সমকালীন: শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং উপরে, জীবনানন্দ দাশ। ডান দিকে, প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং হাউস। ছবি: বিশ্বনাথ বণিক।
একুশ শতকে বাঙালির মাথায় নরকের অনির্বচনীয় মেঘের আড়াল থেকে যখনই একটু আলো ফোটে, তখনই দেখা যায় তাকে সঙ্গ দিতে শুরু করেছেন আপাতলঘু প্রজাতির এক প্রতিনিধি— গোয়েন্দা। আমাদের বিনোদনে, অবসরে ও ব্যস্ততায় নাগরিক সমাজের মুখপাত্র হয়ে উঠছেন এমন এক জন মানুষ, যাঁকে সত্যার্থী ভাবা হচ্ছে। তিনি রঞ্জনের মতো চারুবাসনা নন, বরং উদ্যমে রক্তে মাংসে অঙ্কে পুরস্থাপত্যের জাল ছিন্ন করে, এমনকি ‘রক্তকরবী’-র রাজাকেও আমাদের বিবেচনার্থে প্রকাশ্য করে দিতে পারেন। ব্যোমকেশ বক্সী বা প্রদোষ, ওরফে ফেলু মিত্তির এমনই অভয়বার্তা। ফেলুদা যদি বা কৈশোর সহায়িকা; বইপাড়া বইমেলায়, মঞ্চে ও পর্দায় অখণ্ডমণ্ডলাকার নির্বিকল্প আশ্বাস হয়ে উঠেছেন শরদিন্দু-তনয় ব্যোমকেশ।
অবশ্য সমাজের এই চারিত্র্য এক গভীরতর দর্শনচর্চার ডাক দেয় আমাদের। গোয়েন্দা গল্প, বিশেষ করে অ্যালান পো-র গুণাবলি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যখন বোর্হেস-এর মতো লেখক বিশৃঙ্খলার মধ্যে গোয়েন্দা গল্পের ঘরানাতেই ধ্রুপদী সাহিত্যের ধর্ম খুঁজে পান, তখন ভাবা আবশ্যক হয়ে উঠেছে, ব্যোমকেশ আসলে কে? ইতিহাসের দেবতা কটাক্ষ হানলে বোঝা যায়, বেলা ও কালবেলার এক বিশেষ সন্ধিলগ্নের গোপনীয়তা। ব্যোমকেশ ইতিহাসের মাত্রা। না হলে শরদিন্দু এমন একটি মেসবাড়িতে বোর্ডার হবেন কেন, যেখানে জীবনানন্দ দাশের নামও উৎকীর্ণ থাকবে?
আশ্চর্য সমাপতন যে, জীবনানন্দ ও শরদিন্দু সমবয়সি। দু’জনেরই জন্ম ১৮৯৯ সালের ফাল্গুন-চৈত্রে। জীবনানন্দ, শরদিন্দুর তুলনায় মাত্র মাস দেড়েকের বড়। কিন্তু অধিকতর চমক অপেক্ষা করে থাকে মেসবাড়ি নামের একটি অস্থায়ী আস্তানায়।
মফস্সল থেকে যাঁরা কলকাতায় আসছেন, তাঁদের স্বল্প ব্যয়ে খাওয়াদাওয়ার জন্য এই মেসবাড়ির জন্ম। বিষ্ণু দে-র ‘বেকার বিহঙ্গ’ কবিতায় ও অন্যত্র এই মেসের কথা আছে। কিন্তু আমার বলার কথা, সময়ের মুখে কিছু ব্রণর দাগ থাকে। এমন নয় যে, নিসর্গ-নারী বা ইতিহাস-চৈতন্যের দিকে তাকাতে গেলে আমাদের দ্রষ্টব্যের গভীরে প্রবেশ করতেই হবে। বাস্তবতা এত রহস্যে মোড়া যে আপাততুচ্ছ কিছু সাংস্কৃতিক চিহ্নের মধ্য দিয়েও আমরা সেই দ্রষ্টব্যের একটা আধ্যাত্মিক জরিপ করতে পারি। জার্মান দার্শনিক জিগফ্রিড ক্রাকাওয়ের এই ধরনের অবলোকনকে বলেন ‘ফেনোমেনোলজি অব দ্য সারফেস’। তিনি আর তাঁর অবিস্মরণীয় বন্ধু ওয়াল্টার বেঞ্জামিন সভ্যতার পরিত্যক্ত জঞ্জালসমূহের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের স্থাপত্য-রচনার নীলনকশা খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন। আমরা