Probir Kumar Sen

ডন ব্র্যাডম্যানকে স্টাম্পড আউট করেছিলেন যে বাঙালি ক্রিকেটার

তাঁর নাম প্রবীরকুমার সেন। তিনিই প্রথম বাঙালি টেস্ট ক্রিকেটার। খেলেছিলেন ১৪টি টেস্ট। এক টেস্টে পাঁচটি স্টাম্পড আউট করা বিশ্বের প্রথম উইকেটরক্ষকও তিনিই। প্রথম শ্রেণির ম্যাচে উইকেট নেওয়ার হ্যাটট্রিকও আছে তাঁর। আজ তাঁর জন্মশতবর্ষ পূর্ণ হল।

শুভাশিস চক্রবর্তী
শেষ আপডেট: ৩১ মে ২০২৬ ০৬:৫৬
নির্ভরযোগ্য: (বাঁ দিকে) ক্রিকেটার প্রবীর সেন। সঙ্গে স্যর ডন ব্র্যাডম্যান (ডান দিকে)।

নির্ভরযোগ্য: (বাঁ দিকে) ক্রিকেটার প্রবীর সেন। সঙ্গে স্যর ডন ব্র্যাডম্যান (ডান দিকে)। ছবি: গেটি ইমেজেস।

সে বার অস্ট্রেলিয়ায় ‘খোখান’কে নিয়ে হইচই। ক্রিকেট সাংবাদিক, বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সাধারণ অনুরাগীদের মুখে ওই একটা নাম ঘুরেফিরে চলে আসছে, খবরের কাগজে রীতিমতো স্কুপ নিউজ় হচ্ছে তাঁকে নিয়ে। কারণ, ভারতীয় এই উইকেটরক্ষক ডন ব্র্যাডম্যানকে স্টাম্পড আউট করেছেন! বলের গতি বুঝতে না পেরে ডন ক্রিজ় থেকে সামান্য বেরিয়ে এসেছিলেন। বল তাঁর ব্যাটের স্পর্শ পায়নি, সোজা উইকেটকিপারের হাতে। বিদ্যুৎগতিতে সেই বলের সঙ্গে স্টাম্পের সংযোগ হতেই বিমূঢ় ব্র্যাডম্যান দেখলেন তিনি আউট! সদ্য কৈশোর অতিক্রম করা এক উইকেটরক্ষকের কাছে পরাজিত হয়ে ডন প্যাভিলিয়নে ফিরে গিয়েছিলেন সেদিন। তাতেই ‘খোখান’কে নিয়ে সাড়া পড়ে গেল অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট-ভূগোলে। তবে এই দুরন্ত ঘটনার কিছু দিন আগে, ১৯৪৭-এর ১২ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত সংবাদপত্র ‘দ্য সানডে টাইমস’ এই ভারতীয় উইকেটরক্ষকের বিশেষণে ব্যবহার করেছিল ‘বেবি’ শব্দটি। অধুনা আইপিএল-এর মঞ্চে বৈভব সূর্যবংশীকে ভালবেসে ‘বস বেবি’ বলা হলেও, এই বিস্ময়-শিরোপা প্রায় আট দশক আগে অর্জন করেছিলেন এক বাঙালি ক্রিকেটার, প্রবীরকুমার সেন। তবে খেলার জগতে তাঁর ডাকনাম ‘খোকন সেন’ অধিক খ্যাতি পেয়েছিল। আর বিদেশিদের উচ্চারণে তা-ই হয়ে গিয়েছিল ‘খোখান’।

