Marine Fossil

অক্টোপাসের প্রাচীনতম নিদর্শন ভেবে ভুল করেছিলেন বিজ্ঞানীরা! ৩০ কোটি বছর আগের সেই প্রাণী আসলে কী?

বয়স ৩০ কোটি বছর। এই জীবাশ্মটিকেই এত দিন মনে করা হত অক্টোপাসের প্রাচীনতম জীবাশ্ম। প্রায় আড়াই দশক ধরে এই ভুল ধারণাই রয়ে গিয়েছিল। এত দিনে জানা গেল, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সামুদ্রিক প্রাণীর।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১২ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৬
অক্টোপাস।

অক্টোপাস। — প্রতীকী চিত্র।

অক্টোপাস ভেবে ভুল করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। ধরে নেওয়া হয়েছিল সেটিই অক্টোপাসের প্রাচীনতম জীবাশ্ম। সেই ভ্রান্ত ধারণা ভাঙল এত দিনে। নতুন গবেষণায় দেখা গেল, সেটি আদৌ কোনও অক্টোপাস নয়। কিছু ক্ষেত্রে সাদৃশ্য থাকলেও এ হল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রজাতির প্রাণী।

Advertisement

যে জীবাশ্মটি নিয়ে কথা হচ্ছে, সেটি প্রায় ৩০ কোটি বছরের পুরনো। আমেরিকার শিকাগোর দক্ষিণে ম্যাজ়ন ক্রিক এলাকা থেকে এই জীবাশ্মটি পাওয়া গিয়েছে। ম্যাজ়ন ক্রিক এলাকায় যে এমন একটি জীবাশ্ম পড়ে রয়েছে, সে কথা বিশ্ববাসী প্রথম জানতে পারে আজ থেকে প্রায় আড়াই দশক আগে। ২০০০ সালে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে। সেই থেকে এক প্রকার ‘ভুল পরিচয়’ নিয়েই রয়ে গিয়েছিল জীবাশ্মটি। যদিও সন্দেহের অবকাশ তখন থেকেই ছিল। যা থেকে নতুন করে গবেষণার সূত্রপাত।

এত দিন বিজ্ঞানীদের একটি অংশ মনে করতেন, ৩০ কোটি বছর আগের ওই জীবাশ্মটিই অক্টোপাসের প্রাচীনতম নিদর্শন। এত আগে আর কোনও অক্টোপাসের জীবাশ্মের সন্ধান মেলেনি। এমনটি এর ধারেকাছেও আর কোনও জীবাশ্ম পাওয়া যায়নি। ৩০ কোটি বছরের পর দ্বিতীয় সবচেয়ে প্রাচীন উদাহরণ মিলেছে ৯ কোটি বছর আগে। এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানেই প্রথম খটকা লাগে বিজ্ঞানীদের। সন্দেহ জাগে, তা হলে ৩০ কোটি বছর আগের যে জীবাশ্মটি রয়েছে, সেটি অক্টোপাসেরই তো?

এই খটকা কাটানোর জন্যই ইংল্যান্ডের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অমেরুদণ্ডী প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপক টমাস ক্লেমেন্টস এবং তাঁর সহযোগীরা নতুন করে গবেষণা শুরু করেন। তাতে দেখা যায়, এটি আসলে গভীর সমুদ্রের সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রজাতির প্রাণীর জীবাশ্ম। গবেষকদের দাবি, এটি এক ধরনের নটিলোয়েড (মোলাস্ক গোত্রের খোলসযুক্ত প্রাণী। অক্টোপাসও মোলাস্ক গোত্রের, তবে অক্টোপাসের খোলস নেই)। এখন যে সব নটিলাস সমুদ্রে পাওয়া যায়, এই প্রাণী তাদেরও কোনও নিকটাত্মীয় বলে মনে করছেন গবেষকেরা। গত বুধবার ‘প্রসিডিংস অফ দ্য রয়্যাল সোসাইটি বি’ জার্নালে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে।