সেই আবর্জনার উপনিষদে ঢুকতে চাই। না হলে ব্যোমকেশের ঠিকানা বার করা সম্ভব হবে না। আমাদের নজর করতে হবে এমন কিছু সাংস্কৃতিক রোডম্যাপ, যেখানে উত্তর কলকাতার মেসবাড়ি, ট্রামলাইন, গোপন চাউনি ও অপরাধ, গোয়েন্দা ও বেকার, বৈঠকখানার তাসের আড্ডা... ক্রমাগত তালিকা করে গেলে বোঝা যাবে, আমরা এমন পুণ্য তদন্তে নিযুক্ত রয়েছি, যার ফাটল থেকে বেরিয়ে আসছে সমকালীন জীবনের নিষিদ্ধ ছটা। আজকের বাঙালি ক্রমশ অপরাধ থেকে পাপে যে ভাবে ডুবে যেতে চাইছে, তাতে কোনও ডিটেকটিভ এসে রহস্যের সমাধান না করে দিলে, তার ভাবাই সঙ্গত যে, রাষ্ট্র আর তাকে পুনরুদ্ধার করতে পারবে না।
আধুনিকতার যে লিপিচিত্রটি বেঞ্জামিন দেখতে পান, মধ্য উনিশ শতকীয় প্যারিস শহরের মধ্যে, তার কেন্দ্রস্থলে আছেন বোদলেয়ার। প্যারিস কী ধরনের জনপদ? খানিকটা বেখাপ্পা, নৃপতি ও সৈনিক, নিতান্ত ভবঘুরে, লম্পট ও বেশ্যা, ভিখারি আর আগন্তুক সমাবেশে উত্তর-শিল্পবিপ্লব একটি উদ্ভট সমাজ তৈরি হয়েছে ফ্রান্সের রাজধানীতে। লুম্পেন সর্বহারার নতুন চেহারা দেখা যাচ্ছে যা গতিশীল, পরিবর্তমান। যা ছিল কমিউনিটি বা গোষ্ঠী, তা রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে জনতা বা মাস-এ। ক্রমশ জন্ম নেবে, সদ্যপ্রয়াত হেবারমাস যাকে বলেন, পাবলিক স্ফিয়ার বা জনপরিসর। আর সঙ্গে সঙ্গে কবির সঙ্গে নির্জনতার যে যোগাযোগ, তাও ভিড়ের অন্তর্ঘাতের দ্বারা পরিচালিত হবে। ইতিহাস কেড়ে নেবে নির্জনতার সঙ্গে কবির সহবাসের অনন্য অধিকার। অপর দিকে জনতার বিশাল সমুদ্রে কবির পাশাপাশি হাঁটবেন আর এক প্রজাতির সদস্য, যিনি বিলীয়মান ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলেই আইন-অতিরিক্ত, তিনি গোয়েন্দা। বোদলেয়ার-সংক্রান্ত রচনায় বেঞ্জামিন দেখিয়েছেন, কী ভাবে নৈশ পরিব্রাজনরত কবি আড়ালে থাকা গোয়েন্দার রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়। এই যুক্তিকে আর একটু উস্কে দিলেই কলকাতায় বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে জীবনানন্দ দাশ ও শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়কে বন্ধনীযুক্ত করতে পারা যাবে। যদি ধরে নেওয়া যায়, অনুপস্থিত ঈশ্বরের সঙ্গে নশ্বর মানুষের সমঝোতার জন্য এক জন মধ্যস্থতাকারী দরকার, তবে সেই অনামী রহস্যের উন্মোচনের জন্য কবির কাঁধে হাত রেখে গোয়েন্দাও রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। ইতিহাস যেন নিজেই দায় নিয়েছিল জীবনানন্দ ও শরদিন্দুকে প্রতিবেশী করার। দস্তয়েভস্কি সেন্ট পিটার্সবার্গের নেভস্কি প্রসপেক্ট নামক সড়কে ভূতলবাসীদের পদচারণা নজর করেন। জীবনানন্দ ও শরদিন্দুর মৃগয়াভূমি হ্যারিসন রোড। দু’জনেই জনতার মানুষ, কিন্তু জনতা তাঁদের দখলদারি নিতে পারেনি।
