পরিচয় বুঝিয়ে দেওয়া যেত তো বটেই, বিশ্বাস ছিল ছেলেপুলের নাম ধরে ডাকার ছুতোয় ভগবানকে ডাকার কাজও হয়ে যাবে সহজেই। হিন্দুদের ক্ষেত্রে বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, গীতা, বিবিধ সাহিত্যগ্রন্থ এবং অবশ্যই দুই মহাকাব্য, রামায়ণ ও মহাভারত থেকে আহৃত নামে নামকরণের রীতি ছিল সমাজের সব স্তরেই। কৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম, শিব বা বিষ্ণুর সহস্রনাম এ ব্যাপারে জনপ্রিয়তার শীর্ষে। অন্যান্য দেবদেবী, যেমন দুর্গা, শিব, লক্ষ্মী, গঙ্গা এদেরও প্রভাব দেখা যেত। লক্ষ্মীনারায়ণ, ভগীরথ, সহদেব, শিবকালী, পার্বতীচরণ, কৃষ্ণপদ, রাধারাণী, রামপ্রসাদ, হরিপদ— এ-সবের আধিক্যই ছিল বেশি। এ-সবের মাঝে যে এক-আধখানা ‘মুচিরাম গুড়’ ধরনের নামের দেখা মিলত না, তা নয়। তবে সে ছিল সংখ্যায় কম, বা ব্যতিক্রমী মনের পরিচায়ক।

নবদ্বীপের খাঁটি বৈষ্ণব বংশের ছেলে হরিদাস ছিল আমার কলেজজীবনের বন্ধু। কলকাতা শহর তাকে গড়েপিটে মানুষ করেছিল। পার্ক স্ট্রিটের মিশনারি কলেজে পড়ার ফাঁকে ফাঁকে সেখানকার সারিবদ্ধ রেস্তরাঁ ও পানশালায় অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে সে হয়ে উঠেছিল প্রহ্লাদকুলে দৈত্য। কিন্তু এর মাঝে গোল পাকিয়েছিল তার পিতৃদত্ত নাম এবং পিতৃপুরুষের ‘পাল’ পদবি। মহা ফ্যাসাদ! কো-এড কলেজের আধুনিকা সতীর্থদের সামনে হরিদাস পাল মরমে মরে ছিল এই নামের কারণে, যাতে তার কোনও হাত ছিল না। এক ট্র্যাডিশন হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার ট্র্যাজেডির কারণ!

বংশের নামকরণের ধারা বজায় রাখার প্রতি এই আনুগত্যের আর এক মজাদার উপলব্ধির কথা শুনিয়েছিল আমার অপর বন্ধু রামানুরূপ। তাদের বংশে পুরুষ-নামাগ্রে ‘রাম’ বসানোর রীতি। বংশ বিস্তারের সঙ্গে রামগতি, রামকৃষ্ণ, রামানুজ, রামদুলাল, রামশঙ্কর, রামহরি, রামদুলাল, রামমোহন, রামশশী— তরতরিয়ে এগিয়ে চলেছিল নামকরণের ক্রম। একটা সময় চিন্তা হয়ে গিয়েছিল, যা চলছে তাতে এক সময় রামছাগল, রামদা, রামপাখি-তে গিয়ে না ঠেকে!

উনিশ শতকের শুরুর সময় থেকে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে বাঙালি নামের খানিক বৈচিত্র দেখা যায়। তার মধ্যে সবচেয়ে লক্ষণীয় হল ছেলেদের নামের অন্তে ‘ইন্দ্রনাথ’ শব্দের সংযুক্তিকরণ যা ‘শ্রেষ্ঠ’ অর্থে ব্যবহৃত। পরে রবীন্দ্রনাথ তো অকাতরে নাম বিতরণ করতেন। নবজাতক-জাতিকার নাম চেয়ে তাঁর কাছে কেউ বিমুখ হননি। পারিবারিক নামকরণে রক্ষণশীল হলেও পরিবার-বহির্ভূতদের ব্যাপারে তাঁর উৎসাহ ছিল লাগামছাড়া। এ ব্যাপারে অবিশ্যি রবীন্দ্রনাথের সমান্তরালে বঙ্কিম, শরৎ, মধুসূদন, পরশুরাম, এঁদের চরিত্রের নামও বাংলা সাহিত্যের পাতা থেকে পৌঁছে গেছে সামাজিক নামের ধারায়।

পরশুরাম আবার তাঁর ‘নামতত্ত্ব’ প্রবন্ধে কিছু কূট প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, যেমন বাঙালির সংক্ষিপ্ত নাম কী রকম হওয়া উচিত? সে কি হবে শ্রীযুক্ত না শ্রীহীন? ব্যাকরণে শুদ্ধ হবে সে নাম? না কি শ্রুতিমধুর হলেই হল? “বাঙালী বিদ্যাভিমানী শৌখিন জাতি। শরীরে আর্যরক্তের যতই অভাব থাকুক, বিশুদ্ধ সংস্কৃতমূলক নাম বাঙালীর যত আছে অন্য জাতির বোধ হয় তত নাই!”