বাঙালি ক্রিকেটার প্রবীরকুমার সেন।

বাঙালি ক্রিকেটার প্রবীরকুমার সেন। ছবি: গেটি ইমেজেস।

১৯৩২-এ লর্ডসের মাঠে ভারতীয় দলের প্রথম আন্তর্জাতিক টেস্ট খেলা শুরু। ১৯৪৭-এ দেশ স্বাধীন হল। সে বার শরতে ভারতীয় ক্রিকেটারদের অস্ট্রেলিয়া সফর শুরু হয়েছিল ব্রিসবেন থেকে। ওই পনেরো বছরে ভারত যে বারোটি টেস্ট ম্যাচ খেলেছে, তাতে উইকেটরক্ষকের ভূমিকায় এসেছেন ছয় জন— জে জি নাভলে, দিলাওয়ার হুসেন, হিন্ডলেকার, মেহরমজি এবং জে কে ইরানি। অস্ট্রেলিয়া সফরের তৃতীয় টেস্ট ম্যাচে সুযোগ পেলেন প্রবীর সেন। তেত্রিশ বছর বয়সি ইরানিকে বসিয়ে প্রথম একাদশে নেওয়া হল তাঁর প্রায় অর্ধেক বয়সি প্রবীরকে। ১৯৪৮-এর ১ জানুয়ারি ছিল সেদিন। নতুন বছরের প্রথম দিনটি স্মরণীয় হয়ে গেল বাঙালির ইতিহাসেও— প্রথম বাঙালি টেস্ট খেলোয়াড়ের পালকটি পরে নিলেন খোকন সেন, তাঁর ক্রিকেটীয় কৃতিত্বের মুকুটে।

এক দিন বিশ্রাম ধরে ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত এই ম্যাচ গড়িয়েছিল। প্রথম ইনিংসে খোকন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটার আর এ হ্যামেনসকে স্টাম্পড আউট করেছিলেন, লালা অমরনাথের বলে। হ্যামেনসের রান তখন ২৫। তবে সেই ইনিংসে ব্যাট হাতে প্রবীর করেছিলেন মাত্র ৪ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটার সিড বার্নসের ক্যাচ ধরে তাঁকে প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠান প্রবীর, বোলারের নামটিও অপরিবর্তনীয়— অমরনাথ। যাঁর ক্যাচ ধরলেন আমাদের প্রবীর, সেই সিড বার্নস সম্পর্কে মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “ব্র্যাডম্যান ওরফে অস্ট্রেলিয়া— ‘রাবার’ কুক্ষিগত করবার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে উঠেছিলেন। এবং এই জন্যই সিড বার্নসকে দলে নেওয়া হল। সিড বার্নস তখন অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট কর্মকর্তাদের নেকনজরে নেই: তাঁর ঝোড়ো ব্যক্তিত্ব, একগুঁয়ে জেদ আর প্রচণ্ড পরিহাসপ্রিয়তা তখন অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে হুলস্থুল বাধিয়েছে। ক্রিকেট-কর্তাদের বিরুদ্ধে তিনি যে মামলা দায়ের করেছিলেন, সেটা তখন অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে জোর খবর। কিন্তু ব্র্যাডম্যান জানতেন সিড বার্নস-এর মূল্য কতটুকু।” সেই সিড বার্নসকে আউট করে প্রবীর সেন ব্র্যাডম্যানের পরিকল্পনা প্রতিহত করে দিয়েছিলেন।

এর পর দীর্ঘদিন ধরে, মোট ১৪টি টেস্ট ম্যাচে উইকেটরক্ষকের ভূমিকায় সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং নির্বিকল্প হয়ে উঠেছিলেন এই অবিস্মরণীয় বাঙালি ক্রিকেট খেলোয়াড়।

তা হলে ডন ব্র্যাডম্যানকে কোন ম্যাচে আউট করেছিলেন প্রবীর? সেটা ছিল একটি প্রস্তুতি ম্যাচ। সফরকারী ভারতীয় দলের সঙ্গে সাউথ অস্ট্রেলিয়ার খেলা চলছিল। ১৯৪৭-এর ১২ অক্টোবর, খেলার তৃতীয় দিনে সেই স্বপ্নের ঘটনাটি ঘটিয়ে ফেলেন তিনি— তার পরেই ‘খোখান’কে নিয়ে কৌতূহল, উৎসাহ বেড়ে গেল সে দেশের সংবাদমাধ্যমে। বস্তুত সর্বকালের সেরা স্যর ডনকে কোন‌ও ভারতীয় উইকেটরক্ষক ওই একটি বার‌ই স্টাম্পড আউট করতে পেরেছিলেন, এই তথ্য বাঙালির পক্ষে বিশেষ শ্লাঘার। প্রবীর সেন নিজেও বলতেন: “আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উত্তেজনার মুহূর্তটি এসেছিল যখন আমি অ্যাডিলেডে ব্র্যাডম্যানকে স্টাম্পড করেছিলাম। কারণ তিনি যে আমার দেখা সর্বকালের সেরা।”