প্রত্যেক শহরের চামড়ায় কিছু উল্কি আঁকা থাকে। এই দাগগুলোকেই ক্রাকাওয়ের বলেন ‘মাস অর্নামেন্ট’। যেমন নিজের শহর বার্লিনে তাঁর মনে হয়েছিল হোটেল-লবি আধুনিকতার অপরিচয়কে বিশেষ ভাবে নথিভুক্ত করে। আমরা আমাদের শহরে দেখতে পাই, মেসবাড়ি এমন তাৎপর্য নিয়েছিল গত শতকে। মেস ঠিক গৃহ নয়, সাময়িক আস্তানা। অপার বিস্ময়ে খেয়াল করি যে, বস্তুতই সংসার-সীমান্তে এমন একটি মেসবাড়ি ধরে আছে আমাদের সাংস্কৃতিক আধুনিকতার যৌবনচিহ্ন। ৬৬ নম্বর হ্যারিসন রোডের প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং হাউসের দিকে তাকিয়ে আজ অভিভূত হতে হতে মেনে নিই যে, হ্যারিসন রোডে আরও গভীর অসুখ। নিকটস্থ মেডিক্যাল কলেজ এ রোগ নিরাময় করতে পারবে না। এই বাড়ির সিঁড়িতে, বারান্দায়, খোলা চৌবাচ্চায়, পলেস্তারা-খসা ছাদে ছড়িয়ে রয়েছে সভ্যতা ও আধুনিকতার গোপনতর মিথুনপ্রতিমা, প্রায় মির্যাকল, যেন আকাশ থেকে দেবতারা কুসুমবৃষ্টি করেছিলেন যে, এই মেসবাড়ি থেকেই জন্ম হয়েছিল গোয়েন্দা ব্যোমকেশ ও ‘মাল্যবান’-রচয়িতার। পুর-মানচিত্রে মেসের এই অবস্থান আমাদের ডাক দেয় অন্তঃপ্রদেশে। বুঝতে পারি, শহরের সম্প্রসারণ ও রূপান্তর জনসমষ্টির সামাজিক আকারটি ক্রমেই পাল্টে দিচ্ছে। ফলে কবির সঙ্গে নির্জনতার সহবাস স্থগিত হয়ে যাবে। অপর দিকে জনতার বিশাল সমুদ্রে কবির সহযাত্রী হবেন আর এক প্রজাতির সদস্য, যিনি বিলীয়মান ঈশ্বরের প্রতিরূপ বলেই আইন-অতিরিক্ত। তিনি অপরাধের গিঁট খুলে দেন। তিনি রহস্যমোচনের পার্থিব প্রতিশ্রুতি, সংক্ষেপে গোয়েন্দা। সাংস্কৃতিক তাৎপর্যে ইয়াঙ্কি এডগার অ্যালান পো-র সঙ্গে যদি ফরাসি বোদলেয়ার সংযুক্ত হয়ে থাকেন, তবে জীবনানন্দ-শরদিন্দুও তৈরি করে নিতে পারেন কারুকার্যময় বন্ধনী। আমাদের উদাসীনতায় বাংলা সাহিত্যে আজও অবজ্ঞায় পড়ে আছে এই আত্মীয়তা।
মেস ম্যানেজার সন্দীপ দত্ত মানুষটি বড় সদালাপী। তিনি জানালেন, তাঁর পিতামহ প্রয়াত নন্দলাল দত্ত এই মেসবাড়িটি প্রতিষ্ঠা করেন ১৯১৭ সালে। পরে দায়িত্ব পড়ে তাঁর বাবা নৃপেন্দ্রনাথ দত্তের উপর। এখন তিনিই দেখাশোনা করছেন স্বাভাবিক ভাবেই। ঠিকানা যদিও হ্যারিসন রোডের, সে দিকের প্রবেশপথটি ব্যবহৃত হয় না। আমরা ঢুকেছিলাম কিংবদন্তিপ্রতিম এই দালানে রমানাথ মজুমদারের নামাঙ্কিত রাস্তাটি দিয়ে। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় একদম ছাদের উপর তিন নম্বর ঘরে থেকেছেন ১৯১৯ থেকে ১৯২১, এই দু’বছর। সেখান থেকে হাওড়া ব্রিজ দেখা যেত, ছাদের আলসে দিয়ে ঝুঁকলে এক দিকে হ্যারিসন রোড, পাশ দিয়ে সরু গলি রমানাথ মজুমদার স্ট্রিট। আর জীবনানন্দ? তিনতলায় সিঁড়ি দিয়ে উঠেই ১৬ নম্বর ঘর। এখানেই তিনি থাকতেন ১৯৩০ থেকে ১৯৩৮, এই আট বছর। লম্বাটে ঘর। পুরনো। আর ব্যবহৃত হয় না। সন্দীপবাবু দরজা খুলে দিলেন বারান্দার। নীচে ট্রামলাইন, হ্যারিসন রোড