অক্টোপাস এবং নটিলাস উভয়েই গভীর সমুদ্রের প্রাণী। উভয়েরই কিছু মিল রয়েছে। যেমন উভয়েরই শুঁড় রয়েছে। দাঁতও রয়েছে। তবে দুইয়ের মধ্যে কিছু পার্থক্যও রয়েছে। অক্টোপাসের শুঁড়ে চোষক (সাকার) থাকে, নটিলাসের তা থাকে না। নটিলাসের শুঁড় তুলনামূলক ছোট। সবচেয়ে ব়ড় ফারাক হল— অক্টোপাসের খোলস থাকে না, নটিলাসের থাকে। অক্টোপাসের প্রতিটি শুঁড়ে সাত-নয়টি দাঁত থাকে। নটিলাসে সেই সংখ্যা আরও বেশি। এমন বেশ কিছু পার্থক্য প্রাথমিক গবেষণায় প্রযুক্তির অভাবে ধরা পড়েনি। সেই বিষয়গুলিই এ বার উঠে এল ক্লেমেন্টস এবং তাঁর সহযোগীদের নতুন গবেষণায়।

গবেষকদলের প্রধান ক্লেমেন্টসের কথায়, নটিলাসের মতো দেখতে এই প্রাণীটি মাটি চাপা পড়ার আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে পচেছিল। সেই কারণেই পচন ধরতে ধরতে জীবাশ্ম গঠনের সময়ে তা দেখতে অনেকটা অক্টোপাসের মতো হয়ে গিয়েছিল। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই ২০০০ সালে গবেষকেরা মনে করেছিলেন, সেটি সম্ভবত অক্টোপাস জীবাশ্মের প্রাচীনতম নিদর্শন। কিন্তু তখন থেকেই বিজ্ঞানীদের একাংশ এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছিলেন। কারণ অক্টোপাসের জীবাশ্মের ক্ষেত্রে শুঁড়ের দৈর্ঘ্য এবং আকৃতি যেমন হওয়ার কথা ছিল, ম্যাজ়ন ক্রিক থেকে পাওয়া ৩০ কোটি বছর আগের জীবাশ্মটি তেমন ছিল না।

ক্লেমেন্টস এবং তাঁর সহযোগীরা প্রথমে ওই জীবাশ্মটি বিশ্লেষণ করার জন্য ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করেন। কিন্তু তাতেও কিছু ধরা পড়ছিল না। জীবাশ্মটি যে অক্টোপাসের নয়, সেই সন্দেহ ক্লেমেন্টসদের মনে ছিলই। তবে সেটি আসলে কীসের জীবাশ্ম, তা স্পষ্ট হওয়ার জন্য আরও তথ্যের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু প্রযুক্তিগত বাধার জন্য দীর্ঘ সময় এই গবেষণায় কিছুই দিগ্‌নির্দেশ মিলছিল না। সিএনএন-কে ক্লেমেন্টস বলেন, “একটি পর্যায়ে আমরা কোনও দিকেই এগোতে পারছিলাম না। আমরা খুব হতাশ হয়ে পড়েছিলাম।”

তবে পরে মুশকিল আসান হয় ‘সিনক্রোট্রন ইমেজিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করে। রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি, এটি হল এমন এক ধরনের ইমেজিং কৌশল, যা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন এক্স-রে তৈরি করে। তাতে গবেষকদল একটি র‌্যাডুলা (দাঁতের সারিযুক্ত অঙ্গ, যা নটিলাসের খাদ্যগ্রহণের অঙ্গ) খুঁজে পান। গবেষকেরা জানান, জীবাশ্মটিতে প্রতি সারিতে অন্তত ১১টি দাঁত ছিল, যেখানে অক্টোপাসের মাত্র দাঁত থাকে সাত বা ন’টি। ক্লেমেন্টস বলেন, “এই ছোট ছোট দাঁতগুলিই আমাদের ধরিয়ে দেয় যে এটি কোনও অক্টোপাস ছিল না।”

Advertisement
আরও পড়ুন