এর‌ সঙ্গে আমাদের এই তথ্যগুলিও মনে রাখতে হবে— ডন ট্যালন এই সদ্য-তরুণের পারফরম্যান্স দেখে খুশি হয়ে অনেক পরামর্শ দিয়েছিলেন তাঁকে। বার্ট ওল্ডফিল্ড এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে ‘খোখান’কে নিজের এক জোড়া গ্লাভস উপহার দিয়েছিলেন।

১৯৫২-র ফেব্রুয়ারি। চেন্নাই শহরের চিপক স্টেডিয়ামে পঞ্চম টেস্ট খেলতে নেমেছে ভারতে ও ইংল্যান্ড দল। ভারতীয় দলে দু’জন বাঙালি— প্রবীর সেন এবং পঙ্কজ রায়। এই ম্যাচের অনবদ্য ধারাবিবরণী লিখেছিলেন ক্রীড়া সাংবাদিক চিরঞ্জীব তাঁর ‘জয় থেকে জয় ক্রিকেটে’ ব‌ইয়ে: “আজ মাত্র ৪২ রাণে ইংল্যাণ্ডের বাকি ৫টি উইকেট ফেলে দেন ভারতীয় খেলোয়াড়েরা। ফলে প্রথম ইনিংসে ইংল্যাণ্ডের হয় ২৬৬ রাণ। তার চেয়েও উল্লেখযোগ্য, এই ৫টি উইকেটই পান ভারতের অনন্য বোলার ও চৌকস খেলোয়াড় বিন্নু মানকড়— মাত্র ৯ রাণের বিনিময়ে। কাল তিনি পেয়েছিলেন ৩টি উইকেট, অর্থাৎ সাকুল্যে ৮টি উইকেট ৫৫ রাণের বিনিময়ে। উইকেটরক্ষক প্রবীর সেনের কৃতিত্বও বড় কম নয়। আজকের তিনজন ব্যাটসম্যানসহ এই ইনিংসে ইংল্যাণ্ডের মোট ৪ জনকে স্টাম্পড করেন তৎপর উইকেট রক্ষক সেন।” টম গ্রেভনি, ডোনাল্ড কার, ম্যালকম হিল্টন এবং ব্রায়ান স্ট্যাথাম— ইংল্যান্ড দলের এই চার ব্যাটারকে প্রথম ইনিংসে স্টাম্পড করেছিলেন প্রবীর। দ্বিতীয় ইনিংসে সেই অদ্বিতীয় বিন্নু মানকড়ের বলে তিনি হিল্টনকে আবার স্টাম্পের বেল উড়িয়ে দিয়ে ডাগ-আউটে ফেরত পাঠান। এক টেস্টে পাঁচটি স্টাম্পড আউট করা বিশ্বের প্রথম উইকেটরক্ষক প্রবীর সেনের এই রেকর্ড দীর্ঘদিন অক্ষত ছিল। প্রসঙ্গত, এই খেলার প্রথম দিন, ৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরে খবর আসে, ইংল্যান্ডের রাজা ষষ্ঠ জর্জ প্রয়াত হয়েছেন। ফলে পরের দিনের খেলা শোক প্রকাশার্থে স্থগিত রাখা হয়।