অর্থাৎ সাম্প্রতিক মহাত্মা গান্ধী রোড। রাস্তায় অবিরত লোক চলাচল। বোদলেয়ার ১৮৬০ সালে তাঁর অবিস্মরণীয় প্রবন্ধ ‘আধুনিক জীবনের চিত্রকর’ লেখায় দাবি করেন, ভিড়ই কবির হৃদয়— “হিজ় প্যাশন অ্যান্ড হিজ় প্রফেশন আর টু বিকাম ওয়ান ফ্লেশ উইথ দ্য ক্রাউড। ফর দ্য পারফেক্ট ফ্ল্যানোর, ফর দ্য প্যাশনেট স্পেক্টেটর, ইট ইজ় অ্যান ইমেন্স জয় টু সেট আপ হাউস ইন দ্য হার্ট অব দ্য মাল্টিটিউড... টু বি অ্যাওয়ে ফ্রম হোম অ্যান্ড ইয়েট টু ফিল ওয়ানসেল্ফ এভরিহোয়্যার অ্যাট হোম; টু সি দ্য ওয়ার্ল্ড, টু বি অ্যাট দ্য সেন্টার অব দ্য ওয়ার্ল্ড, অ্যান্ড নট টু রিমেন হিড্ন ফ্রম দ্য ওয়ার্ল্ড... দ্য স্পেক্টেটর ইজ় আ প্রিন্স হু এভরিহোয়্যার রিজয়েসেস হিজ় ইনকগনিটো।”
স্মৃতিসাক্ষ্য: সেই মেসবাড়ি। ছবি: বিশ্বনাথ বণিক
বোদলেয়ার প্যারিসের ঘিঞ্জি এলাকার একটি হোটেলে থাকতেন। দিনে ঘুমোতেন, কবিরা যে-হেতু পেঁচার মতো। রাতে শহর-পরিক্রমায় নির্গত হতেন। জীবনানন্দও সেরকম জানলার খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে দেখতেন আমাদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, নারী, হেমন্তের হলুদ, ফসল ‘ইতস্তত চলে যায় যে যাহার স্বর্গের সন্ধানে’ আর তার পরই ঝুঁকে পড়তেন বারান্দা দিয়ে— “বলে সে বাড়ায়ে দিল গ্যাসলাইটে মুখ।/ ভিড়ের ভিতরে তবু— হ্যারিসন রোডে— আরো গভীর অসুখ।/ এক পৃথিবীর ভুল; ভিখিরির ভুলে: এক পৃথিবীর ভুলচুক।” দুই মহাকবি ভিড়ের কী অসামান্য বন্দনা গেয়ে গেলেন!
বিশ শতকের গোড়ার গৃহস্থবাড়ি যেমন হত, এই মেসবাড়ি সেরকমই। একতলায় উঠোন, খোলা চৌবাচ্চা। চার দিক দিয়ে প্রত্যেক তলার বারান্দা। সন্দীপবাবু জানালেন, জীবনানন্দ তিনতলার বারান্দা দিয়ে আত্মহত্যা করা যায় কি না ভাবতেন। এ কথা তিনি পারিবারিক সূত্রেই শুনেছেন। আমি খোলা চৌবাচ্চাটা দেখছিলাম। মাল্যবান এরকম খোলা জায়গায় স্নান করতে কী বিড়ম্বনাই না ভোগ করত! আর আধ্যাত্মিক অর্থে দেখলে তো জীবনানন্দের পুরো জীবনবৃত্তান্তই আত্মহনন বিষয়ে একটি চারুসন্দর্ভ। সচেতন ভাবে তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেছেন মৃত্যুযাপনের জন্য। লম্বা অবকাশে বরিশাল চলে গেলে ম্যানেজার হয়তো ১৬ নম্বর ঘর অন্য কাউকে দিয়ে দিলেন, তখন জীবনানন্দ ফিরে এসে আর তাঁর প্রিয় ঘরটি পেতেন না। তাঁকে যেতে হত ছাদে, চার নম্বর ঘরে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে এক দিকে শরদিন্দুর তিন নম্বর, অন্য দিকে জীবনানন্দের চার নম্বর। পছন্দ হত না কবির। বড় খোলামেলা। দরজা খুললেই ট্রামলাইন দেখা যায় না ঝুলবারান্দা থেকে। খোলা ছাদের আলসে থেকে ঝুঁকে পড়লে তবে হ্যারিসন রোড। ভয়ঙ্কর ক্ষুব্ধ হয়ে জীবনানন্দ নালিশ করতেন সে যুগের ম্যানেজার নৃপেনবাবুর কাছে।