নামের পরেই থাকে পদবি বা ‘সারনেম’! সাধারণত কুল-পরিচয় বা পেশা অথবা বসতের নিরিখে পদবি যুক্ত হয় নামের অন্তে। সমাজে উপর-নীচ ভেদাভেদের হিসাব যত জটিল হয়েছে, নামের সঙ্গে পদবির ব্যবহার তত প্রকট হয়েছে। বিবাহসূত্রে স্বামীর পদবি গ্রহণের যে সামাজিক রীতি, তা সৃষ্টি করেছে আরও জটিলতা। নারীর সম অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রশ্ন উঠেছে যে, বিয়ের পরে মেয়েদের পদবি কেন পাল্টে যাবে? সুতরাং বিবাহ-পরবর্তী কালে পদবির যুগ্মকরণ এখন প্রচলিত ও স্বীকৃত। তারাপদ রায়ের লেখায় পেয়েছিলাম এ রকম এক উদাহরণ। কাল্পনিক হলেও সে প্রণিধানযোগ্য— “ধরা যাক জয়ন্ত ঘোষের সঙ্গে জয়ন্তী রায়ের বিয়ে হ’ল, তাঁরা দুজনেই ঘোষরায় হলেন, তাঁদের ছেলের নাম হ’ল বৈজয়ন্ত ঘোষরায়। মনে করুন, আরেকটি দম্পতি, তাঁরাও নারীর সমমর্যাদায় বিশ্বাসী, তাঁদের নাম মাধব চক্রবর্তী এবং মাধবী চ্যাটার্জি। তাঁদের নয়নের মণি একমাত্র মেয়ের নাম সুমাধবী চক্রবর্তী চ্যাটার্জি! এই বার আসল সমস্যা। কালক্রমে বৈজয়ন্ত এবং সুমাধবী বড় হ’ল এবং তাদের বিয়ে হ’ল। বিয়ের পর সুমাধবীর সম্পূর্ণ নাম দাঁড়াল শ্রীমতী সুমাধবী ঘোষরায় চক্রবর্তীচ্যাটার্জি! এখানেই কিন্তু সমস্যার শেষ নয়। আরও এবং আরও সমস্যা গোকুলে বাড়ছে। সেখানে দু’টি ছেলেমেয়ে প্রেমে পড়েছে— তাদের এক জনের নাম স্বপন মিত্রটেলার, আরেক জনের নাম আয়েশা রহমানসান্যাল। দু’জনেই চমৎকার ছেলেমেয়ে, তাদেরও বিয়ে হ’ল। এর পর আবার পঁচিশ বছর। কলকাতার মেট্রো রেলের কামরায় প্রতিদিনের যাতায়াতে দুটি যুবক যুবতীর মধ্যে প্রেম হয়েছে, তাদের একজন হ’ল শ্রীযুক্ত অনির্বাণ ঘোষরায় চক্রবর্তীচ্যাটার্জি, অপরজন ঝিমকি মিত্রটেলার রহমানসান্যাল…”

এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে আর এক বার স্মরণ করা যাক— “প্রাচীনকালের দিকে তাকালে নল-দময়ন্তী বা সাবিত্রী-সত্যবানের কোন পদবী দেখা যায় না। একান্ত আশা রাখি, নলকে নলদেববর্মা বলে ডাকা হত না। কুলপদবীর সমাসযোগে যুধিষ্ঠির পাণ্ডব বা দ্রৌপদী পাণ্ডব নাম পুরাণ-ইতিহাসে চলেনি, সমাজে চলতি ছিল এমন প্রমাণও নেই। আমার প্রস্তাব হচ্ছে, ব্যক্তিগত নামটাকে বজায় রেখে আর সমস্ত বাদ দেওয়া!”

এই যুগের বাবা-মায়েরা সন্তানের নাম খোঁজার ব্যাপারে রীতিমতো উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিয়ে থাকেন। অভিধান তোলপাড় করে চলে নামের খোঁজ। কী বৈচিত্রময় সেই নামভান্ডার— ‘ঋতপা’, ‘সমীপেষু’, ‘প্রাণভি’, ‘ঋধিমা’, ‘নির্ঝর’, ’বেদবতী’, ‘দেবশ্রুতি’, ‘একম’, ‘প্রৈতি’, ‘তন্বী’, ‘পুণ্যতোয়া’, ‘ঐশানী’, ‘করতোয়া’, ‘বিলাবল’, ‘সহজ’! ব্যতিক্রমী হতে হবে সে তো বলাই বাহুল্য, তার সঙ্গে নাম হতে হবে জুতসই যাতে স্কুল-কলেজে, দেশ-বিদেশ ব্যতিরেকে বন্ধু-বন্ধুনিদের মুখে তার উচ্চারণ হয় অনায়াসে, নিদেনপক্ষে কেতকী মিত্রের ‘কেটি’ অপভ্রংশ হয়ে!

‘শেষের কবিতা’-র প্রসঙ্গ যখন এসেই পড়ল, তখন নাম উপাখ্যানে দাঁড়ি টানা যাক অমিত রায়ের কথা বলে। পিতৃদত্ত নামের আধুনিক রূপান্তর ঘটিয়েছিল অমিত ইংরেজি ছাঁদে। ইংরেজ বন্ধু ও বন্ধুনিদের মুখে যার উচ্চারণ দাঁড়িয়ে গেল, অমিট রায়! লাবণ্যের সঙ্গে প্রথম আলাপে যখন সে স্বীকার করে, “একেবারে সমুদ্রের ও পারের ওটা দূরের নাম। নামের দূরত্ব ঠিক করতে গেলে মেপে দেখতে হয় শব্দটা কানের সদর থেকে মনের অন্দরে পৌঁছতে কতক্ষণ লাগে...” তখন মনে হয় গোলাপের রূপ, গন্ধ বেঁচে থাকে তার নামের অন্তরেই, অন্য কোথাও নয়।

আরও পড়ুন