রাজার শূন্যস্থানে অভিষিক্ত হয়েছিলেন রানি দ্বিতীয় এলিজ়াবেথ। তাঁর দীর্ঘায়ু নিয়ে তিনি আধুনিক প্রজন্মের কাছেও সুপরিচিত নাম। ১৯৫২ সালেই ভারতীয় ক্রিকেট দল ইংল্যান্ড সফরে গিয়েছিল। জুন মাসে লর্ডসের মাঠে দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচ। রানি এলিজ়াবেথ প্রধান অতিথি। ম্যাচ শুরুর আগে দুই দলের সঙ্গে সাক্ষাৎ, করমর্দনের মতো সৌজন্য-বিনিময় চলছিল। ভারতীয় দলের রিজ়ার্ভ বেঞ্চের উইকেটরক্ষক প্রবীর সেনের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেন রানি: “হাস্যোজ্জ্বল মুখে দু’জনের করমর্দনের সেই মুহূর্ত উঠে গেল ক্যামেরায়। আর সাদাকালো ফ্রেমে তোলা সেই ছবিই হয়েগেল ইতিহাস। প্রথম কোনও বাঙালির সঙ্গে ফ্রেমবন্দী হলেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ।”

১৪টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন প্রবীর। ধরেছেন ২০টি ক্যাচ, সেই সঙ্গে করেছেন ১১টি স্টাম্পিং। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ১০৮টি ক্যাচ ধরেছেন, আর স্টাম্পিংয়ের সংখ্যা ৩৬টি। ১৯৫২ সালে পেয়েছিলেন ‘ইন্ডিয়ান ক্রিকেটার অব দি ইয়ার’ পুরস্কার। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বল হাতে নিয়ে ৭টি উইকেটের মালিক প্রবীর এক বার হ্যাটট্রিক‌ও করেছিলেন। রঞ্জি ট্রফিতে ওড়িশার বিরুদ্ধে সেই ম্যাচে ‘বোলার’ খোকনের নামের পাশে উজ্জ্বল হয়ে আছে ৩.৪-১-৪-৩ বোলিং ফিগারটি।

অবিভক্ত বাংলার কুমিল্লায় জন্ম তাঁর, ১৯২৬-এর ৩১ মে। কলকাতার লা মার্টিনিয়ার কলেজের ছাত্র ছিলেন, স্নাতক পর্ব সিনিয়র কেমব্রিজ থেকে। স্কুলজীবনের প্রান্তে এসে বাংলা দলের হয়ে রঞ্জি ট্রফিতে খেলার সুযোগ এসে যায়, ম্যাচটি ছিল বিহারের বিপক্ষে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট থেকে অবসর নিলেও মাঠের প্রতি টান ছিল তাঁর অফুরন্ত। তাই গলায় টাই বেঁধে অফিশিয়ালের সজ্জায় নয়, এমনকি কোচিং করানোও নয়, সরাসরি খেলতে নেমে পড়তেন অল্পবয়সিদের সঙ্গে— হাতের দস্তানার উষ্ণতা তাঁর বেঁচে থাকার প্রধান পাথেয় ছিল।

১৯৭০-এর শীতকাল। জানুয়ারির শেষ দিক। কলকাতা শহরের মাঠগুলি ক্রিকেট আর কমলালেবুর সৌরভে মাতোয়ারা। কালীঘাট মাঠে খেলতে খেলতেই বুকে অস্বস্তি শুরু হয় তেতাল্লিশ-ছোঁয়া প্রবীরের। সেই সন্ধ্যায় হার্ট অ্যাটাক— খেলার মাঠ থেকে মৃত্যুর প্রান্তরে পৌঁছে যেতে খুব বেশি সময় নেননি প্রথম বাঙালি টেস্ট খেলোয়াড় প্রবীর সেন।

অকালপ্রয়াত সেই ‘খোখান’ শতবর্ষ পূর্ণ করলেন আজ। তাঁর স্মৃতিতেই যে কলকাতায় প্রতি বছর পি সেন ট্রফির আয়োজন হয়, সে সংবাদ ক’জন‌ই বা রাখেন!

আরও পড়ুন