কিন্তু আমরা মূল প্রসঙ্গে ফিরে এলে ফের দেখতে পাব যে, দস্তয়েভস্কির ভূতলবাসীর আত্মকথায় রাজপথ ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’-র বিন্দুকে যে অনামী রহস্য শহরের হৃদয়ে ডেকে নেয়, তা অর্থাৎ আধুনিকতার পরিসর কী ভাবে জনতাকেও জীবনানন্দ ও শরদিন্দুর সৌজন্যে পাঠ্য করে তোলে। এই অনিয়তাকার ও পতিত জনসাধারণের পরিচয় নির্মাণে কবি ও গোয়েন্দার অবদান আছে। যুদ্ধের আশপাশে কলকাতায় যে অচেনা মুখের মিছিল, সন্দেহভাজন অজ্ঞাত আগন্তুকের অরণ্য, কবি হিসেবে জীবনানন্দ তাদের পরিসংখ্যানের স্থাপত্য থেকে জৈব বিষয়ে রূপান্তরিত করলেন। জনতা নিজেই হয়ে উঠল কবির পক্ষে ‘এপিস্টেম’ বা প্রজ্ঞানের সারাৎসার। যাঁরা বোদলেয়ার ও জীবনানন্দকে নির্জনতম ও পরিত্যক্ত ভাবেন, তাঁরা বুঝতে পারেন না মহানগরীর ভিড় এমন এক পর্দা, যার মধ্য দিয়ে দেখা সৌন্দর্যই আধুনিক শিল্প। এই দেখার নানা চলন থাকতে পারে, কিন্তু গোয়েন্দাপ্রতিম নিরাসক্ত অবলোকন তার অবধারিত শর্ত। এডগার অ্যালান পো অনুবাদে বোদলেয়ারকে সন্দেহের অধিকার উপহার দেন। প্রকৃত প্রস্তাবে অ্যালান পো-র ডিটেকটিভ নিজেও আমেরিকানদের পক্ষে বিদেশি। পো অকারণে গোয়েন্দাকে দূরত্বে রাখেননি। তাঁর ভিড়ের মানুষ বোদলেয়ারকে প্ররোচনা দেয় কবির প্রতিকৃতি খুঁজে পেতে। জীবনানন্দ নিজেকে আড়ালে রেখেছেন আজীবন, অনুমোদিত ছাড়পত্র দিয়ে শনাক্ত হতে চাননি, সচেতন ভাবে নিজের বিষয়ে প্রশ্রয় দিয়েছেন নানা হেঁয়ালি। কিন্তু যা প্রেমের কবিতা হিসেবে খ্যাত, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র সেই নির্জন স্বাক্ষর তাঁকে চিনিয়ে দেয়— “তুমি তা জানো না কিছু-না জানিলে/ আমার সকল গান তবু তোমারে লক্ষ্য করে।” কী দূরগামী ও অভিসন্ধিমূলক দৃষ্টিপাত! আজ মনে হয়, কে কাকে লক্ষ্য করেছিল এবং কী ভাবে? দ্রষ্টব্যের অগোচরে ঘটমান দৃষ্টিপ্রবাহে কি ষড়যন্ত্রমনস্কতাও আভাসিত নয়? অপর দিকে একটি আপাতত সুগঠিত সভ্যতার মর্মে কিছু নাশকতামূলক সংশয়ের বীজ গোয়েন্দা বুনে দেয়। শরদিন্দুর লেখা সে-যুগে বাস্তবতারহিত এক পাল্টা বাস্তবতা। শরদিন্দু অনুমান করেছিলেন, শহুরে জীবাণুরা আর দর্শনের পরোয়া করে না, তারা বড়জোর আইনভীরু। মেসবাড়ির এই আসা-যাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে শরদিন্দু আবিষ্কার করেন ঈশ্বরের প্রতিপক্ষ ব্যোমকেশকে। জীবনানন্দের কবির মতোই নরকের ঈশ্বর; কিন্তু এমন নরক, ঈশ্বর যেখানে অনুপস্থিত, অথবা প্রথাপালনকেই ঈশ্বর ভাবা হচ্ছে, এমন উদ্যান সেই নরক। শরদিন্দু এক ছলনাময় আস্থা আমদানি করেছিলেন ব্যোমকেশের মধ্য দিয়ে, যার সঙ্গে জীবনের নৈতিক ভিত্তির সংযোগ নেই। জীবনানন্দ যেমন বেন্টিঙ্ক স্ট্রিট থেকে টেরিটিবাজারে উদ্ভ্রান্ত দার্শনিকের মতো পতনশীল মানুষের খতিয়ান নেন, শরদিন্দু আপাত একটি জ্যামিতিক ছকে তাদের আতঙ্ক থেকে নিষ্কৃতির পদ্ধতি জানিয়ে আশ্বস্ত করেন। জীবনানন্দ যেমন এক ভয়ের দ্বারা তাড়িত হয়ে দ্রুতাবলোকনে বেন্টিঙ্ক স্ট্রিট ও ফিয়ার্স লেনের শ্বাসরুদ্ধ লোল নিগ্রো বা ইহুদি রমণীর ক্লোজ়-আপ নেন, তাঁর দৃষ্টি পুরকামিনীদেরও রেহাই দেয় না। এমন রোম্যান্টিক বিলাস কবির নেই যূথচারী নারীদের বিনুনি থেকে নরকের নির্বচন মেঘ সরিয়ে দেবেন। সহিংস ঘাতকের মতো তিনি মধ্যরাত্রির জরায়ু পর্যন্ত হানা দেন। শরদিন্দু একটি প্রতিপ্রস্তাব হয়ে সেই সব নিবিড় তিমিরে ব্যোমকেশকে পরামর্শদাতা হিসেবে নিযুক্ত করেন, যাতে লঘুচিত্ত নাগরিকেরা অন্তত ছদ্ম-বিশ্রামের বশবর্তী হতে পারেন। একটি ইতিহাস-নির্দেশিত ও পূর্বনির্ধারিত হত্যাকাহিনির বিপরীতমুখী শরিক এই দুই সমবয়সি মফস্সলি লেখক। দু’জনেই বহিরাগত বলেই কলকাতার প্রতি কম-বেশি নির্দয়। আমাদের ঘিঞ্জি ভাঁড়ার, জরাজীর্ণ ডাক্তারের মুখ, উকিলের অনুপ্রাণনা, স্পর্শাতুর কন্যাদের মন বা গড়পড়তার সব পড়তি কৌতুক জীবনানন্দ রাজা লিয়রের ক্রোধে শনাক্ত করলেন, সেই সব মৃদু নাগরিক, যারা নিজেদের গণিকা, দালাল, রেস্ত, শত্রুর খোঁজে ভেবে সাতপাঁচ ভেবে সনির্বন্ধতায় নেমে এসেছিল, তাঁদের কাছে অন্তিম দণ্ডাদেশ পৌঁছে দিতে তাঁর দ্বিধা হয়নি।
‘ঘরের ভিতর কেউ খোয়াড়ি ভাঙছে বলে কপাটের জং/ নিরস্ত হয় না তার নিজের ক্ষয়ের ব্যবসায়ে/
আগাগোড়া গৃহকেই চৌচির করেছে বরং।’
অপর দিকে শরদিন্দু এই পাপাতুরদের শবযাত্রায় রহস্য উপন্যাসের পানশালা খোলা রাখেন, যাতে মদির আলোর তাপে সহজীবীরা স্বস্তি পায়। অপরাধ ও শাস্তির মধ্যে ব্যোমকেশ এক স্বল্পকালীন সাম্যবস্থা। আশ্চর্য এই যে, জীবনানন্দ ও শরদিন্দু পরস্পরকে চিনতেন না, সমবয়সি ও সমকালীন হওয়া সত্ত্বেও। শরদিন্দু তুলনায় মৃত্তিকার জীব বলেই তাঁর দায় ছিল আপাত-অনিয়মের একটি যুক্তি নির্মাণ। হয়তো পরিবেশ তাঁকে সুযোগও দিয়েছিল। তিনি ভাগলপুরের বাঙালি, ফলে কলকাতাকে নিরুত্তাপ ভাবে দেখার শিক্ষা ছিল তাঁর। জায়মান পুঁজিবাদ কী ভাবে নতুন নতুন অপরাধের জন্ম দেয় আর অপরাধমাত্রই পাপ নয়— এ সব কথা বলার জন্যই শরদিন্দু ব্যোমকেশের বয়ান বেছে নেন। ব্যোমকেশও, কৌতূহলভরে খেয়াল করি, কলকাতার বাসিন্দা নন। ব্যোমকেশ বক্সী বুদ্ধির ধারটুকু পেয়েছেন তাঁর মফস্সল-নিবাসী অঙ্কের শিক্ষক বাবার থেকে। স্বভাবে ক্ষমার গুণটুকু পেয়েছেন মা বৈষ্ণব বংশের মেয়ে বলে। অধিকন্তু বলা যায়, শরদিন্দু এক ধরনের হিন্দু রাজনীতির সমর্থক বলেই বঙ্গ-রাজনীতিতে সুরাবর্দির ভূমিকা তাঁকে সংশয়ী করে তুলেছিল।
বোদলেয়ার অ্যালান পো-র রহস্য আয়ত্ত করেছিলেন, কিন্তু গোয়েন্দা গল্প লেখেননি। ফ্ল্যানোর যে এক রকম সত্যান্বেষী গোয়েন্দার পূর্বাভাস, বেঞ্জামিন তা দাবিও করেছেন। কিন্তু খ্রিস্টান বোদলেয়ার আদিপাপে বিশ্বাসী যে-হেতু, আর যে-হেতু মার্কি দ সাদ তাঁকে শেখান অসামাজিক হওয়ার গান, সুতরাং বোদলেয়ারের পক্ষে অনুসারী ডিটেকটিভ গল্প লেখা হয়ে ওঠে না। আড়চোখে দেখা, তীব্র চোখ, মুষ্টিবদ্ধ হাত নিয়ে জীবনানন্দেরও টেরিটিবাজারের গোয়েন্দা হয়ে ওঠা অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু তিনি সে গোয়েন্দা হয়ে উঠতে পারেননি। তার কারণ একই সঙ্গে বিড়ালকে ও বিড়ালের মুখে ধরা ইঁদুরকেও হাসাতে কবিদের আশ্চর্য প্রদীপ জ্বেলে দিতে হয়। ‘নিহত উজ্জ্বল ঈশ্বরের পরিবর্তে’ নিয়তির দূত খুঁজে পাওয়া তার উচ্চাশার অন্তর্ভুক্ত ছিল না। কিন্তু তুলনায় পার্থিব সভ্যতার জীব বলেই, শরদিন্দুর ছিল। ফলে তিনি হ্যারিসন রোডের সন্নিকটে তাঁর তথাকথিত প্রথম গল্প ‘সত্যান্বেষী’-তে (১৯৩৩) একটি অবাস্তব কলকাতার জন্ম দেন— “যাহারা কলিকাতা শহরের সহিত ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত, তাহাদের মধ্যেও অনেকে হয়তো জানেন না যে এই শহরের কেন্দ্রস্থলে এমন একটি পল্লী আছে, যাহার একদিকে দুঃস্থ ভাটিয়া মারোয়াড়ী সম্প্রদায়ের বাস, অন্যদিকে খোলার বস্তি এবং এবং তৃতীয় দিকে তির্যকলক্ষ পীতবর্ণ চিনাদের উপনিবেশ। এই ত্রিবেণী সঙ্গমের মধ্যস্থলে যে ব-দ্বীপটি সৃষ্টি হইয়াছে, দিনের কর্ম-কোলাহলে তাহাকে দেখিয়া একবারও মনে হয় না যে ইহার কোনও অসাধারণত্ব বা অস্বাভাবিক বিশিষ্টতা আছে।” দ্বিতীয় গল্প ‘পথের কাঁটা’য় হ্যারিসন রোড তেমন কুয়াশা-ঘেরা নয়। “বাহিরে কুয়াশা-বর্জিত ফাল্গুনের আকাশে সকালবেলার আলো ঝলমল করিতেছিল, বাড়ির তেতলার ঘর কয়টি লইয়া আমাদের বাসা, বসিবার ঘরটির গবাক্ষপথে শহরের ও আকাশের একাংশ বেশ দেখা যায়। নীচে নবোদ্বুদ্ধ নগরীর কর্মকোলাহল আরম্ভ হইয়া গিয়াছে, হ্যারিসন রোডের উপর গাড়ি-মোটর-ট্রামের ছুটাছুটি ও ব্যস্ততার অন্ত নাই।” ব্যোমকেশ-চরিত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্যই শরদিন্দুর প্রয়োজন হয়েছে অপরিচয়ের, কেননা ব্যোমকেশের স্রষ্টা নানা ভাবে বোঝানোর দায় নেন যে গোয়েন্দা গল্প জীবনযাপনের এক ধরনের অনুবাদ। শরদিন্দুর গোয়েন্দা একটি উন্মোচনকারী চরিত্র, যে নিম্নবর্গীয় বাসনা ও উচ্চবর্গীয় জীবনযাত্রার সেতুবন্ধবিশেষ। গোয়েন্দা, ঈশ্বরের অনুপস্থিতিতে, অন্তর্বর্তী পরিচালক। তিনি একমাত্র অন্যের কাছে যা গোপন, তা প্রকাশ্যে টেনে আনেন। অধঃপতনের সীমাহীন রেখাচিত্রে গোয়েন্দা যুক্তিপরায়ণতার অন্তিম প্রতিনিধি। সুতরাং প্রায় নিয়তিনির্দিষ্ট ভাবে তিনিই বিশ্বাস করতে বাধ্য যে, বিশ্বপ্রকৃতি যুক্তির দ্বারা শাসিত ও যুক্তি অপরাধ থেকে পরিত্রাণের উপায়স্বরূপ। শরদিন্দুর ব্যোমকেশ বিধাতার দূত, কারণ সে সব রহস্যের অন্ত দেখতে পায়। সে জন্যই সে সত্যান্বেষী, আর পুলিশ রাষ্ট্রের প্রতিনিধি বলেই নেহাত আইনের অর্থশূন্য রচনা। পুলিশের কর্তব্য শুধু নবজাত সামাজিক পরিসরের শিষ্টতা বজায় রাখা। গোয়েন্দা ব্যোমকেশ নৈতিকতার প্রবক্তা। অপরাধ-মৃগয়া তার কাজ নয়, বরং সে পতনের নন্দনতত্ত্বকে কার্যকারণবাদ ব্যাখ্যায় ব্যবহার করে। সে সমাজ-দিশারি, কিন্তু কোনও ক্রমেই চূড়ান্ত দণ্ডাদেশ দেওয়া তার কাজ নয়। গোয়েন্দা, বাস্তবিকই অসময়ের দেবদূত ও বিধি-বহির্ভূত। শরদিন্দুর ব্যোমকেশ তা ছত্রে-ছত্রে প্রমাণ করেছে। শরদিন্দু বিশ্বাস করেন শুদ্ধীকরণে, অ্যালান পো-ও তাই।
কিন্তু বোদলেয়ার ও জীবনানন্দ সেই সহজিয়া বিশ্বাস দিয়ে ভাষার মুখশ্রী উজ্জ্বল করতে পারেন না। যে বছর শরদিন্দু ব্যোমকেশকে আবিষ্কার করেন, সে বছরই জীবনানন্দ লেখেন ‘জীবনপ্রণালী’ নামের উপন্যাসটি। সেখানে থাকে আলোকপ্রাপ্তির পরপারে পাপাতুর বোদলেয়ার বা চোর ভিলোঁর কথা। শরদিন্দুর যুক্তি অনিয়মকে সুনিয়ন্ত্রিত দেখতে চায়। জীবনানন্দ যুক্তিহীন, দেখেন অসম্ভব বেদনার সঙ্গে মিশে আছে অমোঘ আমোদ। পরিত্রাণহীন পতনের মধ্যে মানুষের হাতে পাতালের চিরকুট পৌঁছে দেওয়া ছাড়া কী-ই বা করার ছিল তাঁর? শহিদ ও আততায়ী যুগপৎ জীবনানন্দ দাশ ব্যোমকেশের প্রতিবেশী হয়েও অমরতার দিকে চলে গেলেন, তাঁকে শনাক্ত করার জন্য রয়ে গেল শুধু ইতিহাস। আসলে পুঁজিবাদের বিকাশ দাবি করে নাগরিকদের ছদ্মবেশ। ব্যোমকেশ আত্মপরিচয় গোপন করেই মেসে প্রবেশ করে। কিন্তু জীবনানন্দের আত্মপরীক্ষা আরও নিষ্ঠুর আড়ালের। কথার ছলে ম্যানেজার সন্দীপ দত্ত বলছিলেন, “আমরা কিন্তু ওঁকে জানিয়েছিলাম আমরা মেদিনীপুরের লোক। আপনি শিয়ালদায় পূর্ববঙ্গের লোকেদের মেসও পাবেন; সেখানে স্বজাতি... কী জানি কেন, উনি সে-সব শুনলেন না!” ব্যোমকেশের কাজ সামান্য— স্বর্গ ও প্রশাসনের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সে অপরাধ চিনিয়ে দেয়। জীবনানন্দ নরক পর্যটনরত দেবতা, পরচুলা ও মুখের রগড়ে তাকে তো দূরতম বন্দিশালায় একা, অগোচরে বধ্যভূমির দিকে ট্রামলাইন ধরে যাত্রা করতে হবেই। স্বর্গে ফিরে যাওয়ার পথ কবির জানা আছে। গোয়েন্দার নেই। অথবা সত্যান্বেষণের পথে জীবনানন্দই রাজা ইদিপাস— আদি ডিটেকটিভ। যা দেখার কথা ছিল না, তা দেখে ফেলে ঘুমিয়ে আছেন ভাষার অন্ধকারে।
পাউন্ডের দাম কমে যাচ্ছে, চটকল বিপন্ন, শহরের রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার একটি বিশেষ মুহূর্তে শরদিন্দু ব্যোমকেশের জন্ম দেন। এই ব্যোমকেশ আমাদের নরকের পথ ঘুরিয়ে দেখায়। আজ বাংলা সিনেমায় ও মধ্যবিত্ত পাঠকসমাজে তার বিপুল জনপ্রিয়তা আসলে মেট্রোপলিটান কলকাতার বদলে যাওয়ার একটি সূচক। পাপাতুর সমাজ কাউকে তার অবদমিত অপরাধবোধ সমর্পণ করে হাত ধুয়ে ফেলতে চায়। তাই এই ময়লা গ্রহণ করেন আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা ডিটেকটিভ। কলকাতা, আমাদের অশেষ পতনশীল কলকাতায়, আজ ব্যোমকেশকে দেবতা না ভেবে উপায় কী!